দেশপ্রেম ও শুভ সংলাপ

অনিমিখ পাত্র

 

কথাগুলো মাথার মধ্যে চাপ সৃষ্টি করছে। নাছোড় মাছির মতো ভনভন করছে। অস্বস্ত্বির ঘামের মতো বিজবিজ করছে। বাসি হয়ে যাবার আগে, লিখে মুক্ত হওয়া যাক।
মফস্বলে চাকরি করতে যাই। সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় অসহিষ্ণুতা, জে এন ইউ, কানহাইয়া কুমার, দেশপ্রেম, দেশদ্রোহিতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ ওঠে। উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের তফাৎ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব, বিজেপি-আর এস এসের সুচারু পরিকল্পনা এবং হিন্দু-তালিবানি শাসনের প্রাদুর্ভাব সম্বন্ধে বোঝাতে গিয়ে একঘরে হয়ে পড়ি। তারা কেউ JNU এর তথাকথিত রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানকারীদের মুন্ডচ্ছেদ চান, কেউ চান এই JNU বা JU এর মতো বিচ্ছিন্নতাবাদের (!) আঁতুড়ঘর বন্ধ করা হোক। এরা কেউ রাজনাথ সিং বা সাধ্বী প্রাচী নন।
এরা কিন্তু কেউ বিজেপি করেন না। কেউ কেউ আবার বাম সমর্থকও। এরা আমাদের দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষ। কোথাও একটা ভুল যে হচ্ছে টের পাই। বুঝি, রাজধানীর আপাত নিরাপত্তার মধ্যে বসে আমরা অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা দেখাতেই পারি। ফেসবুকের না -ছোঁয়া দূরত্ব থেকে ঠাট্টা- বিদ্রূপ -কার্টুন পোস্ট করাতেও গায়ে তেমন আঁচ পড়ে না। বিরুদ্ধমতের মন্তব্য ডিলিট করার সুযোগ আছে। কিংবা কোণঠাসা করবার সম্ভাবনা টের পেলে সমমনস্ক মানুষজনকে ট্যাগ করে ডেকে এনে বিরুদ্ধমত কে ধুনে দেওয়া যায়। সমর্থন আদায় করা সহজ। চ্যালেঞ্জ সেখানে যেখানে আপনি একা। যেখানে আপনার চিৎকার আপনার গলা বিরুদ্ধগর্জনে চাপা পড়ে যাবে। একটা গোদা এবং দাগিয়ে দেওয়া আবেগ এর কাউন্টার করতে হবে আপনাকে। তখন, হয় আপনি চুপ করে যাবেন। কিংবা তাদের সঙ্গে (একলা হওয়ার ভয়ে) সুর মেলাবেন। নিজের মতকে সাবোটাজ করবেন।
এই মানুষেরা আপনার চতুর্দিকে আছেন। এরা আপনার সহকর্মী। আপনার বন্ধুও। সময় সময় এরা বেশ ভালো মানুষ। তাহলে কী করবেন আপনি? তৃতীয় একটা রাস্তা আছে। পিছু না হটে নিয়মিত সংলাপে যাওয়া। বিশ্বনাগরিকতার বোধকে এরা বুদ্ধিজীবিদের ভাবালুতা বলে উড়িয়ে দেবেন। জাতীয়তাবাদের বিপদের মতো সূক্ষ্ম ও তাত্ত্বিক অথচ সর্বগ্রাসী একটি বিষয় সহজে স্থূল দেশপ্রেমের জাদুটোনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা, সস্তা ও সর্পিল রাজনীতির বিষে জর্জরিত হয়ে থাকা মানুষের মর্মে সহজে ঢুকবে না। ধৈর্য ধরতে হবে।

