ব্যাকইয়ার্ড ওয়াইল্ডলাইফ

বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

 




বিক্রমাদিত্য গুহ রায় কে চিনতে গেলে ড্রয়িংরুম, কম্পিউটার স্ক্রিণ থেকে একটু বাইরে আসতে হবে। পেশায় মাল্টিমিডিয়া এক্সপার্ট ও ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার শুনে যদি ভুরু কুঁচকোন তাহলে পুরো পরিচয়টা দিয়েই ফেলা যাক। ভদ্রলোক একাধারে প্রকৃতিবিদ ও সংরক্ষণবিদ। অন্যদিকে ফোটোগ্রাফার, সিনেমাটোগ্রাফার, কবি, লিরিসিস্ট, শর্ট ফিল্ম এবং নাটক নির্মাতা (‘বৃষ্টিরেল’ বলে একটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য যাদের ছবি কোলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব থেকে গ্রীস চলচ্চিত্র উৎসব অনেক সিলভার স্ক্রিণ আলো করেছে) , আর লেখক। ঘরের পাশের জন্তু জানোয়ার নিয়ে ভদ্রলোকের প্রথম বই “ব্যাকইয়ার্ড ওয়াইল্ডলাইফ”-এর প্রকাশক “টাইমস গ্রুপ”।
জিটক স্ট্যাটাসটিও স্বরচিত “Blessed are those with abortive memories. For they can only feel the orgasm of the moment and not the labour of remembrance.”
অসংখ্য প্রকৃতি এবং সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠনের, ফেসবুকে ৩০০০+ বন্ধুর চেনা মুখ এই মানুষটির সাথে এই অন্য ইন্টারভিউ।
আড্ডা মেরেছে কৌস্তভ।
বিক্রমদার (আমরা তাঁকে এই নামেই চিনি) সাথে বাংলার বুনো গন্ধ মেখে নেওয়া শুরু হোক।

কৌঃ আচ্ছা বিক্রমদা তোমার জি’টক স্ট্যাটাসটার মানে কি? অনেকদিন ধরে দেখছি, কিন্তু কাঁচা বুদ্ধিতে কুলোচ্ছেনা।

বিক্রমদাঃ জি’টক-এ আমার লিওনার্ড কোহেনের দু-তিনটে লাইন দেওয়া ছিল। তো আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু কৌশিক আমায় বললো তোর স্ট্যাটাসে খালি কোহেন, জীবনানন্দ- নিজের কিছু দিসনা কেন? তো সেই মুহুর্তে ওই লাইনটি আমার হাতের সামনে ছিল।আমারই লেখা একটা টুকরো। দিয়ে দিলাম।

কৌঃ বাংলা কবিতায় জীবনানন্দর পরে কেন কোনো স্ট্যাটাস আসেনা?

বিক্রমদাঃ না জীবনানন্দের পরে সে’রম যে খুব কারো কবিতা আমি পড়েছি তা বলা যায়না, হ্যাঁ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পড়েছি-তাঁর কবিতা নিয়ে হয়তো স্ট্যাটাস মেসেজ দেওয়া যায়, তার পরে কোনো কবিতা আমি সেভাবে রিয়ালাইজ করিনি, সেটা আমারই দোষ।

কৌঃ মানে পড়ে দাওনি – না না পড়ে?

বিক্রমদাঃ না আমি আনপড় টাইপের একটা লোক, বেশি কবিতা হজম করতে পারিনা। তাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পর আর এগোইনি।




কৌঃ এর পরের কোয়েশ্চেনটা একসাথে সেকেন্ড আর থার্ড কোয়েশ্চেন। দেখো লোকে তো অনেক জায়গায় যায়, বাঙালি শুরু করে পুরী, দিঘা, দার্জিলিং দিয়ে – আর বেশি পয়সা হয়ে গেলে আমেরিকা ইউরোপ ঘুরে নেয়। তো তুমি এতো কিছু ছেড়ে জঙ্গলে যাও কেনো?
আর পরের প্রশ্নটা হলো এতো জঙ্গলেই যদি যাও তা’লে জঙ্গলের ওপর বইটা না লিখে ঘরের আশেপাশের পশুপাখি নিয়ে কেনো লিখলে?

