ধর্ষংস্কৃতি!

ইন্দ্রনীল বক্সী

 



ধরুন পরীক্ষায় এলো ধর্ষণ কি ও কয় প্রকার ? এর উৎপত্তি কবে ও কোথায় ? সর্বাধিক ধর্ষণের ঘটনা কোথায় ঘটে থাকে ?...ইত্যাদি, ঐ “কবে এবং কোথায়’” প্রশ্নটি ছাড়া বাকিগুলোর উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন । আর যে উত্তরটা সারা পৃথিবীর কেউ আজও খুঁজে পেলোনা হাজার আন্দোলন , হাজার আইন , হাজার হাজার পাতা আর্টিকেলেও, সেটা হচ্ছে – ধর্ষণ কিভাবে বন্ধ হবে ?
যাবতীয় মিডিয়া বাহিত ধর্ষণের খবর , সে ভারতের উত্তর প্রদেশে হোক ,দিল্লিতে হোক কিংবা পশ্চিম বাংলায় ,পড়তে পড়তে দেখতে দেখতে শিউরে উঠতে উঠতে একথা কি মনে হতে থাকেনা যে ধর্ষণের কেমন সামাজিকরণ ঘটে গেছে ! এটা দিল্লির বাসওয়ালা বা কামদুনির পরিত্যক্ত কারখানায় আর আটকে নেই ! ইউ পির গাছ থেকে ঝুলন্ত ধর্ষিতার দেহ থেকে একথাই মনে হতে থাকে – নাঃ এশুধু বিকৃত জৈবীক ক্ষুধা মেটানোর নৃশংস প্রয়াস নয় – এ যেন আরও কিছু বলতে চাইছে । ধর্ষকাম ,ধর্ষচিন্তা ,ধর্ষবিলাস ঢুকে গেছে আমাদের সাংস্কৃতিক রন্ধ্রে ! সবকিছুতেই একটা গা জোয়ারি , মোটাদাগের বিনোদনের খোঁজে আছি আমরা , ভোগের সুক্ষ্ম রেখাগুলো কেমন ধ্যেবড়ে দিয়ে আমাদের যেন বড্ড স্থুল সুখানুভুতি !
NCRB ( NATIONAL CRIME RECORD BUREAU) বলছে ১৯৭১ সাল থেকে ধর্ষণ সম্পর্কিত অপরাধ বেড়েছে ৮৭৩% ! এবং এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র নথিভুক্ত ঘটনার ক্ষেত্রেই । এই মুহুর্তে ভারত পৃথিবীর এ বিষয়ে বাকি দেশগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে । ২০১২ সাল অবধি রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমীক্ষায় সুইডেন ছিলো বিশ্বের অন্যতম রাষ্ট্র - ৬৯ জন ধর্ষিত প্রতি লাখে ! আরো অনেক দেশের সঙ্গে আমেরিকাও রয়েছে । আমেরিকা বর্তমানে ভারতের সঙ্গে যুগ্মভাবে রয়েছে প্রথম স্থানে ! আমেরিকায় আবার উলটো চিত্রও দেখা যায় ,সে দেশের NATIONAL CRIME VICTIMAZATION SURVEY বলছে ২০০৮ সালে সে দেশে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৩৯৫৯০ জন পুরুষ এবং ১৬৪২৪০ মহিলা !
