বিবেকানন্দ পড়বেন ? পড়ুন , তবে খোলা চোখে

বিশ্বজিৎ রায়

 




কাউকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে গেলে তাঁর মত জানা বোঝা চাই । বিবেকানন্দের ‘মত’ নানা কারণে আমাদের কাছে স্পষ্ট করে ধরা পড়ে না । এই ধরা না-পড়ার কারণ বিবেকানন্দের নানা লেখা আর কথাকে কেটেকুটে মহিমময় ‘বাণী’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে । বেশ বড়ো বড়ো করে সেই সব বাণী ছড়িয়ে দেওয়া হয় – এতে কিছু মানুষ বিবেকানন্দের প্রতি অনুরক্ত ও কিছু মানুষ তাঁর প্রতি বিরক্ত । অনুরক্তি ও বিরক্তি দুই যেন ‘একমাত্রিক’ বিপরীত ক্রিয়া ।
নির্ভেজাল অনুরক্তি ও বিরক্তি অতিক্রম করে বিবেকানন্দকে বোঝা ও পড়া দরকার । ফেলে দেবার মতো মানুষ তিনি নন, আবার দেবতাও নন । রক্তমাংসের এক যুবা-সন্ন্যাসী, দেশ-সমকাল ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাসচল ।
তাঁর নামাঙ্কিত প্রতিষ্ঠানের বাণী ও রচনা পড়ে তাঁকে বোঝা যাবে না ।
তাহলে কীভাবে পড়া উচিত বিবেকানন্দ ।
তাঁর নামে যে লেখাগুলি চলে সেগুলির জাত বিচার করে নিতে হবে । কোনটি মৌলিক বাংলা রচনা, কোনটি ইংরেজি বক্তৃতার অনুলিখন, কোনটি ইন্টারভিউ, কোনটি চিঠি তা আগে জানা চাই । ইংরেজি লেখাগুলি অনেক সময় পুরো লেখেননি, গুডউইন শর্টহ্যান্ডে নোট নিয়েছিলেন পরে দুজনে মিলে লেখার রূপ দিয়েছেন । বাংলা লেখাগুলি অধিকাংশ প্রকাশিত হয়েছিল ‘উদ্বোধন’ পত্রে । লেখার গোত্র বিচার করার পর সেগুলি সাল- তারিখের ক্রমে সাজানো চাই । তাহলে চিন্তার ধারাবাহিক রূপ ও বাঁকবদল টের পাওয়া যাবে । বিবেকানন্দের সঙ্গে সমকালীনদের ভাবনাস্রোতের তুলনামূলক আলোচনা জরুরি । বিদ্যাসাগর,বঙ্কিম, ভূদেব, রবীন্দ্রনাথ এঁদের ভাবাদর্শের সঙ্গে বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ মিলিয়ে দেখা চাই ।
মানুষটি কেমন ছিলেন তা জানা যাবে সমকালীন প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিকথা থেকে । বিবেকানন্দের দুই ভাই মহেন্দ্রনাথ ও ভূপেন্দ্রনাথের বিবেকানন্দ সম্বন্ধীয় লেখাগুলি খুবই কাজের । নিবেদিতার লেখা না পড়লে বিবেকানন্দ অধরাই থেকে যাবেন ।
বিবেকানন্দের অনুরক্ত-ভক্তদের পাশাপাশি যাঁরা বিবেকানন্দের ভাবনার সমালোচক যাঁরা তাঁদের লেখাও পড়া চাই ।
একটা চলনসই গ্রন্থ- তালিকা / রচনা- তালিকা তৈরি করা যাক ।

কীভাবে বিবেকানন্দের লেখার জাতবিচার করবেন তার জন্য
পুনর্‌ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় ( শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেকানন্দের নামে প্রচলিত রচনাগুলিকে ছটিগুচ্ছে ভাগ করেছিলেন । পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি গ্রন্থ ও তস্য বঙ্গানুবাদ, বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত ইংরেজি বক্তৃতা বা বক্তৃতার খসড়া ও তস্য বাংলা রূপান্তর, ভক্তসঙ্গে আলাপচারিতা, ভক্তবৃন্দের স্মৃতিচারণ ও তস্য অনুবাদ, বাংলা প্রবন্ধ ও তস্য ইংরেজি অনুবাদ, বাংলা-ইংরেজি কবিতা ও তস্য অনুবাদ, চিঠিপত্র)
বিবেকানন্দ কীভাবে পড়বেন? বিশ্বজিৎ রায়, বারোমাস, ২০১৪( শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা ও কমপ্লিট ওয়ার্কসের ভিত্তিতে এই বিভাজন করেছিলেন । করতে গিয়ে কালানুক্রমিক ভাবে লেখা সাজানোর ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হয়েছিল । সেই সমস্যার কথা এই নিবন্ধে আছে, আর আছে বিবেকানন্দ ছাড়া অন্যেরা কীভাবে ‘রূপান্তর’ ঘটিয়েছিলেন তাঁর লেখার সে বৃত্তান্তও ।)

