আদি’ কৃত্তিবাস বিষয়ক দুটো একটা কথা

বিশ্বজিৎ রায়

 



মাঝে মাঝে জানা কথাগুলো আরেক বার ঝালিয়ে নিতে হয় । ‘কৃত্তিবাস’ নামে যে পত্রিকাটির জন্ম হয়েছিল ‘১৯৫৩ সালের বর্ষাকালে’ তার নাম ঠিক করে দিয়েছিলেন সিগনেটের কর্ণধার দিলীপকুমার গুপ্ত । উনিশ-কুড়ি বছরের তরুণেরা কবিতা লেখার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন এই পত্রিকাটি ছিল তাঁদের সেই স্বপ্নের তরণী, আদরের নৌকাও বলা চলে । এই উদ্যোগের মধ্যে দিলীপকুমার গুপ্তের সহযোগ ছিল বলে পত্রিকাটি দেখতে খুবই সুন্দর হয়েছিল ।‘মূল্যবান কাগজ, পরিচ্ছন্ন মুদ্রণ, প্রতি পৃষ্ঠার ওপরে-নীচে ওয়েভ-রুল দিয়ে কবিতা ছাপার দৃষ্টান্ত’ তখন সুলভ ছিল না । কমবয়সী তরুণ কবিদের উদ্যোগে তাঁদেরই তাজা কবিতায় ভরা এই পত্রিকাটি ছিল ত্রৈমাসিক । দিলীপকুমারের সহযোগ মিললেও পুঁজির আগ্রাসন/ আনুকূল্য এই পত্রিকার কপালে জোটেনি, তরুণেরা তা চাননি । স্পর্ধা করার বয়স ছিল । পত্রিকা অনিয়মিত হয়ে পড়ত, বাজারে ধার শোধ হত না । কবে বেরুত ঠিক নেই । অনিয়মিত বেরুত, তবে তরুণদের এ পত্রিকা জাত খোয়াত না ।
স্বাধীনতা পরবর্তী কৃত্তিবাস ও কৃত্তিবাসীদের মেজাজের সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কল্লোল ও কল্লোলীয়দের বেশ মিল । অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোল যুগ’ যাঁরা পরেছেন তাঁরা সুনীলের কৃত্তিবাস সংক্রান্ত স্মৃতিকথা পাশাপাশি রেখে পড়তে পারেন । সেই রোজগার ও প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই, উল্লাস, প্রায় কবি লেখকদের কমিউনের স্বপ্ন দেখা । কবিতা লেখা ও সাহিত্য চর্চার সঙ্গে অনতি ত্রিশ কবি-লেখকদের অপ্রাতিষ্ঠানিক জীবন চর্চা ও চর্যার সম্পর্ক গভীর । সুনীলরা ‘কল্লোল পর্ব’ দেখেননি, তবে কল্লোল পর্বের বুদ্ধদেব বসু যখন পরিণত বয়সে ‘কবিতা’ পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা কবিতাকে বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছেন সেই পর্বের বুদ্ধদেবের সখ্য-সাহচর্য-সঙ্গ পেয়েছিলেন । ফলে শুধু কবিতার জন্য কিছু করার ইচ্ছে তাঁদের মধ্যে প্রবল হয়েছিল । কবিতার পাশাপাশি অবশ্য গদ্যও এসেছিল – ভাবা হয়েছিল গল্প কৃত্তিবাসের কথা । তবে কৃত্তিবাস যতটা কবিতার ততটা গল্প বা গদ্যের নয় ।
কৃত্তিবাসের সম্পাদনার দায়িত্ব নানা সময় নানা জনের হাতে গিয়েছিল । আদি কৃত্তিবাসীরা প্রবীণ হচ্ছিলেন। ফলে তরুণতর কারও হাতে পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হয় । ১৯৭৪-এ সুনীলের বাড়ির ছাদে কৃত্তিবাস নিয়ে মিটিং বসে । কৃত্তিবাস সাহিত্য মাসিক হিসেবে নব কলেবরে আত্মপ্রকাশ করবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । পরে সুনীল নিজেই স্বীকার করেন, ‘ কৃত্তিবাস নামটির সঙ্গে আমাদের প্রথম যৌবনের অনেক আকাঙ্ক্ষা, স্পর্ধা, স্বপ্ন ও স্বেদ মিশে আছে । লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ জীবন যেন মানায় না । একসময় সে নিঃশব্দে হারিয়ে গেলেই তার যৌবনবন্ত চেহারাটি আমাদের অবিকল মনে থাকে, নিহত বিপ্লবীরা যেমন কখনও বৃদ্ধ হয় না।’ এই উপলব্ধির ফল কী ? সুনীল জানিয়েছিলেন, ‘মাসিক কৃত্তিবাস বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিই এই অস্বস্তির জন্যই । কৃত্তিবাসের জীবনকাহিনী এখানেই শেষ।’
শেষ যে হয়নি টের পাওয়া যাচ্ছে । নানা রূপে প্রত্যাবর্তন ।
তবে কতগুলো প্রশ্ন অনিবার্য ।
অনতি ত্রিশ তরুণ কবিদের ‘স্পর্ধা, স্বপ্ন ও স্বেদ মিশে আছে’ কি ?
পুঁজির প্রতাপের বাইরে অনতি ত্রিশের তরুণেরাই কি এর পরিচালক ?
নবীন কিশোরের হাতে সব কিছু তুলে দেওয়া হয়েছে কি ?
প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে নেওয়া শক্ত নয় । ব্র্যান্ড, পুঁজি, অধিকারের কাহিনি, সাংস্কৃতিক জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করার আধিপত্যকামী বাসনা এসব সুনীলদের আদি কৃত্তিবাসের সহচর নয় । যাতে না হতে পারে তারই জন্য তো লিখেছিলেন তিনি ‘কৃত্তিবাসের জীবনকাহিনী এখানেই শেষ।’ এদিক থেকে সুনীলের এই স্বীকারোক্তি অসম্ভব সৎ বলে মনে হয় – সুনীল নিজে যেখানে ক্রমশই ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠেছেন তার আগেই যেন থামিয়ে দিতে চাইছেন ‘কৃত্তিবাসের জীবনকাহিনী’ ।
চেনা-জানা কথা মাঝে মাঝে ঝালিয়ে নেওয়া ভালো ।

আপনার মতামত জানান