বিসর্জনের ঊনিশ

আবেশ কুমার দাস

 





“ইদানিং সে সুরটা শুনতে যে খুব ইচ্ছে হয়
কিন্তু সে খেলনাওলা আর আসে না পাড়ায়
হয়ত কোনও অন্য অলিগলি ঘুরে
অন্য কোনও কাউকে টানছে সে অদ্ভুত সুরে”


সেই অদ্ভুত সুরটা কি শেষ জীবনে শুনতে খুব ইচ্ছে হত ডগলাস লিনফোর্ড ফ্রিম্যানেরও ? চিরায়ত টেস্ট ক্রিকেটের সেই ধূসর অধ্যায়ের মন কেমন করা সুর। যে অধ্যায়টুকুর অস্তিত্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে আজও অমর হয়ে আছে হ্যামণ্ড, সাটক্লিফ বা জার্ডিনদের মতো এক এক দিকপাল কিংবদন্তির শাশ্বত লোকগাথায়। অথবা সেই বিশ শতকের চতুর্থ দশকের গোড়ার দিকটার কথাই ধরা যাক না কেন। যখন কলোনিয়াল সুগার রিফাইনিং কোম্পানির চাকরিতে যোগ দিয়ে ফ্রিম্যান ফিজিতে কর্মরত। মিনিবাসে চেপে অফিস যেতেন কিনা বলা শক্ত। তবে যেভাবেই গিয়ে থাকুন না কেন মাসের শেষে তাঁরও কান্না পেত কিনা তাই বা কে বলতে পারে আজ আর! ভাবতে অবাক লাগে একজন দীর্ঘায়ু মানুষের জীবনের সেই সোনালি প্রহরটুকু—যার কারণে তাঁর নাম বরাবরের মতো রয়ে যাবে ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়—সেই প্রহরের স্থায়িত্ব সর্বসাকুল্যে মাত্র ষোলো দিন!
৭৯ বছর ২৬৫ দিন আয়ুটা মানুষের জীবনে তো আর নেহাত কম নয়। আর মাত্র একশো দিন বেশি বাঁচলেই আশি বছর পরমায়ু কানায় কানায় পূর্ণ হত এই কিউয়ি লেগস্পিনারের। সেই ৭৯ বছর ২৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র ষোলটি দিন! ইংরেজিতে যাকে বলে চাইল্ড প্রডিজি সেই বিস্ময়বালক হিসেবে ফ্রিম্যানকে ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ক’রে রেখেছে উক্ত ষোলটি দিনই। আর জীবনের মতোই ক্রিকেটেরও কি অদ্ভুত পরিহাস—তাঁর জীবনের সেই সোনালি দিনগুলো কালস্রোতে ভেসে চলে যাওয়া ‘দু’ দিনের সম্পদ দু’ টাকার বাজনার বিস্ময়’ হয়েই ফ্রিম্যানের কাছে রয়ে গেছে আমৃত্যু । নয়ত বিবাগীর মতো কেন তাঁকে সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতে হবে ফিজিতে ? ঊনিশ বছর বয়সটা যে কোনও মানুষের জীবনেই কোনও না কোনও এক সম্ভাবনার বোধনলগ্ন । সেই বয়সেই কি আর বিসর্জনের সুর মানায় ? বিশেষত এমন একজন মানুষের বেলায় জীবন যাঁর ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ দীর্ঘায়ত হয়ে ধরা দিয়েছিল ?
