কেমন আছো, শহর/কসবা/গ্রাম?

ফুলমণি সরেন

 



কেমন আছি আমি? সেটা পড়া যায় আমার রক্তচাপে, আমার দৃষ্টি, শ্রুতি, স্পর্শ, ঘ্রাণ ক্ষমতায়, আমার পেশির সক্রিয়তায়, আমার মগজের আর স্নায়ুর প্রতিবর্তের ক্ষমতায়। কিন্তু কিছুই ঠিকঠাক চলবে না যদি না এইসব কাজের মূলগত দায়িত্ব পালন করে যে কোষগুলি সেখানে প্রাণবায়ু বা অক্সিজেন না পৌঁছোয়। মানে কোষে যথেষ্ট অক্সিজেন না পৌঁছোলে আমি আর ভালো থাকব না। তার জন্য জরুরি আমার ফুসফুসের ভালো থাকা। তার মানে শরীরের বিষবায়ু শুধরে জীবনীশক্তি ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে শহর/ কসবা/ গ্রামের মানে মানুষের বসতির ভালো থাকাও জুড়ে আছে তার শরীরের বিষবায়ু শোধন ক্ষমতার ওপর। শহরের বুকে থাকা সবুজদ্বীপগুলোই সেই ফুসুফুসের কাজ করে। আমি তো জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সীমার মধ্যে শারিরীক বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে গিয়ে নিজের পরিবর্তনশীল শারিরীক প্রয়োজনের সঙ্গে ফুসফুসের মাপ পরিবর্তন করে করে জীবদ্দশা পার করে একদিন মরে যাব। কিন্তু শহরের বাড়বৃদ্ধির সাথে কী তার ফুসসুস বাড়ে?
মানুষের বসতির ফুসফুস মানে শহরের মধ্যেকার সবুজ গাছে ভরা বাগান বা জংলা এলাকা, জলা এলাকা। কিন্তু মানুষের বসতি আয়তনে বাড়লে সবুজ সংকুচিত হয়, জলা জমাট হয় ক্রমাগত। আইন থাকলে, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই হয়। কিন্তু তাতে ক্রমবর্ধমান মানুষের বসতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা বর্জ্য থেকে শোধনের সুযোগ বাড়ার বদলে ক্রমশ কমে যায়। তাহলে কী শহরের অকাল মৃত্যু আটকানো যাবে?
আবার মানুষের শরীরে ফুসফুসই একমাত্র অঙ্গ নয় যা শরীরের বিষ বর্জন করে। বৃক্ক বা কিডনিও শরীরের তরলবাহক রক্তকে ছেঁকে পরিশোধন করে। শহরের বৃক্ক হলো যাবতীয় জলা, বিল। শহর যখন বাড়তে থাকে তখন জলা আর বিলেরও ক্রমশ পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটতে থাকে। তাহলে শরীরের দু দুটো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অপ্রতুল কাজ দিলে, কী করে শহর সুস্থ থাকবে?
সম্প্রতি খবরে প্রকাশ (https://www.youtube.com/watch?v=PU05sU1US_8&list=PL8813 70B27EC7FF67&index=18) উত্তরপ্রদেশের নয়ডাতে ওখলা পাখি অভয়ারণ্য সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ না করেই সে অঞ্চলে মানুষের বসতি নির্মিত হয়ে গেছে। তাহলে এই অঞ্চলের পাখিরা, শামুকেরা, গেঁড়ি-গুগলিরা, তেচোখো মাছেরা কোথায় যাবে? এদের পুনর্বাসন সোনার পাথরবাটিত মতো। কেবলমাত্র ওখলাতেই এরা মানিয়ে নিতে পারে বলে এই অঞ্চলে থাকে। সুতরাং ওখলার জলা শুকোলে এরাও এরা লোপ পাবে, সঙ্গে সঙ্গে লোপ পাবে নয়ডার কিডনির খানিকটা। তাই ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইবুনাল ওখলা পাখি অভয়ারণ্য সংলগ্ন নির্মাণ এলাকার বাড়িগুলি আবসিকদের দখল করতে দিচ্ছেন না। ফলে হবু আবাসিকরা বেশ ঝামেলায় পড়েছেন এবং সরকারী ব্যবস্থাটিকে বিরক্তি দেখিয়ে চলেছেন। আবার শহরের কিডনিটি শুকিয়ে গিয়ে যখন এঁরা বানভাসি রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারবেন না তখনও আবার সরকারকেই দুষবেন। অথচ নিজেদের বাসস্থানাঞ্চল নির্বাচনের সময়ে এতো কথা ভাবার অবকাশ পান নি তাঁরা। সব মানুষের বিবেচনার অভাবে উত্তরোত্তর সমস্যা আরও জটিল হবে, ক্রমশ জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে। আবার তামিলনাড়ুর চেন্নাই শহর বাড়তে বাড়তে প্রায় পঙ্গু করে ফেলছে এই শহরের পাল্লিকারনাই জলাভূমিকে। সমস্যা এখানে নয়ডার তুলনায় গভীরতর; কারণ এই অঞ্চল নয়ডার থেকে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি বৃষ্টিবহুল।
