বিসর্জন হোক না হোক আজ বিজয়া

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



বিসর্জন হোক না হোক আজ বিজয়া। কিছু কথা বলি? আপনি বুঝি নাস্তিক? তাহলে এই স্ট্যাটাস হয়ত আপনাকে বিদ্ধ করবে। মার্জনা চাইছি। আপনি ইচ্ছে হলে পুরোটা না-ও পড়তে পারেন। শুধু আলিঙ্গন দিন। পরে দেখা হবে।
.
দুর্গাপূজায় প্রণাম করা মুসলমানকে দেখে আমাদের মন ভরে যায়। ঈদে অংশ নেওয়া হিন্দুকে দেখে আমরা আশ্বস্ত হই। ওঁরা নাস্তিক নন। ওঁরা সম্প্রদায় আর ধর্মের সীমাটাকে ভাঙতে পেরেছেন। কিন্তু এ নতুন কি? নতুন কিছু নয়। চিরকাল বহু মানুষ নিজের মুসলমান আর হিন্দু পরিচয়ের উপরে উঠতে পেরেছেন, পারবেন, সেটার জন্য তাঁদের মন্দির বা মসজিদ বা গির্জাকে অস্বীকার করতে হয়নি। আর চিরকাল কিছু দানব ধর্মের নামে পৃথিবীতে দূষণ ছড়ায়, ছড়াবে। ওই দানবরাই পৃথিবীতে ধর্ম আর সম্প্রদায়কে এক করে ফেলতে চায়, কিছুটা পারেও। ওরা কেউ কোরান পড়েনি, কেউ গীতা বোঝে না। সে জন্য কি আপনাকে নাস্তিক হতে হবে? ওটাই পথ বুঝি?
.
ধর্ম আর সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা ঘুলিয়ে ফেলেছেন, আস্থা আর আচারের মধ্যে যারা ঘুলিয়ে ফেলেছেন, তাঁরা হলেন নাস্তিক। মোল্লার দৌড় মসজিদ অবধি হতে পারে। নাস্তিকের দৌড় তাঁর চোখের বাইরেই নয়। চাকরি পাচ্ছেন না, অতএব ঈশ্বর নেই। বাবা অকালে মারা গেছেন, অতএব ঈশ্বর নেই। চারদিকে অরাজকতা, অতএব ঈশ্বর মৃত। একটি শিশুকে একজন উন্মাদ ব্ল্যাক ম্যাজিকের কারনে খুন করল, অতএব ধর্ম খুব খারাপ। কী সরল হিসেব, না? এত মেধা আপনার, কিন্তু এ ক্ষেত্রে আপনি সবচেয়ে সরল হিসেবটাই চান। হতে পারে আপনার হাতে চর্চার সময়টাই নেই। অথচ ভেবে দেখুন তো, আপনার মন খারাপের নাম আল্লা অথবা ঈশ্বর কিনা। আপনার পবিত্র ক্রোধের নাম ঈশ্বর নয় তো? আপনার বিশুদ্ধ বিদ্বেষের নাম ইশ্বর নয় তো? ওই কাপালিকের প্রতি আপনার যে আন্তরিক ঘৃণা, সেখানে ঈশ্বর নেই তো?
.
বাঙালির আনন্দের পরব, তাই আপনি দুর্গাপুজোয় আনন্দ করেন? তাই ঈদে অংশ নেন? বন্ধুরা বেরিয়েছে তাই সঙ্গে বেরোন? প্রতিমাকে নিছক শিল্পবস্তু হিসেবে দর্শন করেন? সত্যি? ঈশ্বর নেই সেই প্রমাণ আপনি পাননি। বেশ। আপনার নাস্তিকতা যে আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট, ফ্যাশন, বা ভন্ডামি নয় প্রমাণ করতে পারবেন? চরম বিপদ যখন আসে, আপনি নড়ে যান না তো? যদি তাই হয়, ঢের সম্মানের হবে, তার চেয়ে সগর্বে বলুন, আপনি আস্তিক। দুর্গা আসলে কে ছিলেন, আর্যসভ্যতায় তাঁর ভূমিকা কী, যিশু আসলে কেউ ছিলেন কিনা, তিনি কেমন ফার্নিচার বানাতেন, মহম্মদ দেখতে কেমন ছিলেন- এসব অবান্তর। আজ আর তাঁদের ব্যক্তিস্বরূপ বা বস্তুস্বরূপ খুঁজে পন্ডিত ছাড়া কারও লাভ নেই, তাঁরা একটা জ্যোতিঃপুঞ্জে পরিণত হয়েছেন- তা গড়া হয়েছে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের আস্থা ও আনন্দ মিলিয়ে। সেটাকে প্রণাম করুন, নিজেকে যুক্ত করুন নিজের স্রোতে। লুকিয়ে চুরিয়ে চারদিক দেখে নিয়ে পেন্নাম করবেন না, মনে মনে পেন্নাম করবেন না। আর যদি সত্যিই নাস্তিক হন, ‘চতুরঙ্গ’-র জ্যাঠামশাই হয়ে দ্যাখান, নিজের জীবনটাকেই মন্দির করে তুলুন, নাস্তিকতা স্বয়ং একটা ধর্ম হতে পারে, জীবনধর্ম, তবে সেক্ষেত্রেও আপনি একজন ধার্মিক, হয়ত আরো বেশি।
.
ভেবে দেখুন, পৃথিবীতে ওই মৌলবাদীরাই আসল নাস্তিক। ওরা কোনো ‘হ্যাঁ’ মানেনা, ওদের পুরোটাই ‘না’। ওরা জানে পৃথিবীতে ঈশ্বর বলে কিছু নেই, আল্লা বলেও কিছু নেই। ওরা জানে ঈশ্বর থাকলেও তিনি ক্ষমতাহীন, এমনকি ওদের চেয়েও। তাই ওরা কেউ কেউ ঈশ্বরের ধারণাটাকে ছিঁড়ে কেটে পতাকা বানিয়ে ফেলেছে, কেউ কেউ বানিয়েছে ধর্ষনের পরে নিজেদের বীর্য আর থুতু মোছার তোয়ালে। কোনোটা সবুজ, কোনোটা গেরুয়া।
.
শুভ বিজয়া বন্ধুরা। একজন হিন্দুর শুভেচ্ছা, প্রীতি, ও প্রণাম গ্রহণ করুন।

আপনার মতামত জানান