ক্ষত্রিয় গুণ

মাসকাওয়াথ আহসান

 

নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে পরিচয় একটা বুক শেলফ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে। কিশোর বেলায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বুঁদ সে সময় এক ধাক্কায় গুণ আমাকে নিয়ে গেলেন ‘হুলিয়া’র আরেক রোমান্টিকতায়। এরপর আবুল হাসান এসে যখন উদিত দুঃখের দেশের কথা বলেন; খুব বুঝতে পারি গুণ কী বলছিলেন আমাকে।
নির্মলেন্দু গুণ বুঝতে পেরেছিলেন এই দেশে দেশপ্রেমের অপরাধে মাথার ওপর হুলিয়া ঝুলবে। রাজনীতিকতার এই কবি প্রেমের পুতুপুতু কবিতার ইতিরেখা টেনে কেন যেন মনে হয় দেশ-মৃত্তিকাকে ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন আমাদের। নিজেও কখনো কেবল পদ্য লিখে উহু আহা করেননি। প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকনের মতো একহাতে কবিতা লিখেছেন; আরেক হাতে রাজনীতির পোস্টার লিখেছেন যেন। উনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পরেই বাংলাদেশ আবার পরাধীন হয়ে গেছে। তাই নির্মলেন্দু গুণ মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরেননি। ৬৯ বছর বয়েসে সটান পথ হাঁটেন। তাকে বইমেলায় দেখলেই মনে হতো; কবি নয়; একজন ক্ষত্রিয় হেঁটে যাচ্ছেন।

লেজুড় বৃত্তি করে অদৃশ্য সাবানে হাত কচলানো চাকরস্য চাকরের নবরত্ন সভার সার্কাসের বাইরে নিরাপোষ পৌরুষ নির্মলেন্দু গুণকেই যেন মানায়। চোরের খনিতে যেখানে ঋণ খেলাপী আর করফাঁকি দেবার দল রাজনীতির ফুরিয়ে যাওয়া বুবু-ভাবীদের আঁচলের তলায় পিপিং টম দরবেশ-ফালু হয়ে বাঁচে; ঠিক সেইখানে কবির উপহার দেয়া শব্দ ‘মুঠোফোন’-এর বিজ্ঞাপন-এ অংশ নেবার পর; কর দপ্তরে গিয়ে উনি বলেন, বেশ কিছু অর্থ উপার্জিত হয়েছে; তাই কর দিতে এলাম। কর বিভাগের কর্মকর্তারা স্তম্ভিত হয়ে যায়। প্রতিদিন কত কর ফাঁকি দেয়া ধেড়ে শ্যামল
ইঁদুর সামলাতে হয় তাদেরকে; সেই ঠগের দেশে এ দেবদূত এলেন কোত্থেকে!

নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আমার জীবনের এক স্মিত ভাললাগার স্মৃতির সঙ্গে জোড়া লেগে গেল ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে আড্ডা দিতে এসে (মতান্তরে পড়তে এসে)। এষা খান নামে আমাদের এক বন্ধু ছিলো। ইন্দিরা গান্ধীর মতো দেখতে ও ব্যবহারে। আমি যেহেতু ক্লাস করতাম না; এষাই ক্লাসের কিছু খোঁজ খবর আমার ডায়রীতে লিখে দিতো। আর প্রত্যেকদিন লিখে দিত নির্মলেন্দু গুণের কবিতার কিছু ছত্র। নির্মলেন্দু গুণের সব কবিতাই তরুণীর মুখস্থ ছিলো। ফটোজেনিক মেমোরী সম্ভবতঃ। ক্লাসের খবর তাই আর পড়া হয়নি। পড়তাম এষার হাতে লেখা
নির্মলেন্দু গুণ। প্রেম এবং দ্রোহের খুব বাছাই করা লাইন। এইভাবে দিনের পর দিন নির্মলেন্দু গুণ পড়তে পড়তে আমার গদ্যের উন্নতি হতে থাকে। কারণ উনার কবিতায় গদ্যের
নানারকম নিরীক্ষা থাকে। আবার গদ্যের শরীর জুড়ে থাকে পদ্যের চমৎকার সব আঁচড়।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকায় কবিতা পাঠের আসরে তিনি আসতেন। বাংলা একাডেমীতেও। একজন কবির কবিতা পাঠের শৈলী থাকতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু সেইখানেও নির্মলেন্দু সম্পূর্ণ। আর উনি বেশীর ভাগ সময় গম্ভীর মানুষ; কিন্তু হাসলে আশ্চর্যজনক তারুণ্য দৃশ্যমান হয়। তাই উনার বয়স ৬৯ বছর হলেও ক্ষতি নেই; হাসলেই তিরিশ। আর আমি নিশ্চিত দুই বাংলায় অনেক এষা আছে যারা স্মৃতি যন্ত্রে গুণের কবিতা ধারণ করে রেখেছে।

