‘এক অ্যাহেসাস’ - অসহিষ্ণুতা রিভিসিটেড

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

১. ‘ওরা বাই বার্থ টেররিস্ট। ওসব ব্রেনওয়াশ-টোয়াশ নয়, বলতে পারিস কেন শুধু ওরাই ব্রেনওয়াশড হয়’ ব’লে খানিক কেশে, কেন শীত আসছে না, এই সুপর্ণা মেয়েটি কে ...ব’লে টলে আবার ডিকটাম শোনালেন মিস্টার মধ্যবিত্ত ‘ওরা বাই বার্থ টেররিস্ট’। মাঝখান থেকে আমি লেগাসির পর লেগাসি ধরে চলে আসা রাজনীতি, দারিদ্র, শিক্ষাগত পপারাইজেশন – আসলে সমস্যার মুলে যে এইসব তা বলতে গিয়ে চাপা পড়ে গেছি। এরা, এসব শোনেনা। একমুঠো চাল ভিক্ষে ক’রে ইস্কুল চালানো সুকাই চাচা, পড়ব ব’লে কোরানশরীফ আনতে গিয়ে ‘একটু বসে যাও বাবা’ ব’লে পায়েসান্ন খাওয়ানো বন্ধুর আম্মিজান, এবছর বেশী ফলেছে তাই সেভাবে ফুলকপির দাম পাওয়া যাচ্ছে না ব’লে অসহায় হাসা বীরভুমের আমিনুল শেখ – এইসব সন্ত্রাসবাদীর জন্মমুহূর্তের সাক্ষী, আঁতুড়ঘরের সিসি টিভি ওই মিস্টার মধ্যবিত্ত। আমি ভিড় বাসে সামলে চলি। মিনি হ’লে কুঁকড়ে বসি অথবা বাঁদিকের সিটগুলোর দিকে সরে আসি। কে জানে, হয়তো রোজ দুবেলা ক’রে নোটস নিতে আসা বোনের বান্ধবী, দুদিন হেসেছিল ব’লে এককালে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম সেই মেয়েটি অথবা দূর থেকে বয়সী ইংগ্রিড বার্গম্যানের মতো লাগত যে বন্ধুর মা’কে – তারাই ফিসফিস ক’রে আমাকেই হয়তো বলছে – ‘পুরুষ, বাই বার্থ রেপিস্ট....’

২. চৌমাহার মোড়ে ঘরে ঘরে পুরুষ ঢোকানোর আব্দার করা ‘সাহেবি’ উচ্চারণ ভয়ের, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ের যে লোকগুলো ওই ফুটেজটায় হাততালি দিয়ে উঠল, তারা। এই উচ্ছ্বাসগুলোই অসহিষ্ণুতা। কালীঘাটে পুজো সেরে কথা না রাখা কমরেডের প্রতি পার্টিগত সংহতি রক্ষার অজুহাতে একবারের জন্যও প্রতিবাদী হতে পারে না যে বামপন্থী কণ্ঠ, সেই নীরবতাগুলোই অসহিষ্ণুতা। ছোটবেলায় ‘মুসলমান’ সিরিয়াল ‘ম্যায় দিল্লি হু’ চালানো হত না ব’লে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম যে ‘বাঙ্গালী’ (মানে ‘হিঁদু’) বন্ধুর বাড়ি, তার রোয়াক - কলতলা - বিছানাগুলোই অসহিষ্ণুতা। প্রতিদিন সকালের কাগজে সিপিএম কর্মীর রক্ত পাওয়ার আশায় ভ্যাম্পায়ারি বিবৃতি দিয়ে পরোক্ষে আমার বাবার মৃত্যুকামনা করা বিক্রি হয়ে যাওয়া অসুমনোচিত দুঃস্বপ্নকণ্ঠগুলোই অসহিষ্ণুতা। কালচারাল এনক্রোচমেণ্টের ফাঁদে না পড়ায় দৃঢ় অভিনেতাকে ইন্ডাস্ট্রি থেকে ক্রমশ একঘরে করে দিয়ে শেষমেশ দ্বিরাগমন করতে বাধ্য করাটাই অসহিষ্ণুতা। নিজের কালো হয়ে যেতে থাকা শরীরটার জন্য নয়, টি এস্টেটের যে লোকগুলো এখনও মরেনি তাদের আরেকটু বেঁচে থাকার জন্য সরকারি সাহায্য নেওয়া অভিনেতার চোখে জল আনা আত্মত্যাগ নিয়ে যে সংবাদপত্র বলে বসে ‘অবশেষে পথে এলেন চন্দন সেন’ গোত্রের অশ্লীল খিস্তি, সেই ধুত্তোর সম্পাদকীয়োচিত বেলেল্লাপনাটাই অসহিষ্ণুতা। আসলে এ এক অসুখ, যা নোয়াখালির ফরিস্তাকে দিয়ে কলকাতার এক উঠতি দেশনায়ককে ঠেস দিয়ে ব’লে বসায় ‘পার্ক সার্কাসের সার্কাস’, পট্টভির হার তাঁর নিজের হার মনে হয়, সুভাষের জয় তাঁর নিজের জয় হয় না। আমি নিশ্চিত মেয়ো রোডে ঠায় দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভুল বুঝতে পারেন মহাত্মা। মানুষ বোঝেনা। গ্রীক কবি জর্জ সেফেরিসের কথাটা মনে আসছে - ‘Statues are not the ruins, we are the ruins…’

