বিজয়োল্লাস আর কিছু কথা

শবর মিত্র

 


গত পরশু ইডেন গার্ডেনসে আমরা এক অভূতপূর্ব বিজয়োল্লাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম। শহরের নাম আছে এরকম একটা দল একটা কর্পোরেট টুর্নামেন্ট জিতেছে। শহরের গর্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, এটাই তথাকথিত ধারণা আমাদের। আমাদের শহরকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হত একটা সময়ে। জানি না সত্যি নাকি, তবে কানাঘুষোয় শোনা যায় ব্রিটিশ আমলে এই শহরে নেতাজী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মত মনিষীরা ছিলেন। বাল্যবিধবাদের পুনর্বিবাহ, সতীদাহ প্রথা রদে এই শহর পথপ্রদর্শক। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্তরা এই বাংলার লোক। বাংলার চা, আম জগদ্বিখ্যাত ছিল নাকি এক সময়ে।
দেশ কাল সময় ভেদে সংস্কৃতি পরিবর্তন হতেই পারে। বাংলার সংস্কৃতি পরিবর্তনটা এমন কিছু বড় কথা নয়। বাংলার মুখ বলতে আমরা যাদের বুঝতাম সেই সত্যজিৎ, মৃণাল সেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দেরা এখন অতীত। তার পরিবর্তে পাগলু নৃত্য কিংবা বিজাতীয় লুঙ্গি ড্যান্স বাংলার সংস্কৃতি হতেই পারে, বলুন? বাঙালি এখন নিজের সন্তানকে বাংলা পর্যন্ত বলতে দেয় না, সেখানে এ আর এমন কি!

চলুন কিছু জায়গায় আলোকপাত করি।

আই পি এল কি?
আই পি এল কি? এটা খুব একটা কঠিন প্রশ্ন নয়। কয়েক বছর আগে টি টুয়েন্টি ক্রিকেট আবিস্কার হবার পরে এর প্রচলন হয়। বিশ্বে ক’টা দেশ ক্রিকেট খেলে জানেন তো? তা সেই হাতে গোনা কয়েকটা দেশের খেলোয়াড়দের নিলামে চড়ানো হল। বিশ্বের বৃহত্তম বাজার হল ভারতবর্ষ। আর ভারতবর্ষের লোক খেতে না পেলেও ১৮০০ টাকার টিকিট খেলে খেলা দেখতে যাবে সেটা কর্পোরেটরা নির্ঘাত জানেন। সেটা আরও উত্তেজক কিভাবে বানানো যায়? একটাই পদ্ধতি। তা হল খেলাটার সাথে একটা আবেগ জড়ানো যাক। শহরের আবেগ। এমনিতেই ভারতীয় জনতা বিভক্ত হতে, একে অপরের সাথে লড়াইতে বিশেষ পারদর্শী, সুতরাং আই পি এল এল। এবং আদতে সাত আটজন কোটিপতিকে আরও টাকার মালিক করার জন্য এই খেলাটির সাথে শহুরে আবেগকে ব্লেন্ড করা হল। যদি এরকম হত খেলাটা, যে রিলায়ান্সের সাথে রেড চিলিজ এন্টারটেনমেন্টের খেলা? তাহলে কি এত লোক দৌড়ত? লাখ, দুঃখিত, কোটি টাকার প্রশ্ন।

শাহরুখ খান কে?
বলিউডের বাদশা। তার থেকেও বড় কথা, সাম্প্রতিক একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যে ক’জন অভিনেতা অভিনেত্রী আছেন তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধনী। আর আমাদের রাজ্য এই মুহূর্তে ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য। আমাদের রাজ্যে আয়লাবিধ্বস্তদের ক্ষতিপূরণ দেবার টাকা নেই। রাজ্য সরকারী কর্মীরা বছরের পর বছর ডি এ পান না। রাজ্যে বেকারের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাকরি নেই বললেই চলে। হিসাব করে দেখতে পেলে দেখা যাবে হয়ত কিং খানের মোট সম্পত্তি রাজ্য সরকারের থেকেও বেশি। আমরা তাকে সৌজন্য দেখালাম। কি? না তার বিনোদন কর মকুব করে দিয়ে। আমরা উদারতা দেখাতে গিয়ে আসলে কি হারাকিরি করে বসলাম না? বদ লোকে তো আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে!

আই পি এল দলগুলির social responsibility:
যদিও কর্পোরেট গ্রুপগুলি নিয়ন্ত্রণ করছে আই পি এলকে তবু ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড আই পি এলের উদ্দেশ্য বোঝাতে গিয়ে বলেছিল আঞ্চলিক দলগুলির তরুণ ক্রিকেটারদের উত্থানের অন্যতম মাধ্যম এই আই পি এল। মুম্বই, বেঙ্গালুরু, রাজস্থান, চেন্নাই কিংবা পঞ্জাব প্রত্যেকটি দলই নিজেদের এলাকার ছেলেদের দিয়ে কন্ডিশনিং ক্যাম্প করিয়ে বেশ কিছু নতুন খেলোয়াড় তৈরি করেছে দেশের জন্য। কলকাতা সেখানে কি করেছে? ন্যুনতম সৌজন্য না
দেখিয়ে বাংলার যে ছেলেটা গোটা বিশ্বের ক্রিকেটের কাছে বাংলাকে চিনিয়েছে, তাকে অবহেলা করেছে। তার বয়স হয়ে গেছিল, পারফর্ম করতে পারছিল না মেনে নিলাম, এবার বাকিদের? কলকাতা একজন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের খেলোয়াড়কেও তৈরি করে নি। আই পি এলে কলকাতা নাইট রাইডারস একমাত্র দল যাদের দলে সেই রাজ্যের একমাত্র খেলোয়াড়ও ছিল না। কলকাতা নামটাই ছিল কেবল।

কোন সময়ে মাতামাতি এবং অসৌজন্যের রাজনীতি
সৌজন্য বাঙালি রাজনীতিকদের কাছে আশা করা অন্যায়। তবে যেদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এবং এক বাঙালি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মৃত্যু হয়, সেদিন কিছু সৌজন্যবশত এক মিনিট নীরবতা পালনও কি করা যেত না?

পুলিশের কাজ এবং রাজধর্ম
আমরা কি কেউ জানি একটা গণতান্ত্রিক দেশে একজন পুলিশের কাজটা কি? জানি না সম্ভবত। একটা বিশৃঙ্খল সমারোহে পুলিশ যখন সেই বিশৃঙ্খলাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় তখন সেখানকার লোক কোথায় যাবে বলতে পারেন? রাজ্যের মন্ত্রীরা সেই পরিস্থিতি সামলাবার জন্য বাইরে না গিয়ে ভেতরে উদ্দাম নাচ গানের মধ্যে বিবৃতি দিচ্ছেন “আমার পেছনটা না দেখে সামনেটা দেখুন”।
রাজধর্ম কি আসলে? আর্তকে রক্ষা করা নয়? নিজের প্রজার ভাল মন্দ দোষ ত্রুটি দেখবার নয় কি? নাকি এটা আসলে সোনার পাথরবাটি?

যদি বলি বাংলা বিপন্ন এখন? সব দিক দিয়ে? সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক চেতনা শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে আমাদের। যে রঙিন চশমা দিয়ে আমরা দেখছি আসলে সেটা সরে গেলে নিজেদের যে পচা গলা রূপটা দেখব সেটা দেখে শিউড়ে উঠব না তো?
প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।


(এই লেখাটির মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব)

আপনার মতামত জানান