১৯১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৪ সালের ৩১ মে। কত জলই না বয়ে গেছে ওয়েলিংটনের নিকটস্থ হাট নদীর বুক চিরে। মানব সভ্যতার ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধলগ্নের উত্তপ্ত দুনিয়া থেকে শীতল যুদ্ধের উপান্তে একমেরু জমানায় এসে উপনীত হওয়া। জারতন্ত্রের বিদায় বাজিয়ে সোভিয়েত স্বপ্নের আগমনী থেকে একটা বিরাট দেশের ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। ক্রিকেট সভ্যতার ইতিহাসেও সমসাময়িক এই আশি বছরে ঘটে গেছে কত মূল্যবোধের ওলোট পালোট। সাদা পোশাক লাল বলের নীল বনেদিয়ানা থেকে কেরি প্যাকার উদবর্তিত রঙিন পাজামা ক্রিকেটের বিবর্তন। আন্ডারস্টেপিং নো বলের যুগ শেষ হয়ে ওভারস্টেপিং নীতির প্রবর্তন। ট্রেভর চ্যাপেলের কুকীর্তির অনিবার্য ফলশ্রুতি আন্ডার আর্ম বোলিং-এর পাকাপাকি বিলোপসাধন।
কিন্তু ১৯৯৪ সালের ৩১ মে চিরঘুমে ঢলে পড়ার আগের মুহূর্ত অবধিও ফ্রিম্যান নিজের গড়া একষট্টি বছরের পুরনো একটি রেকর্ডকে অন্তত অক্ষত রয়ে যেতে দেখে গেছেন। ১৯৩৩ সালের ২৪ মার্চ তখনও অবধি নেলসন কলেজে পাঠরত ফ্রিম্যান নিউজিল্যাণ্ডের হয়ে ডগলাস জার্ডিনের নেতৃত্বাধীন সফরকারী ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্রাইস্টচার্চে যেদিন জীবনের প্রথম টেস্টটি (সার্বিক টেস্ট ইতিহাসের ২২৫ তম খেলা) খেলতে নেমেছিলেন সেদিন তাঁর বয়স মোটে ১৮ বছর ১৯৭ দিন। ২৩ তম কিউয়ি টেস্ট ক্যাপ মাথায় পরে ফ্রিম্যান সেদিন কনিষ্ঠতম কিউয়ি ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট অভিষেকের সেই যে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন তা অক্ষত ছিল ১৯৯৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ২০০ তম কিউয়ি টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির আবির্ভাবের পূর্বাবধি প্রায় চৌষট্টি বসন্ত। ভেট্টোরির টেস্ট অভিষেক ঘটে ১৮ বছর ১০ দিনে। এবং এক আশ্চর্য সমাপতনের মতো এক্ষেত্রেও নিউজিল্যাণ্ডের বিপক্ষ ছিল মাইক আথারটনের নেতৃত্বাধীন সফরকারী ইংল্যাণ্ড দল। ১৯৯৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারিব্যপী ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত এই টেস্টটি ছিল সার্বিক টেস্ট ইতিহাসের ১৩৫৪ তম খেলা। ২২৫ থেকে ১৩৫৪—পরিসংখ্যানই বলে দেবে ইতিমধ্যে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনা বেয়ে বয়ে গেছে কত কাল। ফ্রিম্যান এবং ভেট্টোরির এই মাঝামাঝি পর্বে নিউজিল্যাণ্ডের হয়ে টেস্ট খেলে ফেলেছেন আরও ১৭৬ জন ক্রিকেটার যাঁরা চৌষট্টি বছরেও নিজের আসন থেকে টলাতে পারেননি ডগলাস ফ্রিম্যানকে।