বিবেকানন্দের নিজের লেখা পড়ার জন্য
স্বামী বিবেকানন্দ বাংলা রচনা সংকলন, বিশ্বজিৎ রায় সম্পাদিত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি (বিবেকানন্দের বাংলা রচনাগুলি কালানুক্রমে সাজানো আছে, লেখাগুলি সম্বন্ধে প্রাসঙ্গিক তথ্য দেওয়া হয়েছে, অনুসরণ করা হয়েছে বিবেকানন্দের জীবৎকালে ‘উদ্বোধন’ পত্রে প্রকাশিত পাঠ ।)
পত্রাবলী, উদ্বোধন কার্যালয় ( বিবেকানন্দ বাংলা ইংরেজি দু-ভাষাতেই চিঠি লিখতেন । ফলে পত্রাবলীর পাশাপাশি অদ্বৈত আশ্রম থেকে প্রকাশিত Letters রাখা চাই । বাংলা চিঠি বাংলায়, ইংরেজি চিঠি ইংরেজিতে পড়া দরকার।)
দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, অদ্বৈত আশ্রম ( শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালিকা মাথায় রেখে ইংরেজি রচনা পড়ার জন্য কমপ্লিট ওয়ার্কসের খণ্ডগুলি পড়া ছাড়া গতি নেই । বাংলার মতো ইংরেজি রচনার কোনও তথ্যনিষ্ঠ কালানুক্রমিক সংকলন এখনও প্রকাশিত হয়নি ।
বীরবাণী, উদ্বোধন কার্যালয় ( বিবেকানন্দের কবিতা পড়ার জন্য এটি পড়তে হবে । বেশ কয়েকবছর আগে বিবেকানন্দের ইংরেজি কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় । খুবই তথ্যসমৃদ্ধ সেই বইটির পরিবেশক ছিলেন যতদূর মনে পড়ছে দাশগুপ্ত । বইটি মুখ লুকিয়েছে হাতের কাছে নেই । এই বইতে বিবেকানন্দের সংস্কৃত পদ্যগুলিও ছিল । বীরবাণীর পাশাপাশি পার্থপ্রতিমের এই বই অবশ্য পাঠ্য ।)
সঙ্গীতকল্পতরু, শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত ও শ্রীবৈষ্ণবচরণ বসাক সম্পাদিত( বিবেকানন্দের করা এই সংগীত সংকলনটির খুবই চমৎকার প্রাসঙ্গিক তথ্য-আলোচনা সহ পুনর্মুদ্রণ করেছেন সর্বানন্দ চৌধুরী রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার থেকে ।)

বিবেকানন্দের কথামৃত
স্বামী শিষ্য সংবাদ, শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী, উদ্বোধন কার্যালয় ( রামকৃষ্ণের কথামৃত লিখেছিলেন শ্রীম, খুবই বিখ্যাত ও বহুপঠিত । তুলনায় শরচ্চন্দ্রের ‘স্বামী শিষ্য সংবাদ’ কম পঠিত, কিন্তু অবশ্য পাঠ্য । টাটকা তাজা মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে )

স্মৃতিকথা
স্মৃতির আলোয় স্বামীজী, স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয় ( নানাজনের স্বামীজী বিষয়ক স্মৃতিকথার সংকলন, প্রত্যক্ষদর্শীদের কথার ভারই আলাদা)
দ্য মাস্টার অ্যাস আই শ হিম, সিস্টার নিবেদিতা, অদ্বৈত আশ্রম (খুবই গুরুত্ব নিবেদিতার এই স্মৃতিচারণ, স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি নামের বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায় ।)
এছাড়াও পড়া যেতে পারে বিবেকানন্দের গুরুভাইদের স্মৃতিমূলক রচনা । অভেদানন্দ, অখণ্ডানন্দ দুজনের স্মৃতিকথা পড়া দরকার ।