বিক্রমদাঃ এইখানে তোর একটা ভুল ধারণা আমি দূর করি। জঙ্গলে আমি যাই হয়তো বছরে দু’বার কি তিনবার। ইদানীং কালে দেখছিস হয়তো মাঝে মাঝেই (শেষ চার মাসে চারবার)। কিন্তু বইটা যখন লিখেছি এতো পরিমাণ জঙ্গলে যাওয়ার সুযোগ আমার ছিলনা। আর বইটার প্রথম পৃষ্ঠাটা পড়লে দেখতে পাবি, যে ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে গেলে জঙ্গলে যেতে হবে তার মানে নেই। সেটা দেখা ভালো, কিন্তু তার আগে তোমাকে জানতে হবে তোমার শহরে তোমার বাড়ির আশেপাশে ওয়াইল্ড লাইফ আছে। তাদেরকে যদি তুমি দেখতে শেখো, সেটাও জঙ্গলের থেকে কম উত্তেজক নয়।
এবার তোর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দি, আমি জঙ্গলে কেনো যাই-পুরী, দিঘা না গিয়ে। এর উত্তরে ওই, ভালোবাসা।
আর আমি যে শুধু জঙ্গলে যাই তা তো নয়, গ্রামে গিয়ে লোকের বাড়ি থেকে খেজুরের রসও খাই, আর বাউল মেলায় গিয়েও অনেক সময় রাত অবধি থাকি।

কৌঃ তো এই ভালোবাসাটা এলো কোত্থেকে? মানে আমি বইটা পড়েছি আমি জানি, কিন্তু যারা ইন্টারভিউটা পড়বে অনেকেই জানেনা।

বিক্রমদাঃ এতো বড় মারাত্মক প্রশ্ন, কারণ “যার যা’তে মজে মন কিবা নারী, কিবা ধন”।

কৌঃ কিন্তু তোমার কিসে মজলো?মানে কেন মজলো?

বিক্রমদাঃ এতো বড় কঠিন প্রশ্ন ভাই। আমি ছোটোবেলা থেকেই যেখানে আমি থেকেছি-কোলকাতার উপকন্ঠে একটা জায়গায়, যেখান থেকে দু’পা ফেললে কোলকাতা – দু’পা পিছনে গেলে চব্বিশ পরগণা।
তো সেখানে দিগন্তবিস্তৃত ঘাসের মাঠ পেয়েছি।বটগাছ, খেজুরগাছ, আমগাছ, কৃষ্ণচূড়া গাছ পেয়েছি।ঝিল পেয়েছি।তো এই জলে লাফিয়ে, জঙ্গলে দৌড়ে, গাছে উঠে শৈশবটা কেটেছে আর কি।তাই তখন থেকে যে যে উপাদানগুলোর মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়েছি-প্রত্যেকটা উপাদানের জন্য ভালোবাসা তৈরী হয়ে গেছে।গাছ, মাটি,বন,পোকা,মাকড়শা,ব্ াঙ,সাপ,টিকটিকি,পাখি।

কৌঃ আচ্ছা, কিন্তু তুমি ঘাস মাটি সংরক্ষণ না করে তা’লে পোকামাকড়-পশুপাখি সংরক্ষণে গেলে কেন?

বিক্রমদাঃ এটা ভুল তথ্য।আমি ঘাস,মাটি সংরক্ষণ করিনি তোকে কে বললো? যেমন আমি এইসময় প্রফেশনালি ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করছি। কয়েকটা বড়ো বড়ো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যান্ডস্কেপও ডিজাইন করেছি।সেখানে ঘাস মাটি নিয়ে প্রচুর কাজ আমাকে করতে হয় এবং আমার যেটা আল্টিমেট লক্ষ্য হচ্ছে এই ল্যান্ডস্কেপগুলোতে যে ধরণের মূলতঃ বিদেশী গাছ ব্যবহার করা হয়- আস্তে আস্তে সেই গাছগুলোকে প্রতিস্থাপিত করে যাতে বিভিন্ন দেশী গাছ ব্যবহার করা হয়।
আমার সাথে যে গার্ডেনাররা কাজ করছেন আমরা ল্যান্ডস্কেপে তুলসী গাছ,হলুদ গাছ, দেশীয় কাঁঠচাঁপা এগুলোকে ব্যবহার করছি-যেগুলোকে নেটিভ প্ল্যান্টস বলে সেগুলোকে ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে আমরা সংযোজিত করছি।