তবে ছয় দশকেরও বেশি স্থায়িত্বময় এই একটি কিউয়ি রের্কডের দৃষ্টিকোণ থেকেই আজ আর মাত্র প্রাসঙ্গিক নয় ডগলাস লিনফোর্ড ফ্রিম্যানের ক্রিকেটকথা। সে তো টেস্ট ক্রিকেটে ভিনু মানকড়ের সঙ্গে ম্যারাথন প্রথম উইকেট জুটিতে আমাদের কুমোরটুলির পঙ্কজ রায়ের 8১৩ রানের বিশ্ব রেকর্ডটিও অক্ষত ছিল পরবর্তী অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় (এবং প্রথম উইকেট জুটিতে আজও এটি ভারতীয় রেকর্ড)। একমাত্র জিম লেকার আর অনিল কুম্বলের সেই অনতিক্রম্য বোলিং রেকর্ড ব্যতিরেকে যে কোনও পর্যায়ের ক্রিকেটে আর যে কোনও রেকর্ডই যে কোনওদিন ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। ফ্রিম্যানগাথার অমরত্বের হদিশ পেতে হলে আজ বরং আমাদের ডুব দিতে হবে ক্রিকেট পরিসংখ্যানের গাণিতিকতার তলদেশে ফল্গুর মতো বহমান জীবনস্রোতের অতলে। সিরিল লিওনেল রবার্ট জেমসের সেই বিখ্যাত উক্তির (Beyond a Boundary গ্রন্থের মুখবন্ধে উত্থাপিত সেই প্রশ্ন—“What do they know of cricket who only cricket know?”) ছায়া অবলম্বনেই যেন তাই বলা যায় নিছক রান উইকেটের শুকনো পরিসংখ্যান পেরিয়ে ভাবীকালের ক্রিকেট রসিকের মনে ডগলাস ফ্রিম্যানের আসনটি নিজের পাকাপকি জায়গা ক’রে নিয়েছে শুধুমাত্র টেস্ট তথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের আঙিনা থেকে এই বিস্ময়বালকের অকাল বিদায়ের সূত্র ধরেই। ক্রিকেটের ময়দান পেরিয়ে বৃহত্তর জীবনের ঝিঁঝিডাকা বিয়োগরসের সমার্থক হয়ে ওঠে ফ্রিম্যানের ক্রিকেট জীবনের সেই অসময়ের অন্তর্জলী যাত্রা। সম্ভাবনার অপমৃত্যু ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না যাকে।
টেস্ট অভিষেকের মাত্র মাসকয়েক আগে একজন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে ওয়েলিংটনের হয়ে ফ্রিম্যানের আবির্ভাব ১৯৩২-৩৩-এর সন্ধিবেলায়। অভিষেক ম্যাচেই বিপক্ষ অকল্যান্ডের উভয় ইনিংসে যথাক্রমে ৮৫ রানে ৪ টি এবং ১০২ রানে ৫টি উইকেট দখল ক’রে সমকালীন কিউয়ি ক্রিকেট সমাজে রীতিমতো সাড়া জাগিয়ে তোলেন বছর আঠেরোর এই ডানহাতি লেগস্পিনার। ওয়েলিংটনের হয়েই জীবনের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির খেলায় সফরকারী এমসিসি-র বিরুদ্ধে ফ্রিম্যানের চমকপ্রদ সাফল্য রাতারাতি জাতীয় টেস্ট দলের দরজা খুলে দেয় এই বিস্ময়বালকের সামনে। উক্ত খেলায় ৭১ রানে ৩টি উইকেট দখল করেন ফ্রিম্যান। তাঁর লেগব্রেক গুগলির শিকার হয়েছিলেন যথাক্রমে এডি পেন্টার (২০ টেস্টের ৩১ ইনিংসে ৫ বার অপরাজিত থেকে ৪টি শতরান ও ৫৯.২৩ গড়ে যাঁর সংগ্রহ ১৫৪০ রান), ওয়ালি হ্যামণ্ড (৮৫ টেস্টের ১৪০ ইনিংসে ১৬ বার অপরাজিত থেকে ২২টি শতরান ও ৫৮.৪৫ গড়ে সংগ্রহ ৭২৪৯ রান) ও লেস অ্যামেসের (৪৭ টেস্টের ৭২ ইনিংসে ১২ বার অপরাজিত থেকে ৮টি শতরান ও ৪০.৫৬ গড়ে সংগ্রহ ২৪৩৪ রান) মতো সমসাময়িক তিন ইংরেজ মহারথী।