এসব পরিসংখ্যানের ফিরিস্তি ছাড়ুন । তাহলে বুঝতে পারছেন, সারা পৃথিবীর সঙ্গে এ দেশও কেমন ধর্ষণের ভূবনায়নের মানচিত্রে ঢুকে গেছে । শিক্ষিত ,অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশ হোক কিংবা অর্ধ শিক্ষিত ,অনুন্নত দেশ – ধর্ষণচর্চা চলছে এবং বেড়েই চলেছে । ধর্ষণের ‘প্রেক্ষিত’ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় , নাঃ স্থান কাল-পাত্রর বেড়া নেই ,এমনকি বিখ্যাত মিশরের তাহারির স্কোয়্যারের গনআন্দোলনে প্রায় প্রতিদিন ধর্ষিত হতে হয়েছে কোনোনা কোনো এক আন্দোলনকারী কে –আন্দোলনকারী দ্বারা । আমেরিকায় ‘ওয়াল স্ট্রীট দখল” আন্দোলনে ঘটেছে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ! অকুপাই ওয়ালস্ট্রীট ক্যাম্পে তৈরী করতে হয়েছিলো ১৬ স্কোয়ারফুটের মহিলাদের জন্য “সেফ জোন” যেখানে ৩০জন মহিলা থাকতে পারবে নিরাপদে ।
দেখেশুনে যা মনে হয় ধর্ষণ শুধু কোনো আক্রমনাত্মক জৈবীক ক্রিয়া নয় , একটা চিন্তা ,একটা অবস্থান এবং কিছু ক্ষেত্রে একটা স্টেটমেন্ট । এর দ্বারা আক্রান্ত সমগ্র মানবজাতি , অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিকার স্ত্রী লিঙ্গ হলেও এটা মনে করার কারন নেই আমরা কেউ নিরাপদ ,বিশেষ করে শিশুরা – লিঙ্গ নির্বিশেষে । এর ব্যাপ্তির সঙ্গে তুলনা করা যায় পৃথিবীব্যাপী উগ্রপন্থার ক্রমবর্ধমান ভয়ংকর ধবংসাত্মক আগ্রাসনের । কখনও নিজ দূর্বলতাকে ঢাকতে , সামাজিক দখল কায়েম রাখতে ,বিকৃত মানসিক বিকার থেকে ,কিংবা সমাজের অজুহাতে প্রবল ‘শিক্ষা’ দিতে, অন্য যৌনতাকে বিদ্ধস্ত করতেও অসম্ভব কার্যকরি অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার হয়ে চলেছে ধর্ষণ। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙ্গে দিতে এবং সেনা বাহিনীকে উব্দুদ্ধ করতে গোষ্ঠিগতভাবে এর ব্যাবহার ইতিহাসে কম নেই । উদাহরন - বাংলাদেশ যুদ্ধে প্রায় চার লক্ষ নারী ধর্ষিত হয় পাকিস্থানী সেনা ও রাজাকারদের দ্বারা । এটি ছিলো পরিকল্পনামাফিক একটি কার্যক্রম ,মূল লক্ষ্য ছিলো বাংলাভাষি মুসলমান নারীরা এবং হিন্দু নারীরা । এটি ছিলো মিলিটারি এজেন্ডা । যুদ্ধে এর ব্যাবহার একটি অমোঘ অস্ত্র হিসেবেই ।
জানলে অবাক হতে হয় ,প্রাণীজগতে মানুষ একা নয় যারা এই অপবিদ্যা আয়ত্ত করেছে । শিম্পাঞ্জি এবং বোতলনাক ডলফিন, হাঁস এমনকি কিছু পতঙ্গের মধ্যেও এর প্রবণতা দেখা যায় । যদিও মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের এরূপ আচরনকে বিতর্কিত বলে মনে করা হয়না । কিছু গবেষণা মানসিক বিবর্তনের তত্ত্ব খূঁজে পেয়েছেন মানুষের ক্ষেত্রে ।