কৌঃ এবার একটা ভূগোল পরীক্ষা। আমরা তো মোটামুটি বাংলা ম্যাগাজিন আর আমার জঙ্গলের ব্যাপারে জ্ঞান না বলাই মঙ্গল। আমার কাছে বাঙলার জঙ্গল মানে ওপরে ডুয়ার্স আর নীচে সুন্দরবন। তো এইদুটো ছাড়া বাঙলায় উল্লেখযোগ্য জঙ্গল এবং তাদের প্রাণীভান্ডার নিয়ে কিছু বলো।আমায় কেউ জিজ্ঞেস করলেই আমি নীচে কুমির আর বাঘ এবং ওপরে হাতি আর বাইসন বলি।

বিক্রমদাঃ বাংলার খুব উল্লেখযোগ্য একটা বন্যপ্রাণীকে বাদ দিলি সেটা হচ্ছে গন্ডার।

কৌঃ দেখো আমি জলদাপাড়ায় একবার গেছিলাম এবং সেখানে হাতির পিঠে চেপে ঘুরতে ঘুরতে একটা গন্ডার ছাড়া আর একটা মশাও দেখিনি। মা বলেছিল ওটা পায়ে শিকল বেঁধে রাখা আছে।

বিক্রমদাঃ প্রাণীভান্ডার সম্বন্ধে যদি জানতে চাস তা’লে একদম উপর থেকে শুরু করি।
দার্জিলিং জেলাতে দুটো বড়ো জঙ্গল আছে। একটা হচ্ছে নেওড়াভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক আর একটা সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্ক।সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্ক আবার দার্জিলিং ছাড়াও অন্য একটি প্রদেশ সিকিমের মধ্যেও কিছুটা পড়ছে। তো এইদুতো জঙ্গলে বিভিন্নরকমের পাখি আছে।তার মধ্যে খুব উল্লেখযোগ্য হলো হিমালয়াল মোনাল,স্যাটার ট্র্যাগোপান, বিভিন্ন ধরণের সানবার্ড ইত্যাদি। আর যদি স্তন্যপায়ী বলিস, তো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্তন্যপায়ী হলো রেড পান্ডা। সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্ক রেড পান্ডার জন্য খুব বিখ্যাত। এছাড়া সান্দাকফুর উপরদিকে, সেটাকে বাঙলা বলবো না সিকিম বলবো আমি জানিনা- মিলিয়েই বলছি, বেশ কিছু অঞ্চল আছে- যেখানে স্নো লেপার্ডের রেকর্ডও আছে।
এরপর ডুয়ার্সের দিকে যখন আমরা নামি তখন একটি অত্যন্ত রহস্যজনক প্রাণী দেখা যায়-যেটা খুব কম মানুষ আজ পর্য্যন্ত দেখেছে-সেটা হলো ক্লাউডেড লেপার্ড বা বাদুড়ে চিতা।সেটা আকারে চিতাবাঘের চেয়ে অনেক ছোটো, একটা বড়োসড়ো বিড়ালের চেয়ে একটু বড়ো।

কৌঃ রহস্যজনক বলছো কেন?

বিক্রমদাঃ কারণ তার লাইফস্টাইলটাই খুব সিক্রেটিভ। সে অত্যন্ত রাতে বেরোয়, গভীর জঙ্গল ছাড়া দেখা যায়না। সাধারণ চিতাবাঘ অনেকসময় চা বাগান বা বস্তি এলাকায় দেখা যায়, বছরে দু-তিনবার হলেও। ক্লাউডেড লেপার্ড সেইভাবে মনুষ্য অধ্যুষিত এলাকায় অতোটা প্রবেশ করেনা এবং প্রাণীটা চলাফেরা এতোটাই নিঃশব্দে করার ক্ষমতা রাখে, যে মাথার ওপর দিয়ে একটা ক্লাউডেড লেপার্ড চলে গেলে তুই টেরও পাবিনা।

কৌঃ এদের হিংস্রতা কি কম চিতাবাঘের তুলনায়?

বিক্রমদাঃ সেটা যদি বলিস তা’লে তো মানুষের তুলনায় বলতে হয়।কারণ মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর হিংস্রতম প্রাণী।

কৌঃ না সেইটা বাদ দিয়ে?

বিক্রমদাঃ মানে মানুষ একশো হলে চিতাবাঘ এক।

কৌঃ আর চিতাবাঘকে একশো ধরলে?

বিক্রমদাঃ আমি চিতাবাঘের মধ্যে কোনো হিংস্রতা খুঁজেই পাইনা। হিংস্রতা কোথায় চিতাবাঘের?