দুর্ভাগ্যবশত এর পরপরই উক্ত ১৯৩২-৩৩ মরসুমের ঘরোয়া টেস্ট সিরিজটি কেবল ফ্রিম্যান নয় গোটা নিউজিল্যাণ্ডের পক্ষেই এক চরম দুঃস্বপ্নের কালবেলা হয়ে দাঁড়ায়। সৌজন্যে উভয় টেস্টে ওয়ালি হ্যামণ্ডের সেই যথাক্রমে ২২৭ ও অপরাজিত ৩৩৬ রানের দু’টি অমর উইলোগাথা।
ক্রাইস্টচার্চে ২৪-২৭ মার্চব্যপী অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে হ্যামণ্ডের আগমন ইংরেজ ইনিংসের মাত্র দ্বিতীয় বলে। স্কোরবোর্ডে কোনও রান যোগ হওয়ার আগেই ফ্রেডরিক ব্যাডককের শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হয়েছে ওপেনার হারবার্ট সাটক্লিফকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে গেলেন অপর ওপেনার এডি পেন্টার এবং সহ অধিনায়ক বব ওয়াটও। ৩ উইকেটে ৪৬ থেকে হ্যামণ্ডের সাথে ইনিংসের হাল ধরলেন অধিনায়ক জার্ডিন। প্রাথমিক বিপত্তি সামলে দলের ১৩৩ রানের মাথায় ব্যাডককের শিকার হয়ে ফিরে গেলেন তিনিও। কিন্তু এরপরেই লেস অ্যামেসকে সঙ্গী ক’রে পঞ্চম উইকেটে ২৪২ রান যোগ করে হ্যামণ্ড। আ্যমেসও শতরান করেন। হ্যামণ্ডকে ২৫ মার্চ সকালে ফিরিয়েছিলেন ব্যাডককই। কিন্তু ততক্ষণে ইংরেজ ইনিংস ৪২৪ রানে পৌঁছে গেছে। আর হ্যামণ্ডের পরাক্রমে ইতিমধ্যে কাঁধ এতটাই ঝুলে গেছে কিউয়িদের যে এরপরে ফ্রেডি ব্রাউন ও বিল ভোসও যথাক্রমে সাত ও আট নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ৭৪ ও ৬৬ রানের দু’টি ঝোড়ো ইনিংস খেলে গেলেন। কিউয়ি অধিনায়ক মিলফোর্ড পেজ ১৪৭.৩ ওভারে মোট সাতজন বোলারকে ব্যবহার করেও ইংরেজদের অল আউট করতে পারেননি। ৮ উইকেটে ৫৬০ রানে তারা ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে। ইংরেজ আগ্রাসনে জীবনের প্রথম টেস্টে কিউয়িদের তুরুপের তাস ফ্রিম্যানের বোলিং-এর হিসেব (২০-২-৭৮-০) রীতিমতো এলেবেলে হয়ে দাঁড়ায়। কিউয়িরা পাল্টা ব্যাট করতে নেমে ১১৬.১ ওভারে ২২৩ রানে সবাই আউট হয়ে গিয়েছিল (বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হেনরি ভিভিয়ান চোটের কারণে ব্যাট করেননি)। ফ্রিম্যান নয় নম্বরে নেমে মাত্র ১ রান ক’রে ভোসের বলে বোল্ড হয়ে যান। বৃষ্টিবিঘ্নিত এই টেস্টের শেষদিন ফলো অন করা নিউজিল্যাণ্ড খেলার অবশিষ্ট সময়টুকু কোনও উইকেট না হারিয়ে ৩৫ রান তুলে কাটিয়ে দিতে পেরেছিল। জীবনের তৃতীয় প্রথম শ্রেণির খেলায় এই প্রথম ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছিলেন ফ্রিম্যান।