নির্মলেন্দু গুণ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। উনি দেখতে চেষ্টা করেছেন কিরকম টাকা-পেশীর খেলা চলে এই ছাগ-বান্দর সার্কাসে। কীভাবে ভোট কেন্দ্র দখল হয়, পার্টি ক্যাডাররা ব্যালটে সিল মেরে গণতন্ত্রকে গর্ভবতী করে। জন্ম নেয় ব্যবসায়ী হাইব্রীড লুন্ঠক কুরাজনীতিক। ভারতের লেখক খুশওয়ান্ত সিং-কে তো নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে দেয়নি কংগ্রেসের পান্ডারা। ভাগ্য ভালো নির্মলেন্দু গুণ অন্ততঃ প্রার্থী হতে পেরেছিলেন। ঐ নির্বাচনী এলাকার বেচারা শিক্ষার অভাব বঞ্চিত নিজের দোষে ধুঁকে ধুঁকে মরার ভোটাররা নির্মলেন্দুকে কিছু ভোট দিয়েছে। কিন্তু কবি যেহেতু টেকাটুকা দেননি; ভোটারেরা শ পাঁচেক করে টাকা নিয়ে বা সেভেন আপ খেয়ে ভোট দিয়ে এসেছে কোন সারমেয় ছানাকে। ফলে সংসদে দিনমান ঘেউ ঘেউ। সেখানে দাঁড়িয়ে পৌরুষ নিয়ে কথা বলার মত গুণেরা তো আসতে পারেন না। চিন্তার জগতে খর্ব কতগুলো ছাগ-বান্দর নিয়ে ঘুম পাড়ানী মাসী পিসিরা সেখানে মাম ভাইরাস ছড়ান। মাম বলে এদের পায়ের কাছে পড়ে গেলে এক লাথি কষে দিলে ঐটাই মনোনয়ন চূড়ান্ত করার ইঙ্গিত। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণের উচ্চতা এতো বেশী যে উনার
পক্ষে ঝুঁকে কারো দয়া-দাক্ষিণ্য নেবার জীনগত সুযোগই নেই।

এলাকার পুলিশের গুলি খেয়ে আদালত ভবনের সামনে লুটিয়ে থাকা ভোটারেরা যে ছাগ-বান্দরকে ভোট দিয়েছিল; তার অনেক উন্নতি হয়েছে। ঢাকায় বাড়ী; শুল্ক ফ্রি গাড়ী; সুইস ব্যাংকে টাকা, গ্রামের বউটাকে পারসোনায় পাঠিয়ে ঢাকাইড করতে হয়েছে। ছেলেপিলে গুলো লন্ডনে গিয়ে স্পোর্টস কারে ঘুরছে চার বোতল ভোদকার আমেজে। লুন্ঠন শেষ হলে সাংসদ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে দেহ রাখলে; দেশে রয়ে যাওয়া ফেনসিডিল বিলাসী ভিও আইপি ব্যবসার প্রাডো হাঁকানো; মাথায় পতাকা বুকে চেতনার সীলমারা ছেলেটি পৃথুল গতর নিয়ে নির্বাচনী
মতান্তরে জমিদারী এলাকায় যাবে। ভোট ভিক্ষা (লুট) করতে। কিন্তু এলাকার জন্য তাদের কিছু করার নেই। উন্নয়নের বরাদ্দগুলো পার্টির পোষা কবুতরদের মাঝে ছিটিয়ে দিতে হবে
যে।

আর নির্মলেন্দু গুণ তিল তিল পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন কাশবনে আরেক শান্তি নিকেতন। আসলে প্রথাগত অর্থে জমিদারের ছেলে হলেই যে শান্তি নিকেতন গড়া যায় তা নয়। নির্মলেন্দু গুণের মত মনের জমিদার হতে জানতে হয়। আমার মনের জমিনেও তো উনার কিছু শতাংশ অনুদান আছে। গদ্যলিখে যতটুকু করে কম্মে খাওয়া সে তো গুণ কর্তারই আশীর্বাদ।

আমি বড় মাপের মানুষদের ভয় পাই। ফলে অনেক সুযোগ থাকার পরেও নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা করিনি। কারণ যা বলার, যতটুকু দেয়ার উনি কবিতায় দিয়ে দিয়েছেন, আবার বিরক্ত করে কী লাভ! হঠাত এক বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে উনার সঙ্গে দেখা। তো গৃহকর্তা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন কার্টেসী বশতঃ; নির্মলেন্দু গুণ সেই তরুণ হাসি দিয়ে বললেন, ওকে তো চিনি। ভালো লেখে। কবি রফিক আজাদও বললেন, ওরা আমাদের কতটুকু পড়ে, খোঁজ রাখে জানিনা; আমরা লক্ষ্য রাখি তরুণদের দিকে। নির্মলেন্দু গুণ আমাকে চেনেন এই বিস্ময়ে; টেবিলের খাবার গুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলাম না। পেট ভরে গেছে। আনন্দম; নির্মলেন্দু গুণ।

আপনার মতামত জানান