কৌঃ যেটা জানতে চাইছি সেটা হলো এই ক্লাউডেড লেপার্ডের সিক্রেটিভ লাইফস্টাইলের কারণে শিকার করার দক্ষতা কি ইচ্ছে দুটোই কি কম?

বিক্রমদাঃ ধ্যাৎ। শিকার করার দক্ষতা কম হলে সে এতোদিনে বিলুপ্ত হয়ে যেতো।জ্ঞাতিগুষ্টি কিছু থাকতোনা।তোকে কিম্বা শিকারকে টের পাওয়ানোটা তো ওর লক্ষ্য নয়।ওর লক্ষ্য হচ্ছে নিঃশব্দে চলাফেরা করা, শিকার করে খাওয়া দাওয়া, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করে বড়ো করা – এই তো, আর কি।

কৌঃ আচ্ছা এছাড়া ডুয়ার্সে আর কি আছে?

বিক্রমদাঃ হ্যাঁ এরপরে তুই যা বললি হাতি এবং যেটাকে তুই বাইসন বলছিস সেটাকে আমি বাইসন বলিনা। ওনার ভারতীয় নাম হচ্ছে গউড়। G-A-U-R। হয়তো কোনো একসময় কোনো এক ইংরেজ সাহেব জঙ্গলে গিয়েছিলেন তার সামনে দিয়ে একটা গউড় রাস্তা পেরোচ্ছিল। তো তখন তিনি তার নেটিভ সঙ্গী ,গাইড বা বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ভাঙা হিন্দিতে – “ইয়ে কেয়া হ্যায়?” । তো সেই ভদ্রলোক বলেন “ভাঁইসা।”, হিন্দিতে যার মানে মোষ। তো সাহেব সেটা ‘বাইসন’ শুনেছিলেন, আর সেই নামটা রয়ে যায়।

কৌঃ এরপর বলো মধ্যবঙ্গের জঙ্গল নিয়ে জ্ঞান খুব কম।সেটায় সত্যি কি কোনো জঙ্গল আছে?

বিক্রমদাঃ মধ্যবঙ্গের জঙ্গলে যেটা পাই- সেটা মূলতঃ রাঢ়বঙ্গের জঙ্গল।এছাড়া মধ্যবঙ্গের জঙ্গল বলতে কিছু পর্ণমোচী জঙ্গল আছে। সেটা মানুষেরই তৈরী।বেথুয়াডহরি নদীয়ায়। কয়েকটা ছোটো ছোটো পকেট এরিয়া।এরকম কয়েকটা জঙ্গল আছে। স্বাভাবিক জঙ্গল যদি বলিস তো ওই রাঢ় অঞ্চলের জঙ্গল – অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গল ইত্যাদি।

কৌঃ মানে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিক।

বিক্রমদাঃ হ্যাঁ, কারণ পূর্ব দিকে যদি আসিস, সেই অঞ্চলটাতো পুরোটাই শহর, চাষের জমি, বাড়িঘর।সভ্যতা।

কৌঃ শহুরে সভ্যতা। যাই হোক। যাইহোক –যে জঙ্গলগুলো আছে সেখানে বন্যপ্রাণীর ভান্ডার কিরকম?

বিক্রমদাঃ প্রাণীভান্ডার আছে। কিন্তু মূল সমস্যাটা হলো দীর্ঘকাল ট্রাইবাল লোকজন এখানে থাকা এবং ট্রাইবাল উন্নয়নের নামে তথাকথিত সভ্য লোকেরা যেভাবে ব্যবহার করেছে – তাতে প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা হয়েছে এবং প্রাণীও মারা পড়েছে। এখানে লেপার্ড আছে তার চিহ্ন পাওয়া যায়।সজারু পাওয়া যায়, নেকড়ে পাওয়া যায়, ভাল্লুক পাওয়া যায়, হায়না পাওয়া যায় এবং একটা খুব মজার জন্তু পাওয়া যায় যার নাম প্যাঙ্গোলিন।এছাড়া ছোটো প্রাণীর মধ্যে বড়ো কাঠবিড়ালী, ছোটো কাঠবিড়ালী, বিভিন্ন রকম ভাম, খটাশ এগুলো পাওয়া যায়। আর পাখির সম্ভার প্রচুর।

কৌঃ সুন্দরবনে আর ঢুকছিনা। অন্য একটা কথা বলো – বাংলায় চোরাশিকারের পরিমাণ কিরকম?