৩. প্রিয় পাঠক, অসহিষ্ণুতা একটা চেইন – নিউক্লিয়ার ফিশনের মতো। আপনি ভাবছেন জাহির-কাইফদের তাড়িয়ে টিম ভারতকে বিশ্বকাপ দেবেন? আচ্ছা, তাড়ালেন। একসময়ে ছোট হয়ে যাওয়া পরিবারের নীচের ঘরে হোহো হাসবেন হার্দিক, দোতলায় তৈরি হবে কোঁকড়াঝড় – বোরো মিলিটারিরা ঝাঁঝরা করে দেবে আদিবাসীদের। ফরিদাবাদে ঘুমের মধ্যে দলিত রাজিন্দরের দু বছর আর নমাসের দুটো ফুটফুটে বাচ্চার গায়ে ঢেলে দেওয়া হবে ওপরতলার কেরোসিন, থুড়ি, চন্দমেত্ত। হরিয়ানার সোনপাধে পায়রা চুরির দায়ে পিটিয়ে মারা হবে দলিত কিশোরকে। খোলা রাস্তায় পোশাক পড়ার ফালতু অধিকারটাও হারাবে এস্টেটের মানুষদের আদিবাসী তকমা পাওয়ার আন্দোলনে যেতে গিয়ে গৌহাটির লক্ষী ওরাং কিম্বা ডাকাতির এফাইআর করতে গিয়ে নয়ডার গৌতম বুদ্ধ নগরের সুনীল গৌতমের পরিবার। আর তাতে বুদ্ধ না হাসলেও রাস্তার লোকেরা ফিকফিক হাসবেন সন্দেহ নেই। আসলে মানুষ কখনো দলিত হয়না, মনুষ্যত্ব দলিত। আর তারপর লড়াইটা খোলা শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নামবে। তখন তফাত শুধু পুরুষ বা নারীর। নারী হ’লে ব্যক্তিগত প্রত্যঙ্গ বিকিয়ে দেবে বিপরীত লিঙ্গের আইরিশ, কনুই বা পুরুষাঙ্গের দিকে। অথবা পুরুষ হ’লে প্ল্যাটফর্ম বা রেললাইন – চলবে যত্রতত্র ‘বিক্ষিপ্ত ঘটনা’, থুড়ি, ঠেলা। ব্যাটল অফ দ্য সেক্সেস। আসবে নিউক্লিয়ার ফ্ল্যামিলির কোল্ডব্লাডেড লড়াই। আসবে পিটার-ইন্দ্রানী-প্রথম পাতার টাকার খেলা। পড়ে থাকবে ওই ইংরাজি ছড়াটার মত একটা ফাঁকা ঘরে দড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর শেষ মানুষ। আর তারপর ক্রিস্টির সেই গপ্পটার মতো ‘and then there were none’. প্রিয় পাঠক, এটাই অসহিষ্ণুতার ফিউচার।