আমরা পশ্চিমবঙ্গে এখনও পরিবেশ ও মানুষের বাড়ি তৈরি নিয়ে এ যাতীয় বিতর্কের মুখে পড়ি নি, তার কারণ আমাদের এখনও পর্যন্ত কোনো এনভায়রনমেন্ট ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইপিএ) বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ণ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতেই হয় না বলে। নয়ডাতে সমস্যার কারণ কেন্দ্রীয় পরিবেশ নীতিকে রাজ্যে মানা হয় নি তাই। সেটাকে ব্যববসায়ী মহল শুধুমাত্র ব্যবসায়ে বাধাদান বলেই দেখছেন। কিন্তু আশু নাগরিক সমস্যাগুলোকে কেউ বুঝতেও পারছেন না; কিংবা বুঝলেও অস্বীকার বা অবহেলা করছেন। তাই বলছেন যে, শরহরাঞ্চলে ইপিএ করা হবে কেন। কিন্তু শহরের কলেবর উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে শহর যে সীমা ছাড়িয়ে কসবা গ্রাম, বন, জলা সব গিলে ফেলবে সে বিবেচনাটির আভাস মাত্র নেই এই যুক্তিতে।
আবার তামিলনাড়ুর জমিবাড়ি ব্যববসায়িদের কাছে ইপিএ আরেকটা প্রশাসনিক “লালফিতাশাহী” মাত্র। সে শহরের পরিবেশকর্মীরা অবশ্য বলছেন সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থায় যাবতীয় নির্মাণ প্রকল্পকে যথাবিধি কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানোর ব্যবস্থা করার কথা। আবার কেউ কেউ বলছেন, কোন এলাকায় ইপিএ করা হবে আর কোন এলাকায় আদপেই ইপিএ করার দরকার নেই সেসব কথা সহজেই বোঝানো যায় ইপিএ-র দরখাস্ত জমা থেকে জবাব পাবার সময়কালের সীমাবদ্ধতা দিয়ে। যেমন কোনো নির্মাণ প্রকল্পের এলাকা নির্বাচনের পর নির্মাণকারী সংস্থা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ইপিএ-র অনুরোধ জানাবে। যদি পাঁচ/দশ/পনের/কুড়ি দিনের মধ্যে ইপিএ-র দিনলিপি ও নির্দেশ পায় দরখাস্তকারী নির্মাণ সংস্থা তা হলে ধাপে ধাপে ইপিএ হবে, তাও জবাব পাঠানো থেকে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। তারপর ইপিএ শেষ হওয়া থেকে, ধরা যাক, এক মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে মূল্যায়ণকারী সংস্থা বাধ্য থাকবে। আবার নির্মাণকারী সংস্থা ইপিএ-র দরখাস্ত করার তিরিশ/চল্লিশ অর্থাৎ নির্দিষ্ট দিনের, মধ্যে মূল্যায়ণকারী সংস্থা থেকে কোনো জবাব না পেলে নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারে বলে ধরা যাবে। তবে সে ক্ষেত্রেও নির্মাণের ছাড়পত্রের প্রমাণ থাকা আবশ্যক। আবার এইসব প্রকল্পে লগ্নীকারীদের স্বার্থে ইপিএ-র নথির পিডিএফ ও জিপিএস তথ্য ওয়েবসাইট মারফত প্রকাশ করা হলে আরও ভালো হয়।
এসব তর্ক এড়িয়ে আমরা ব্যক্তি দায়িত্বে কী করতে পারি? প্রথমত, নতুন নির্মাণপ্রকল্পে কোনো লগ্নি করার আগে জেনে নিতে পারি সেই প্রকপ্লের ইপিএ ছাড়পত্র আছে কিনা। প্রকল্প স্থলের আরএস/সিএস নম্বর, জে.এল নম্বর দাগ নম্বর মিলিয়ে নেওয়ার নথিপত্রর মতোই জরুরি ইপিএর ছাড়পত্রটা দেখে নেওয়া। তারপর নির্মানাপেক্ষ প্রকল্পে লগ্নি করলে দরাদরি করতে পারি রেন রেনওয়াটার হারভেস্টিং লাগু করানোর জন্য। আরও জোর দিতে পারি নির্মাণের প্রতি ধাপে/ তলায় সিঁড়ির পাশে খোলা বাগান করানোর।
রেন ওয়াটার হারভেস্টিং আর ব্যক্তিওগত উদ্যোগে বাড়ির পরিবেশকে আর শহরের স্বাস্থ্যকে বহাল রাখার আরও অন্যান্য উপায় নিয়ে বিশদে আলোচনা পরের কোনো কিস্তির জন্য তোলা রইল।

আপনার মতামত জানান