বিক্রমদাঃ চোরাশিকার নিয়ে এইভাবে তথ্য দেওয়া খুব মুশকিল।সুন্দরবনের বেশ কয়েকটা অঞ্চলে সমস্যা আছে। যদিও প্রশাসন আমি বলবো বেশ প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে হরিণ মারা এবং বাঘ মারার চক্র সক্রিয় আছে।

কৌঃ বাকি জঙ্গলগুলোয়?মানে ডুয়ার্স কিম্বা রাঢ়বঙ্গে?তুমি একটু আগে যে সভ্য লোকেদের নিয়ে যে সমস্যার কথা বলছিলে,-

বিক্রমদাঃ না ডুয়ার্স এলাকায় চোরাশিকারীদের উৎপাত কম।আর উন্নয়নের ধাক্কার কথা তো বললামই।

কৌঃ এবার একটা গল্প শোনো। আমি জলদাপাড়ার কাছে একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে গ্রামের একজন মানুষের সাথে আলাপ হয় যে ওখানকার আদি বাসিন্দা। তিনি যেটা বলছিলেন তা হলো – তাদের জীবন ছিলো জঙ্গলনির্ভর। এখন জঙ্গলে ঢোকা নিষেধ হয়ে যাওয়ায়- তাদের অবস্থা খুব খারাপ।জঙ্গলের থেকে যে কাঠ পাওয়া যেতো বা শিকার পাওয়া যেতো তার আর কোনো ব্যবস্থা নেই।আমরা সংরক্ষণ নিয়ে যে এতো কাজ করছি-কিন্তু এদের কি কোনো সংরক্ষণ দরকার নেই? প্রশ্নটা অনেকদিন আগেই আমায় খুব হন্ট করেছিল। আর এরা তো তথাকথিত সভ্য মানুষ নয় – নিতান্ত গরীব মানুষ।

বিক্রমদাঃ তুই যে প্রশ্নটা তুললি সেটা সংরক্ষণের আগেও একটা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন।দেখতে হবে আমাদের রাষ্ট্র কি ভাবছে? সংরক্ষণটা এমন জিনিস সেটা সমস্ত প্রাণীকেই কভার করে। আর মানুষ এমন প্রাণী নয় যে তাকে সংরক্ষণ করবোনা|আর এই জঙ্গল বাঁচাবে কে? মানুষ বাঁচাবে।আর আদিবাসীরা সেটা কেনো বাঁচাবে – কারণ তার লাভ আছে। জঙ্গল ছাড়া সে নিজেও বাঁচবে না। এরম উদাহরণ আছে এবং সফল উদাহরণ আছে যেখানে চোরাশিকারীদের চেঞ্জ করে গাইড করে দেওয়া হয়েছে।
এবারে হচ্ছে আমার দেশ কি ভাবছে? সেইখানে যদি দেখিস, দেখবি খুব অদ্ভুতভাবে প্রত্যেকটা রাজ্যে আস্তে আস্তে নগরায়ণকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রত্যেককটা রাজনৈতিক দল এমন একটা প্রচার করছে – যেন শিল্পায়ণ করলেই, চারটে কারখানা, চারটে কলের স্থাপন করলেই দেশের উন্নতি হবে।
যে মানুষগুলো প্রথম থেকে জঙ্গলে আছে, জঙ্গলই যাদের জীবিকা তাদের হাতে কিন্তু জঙ্গল নষ্ট হয়না।একটা লোক কাঠ কেটে নিজের জীবন কাটাচ্ছিল। সে জানে যদ্দিন এই জঙ্গল আছে তদ্দিনই সে আছে।আর সে দিনে কটা গাছ কাটতো চারটে-পাঁচটা। এবার একজন শহুরে বাবু এলো বললো, “এইগাছটা মেহগনী-এটা থেকে ভালো আসবাব হয়-আমি কারখানা করবো-এটা দিনে দশটা করে কাটো”।কিম্বা যে অঞ্চলে কোনোকালে রাস্তা নেই-সেখানে রাস্তা করে উন্নয়নের লোভ দেখানো হলো,চারটে শহুরে লোক এলো আর জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র গেলো উচ্ছন্নে। আদিবাসী মানুষটাও লোভে পড়ে বেশি গাছ কাটতে লাগলো।এবার তুই যখন নিজের ড্রয়িংরুমে সেই কাঠের সোফাটায় বসবি তোর কিন্তু আর মনে পড়বে না- যে এই কাঠটা কিন্তু সেই হাসিমারার জঙ্গল থেকেই আসছে।
জঙ্গলের আদিবাসীদের হাতে কিন্তু জঙ্গল নষ্ট হয়না। অনেক সংরক্ষণবিদ এই কথাটা পড়ে হয়তো তীব্র আপত্তি জানাবেন।কিন্তু আসল সমস্যা এটাই।