বিভিন্ন গবেষণা মূলক লেখা ,ঘটমান ঘটনা ,ইতিহাস,ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা এটাই ভাবতে বাধ্য করে যে ধর্ষণের কারণ অনুসন্ধান অনেক গভীরতা দাবী করে । এর বীজ আমাদের ডি এন এ বহন করে চলেছে বললে আপত্তিকর মনে হলেও অত্যুক্তি নয় । এর শুরু হচ্ছে একটি শিশু জন্মের পর থেকেই । হ্যাঁ সদ্যজাত কোলের ‘ব্যাটাছেলে’টির মধ্যে পরিবার ও সামাজ ধীরে ধীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ‘শিকার ও শিকারীর’ তত্ত্ব । বড় হতে হতে সে শিখে নিচ্ছে সে ‘প্রথম লিঙ্গ’ ,সক্ষমতর । দ্বিতীয় লিঙ্গ হচ্ছে ‘মেয়েরা’ তুলনায় দুর্বল লিঙ্গ ! তাকে যন্ত্রনা পেলে কাঁদতে নেই ‘মেয়েদেরমতো’ ,তাকে উৎপাদনশীল হতে হবে , তাকে বুক চিতিয়ে রক্ষা করতে হবে পরিবার তথা মেয়েদেরকে –কারণ সে নাকি অধিক শক্তিশালী ও সাহসী ! সযত্নে লালন করা হচ্ছে তার শিকারী সত্তাকে সেই গুহামানবের যুগ থেকেই ।
ধর্ষণ কি শুধু একা একটা নারীর উপর সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়াই ? নাঃ ,ধর্ষচিন্তা বহন করছি আমরা নিত্য আমাদের চিন্তায় , আমাদের পর্যবেক্ষণে ,আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরায় । সে ভিড় বাস হোক ,কিংবা অফিসের নির্জন কিউবিকল,কাজের মাসিকে যথেচ্ছ অপমানে , রিক্সাওয়ালাকে গালাগাল দেওয়ায় কিংবা অধস্তন কর্মচারীকে চরম অপদস্থ করায় । শুধু কেউ কেউ অতিবিকারে বিপদসীমা পেরিয়ে যাচ্ছে । মানি নামানি গোড়ায় গন্ডগোল রয়ে যাচ্ছে । ‘পুরুষাকার’ কথাটার গভীরেই থেকে যাচ্ছে যথেচ্ছ অবদমন করার স্পৃহা, ধবংসাত্মক মনবৃত্তি এবং এর মালিকানা শুধুমাত্র ‘পুরুষ’ প্রজাতির একছত্র নয় এই মুহুর্তে ,এটা একটা অবস্থান,একটা প্র্যাকটিস । শিক্ষা-সামাজিকতা আমাদের পরিশীলিত করেছে , শিকারী সত্তাকে অবদমিত রাখতে বাধ্য করেছে মাত্র। আমরা ভুলে যাই আমাদের মধ্যেই বিদ্দমান ‘Ape’ কে , যে বিবর্তনের মাধ্যমে বুদ্ধিযুক্ত হয়েছে ,আরও জটিল হয়ে উঠেছে । সমস্যা এখানেই , পশুজগতের স্বাভাবিক আগ্রাসন যখন মানব সমাজে প্রয়োগ হয় তখন তা এক বিকট –বিকৃত চেহারা নেয় ! সঙ্গে যুক্ত হয় মানবীয় মেধাজাত যুক্তি/লজিক- যা কোনো মনুষ্যতর জীবের প্রয়োজন পড়েনা । এটা বেশী ভয়ংকর হয়ে ওঠে । গড়ে ওঠে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ । জৈবীক কারন পেরিয়ে তা হয়ে ওঠে ‘উচিৎশিক্ষা’ দেওয়ার পদ্ধতি ! সমষ্টিগতভাবে মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার অস্ত্র ।
এর শিকড় আমাদের অস্তিত্ত্বের গভীরে রয়েছে ,আমাদের চেতনার অলিন্দে । এবং আমরা তা মানছিনা , বাইরে থেকে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করছি ক্ষত উপসমে । কোনো আইন, কোনো পেপার স্প্রে ,কোনো APPS যথেষ্ট নয় ,এগুলি কিছু সহোযোগী ভুমিকা নিতে পারে মাত্র । এর শুরু করতে হবে পারলে ভ্রুণ থেকে , শিশু জন্মের পরদিন থেকে । এবং কোনো চটজলদি নকশা নেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সাফল্যের , দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বদলে দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ‘দর্শন’ কে ,তবেই হয়তো ধর্ষণমুক্তি ...

আপনার মতামত জানান