ধূসর নক্ষত্রের দেশ

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

 

৪ঠা জুলাই, ১৯৩৪। ইতিমধ্যেই নাৎসি দল আর হিটলারের প্রতি অসন্তোষ থেকে দেশ ছেড়েছেন একের পর এক সাহিত্যিক—বিদ্বজন। তাঁদের ধারণা যে ভুল ছিলনা সেসবের প্রমাণ মিলছে একেক করে। কুয়াশা সরে গেছে গতবছরের “রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকান্ড” থেকেও, বোঝা যাচ্ছে কাদের চক্রান্তে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল কমিউনিস্ট আর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’রা। তারপর দেশজুড়ে অসংখ্য ধরপাকড় আর গ্রেপ্তারে তৈরী হয়েছে এক “বিরোধীশূন্য” নতুন জার্মানী। কিন্তু থামেনি তাতেও! মাত্র দু’-তিনটে রাতের অন্ধকারে, নিজের দলের অন্দরে যে বিরোধিতার বীজ বেড়ে উঠছিল, সেরকম শতাধিক নেতা-সদস্যকে “Operation Hummingbird”-এর মাধ্যমে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। একচ্ছত্র ক্ষমতার দখল নিতে চ্যান্সেলর নিজের বহুদিনের সাথী “সমকামী” আর্নস্ট রোহম্’কেও রেয়াত করেননি। এসব হাজারো চিন্তা আসছে, আর অনুশোচনার আগুন ফাঁকা ঘরের ভেতর পুড়িয়ে মারছে এক কবি’কে। দেশ ছাড়া তো দূরের কথা, সাধারণ জার্মান জনগণের মত তিনিও একসময় সমর্থন জানিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী নাৎসি দলকে। শুধু তাই-ই নয়, ফ্যুয়েরারের প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য স্বাক্ষর করেছিলেন “Gelöbnis treuster Gefolgschaft” (বিশ্বস্ত আনুগত্যের শপথনামা)-তে, রেডিও’তে ভাষণ দিয়ে জানিয়েছিলেন বিগত ওয়েইমার রিপাবলিকের তুলনায় শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক ভালো, যোগ দিয়েছিলেন নাৎসিদের প্রাশিয়ান সাহিত্য অ্যাকাডেমী’তে, সেখানকার সর্বময় কর্তাও হয়েছিলেন। তবে আজ এত অনুশোচনা কিসের! কি এমন হয়েছিল সেইসময় যাতে গোটা বিশ্ব তাঁকে চিনেছিল এভাবে, “... publicly labelled a swine by the nazis, an imbecile by the communists, an intellectual prostitute by democrats, renegade by the emigrants and a pathological nihilist by religious”! এতটা খারাপও কি হতে পারে একজন মানুষ, যাতে তৎকালীন গোটা পৃথিবীটাই পরিণত হয় তাঁর শত্রুশিবিরে?



