আটপৌরে মধ্যবিত্তের শুদ্ধ উপবীত

সরোজ দরবার

 



ঠিক পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সেদিন আমাদের এত ‘সাউন্ড’ ছিল না, কিন্তু ছিল শাপমোচনের প্রতিশ্রুতি। সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে টালিগঞ্জ মেট্রোর দূরত্ব আজ ট্যাক্সির মিটারে পরিমেয়, কিন্তু বাঙালির আটপৌরে ইতিহাসে আসলে সে তো দূরত্ব নয়। বস্তুত ‘ঐশ্বরিক’ শব্দটি বাংলা অভিধানে যতখানি সুলভ, তার তুলনীয় কোনওকিছু বাঙালি সহজে খুঁজে পায় না। শুধু এই দুটো জায়গার এখনও দু’জন মানুষের দুই মূর্তি বাঙালিকে এই শব্দের প্রতি তুলনীয় অনুভূতি দিতে পারে। একদা বঙ্কিম লিখেছিলেন, ‘বাংলার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গলার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমিও লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে’। তবু সকলেই ইতিহাস লেখে না, কেউ কেউ লেখে। সকলেই বলতে পারেন না তাঁর গানের স্বরলিপি লেখা রবে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পারেন।
১৯৫৫ সালে যখন শাপমোচনে উত্তমকুমার গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে নিজের অস্ত্বিত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন, তখন আসলে ঔপনিবেশিক গ্লানি কাটিয়ে বাঙালিরও ধীরে ধীরে শাপমোচন হচ্ছে। সব চাওয়া আর না পাওয়ার বিপ্রতীপে বাঙালি খুঁজে নিতে চাইছে সুন্দরের শান্তিনিকেতন। ঠিক সেই সময়ে পর্দার আশ্রয় হয়ে উঠলেন উত্তম। ধুতি-গোটানো হাতার হাফশার্টের আটপৌরে চেহারাতেই কী করে বাঙালির মন ও মননের অধিপতি হয়ে উঠতে হয় তার ইঙ্গিত মিলল। ঠিক তারই যেন অনুলিপি দেখা গেল, বাংলা গানের ভুবনেও। সেদিন বাঙালিনির যেমন উত্তম ছিল, বাঙালি যুবকের ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
আজ এতদিন পরে তাঁর গান কী, কেমন...কেন নদী এই ঐশ্বরিক কন্ঠধ্বনীর শুধনো প্রশ্ন শুনতে রাজি হল, সে ব্যাখ্যা বৃথা। তার তেমন প্রয়োজনও কোনও বাঙালি বোধ করে না। আজও। শুধু স্মরণীয় ভাবে মনে রাখে এই মানুষটিই গান গাওয়াকে বলতেন ‘কাজ’। দেবব্রত বিশ্বাস বলতেন, গান দিয়ে শ্রোতাদের বোল্ড করে দিতেন, হেমন্তও তো তাই বললেন। আজও দূরদর্শনের পর্দায় ইন্টারভিউয়ে কান পাতলে শোনা যায়, খ্যাতির উত্তুঙ্গ শিখরে বসেও মাটির মানুষের বিনয়ে তিনি বলছেন, আমার এ গলা ঈশ্বরের দান। বাংলা গানের আর এক দিকপাল সলিল চৌধুরীও তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বলবেন, ভগবান যদি গান গাইতেন, তবে হেমন্তদার গলাতেই গাইতেন। কিন্তু শুধু ঈশ্বরের দানে তিনি হেমন্ত হননি। বাঙালি জানে, তাদের প্রণয়ের প্রতিবেদনকে তিনি কেমন করে সুরে সুরে কাব্যময় অনুবাদ করে তুলেছিলেন। আবার সে কাব্যকে কোন মুন্সিয়ানায় তিনি অনুচ্চার সংলাপ করেছিলেন তিনিই জানেন। অথচ ইতিহাস বলবে উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁয়ের কাছে তিনি কিছুদিনই মাত্র শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা করেছিলেন। আর ইতিহাসের উল্লেখ ছাড়াই কাছের মানুষের স্মৃতিচারণায় থাকবে আর এক একলব্যের কাহিনি। যেখানে তিনি সুনে শুনে আয়ত্ত করছেন শচীন কত্তার গান। বিন্দুমাত্র আশ্রমিক না হয়েও আত্মস্থ করছেন গুরুদেবকে। বাবা চাননি, কিন্তু মা ছেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়লেও যেন পঙ্কজ মল্লিক, শচীন কত্তার সঙ্গেই তাঁর ছেলের নাম থাকে।কলম্বিয়া রেকর্ডসের সুপারভাইজার শৈলেশ দত্তগুপ্ত জহুরী ছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামের সঙ্গীত রত্নটিকে চিনতে তিনি ভুল করেননি।
স্বরক্ষেপণের তিনি সম্রাট, অনুভূতির সঠিক তন্ত্রীতে সুরের ছোঁয়া লাগানোর অধিপতি, তবু বাঙালির হেমন্ত বোধহয় অন্যকিছু। আসলে তিনি আটপৌরে মধ্যবিত্তের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতিনিধি। ঐ তো ধুতি আর হাফশার্ট, ঐ তো মোটে একটা মোটা ফ্রেমের চশমা-তারও যে এমন জৌলুস থাকে, মধ্যবিত্ত মানেই মেধা আর মানে যে মঝঝিম নয়, বরং মধ্যবিত্তেরও নিজস্ব অহংকার থাকে, থাকে ব্যাক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য-আজও তা খুঁজে পাওয়া তাঁর মধ্যেই। ঠিক এইখানেই তিনি বাঙ্গালির হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সারল্যের মধ্যে যে সরলরেখার গরিমা হেমন্তর জীবন থেকে গান তাঁরই পরিচয়। তাই বম্বের যে হেমন্তকুমারের সুরে দেশবাসীর তন ডোলে, মন ডোলে... তিনি যেন কেমন আলাদা হয়ে যান জীবনপুরের পথিক হয়ে। তাঁর সাকিন শুধু বাঙালির হৃদয়েই। আমরা শুধু জানি, দাদার কীর্তি তাঁকে গড়তে হয় না, তা রচিত হয় বাঙালি শ্রোতার ঠোঁটে ঠোঁটে ভর করে। বাংলা গানে তাই তাঁর নামেই বসন্ত-উত্তরসূরীর এই পংক্তি তাই শুধুই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, যথার্থ মূল্যায়ণও বটে।
তাঁর পরে বাংলা গানের পালাবদল হয়েছে। বাংলা গান পেয়েছে গৌতম চট্টোপাধ্যায় থেকে সুমনকে। অনেক ওঠা-পড়া,ভাঙাগড়া থেকে জাতীয় পুরস্কার সব পেয়েছে।আজ পঞ্চাশের দশকের বা তথাকথিত স্বর্ণজুগের গানের ভাষা থেকে গায়কি নিয়ে দিস্তে দিস্তে থিসিস লেখা হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু সে সবের অনেক উপরে থেকে যান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আজ সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের আলো ছায়ায় তার দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তি দেখে বাঙালি জানে বাংলা গানের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসলে এক যোগী। যার শুদ্ধ স্বরে লেগে আছে বাঙালির আত্মশ্লাঘা। বাঙালির কাছে তাই তিনি শুধু গায়ক তো নন, সুরকার, সঙ্গীতশিল্পীও নন শুধু, তিনি থেকে জান আটপৌরে মধ্যবিত্তের শুদ্ধতম উপবীত হয়ে।


আপনার মতামত জানান