৩১ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলব্যপী অকল্যাণ্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টেও (সার্বিক টেস্ট ইতিহাসের ২২৬ তম খেলা) কিউয়িদের দুরবস্থার কোনও হেরফের হল না। এবারে প্রথমে ব্যাট করে তারা মাত্র ৫৬.৫ ওভারে ১৫৮ রানে সবাই আউট হয়ে গেল। দীর্ঘদেহী ইংরেজ পেসার উইলিয়াম বাউয়েসের (১৯-৫-৩৪-৬) সামনে এক স্টিউয়ি ডেম্পস্টার (অপরাজিত ৮৩) ছাড়া কিউয়িদের কেউ দাঁড়াতেই পারল না। ফ্রিম্যান এই দফায় সবার শেষে ব্যাট করতে নেমে আবার ১ রান ক’রে রান আউট হয়ে যান। জবাবে পুনরায় হ্যামণ্ডের ভিনি ভিডি ভিসি। পার্থক্যের মধ্যে এবারে যখন তাঁকে নামতে হল ততক্ষণে প্রথম উইকেট জুটিতে ৫৬ রান যোগ হয়ে গেছে। আর এই দফায় ওপেনার হারবার্ট সাটক্লিফকে (৫৪ টেস্টের ৮৪ ইনিংসে ৯ বার অপরাজিত থেকে ১৬ টি শতরান ও ৬০.৭৩ গড়ে যাঁর সংগ্রহ ৪৫৫৫ রান) ফিরিয়েছেন ফ্রিম্যানই। প্রথম পরিবর্ত হিসেবে বল করতে এসে। কিন্তু হ্যামণ্ড নামতেই আবার সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। চড়চড়িয়ে এগোতে লাগল ইংরেজদের ইনিংস। শেষমেষ ১৫৬ ওভার খেলে ৭ উইকেটে ৫৪৮ রান তুলে ইংল্যাণ্ড যখন ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করল ওয়ালি হ্যামণ্ড তখনও ৩৩৬ রানের দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দাপটে একা ফ্রিম্যানই (২০-১-৯১-১) নয় সমস্ত কিউয়ি বোলারেরই বোলিং-এর হিসেব একেবারে তাল তুবড়ে গেছে। পয়লা এপ্রিল সারাদিন হ্যামণ্ডের হাতে বোকা বনে একেবারে শেষবেলায় নিউজিল্যাণ্ডকে দ্বিতীয় দফায় ব্যাট করতে নামতে হয়েছিল। ২ এপ্রিল ছিল এই টেস্টের ঘোষিত বিশ্রামের দিন। ৩ এপ্রিলের খেলা পুরোটাই বাকি তখনও। কিন্তু নিশ্চিত ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা থেকে আবার কিউয়িদের উদ্ধার করেছিল আবহাওয়া। শেষদিনের প্রায় পুরো খেলাটুকুই ভেস্তে গিয়েছিল বৃষ্টিতে।
পরবর্তী ১৯৩৩-৩৪ মরসুমে ওয়েলিংটনের হয়ে আর মাত্র একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন ফ্রিম্যান। উক্ত খেলায় ১টি উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। এবং সেখানেই তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট জীবনও সাঙ্গ হয়। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে। ১৯৩৫ সালে কলোনিয়াল সুগার রিফাইনিং কোম্পানিতে একটি চাকরি পেয়ে যান ফ্রিম্যান। পরবর্তী বিশ বছরের জন্য উক্ত সংস্থা তাঁকে পাঠিয়ে দেয় ফিজিতে। যেমন ধূমকেতুর মতো একদিন আচমকা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটের রঙ্গমঞ্চে আর্বিভাব ঘটেছিল এই বিস্ময়বালকের তেমনি ধূমকেতুর মতোই চেনা আকাশ ছেড়ে আবার মহাবিশ্বের কোন এক অজানা কোণে নামগোত্রহীনের মতো মিলিয়ে গেলেন ফ্রিম্যান। মাত্র ষোল দিনের ক্রিকেট জীবনে ২টি টেস্টের ২ ইনিংসে ব্যাট ক’রে ২ রান (গড় ১.