গটফ্রায়েড বেন। জন্ম প্রাশিয়ার ম্যান্সফিল্ডে, এক প্যাস্টর পরিবারে। বাবা গুস্তাভ বেন ছিলেন লুথারিয়ান ধর্মযাজক এবং বাড়িতে তিনি কঠোর নিয়মনীতি চালু করেছিলেন। এই কঠোরতা-ই শৈশবে তাঁর মধ্যে বপন করেছিল ঘৃণার বীজ। প্রায়শই বাবার ভয় থেকে বাঁচানোর জন্য বেন তাঁর ভাই-বোনেদের নিজের লেখা রূপকথার গল্প শোনাতেন। আরো এক অনন্য প্রতিভা ছিল তাঁর। যেকোনো মানুষকেই খুব সহজে খুশী করতে পারতেন তিনি। এর সবথেকে বড়ো প্রমাণ দিয়েছিলেন যখন লেখালেখি’কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকলেও মারবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে থিওলজি এবং বার্লিনের কাইজার উইলহেম্ অ্যাকাডেমী থেকে মিলিটারী মেডিসিন পড়েন, শুধুমাত্র বাবার মন রাখার জন্য। মিলিটারী ডাক্তারীর কাজে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তি আসতে থাকলে পড়াশোনা করেন প্যাথোলজি নিয়ে। মাত্র এক বছরের মধ্যে দু’শোরও বেশী শরীর ব্যবচ্ছেদ করে সাড়া ফেলে দেন বার্লিনে, লিখতে শুরু করেন এক নতুন ধরনের কবিতা। পচে যাওয়া শরীর, মাংস, রক্ত, জরা ও ব্যাধির প্রকোপে অসহায় অস্তিত্ব, রোগাক্রান্ত মানবতা নিয়ে অস্তিত্ববাদী বহিরঙ্গে গূঢ় শূন্যতাবোধ ফুটিয়ে তোলা-ই ছিল তাঁর কবিতার উদ্দ্যেশ্য, যা পরবর্তী সময়ে “Expressionism” নামে বিখ্যাত হয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের মৃত্যু (ক্যারোলিন বেন, যাকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন) এবং প্যাথোলজির বিবিধ অভিজ্ঞতা প্রতিভাত হতে থাকে তাঁর কবিতায়। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর প্রথম কবিতার বই “Morgue und andere gedichte” (মর্গ এবং অন্যান্য কবিতা) প্রকাশিত হলে শোরগোল পড়ে যায় জার্মান সাহিত্যমহলে। সমালোচনা, বিদ্রুপ আর বিস্ময় ঘিরে ফেলে তাঁর কবিতাচর্চাকে। বিতর্কের সাথেই আসে জনপ্রিয়তা এবং বহু মহিলা পাঠক ও কবি তাঁর প্রেমে পড়তে থাকেন (যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন এক্সপ্রেসনিজম্ ঘরানার ইহুদী কবি এল্স ল্যাস্কার স্কুল্যার)। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বেন প্রথমে বেলজিয়ান ফ্রন্টে পদাতিক সৈন্য হিসেবে যোগ দেন। তারপর মিলিটারী ডাক্তার হিসেবে কাজ করেন ব্রাসেলসে, কাজ করেন মিলিটারী বেশ্যালয়ের ডাক্তার হিসেবেও (তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই “Fleisch” (মাংস)-এ উপচে পড়েছে সেইসব অভিজ্ঞতা)। যুদ্ধশেষে দেশে ফিরে বেন শিরা ও চামড়ার রোগ নিরাময় নিয়ে পড়াশোনা ও চিকিৎসা শুরু করেন। যুদ্ধপরবর্তী ওয়েইমার রিপাবলিক’কে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন; কমিউনিস্টদের নিয়মনীতি বা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের অভিজাত “আমেরিকান ঘরানার” পুঁজিবাদকে তাঁর ভবিষ্যত জার্মানীর উপযুক্ত মনে হয়নি। সমর্থন করেছিলেন নিয়েৎজে’র নিহিলিস্টিক আদর্শে অনুপ্রাণিত ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’কে। শুধুমাত্র হিটলারের মন রাখা-ই নয়, এর সাথে জড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যানধারণা এবং এক গোপন অভিসন্ধিও। তাঁর ধ্যানধারণা স্পষ্ট হয় এই কয়েকটি লাইনেঃ “He who has money, lives long: he who has authority, can do no wrong: he who has might, establishes right. Such is history! Ecce historia!” আর অভিসন্ধি, ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে বেনের স্ত্রী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী এডিথ ব্রসিন মারা গেলে বেন প্রচন্ড একাকীত্ব এবং হতাশায় ভুগতে থাকেন। এই হতাশা আর একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতেই তিনি এগিয়ে যান এক অন্য দুনিয়ায়। নাৎসি রাজত্বের রাজকবি হওয়ার জন্য, “Expressionism” কে- রাজকীয় ঘরানা হিসেবে প্রতিস্থাপিত করার জন্য, আরো অনেক জনপ্রিয়তায় ডুবে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। তাই, ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দে যোগ দেন নাৎসিদের প্রাশিয়ান সাহিত্য অ্যাকাডেমী’তে। সেইবছরই তাঁর লেখা “Nach dem Nihilismus” এবং পরেরবছর “Der Neue Staat und die Intellektuellen” প্রবন্ধদুটি নাৎসিদের সমর্থন পায় এবং তার ফলস্বরূপ সেখানকার সর্বময় কর্তা হয়ে যান তিনি। এক অশুভ স্বপ্ন যেন ক্রমশ এগিয়ে যায় বাস্তবায়নের দিকে।