বিবেকানন্দের ভাইদের রচনা
শ্রীমৎ বিবেকানন্দ স্বামীজীর জীবনের ঘটনাবলী, মহেন্দ্রনাথ দত্ত, দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি (খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত এই বইটি যে কী টাটকা আর তাজা বলার নয়)
লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ, মহেন্দ্রনাথ দত্ত, দি মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি( একই রকম তাজা লেখা)
Swami Vivekananda Patrot-Prophet, Bhupendranath Datta, Nababharat Publishers (বিবেকানন্দের এই ভাইটির মেজাজ-মর্জি মহেন্দ্রনাথ দত্তের থেকে আলাদা । দেশ-কাল-সমাজের প্রেক্ষিতে বিবেকানন্দকে বুঝতে চেয়েছেন।)
মঠ-মিশন
১৯০২ খ্রিস্টাব্দে বিবেকানন্দের প্রয়াণ, মঠ-মিশনের পূর্ণাঙ্গরূপ বিবেকানন্দ নির্মাণ করে যাননি, তাঁর পরিকল্পনা ও নির্দেশিকা অবশ্য ছিল, তা মাথায় রেখে গুরুভাইরা নিজেদের ভাবনাকে রূপায়িত করেছিলেন । মঠ-মিশনের ইতিহাস না পড়লে তাই বিবেকানন্দকে বোঝা মুশকিল । দুটি বই এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ।
রামকৃষ্ণ মঠের আদিকথা, স্বামী প্রভানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়
History of the Ramakrishna Math and Mission, Swami Gambhirananda, Advaita Ashramsa
খেয়াল করুন, বিবেকানন্দের জীবনী বিষয়ক কোনও বই এ তালিকায় দেওয়া হয়নি । এই বইগুলি থেকে পাঠককে বিবেকানন্দের জীবনবৃত্তান্ত সাজিয়ে নিতে হবে । তথ্যের জন্য সাহায্য নিতে পারেন কয়েকটি বইয়ের ।

বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ,শঙ্করীপ্রসা বসু, মন্ডল বুক হাউস
Swami Vivekananda in the West/ New Discoveries, Marie Louise Burke, Advaita Ashrama
শঙ্করীপ্রসাদ ও বার্ক দুজনেই খণ্ডে খণ্ডে লেখা বইগুলিতে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছেন কিন্তু দুজনেই ভক্ত, বিশ্লেষণী দৃষ্টি যেন ভক্তিতে আচ্ছন্ন । ফলে বই-দুটি পড়ে পাঠককে নিজের মতো করে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে তথ্যটুকু গ্রহণ করতে হবে ।
বিবেকানন্দের জীবনবৃত্তান্ত নির্মাণের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে শঙ্করীপ্রসাদ সম্পাদিত Swami Vivekananda in Contemporary Indian News- এর খণ্ডগুলি । প্রকাশক রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার ।

এভাবে বিবেকানন্দ সম্বন্ধে খানিক তথ্য সংগ্রহের পর পড়া উচিত বিবেকানন্দ সমালোচকদের লেখা । বিবেকানন্দের ভাবনায় ‘স্ববিরোধ’ আছে ও বিবেকানন্দ ‘মতলববাজ’ এই দুই ধারায় বিবেকানন্দের বিরোধীরা মূলত সরব । ভাবনার স্ববিরোধ উনিশ শতকের অনেক চিন্তকের মধ্যেই ছিল, বিবেকানন্দও তার ব্যতিক্রম নন । স্ববিরোধ না-বলে টানাপোড়েন বা উভবলতা বলা চলে । বিবেকানন্দের চিন্তার স্ববিরোধ/ উভবলতা নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন আশীষ লাহিড়ী, নিরঞ্জন ধর । রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় বিবেকানন্দকে ‘মতলববাজ’ বলে দেখাতে চেয়েছেন – তাঁর এই মতামত খানিকটা একপেশে । ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে সুমিত সরকার ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডল নিয়ে আলোচনা করেছেন । ইন্দিরা চৌধুরী বিবেকানন্দের পৌরুষের ধারণার নির্মাণের কার্যকারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন । শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেকানন্দের ভাবনা কেমন করে হিন্দুত্ববাদীদের হাত শক্ত করতে পারে তা নিয়ে যুক্তি সাজিয়েছেন । এই সব চিন্তা দিয়ে বিবেকানন্দকে যাচাই করুন ।
কাউকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার আগে পড়া দরকার, নির্বিচার গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান কি ভালো ! আরেকটা কথা, কাউকে সম্পূর্ণ গ্রহণ বা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান তো নাও করতে পারি আমরা । কেই বা আর পুরো ‘ভালো’ বা পুরো ‘খারাপ’ ।






আপনার মতামত জানান