কৌঃ বুঝলাম, আচ্ছা ইন্টারভিউটা খুব সিরিয়াস হয়ে গেল, এবার একটু এন্টারটেনিং করা যাক।বাদাবনের কুমীর বাদে (এই নিয়ে বিক্রমদার একটা ট্রেডমার্ক অভিজ্ঞতা আছে, সেটা জানতে হলে তাকেই জিজ্ঞেস করবেন।) তোমার আর কোনো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা আছে জঙ্গলে?

বিক্রমদাঃ জঙ্গলের সব অভিজ্ঞতাই স্মরণীয়।ওভাবে তো বলা মুশকিল।

কৌঃ না মানে লালমোহনবাবুর ভাষায় রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা?

বিক্রমদাঃ রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা যদি বলিস, শরীরের লোম তো শুধু ভয়ে খাড়া হয়না। তবে শোন।
সুন্দরবনে লোথিয়ান আইল্যান্ড নামের একটা দ্বীপ আছে। দ্বীপটা খুব অদ্ভুত, কারণ ওটা সাপেদের ডাম্পিং গ্রাউন্ড। যেখানে যতো সাপ ধরা পড়ে, অনেক সময়ই প্রশাসন থেকে তাদের জাত, প্রয়োজনীয় পরিবেশ বিচার না করে ওখানে ছেড়ে দেওয়া হয়।কেউ ওখানকার নেটিভ, কেউ নয়।বিভিন্নরকমের কচ্ছপও দেখা যায়। আর ম্যানগ্রোভ ফরেস্টটা খুব সুন্দর।
তো একবার সেখানে বিনা পয়সায় ঘুরে আসার একটা সু্যোগ এসে যায়।
প্রথম রাতে সাপ দেখে, কিছু ধেড়ে ইঁদুরের থেকে বেঁচে দ্বিতীয় রাতে লোথিয়ান আইল্যান্ডেরই দক্ষিণ দিকে চলে যাই মোটর বোটে করে। সেই জায়গাটাতে একটা বিরাট বড়ো ওয়াচ টাওয়ার ছিলো।সুন্দরবনের ওয়াচ টাওয়ারগুলো হলো খানিকটা সিঁড়ি উঠেছে, তারপরে একটা তলা। এইরকম দ্বিতীয় নাকি তৃতীয় তলায় আমরা বিছানাপত্র করে শুয়ে ছিলাম।
এমন সময় আমাদের দলের এক সঙ্গীর খাবারের জন্য কিছু হলুদ, নুন এইসব জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয়।তো ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দু’জন স্টাফ আমাদের সাথে ছিলো তাদের সাথে নিয়ে আমরা মোটর বোটে করে বেরোলাম। খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে বড়ো নদীতে পড়লাম। তারপর ওপাড়ে গেলাম। এবার যখন ফিরছি তখন দেখি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দু’জন স্টাফ আমাদের বললেন “আপনাদের একটা অদ্ভুত জিনিস দেখাবো। দেখবেন?” আমরা বল্লাম “হ্যাঁ দেখান। কি দেখাবেন?” ওনারা বল্লেন “জঙ্গলের দেওয়ালি দেখাবো। সময় আছে?”
তো বোটটা নিয়ে যে খাঁড়ি দিয়ে আমাদের ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়ার কথা, সেটা দিয়ে না গিয়ে অন্য একটা সরু খাঁড়ি দিয়ে ওনারা লঞ্চটা ঢোকালেন। এবার আস্তে আস্তে খাঁড়ি সরু হতে হতে,জঙ্গলে এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম যে বাইরে চাঁদের আলো আছে কি না- বোঝা যাচ্ছেনা। বোধহয় তখন চাঁদটা ওঠেওনি।তো এরমই একটা জায়গায় বোটটা নিয়ে গিয়ে ওরা বললো “এবার আমরা ইঞ্জিনটা বন্ধ করে দিচ্ছি”।নৌকাটা আস্তে আস্তে ভেসে যেতে লাগলো।অল্প অল্প জোছনা উঠলো কিছুক্ষণ পরে। জঙ্গলের মধ্যে আলোছায়া দিয়ে ভেসে যাচ্ছি।তার মধ্যে জলের ওপর ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ।জলের তলায় ঝিনুক থাকে। তো যেখানে জোয়ারের জলে তারা খটাশ খটাশ করে ঝিনুকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত মায়াবী একটা পরিবেশ।
সেইখানে গিয়ে একটা বাঁকের মধ্যে নৌকাটাকে দাঁড় করিয়ে দিলো। দেখলাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে কুড়ি ফুট দূরে-দুটো খলসি গাছ। সুন্দরবনে বিভিন্নরকম গাছের মধ্যে খলসি একটা গাছ। সেই গাছ বেশ বড়ো। এক একটা গাছ প্রায় কুড়ি ফুট লম্বা।ঝুপসি টাইপের গাছগুলো।সেই দুটো গাছের গায়ে -মাথায়- চোখে- কানে -নাকে কোটি কোটি জোনাকি। আলোয় আলোয় ঝলমল ঝলমল করছে। যেন পার্কস্ট্রীটের ক্রিসমাস ডেকরেশন, বা বড়ো পূজো প্যান্ডেলের আলো এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেই জলের ওপর বসে, জোনাকি আর খলসি গাছের জঙ্গলের দেওয়ালি কতক্ষণ দেখছিলাম খেয়াল ছিলোনা।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে মনে পড়লো একজন সঙ্গী অপেক্ষা করছে। আমরা জিনিসপত্র নিয়ে গেলে সে রান্না করবে, তারপর আস্তে আস্তে ফেরৎ এলাম।