কিন্তু এরপর থেকেই মোড় ঘুরতে থাকে, আসতে থাকে হাজারো সমস্যা। তিনমাস, মাত্র তিনমাসের মধ্যেই বেন’কে সরিয়ে প্রাশিয়ান সাহিত্য অ্যাকাডেমীর সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ করা হয় হান্স ফ্রেডরিখ ব্লাঙ্ক’কে। ইহুদী প্রকাশনা সংস্থা থেকে বই বেরোনোর কারণে নিষিদ্ধ করা হয় তাঁর বই। নাৎসি সংবাদপত্র “Völkischer Beobachter” (জাতীয় পরিদর্শক) তাঁকে “ইহুদী রক্তের শুয়োর” বলে বিবৃতি দিলে নাৎসি দল বেন’কে নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। কোনোরকমে নিজের ও পূর্বপুরুষদের নথিপত্র দেখিয়ে সে সমস্যার সমাধান করলেও নিস্তার মেলেনা। এরপর ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে “Operation Hummingbird” বা “The Night of Long Knives”-এ একের পর এক দলেরই হিটলারবিরোধী লবির নেতা—কর্মীদের গুপ্তহত্যা শুরু হলে বেন ভয়বিহ্বল হয়ে পড়েন। বুঝতে পারেন, কোন বিষম পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন তিনি! সরাসরি বিরোধিতার পরিণাম ছিল মৃত্যু, তাই নীরবে নাৎসিদের থেকে দুরত্ব বাড়াতে থাকেন, কৌশলে আভ্যন্তরীণ আগুন এড়িয়ে যান “Wermacht” (সৈন্যদল)-এ যোগদান করে। কিন্তু সেভাবেও ধামাচাপা দেওয়া যায়না। ১৯৩৬ সালে এস.এস. ডিভিশনের ম্যাগাজিন “Das Schwarze Korps” (কালো সৈন্যদল) বেনের কবিতাকে “অধঃপতিত, ইহুদী মানসিকতার, সমকামী” কবিতা বলে সমালোচনা করে। প্রাণহানির আশঙ্কা গ্রাস করে গটফ্রায়েড বেন’কে। ইতিমধ্যে চিত্রশিল্পী উল্ফগ্যাং উইলরিখ্ তাঁর বইয়ে রীতিমত অকথ্য ভাষায় কিংবা বরীস ফ্রেইহের ভন্ ম্যুনখহসেন্ বেনের “ইহুদীসুলভ পদবী”-কে আক্রমণ করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। নাৎসি নেতা হেইনরিখ্ হিমলার সেইসময় বেনের পাশে দাঁড়ালেও তাঁর লেখালেখি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। হের্তা ভন ওয়েডেমেয়ার’কে বিয়ে, তার আত্মহত্যা এবং পরেরবছর ডাক্তার ইল্স কউল’কে বিয়ে করেও বেন তাঁর হতাশা, একাকীত্ব কিংবা তিক্ত নাৎসিভীতি থেকে রেহাই পাননি। হয়তো সেই আক্ষেপ থেকেই বলেছিলেন, “My youth is a scab: under it there is a wound that every day leaks blood. It disfigures me.”



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নাৎসি হেডকোয়ার্টার থেকে বেন’কে পূর্ব জার্মানীর গ্যারিসনে পাঠানোর নির্দেশ আসে। সেখানে গিয়ে তিনি কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতে থাকেন, নিজ উদ্যোগে কিছু বইও প্রকাশ করেন। কিন্তু আরো কিছু বিতর্ক অপেক্ষা করে ছিল তাঁর জন্য। যুদ্ধ শেষ হতেই মিত্রশক্তি তাঁর লেখা পুনরায় নিষিদ্ধ করে শুধুমাত্র নাৎসিবাদ’কে সমর্থনের জন্য। তবুও লেখা ছাড়েননি, ধরনে বদল এনে ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর লেখা থেকে ব্যান উঠলে এক নতুন গটফ্রায়েড বেনের আবির্ভাব ঘটে। আধ্যাত্মিক, স্থির, প্রশান্তিময় কবিতার বই “Statische Gedichte” (স্থিরতার কবিতা) প্রকাশিত হলে তিনি পাঠকমহলে সমাদৃত হন। “Ptolemäer” (টলেমী’র শিষ্য)-এর পর ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর আত্মজীবনী “Doppelleben” (দ্বিগুণ জীবন) প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে “জর্জ বুখনার পুরস্কারে” সম্মানিত করা হয়, ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে পান “ক্রস অব মেরিট পুরস্কার”। হয়তো পেতে পারতেন আরো অনেক পুরস্কার, কিন্তু তাঁর সাহিত্যপ্রতিভা চাপা পড়ে গেছিল তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের আড়ালে। কোনো ট্র্যাজিক নায়কের মত সবকিছু পেতে গিয়ে যেন কোনোকিছুই পাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। নাৎসিরা যেমন তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারেনি, তেমনি তিনিও সমকালীন বহু চিঠিতে নিজেকে “নাৎসি নন” বলে জানিয়েও গণ্য হয়েছেন একজন নাৎসি হিসেবে। ১৯৩৮ সাল থেকে তিনি ব্যক্তিগত চিঠিতে এমনই খোলাখুলি কথা লিখতে আরম্ভ করেছিলেন যে সেইসব চিঠি গেস্টাপো বাহিনীর হাতে পড়লে তাঁকে কনশেনট্রেশন ক্যাম্পেও যেতে হত। মানুষ এবং প্রাবন্ধিক বেন’কে নিয়ে হিটলারের রাজত্বে কোনো সমস্যা ছিলনা, কিন্তু কবি বেনের নৈরাশ্য, পচন, বিকৃতি কিংবা মানবিক দৌর্বল্যের দিকগুলো কোনোদিনই একটি মিলিটারী রাষ্ট্রের প্রতিভূ হয়ে উঠতে পারতো না। আজ, মৃত্যুর দীর্ঘ ৬০ বছর পর, একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাঁর সাহিত্যকর্ম স্বীকৃতি পেয়েছে; তাঁর নতুন ধারার কাব্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বহু নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তবু আজও তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে লেপটে আছে এক চাপা দীর্ঘশ্বাস। মরণশীলতার দুনিয়া যেন জানতে পারেনি একটি ধূসর নক্ষত্রের অস্তিত্ব। রয়ে গেছে এক অনতিক্রম্য দুরত্ব, স্থির।

আপনার মতামত জানান