০০) ও ২৪০ বলে ১৬৯ রান দিয়ে ১ উইকেট (সেরা বোলিং ৯১ রানে ১ উইকেট) এবং ৫টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ৬ ইনিংসে ব্যাট ক’রে ২৮ রান (সর্বোচ্চ ৮ ও গড় ৪.৬৬) ও ৬৭৮ বলে ৪৯৫ রান দিয়ে ১৪টি উইকেট (গড় ৩৫.৩৫) নিয়ে অত্যন্ত সাধারণ ভাবে ময়দান ছাড়তে হল তাঁকে। ফিজিতে থাকাকালীন মাইনর পর্যায়ের ক্রিকেট খেলেছেন। সেই পর্যায়ের ক্রিকেটে ফিজির প্রতিনিধিত্ব ক’রে পূর্বতন স্বদেশ নিউজিল্যাণ্ডেও সফর করেছেন পরবর্তীতে। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আর ফিরে আসা হয়নি ফ্রিম্যানের। ফিজির বিশ বছরের পর্ব শেষে উক্ত সংস্থা তাঁকে পরবর্তী আরও বিশ বছরের জন্য পাঠিয়ে দেয় সিডনিতে। ততদিনে তাঁর বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। সিডনিতেই ১৯৯৪ সালের ৩১ মে মৃত্যু হয় তাঁর।
ফ্রিম্যানের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সাধারণ এক ক্রিকেটার মনে হবে তাঁকে। আর সত্যিও তাঁর পর্যায়ের ক্রিকেটার আগে পরে আরও হুদো হুদো এসেছে বিশ্ব ক্রিকেটে। কিন্তু আজ এত বছর পরে তলিয়ে ভাবতে বসলে ফ্রিম্যানের কাহিনি ক্রিকেট রোমান্টিকের মনকে টানবে তাকে ব্যথাতুর উদাস করবে অন্য কারণে। আগেই বলেছি ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪ থেকে ৩১ মে, ১৯৯৪—অনেক বদলে গিয়েছে ক্রিকেট সভ্যতা। সেই বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটের বিবর্তনের একটা মিসিং লিঙ্ক হয়েই বেঁচে থাকবে ফ্রিম্যানের কাহিনি। যে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির যুগে আজ আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে টিঁকিয়ে চলি, মাসের পর মাস সংস্থার সাধারণ কর্মচারীদের বেতন না দিয়েও ক্রিকেটের অকশনে বিজয়ী রাজা হর্ষবর্ধন হয়ে বসে থাকার নির্লজ্জ ‘আভিজাত্য’ নির্বিকারে দেখে যাই যে যুগে বাঁচতে গিয়ে, জীবনে কখনও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারার যোগ্যতাহীন ক্রিকেটারদেরও মানুষের ঘাম কান্না রক্তে ভেজা সেই টাকার লভ্যাংশতেই (তথা কুড়ি ওভারের ক্যাসিনোর দৌলতে) নিজেদের হাত ময়লা করতে দেখি—সেই যুগে দাঁড়িয়ে কি আর কল্পনা করতে পারব নিছক একটুখানি ভাল থাকার তাগিদে একটুখানি আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ চেয়ে একজন সম্ভাবনাময় তরুণকে একদিন একমুহূর্তে জলাঞ্জলি দিয়ে দিতে হয়েছিল অনাগত এক উজ্জ্বল ক্রিকেট কেরিয়ারের স্বপ্নটুকু! পেট আর প্যাশনের দড়ি টানাটানিতে কত উজ্জ্বল সম্ভাবনারা দেশে দেশে কালে কালে যে স্রেফ মাঠে মারা গেছে তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফ্রিম্যানের ক্রিকেট জীবনের সেই ট্র্যাজিক পরিণতি। মাত্র ষোল দিনের স্বল্পায়ু কেরিয়ার সত্ত্বেও তাই ডগলাস লিনফোর্ড ফ্রিম্যান ভাবীকালের প্রকৃত ক্রিকেট ঐতিহাসিকের মনোজ্ঞ গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। হেনরি ভিভিয়ান, জ্যাক ডুনিং বা পল হোয়াইটলর মতো সমসাময়িক অন্যান্য কিউয়ি টেস্ট তারকাদের থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য এখানেই।
যে প্রসঙ্গক্রমে আজ এত কথার এসে পড়া—একটা বয়সের পরে কি দু’দিনের সম্পদ সেই দু’টাকার বাজনার বেসুরো সুরটা শুনতে খুব ইচ্ছে হত ডগলাস ফ্রিম্যানেরও ? তাঁর পরবর্তী আপাত সাধারণ দশটা পাঁচটার জীবনকাহিনির হদিশ যাঁদের জানা আছে সেইসব ক্রিকেট রোমান্টিকের মনে এই প্রশ্নটুকু আজ এত বছর বাদে তোলপাড় তুলবেই। উজ্জ্বল ক্রিকেট জীবনের সম্ভাবনায় ইতি টেনে পেটের তাগিদে চাকরি নিয়ে দেশান্তরে চলে যেতে হলেও ক্রিকেটকে কিন্তু তিনি ভোলেননি আজীবন। পরিণত বয়সে ফিজিতেও মাইনর পর্যায়ের ক্রিকেটে তাঁর খেলে যাওয়াই তার আভাস দেয়। এমনকি জীবনের একেবারে শেষের দিনগুলোতেও তাঁর স্মৃতিতে ঘুরে ফিরে এসেছে ক্রিকেট। ছয় দশক আগের সেই কবেকার সফরকারী এমসিসির সঙ্গে খেলার কত ছুটকো ঘটনা। এমসিসির দ্বিতীয় উইকেটরক্ষক জর্জ ডাকওয়ার্থের ব্যক্তিগত সংগ্রহের সেই অটোগ্রাফ রেপ্লিকাবুকটির কথাও মৃত্যুর পূর্বাহ্নেও ভোলেননি ফ্রিম্যান।
যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনেই বোধহয় এমনটাই ঘটে। পেটের তাগিদে একদিন প্যাশনকে শিকেয় তুলে দিতে বাধ্য হওয়া কোনও কবি সাহিত্যিক কি আজীবনেও ধ্বংস ক’রে ফেলতে পারেন প্রথম যৌবনের সেই মহার্ঘ্য কবিতার খাতা ? বরং অনেক বছর পরেও কোনও এক ঘোরতর সাংসারিক সন্ধেয় আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে শীর্ণ জীর্ণ কোনও লিটল ম্যাগাজিন হাতে উঠে এলে কি সেই কবেকার বেসুরো সুরটা নিমেষে মূর্চ্ছনা তোলে না তাঁরও কানে ? শৈশবের সেই নাম না জানা খেলনাওলা কত না স্বপ্নের ফেরি নিয়ে এমনি ঘুরে গেছে একদিন আমাদের সকলেরই পাড়ায় পাড়ায়। সেই পাড়াটা বাগবাজারেই হোক অথবা ব্রিসবেনে। নৈহাটিতে হোক অথবা নেপিয়ারে। দেশ কাল নির্বিশেষে একটা বয়সে আমরা সকলেই মাতাল হয়েছি সেই অদ্ভুত বেসুরো সুরে। হ্যামলিনের বাঁশিওলার মতো তার সেই বাজনার সুর একদিন আমাদের এক একজনের মনকে টেনেছে এক এক রাস্তায়। সুরের মানেটা না বুঝেও মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি সবাই। এক এক অলিগলি বেয়ে এক একজন সেই নেশার টানে শেষ অবধি এসে পড়েছি একই পরিণতির গন্তব্যে।