কৌঃ এবার আমরা একটু জঙ্গল থেকে বেরোই। অনেক গভীর জঙ্গলে চলে গেছি।তোমাকে যা দেখেছি তুমি শুধু জঙ্গলসর্বস্ব নও। তোমার প্রথম বইটা যাদের নিয়ে তারা ঠিক বন্যপ্রাণী নয়, নাগরিক বন্যপ্রাণী বলা চলে।তাছাড়া তুমি গল্প লেখো। এককালে কবিতা লিখতে।ছবি তোলো।সিনেমাটোগ্রাফি করো। ব্যান্ডের জন্য গান লেখো এবং একটা চাকরিও করো। এতো কিছুর সময় পাও কি করে?আর একটা লেজুড় প্রশ্ন এতো কিছু করোই বা কেন?

বিক্রমদাঃ ভারী কঠিন প্রশ্ন কিন্তু ভারী সহজ উত্তর।সবকটা তো এক সাথে করিনা। সকালে দাঁত মাজি,তারপরে চান করি, বাস ধরি, অফিসে যাই। বেঁচে থাকার জন্য তো এতো কিছু করতে হচ্ছে।সেই এতো কিছুর সাথে যদি আর কিছু ‘এতোকিছু’ যুক্ত হয় তাতে ক্ষতিটা কি?

কৌঃ অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে না?

বিক্রমদাঃ হ্যাঁ। কিন্তু যে একশোটা নাড়ু পাকাতে পারে, সে দুশোটাও পারে এবং আমার মনে হয় সবাই পারে।

কৌঃ এর মধ্যে কোনটা সবচেয়ে আনন্দের কাজ?

বিক্রমদাঃ প্রত্যেকটা না আলাদা রকমের আনন্দ। তুলনা টানা খুব মুশকিল। আর জঙ্গলে যেতে যেতেও আমি কবিতা কি গান লিখতে পারি।রবি ঠাকুর তো বলেই গেছেন ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে, ফুলের গন্ধে পরশ লেগে উঠেছে মন মেতে।ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান। বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার প্রাণ’।
এগুলো সব ইন্টার রিলেটেড।

কৌঃ তাহলে তুমি শুধু বিস্মিত হতেই চাও?

বিক্রমদাঃ চাই। আসলে চারপাশের এই রং-ধর্ম-বর্ণ এগুলো তো এক একরকম মায়ার সৃষ্টি করে।সেই যে মায়ার জগৎটাকে অবহেলা করে আমরা ইঁটকাঠের জগতে বসে পড়ি।যখনই বিষন্নতা আসে, এই মায়াগুলো বাঁচিয়ে দেয় আমায়।

কৌঃ মানে অফিসের গেট দিয়ে ঢোকা আর বাইরে বেরোনোর পর যে পৃথিবীটা, সেইটাকে তার মতো উপভোগ করা দরকার?