৪. প্রিয় শাহরুখ, আপনি ঠিক বলেছেন, দেশে কোনো অসহিষ্ণুতা নেই। প্রিয় আমীর, আপনিও নির্ভুল, দেশ থেকে চলে যাওয়ার কথা আপনি ভাবতেই পারেন। আসলে ওপর থেকে ভারত কেন, রুয়ান্ডা বা কমিউনিস্ট নিধনের সময়ে জাভা-সুমাত্রাকে দেখলেও সারে জাঁহাসে আচ্ছাই লাগে, কাছে এলে ক্ষতটা বোঝা যায়। সমস্যাটা আপনাদের নয়। সমস্যাটা গুজরাটের পাতান জেলার যে ছ’ মাসের বাচ্চা মেয়েটা ধর্ষিত হল, তার। সমস্যাটা রূপ কানোয়ারদের। আমি নিশ্চিত আত্মহত্যা বা গর্ভপাত জনিত মৃত্যু ব’লে চালিয়ে দেওয়া চেপে যাওয়া গুমখুন বা অনার কিলিংএর মধ্যে এগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভুল ক’রে ভাঙ্গা বাস থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাস্ট দুএকটা স্যাম্পল। আইসবার্গের ওপরের অংশ। আর কাগজে জায়গা না পাওয়া বাকি ৩/৪ ভাগটা, প্রিয় পাঠক, কেউ জানতে পারে না। ওদের কোনো দেশ ছাড়ার অপশন থাকে না। ওদের কোন দিলওয়ালে নেই।

৫. আর ওই পক্ষপাতগুলোও অসহিষ্ণুতা। হত্যার দাম কোথাও বেশি, কোথাও কম। দাভোলকর বা অভিজিত – কার খুনে আপনি বেশী প্রতিবাদী হবেন ঠিক করবে আপনি রাস্তার কোন দিক ঘেঁষে যান তার ওপর। উত্তরপাড়ার কাছে ভদ্রকালীর থ্যাতলানো দীপু শর্মাকে সযত্নে এড়িয়ে যায় তথাকথিত ওম্যান লিব। ছত্রপতির পড়ে থাকা মানুষগুলোকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে ২৬/১১ –র ক্যামেরা চলে যায় তাজ হোটেলের কুশীলবদের দিকে। প্যারিস নিয়ে ডিপি পাল্টায় যাদের, সিরিয়া-বেইরুট ছাড়ুন, টি এস্টেটের জন্য একফালি সবুজ প্রচ্ছদের জন্য আনচান করে না তাদের দরদিয়া দিল। নিকারাগুয়া নিয়ে মন কাঁদলেও আমলাশোলে কারা কারা দুবেলা খেতে পায় জানার চেষ্টা করেছেন কজন বামপন্থী? ঔরংজেব ইতিহাসের দুষ্টু ছেলে, অথচ ভাই শাহরিয়ার-খুরশিদ মির্জারদের মেরে নুরজাহানকে জেলে ভ’রে শাহজাহান ছলছল চোখের হিরো। নাকি তাজে টুরিস্ট টানার বিজ্ঞাপন? বাদ দিন। ঘরের নাম রাখুন সাহারানপুর - মুজফফরনগর - গোপালগড় - ত্রিলোকপুরী। ছেলে জিজ্ঞেস করলে বলুন এসবই তোকে বড় করার জন্য কখগঘ-এবিসিডি নেটওয়ার্ক, উঠে দাঁড়ানোর জন-গন-মন। এগিয়ে থাকে, এগিয়ে রাখে। না দাঁড়ালে ডিসেম্বরের বহুজাতিক পৌষ মেলার ছলছল চোখের পট বা ডোকরা শিল্পীরা কিছু না বলুক, প্রীতি জিণ্টারা রেগে যেতে পারেন।

যদি এগোতে না পারেন, তাহলে গুটি গুটি পায়ে হল থেকে বেরিয়ে পড়ুনন। এ ছবি আপনার জন্য না।

আপনার মতামত জানান