কবি সুকান্তর সেই আঠেরো বছর বয়স সব দেশে সব কালেই বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলা অনেক প্রতিশ্রুতির স্বপ্ন দেখায়। আঠেরোর পিঠোপিঠিই আসে ঊনিশ। শুধু ডগলাস ফ্রিম্যানের ক্রিকেট কেরিয়ারের বেলাতেই নয় জীবনের অন্যান্য সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রেও অনেক উজ্জ্বল সম্ভাবনার বির্সজনের ঐতিহ্য আছে এই ঊনিশের। বাংলা রুপোলি পর্দার নস্টালজিক দর্শক কি কোনওদিনও ভুলতে পারবে শিখা বাগকে ? ‘অগ্নিপরীক্ষা’ বা ‘শিল্পী’র মতো একদা তোলপাড় তোলা ছবিতে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাল্যবেলার চরিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর সেই অনায়াস চিত্রায়নকে ? জওহরলাল নেহরু, রাজা গোপালাচারী বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়দের মতো ব্যক্তিত্ববর্গের প্রশংসাধন্যা এই শিশুশিল্পীর চলচ্চিত্রজীবনও শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৯৬১ সালে মাত্র ঊনিশেই। নিঝুম কোনও রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে আজও কি তাঁর কানে ভেসে আসে না ‘রুমঝুম রুমঝুম/ভাঙল রাতের ঘুম’-এর মায়াবি সুর!
আমার ব্যক্তিগত পরিচিত বয়েজ্যেষ্ঠ এক শুভানুধ্যায়ীর কথা দিয়ে ইতি টানব ফ্রিম্যান প্রসঙ্গের। প্রায় দুই যুগ আগে এরকমই এক স্বপ্নিল আঠেরো ঊনিশে সঞ্জীবকুমার মুখোপাধ্যায় নামক আমার একান্ত সুপ্রিয় এই মানুষটিও স্বপ্ন দেখতেন কবি স্বীকৃতির। ডগলাস লিনফোর্ড ফ্রিম্যান বা শিখারানী বাগের মতো তাঁর নাম হয়ত থেকে যাবে না ইতিহাসে। কিন্তু একদিন কথাপ্রসঙ্গে তাঁর অন্তরে আজও টিঁকে রয়ে যাওয়া এমন এক অপূর্ব কবিমানসের পরিচয় পেয়েছিলাম—জীবনের কি অদ্ভূত খেলা—খেলার মাঠের সেই কবেকার হারিয়ে যাওয়া ফ্রিম্যান বৃত্তান্ত আবার ফিরে এল একলহমায়।
পুজোর উত্তর কলকাতা আমাদের অনেকেরই প্রিয়। আর প্রতিমার আঁতুড়ঘর সেই কুমোরটুলিতে একদিন অন্তত পা রাখতে না পারলে অনেকেরই সেবারের পুজোটা ঠিক সার্থক হয় না। সঞ্জীববাবুরও খুব প্রিয় পুজোর এই কুমোরটুলি । কিন্তু হট্টমেলায় মণ্ডপে নয় তিনি এমন সময় একা একা হাঁটতে ভালবাসেন একটু দূরের সেই প্রায়ান্ধকার আঁতুড়ঘর লাগোয়া আবছায়া গলিগুলোয়। আলোকমালার আনন্দযজ্ঞ থেকে ঠিক এই সময় অল্প দূরে উপেক্ষার অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে সার সার দাঁড়িয়ে থাকা খানকয়েক প্রতিমা। নান্দনিকতার বিচারে যারা যে কোনও মণ্ডপের প্রতিমার সমতুল্য। কিন্তু তারা বাজার পায়নি। সকল সৌন্দর্যের অধিকারিণী হয়েও সেইসব অপরূপা সৃষ্টিরা প্রতি বছরেই এমনি সবার চোখের আড়ালে নিছক অবহেলায় অযত্নে উৎসবের দিনগুলো কাটিয়ে দেয়।




abesh.das@gmail.com

আপনার মতামত জানান