বিক্রমদাঃ একদম।

কৌঃ কিন্তু ধরো অনেকে বলছে আসছে ২১শে ডিসেম্বর পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাবে। সেটা মাথায় রেখে তোমাকে যদি নিজের একটা এপিটাফ লিখতে বলা হয় কি লিখবে?

বিক্রমদাঃ পৃথিবীই যদি ধ্বংস হয়ে যায়, ভাটের এপিটাফটা পড়বে কে?

কৌঃ লিখতেই চাওনা?

বিক্রমদাঃ না। কেন লিখতে চাইনা এই নিয়ে একটা কবিতা পড়িস। কবির নাম মনে থাকেনা আমার। তবে এটা বোধহয় শেলীর লেখা। কবিতাটার নাম ওজিমান্ডাস।
কবিতাটায় আছে- একটা বড়ো পেডেস্টাল, সেখানে লেখা আমি ওজিমান্ডাস, এখানে আকাশকে আমি কন্ট্রোল করি, বাতাসকে আমি কন্ট্রোল করি। তারপর সেটার ওপরে যখন চোখ গেল দেখা গেল সেখানে একটা বড়ো মূর্তি ছিলো কোনো এক সময়, এখন আর নেই।
কবিতাটা এইটুকুই। ওজিমান্ডাস ভেবেছিলেন এমন একটা কীর্তি স্থাপন করে যাবেন যে সবাই জানবে ওজিমান্ডাসের চেয়ে বড়ো কেউ হয়না।আসলে কাল এমনই একটা জিনিস যে সবাইকে গুঁড়িয়ে দেয়, ধ্বংস করে দেয় কারো প্রতি কোনো মায়া নেই তার।

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ ০০০০০০০০০০০০
কৌস্তভের নোটঃ
এরপরে আমরা আরো কিছুক্ষণ কথা বলেছিলাম। বিক্রমদার স্ত্রী মহুয়াদি বিক্রমদাকে কিরকম প্রত্যেকবার জঙ্গলে যাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করে তা নিয়ে।
অরণ্যের দিনরাত্রি না আবার অরণ্যে, বিভূতিভূষণ না বুদ্ধদেব গুহ জাতীয় একটা খেলাও খেলেছিলাম।
কিন্তু হঠাৎ করে আমার শেষ প্রশ্নটায় বিক্রমদার উত্তরটা টাইপ করতে গিয়ে মনে হলো, থাকনা, একটা ইন্টারভিউ এরকম ভাবেই শেষ হোক। সবকিছুতে নিয়ম মানতে হবেই বা কেন? এরপরের প্রশ্নগুলোকে নিজেরই হঠাৎ ভীষণ অর্থহীন লাগছে।
বিক্রমদা ঠিকই বলেছিল। কবিতাটা শেলীর।সনেট। ওটা দিয়েই শেষ করি।
“I met a traveller from an antique land,
Who said—“Two vast and trunkless legs of stone
Stand in the desert. . . . Near them, on the sand,
Half sunk a shattered visage lies, whose frown,
And wrinkled lip, and sneer of cold command,
Tell that its sculptor well those passions read
Which yet survive, stamped on these lifeless things,
The hand that mocked them, and the heart that fed;
And on the pedestal, these words appear:
My name is Ozymandias, King of Kings;
Look on my Works, ye Mighty, and despair!
Nothing beside remains. Round the decay
Of that colossal Wreck, boundless and bare
The lone and level sands stretch far away.”
- Ozymandias, By PERCY BYSSHE SHELLEY

পুনশ্চঃ বিক্রমদার বই ‘ব্যাকইয়ার্ড ওয়াইল্ডলাইফ’ ফ্লিপকার্টে পাওয়া যায়। কিনতে হলে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে অর্ডার দিন। কিছু অসাধারণ ছবি, অদ্ভুত এন্টারটেনিং বিবরণ এবং ঝকঝকে ডিজাইন সহ বইটি সত্যি একটা ‘রোমহর্ষক’ অভিজ্ঞতা।
http://www.flipkart.com/backyard-wildlife-9380942643/p/itmd3 48gmyuyfnaz?pid=9789380942643&ref=c688e9ad-24ac-44a1-bf4 7-a162c1173684&srno=s_1&otracker=from-search&que ry=backyard%20wildlife

আপনার মতামত জানান