*
দেশ একটা বায়বীয় ধারণা। একে কংক্রিটভিত্তি দেয় দেশের পতাকা। সেনাবাহিনি। প্রতিবেশি দেশের প্রতি বিষোদ্‌গার এবং নিজের দেশকে শ্রেষ্ঠ কল্পনা করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর। ১৫ অগাস্ট উদ্‌যাপন ও তৎসহ দেশাত্মবোধক গান ( যদিও সকালে খানিক বাজার পরই পাড়ার মোড়ে মোড়ে ঐ একই চোঙা লুঙ্গি ড্যান্স কিংবা পাগলু দখল নিয়ে নেয় )। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ লাগলে তো কথাই নেই। কিংবা ক্রিকেট খেলা। দেশ মানে যে দেশের মানুষ সেটা অধিকাংশেরই খেয়াল থাকে না। ভারতবর্ষ মানে চোখ বুজে এক নিশ্বাসে বলুন তো কোন্‌ কোন্‌ রাজ্যের নাম মনে পড়ে? দেখবেন অরুণাচল প্রদেশের কথা আপনি ভুলেই গেছেন। আসাম বা মণিপুর যদিও বা মনে আসে মিজোরাম বা নাগাল্যান্ড কষ্ট করে মনে করতে হবে আপনাকে। ছত্তিশগড়ও সহজে খেয়াল হবে না। ভেবে দেখবেন, ঠিক এইসব প্রদেশগুলিতেই বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ওই যে আপনি ভুলে গেলেন, আর ওদের পেশীর জোরে মনে করাতে চাইলেন তুমি ভারতীয়, চলবে কেন? আন্দামান-নিকোবরকে যে শুধু বেড়াতে যাবার প্রয়োজনেই লাগে, সে কি ভারতের উপনিবেশ নয়?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলুন তো, সত্যিই চন্ডাল ভারতবাসী আপামর দলিত ভারতবাসী আপনার ভাই? ওই যে মূর্খ মুসলমান চাষী ময়লা লুঙ্গি পরে নামাজ করে উঠল সে আপনার আপনজন? ওই যে লোকাল ট্রেনে যে লিকলিকে ছেলেটি পিঠে মোটা একটা লাঠি দিয়ে নিজেকে মারে ভাবলেশহীন আর তার পর হাত পেতে দাঁড়ায় আপনার সামনে আর আপনি মুখ ঘুরিয়ে নেন, সে আপনারই ভারতমাতার সন্তান? আপনি যখন স্থানীয় রাজনৈতিক গুন্ডার দাদাগিরি মেনে নিলেন আপনার বিদ্যালয়প্রাংগণে, যখন আপনি গণটোকাটুকির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন না, দেশদ্রোহিতা করলেন না আপনি? ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের হাতে ভারতবর্ষ একটু একটু তৈরি হয় রোজ। প্রতিটি অন্যায়ের সঙ্গে, আপনার ব্যক্তিগত প্রতিটি আপোষের সংগে সঙ্গে আপনার দেশ একটু একটু আহত হতে থাকে। যখন আপনি ধর্ষণকারীর শাস্তির দাবির বদলে মেয়েটির পোশাকের দিকে আঙুল তুললেন, দেশদ্রোহিতা করলেন, মানবদ্রোহিতা করলেন। বয়স্ক মানুষটিকে ধাক্কা মেরে লাইন ভেঙে আগে উঠে পড়লেন অটোতে আপনি তখন দেশদ্রোহী। সাদা চুনকাম করা দেওয়ালে এই যে পানের পিক ফেলে নোংরা করলেন, দেশের ক্ষতি করলেন আপনি। ছত্তিশগড় সরকার আইন করে আদিবাসিদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নিল। এইভাবেই আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আদিবাসি রেড ইন্ডিয়ানদের ঠকিয়ে তাদের পরবাসী করেছিল ইউরোপের সাহেবরা। তাহলে আপনি কে? আসল ভারতবাসী কে?
*
এই প্রশ্নগুলি ধীরে শান্তভাবে প্রতিদিন করা প্রয়োজন আজ। এই যে মূল ভূখন্ডের অধিবাসী মূলস্রোতের মানুষ ( এই মূল ভূখন্ড শব্দবন্ধটিই অনেকটা অন্ধকারকে তর্জনি তুলে দেখায় ), এরাও কিন্তু অসুখে আছেন। প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের মারে আর হিংসার ভোটবাক্সের রাজনীতির ফেরে ‘দ’ হয়ে থাকা মানুষের ভুলে থাকার জন্য খেলনা চাই। দেশপ্রেমের মদ চাই। ধর্মের আফিম চাই। রাষ্ট্র যেমন বোকাবুদ্ধির ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত শোষণ চাপিয়ে দেয়, এরা নিজেরাও নিজেদের ঠকান। এরা ভালো থাকার ভাণ করতে চান। রাষ্ট্রও বলে তুমি ভালো আছো। এই ভাণে ভর্তুকি দেয়। দেশ আমার- এই ভেবে এরা নকল একটা ক্ষমতার আস্বাদন চান। শক্তের ভক্ত এরা। লাথি ঝাঁটা খাই, তবুও তো আমারই ফ্যামিলি। বাঁকা হোক, তবুও আমার। ইতিহাসে আমাদের রুচি নেই। মাত্রই ক’বছর আগে ভারতের ম্যাপটাই ছিল অন্যরকম- পাকিস্তান, বাংলাদেশ সবটাই ছিল সেই ম্যাপে। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা চলে গেলে যে তা প্রতিবেশি দেশগুলির মতই ভয়ঙ্কর অরাজক হবে সেও আমরা সহজে ভাবতে পারি না। প্রকারান্তরে কি তালিবানরাজকেই আমরা স্বাগত জানাচ্ছি? পারভেজ মুশারফের জন্ম হয়েছিল দিল্লীতে আর আদবাণীর জন্মস্থান করাচি। তবুও তো যুদ্ধ হল! বিজেপি ক্ষমতায় এলেই যে এরকম হয়, মোদি সরকারের ক্রমাগত অপদার্থতাকে ঢাকতেই যে দেশপ্রেমের সুপরিকল্পিত জিগির এটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধি খরচের দরকার হয় কি? অপেক্ষা করুন, আবার একটা ভারত-পাক যুদ্ধও হয়তো আসবে।
*
সাধারণ মানুষ সহজ বাইনারিতে সব ছকে নেন। আমার দেশ ভালো, বাকিরা খারাপ। আমরা যেহেতু JNU কিংবা যাদবপুরে পড়িনি ওগুলো বদমাইশির আখড়া। ওইসব মুক্তচিন্তা মুক্ত পরিবেশ আমরা পাইনি, ওদেরও পাওয়ার দরকার নেই। আমাদের প্রতিবেশি দেশে হয়তো এরকমই, উল্টোভাবে। এই কারণেই বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার ব্লগাররা মরলে আমরা প্রতিবাদ করি। কিন্তু এদেশের কালবুর্গি বা রোহিত ভেমুলার বেলায় স্পিকটি নট।
আমাদের বেশির ভাগের ভেতরেই কিন্তু বিভেদকামিতার এক শয়তান থাকে। অনুচিতের বোধ ও শুভবুদ্ধির মোড়ক ফুঁড়ে সে সুযোগ পেলেই ঠেলে বেরোতে চায়। নির্মূল করা কঠিন, ভীষণ কঠিন। তাহলে পথ কি? স্মৃতি ইরানি কিংবা কন্ডোম গোনা বিজেপি বিধায়ক মাথাব্যথার মূল কারণ নন। এরা বেশিদিন থাকবেন না। জনতা থাকবে। এই যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে আলোকপ্রাপ্ত ছাত্রদের সঙ্গে, ধর্মান্ধতাবিরোধী ও চিন্তাশীল অংশের সঙ্গে আমজনতার একটা অংশের, এটা দুরপনেয় নয়। প্রথমেই দৃঢ় গলায় বলতে হবে, আমরা যে কোনোরকম সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। ভারত টুকরো টুকরো হয়ে যাক- এই স্লোগান যদি কেউ দিয়ে থাকে তাদের আইন মোতাবেক শাস্তি হোক। আমরা বিশ্বনাগরিকত্ব অর্জন করতে চাই বটে, আদর্শ দেশের আদর্শ নাগরিকের সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, কিন্তু আমরা একইসঙ্গে গভীরভাবে দেশপ্রেমিক। আমাদের প্রকাশভঙ্গী আলাদা। সরকার নয়, অন্ধ পচা নিয়মকানুন না, আমাদের দায়বদ্ধতা দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি, নিপীড়িতের প্রতি একটু বেশি পরিমাণে। বাণী নয়, নামের প্রতি আনুগত্য নয়, বঞ্চিত মানুষের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। সময়ে সমস্ত চক্রান্ত ফাঁস হবে। আমরা শাস্তি চাই কফিন নিয়ে দুর্নীতিকারীদের, কর ফাঁকি দেওয়া শিল্পপতিদের, দাঙ্গাবাজ ও ধর্ষণকারীদের, মণিপুরের মায়েদের চোখের জলের অপমানের বদলা চাই। আমাদের দেশের প্রান্তিক ও নিরক্ষর অনেক মানুষ তাদের দেশের নামই বলতে পারবেন না, কেন, সে প্রশ্নের জবাব চাই। প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাজ এমনই হওয়া উচিৎ।
*
ছাত্রদের কোনো শক্তিই অঙ্কুশ দিয়ে বাঁধতে পারবে না। পৃথিবীর ইতিহাস তার সাক্ষী। ছাত্ররা লড়বেন। কিন্তু আমরা যারা দিল্লী বা যাদবপুরে নেই, নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে, মেলামেশার বৃত্তে, বন্ধুদের পরিচিতদের মধ্যে, আসুন আমরা এই সংলাপটা শুরু করি। কথোপকথনের মধ্য থেকেই বিপদগুলি চিহ্নিত হবে। আমরাও অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি কিনা, সমস্ত মত শুনতে পারার ধৈর্য্য দেখাতে পারছি কিনা, পরীক্ষা হোক। আজ হয়নি, শুভবুদ্ধির জয় কালকে হবেই। এই পৃথিবীকে আগামীর বাসযোগ্য করে যেতে হবে আমাদেরই।

আপনার মতামত জানান