যাঁরা অন্যভাবে অপ্রতিরোধ্য

ফুলমণি সরেন

 



বান্টি আজ একুশ বছরের যুবক। কিন্তু বান্টির সিনেমা বা টিভি দেখতে ভালো লাগে না। কেন এমন অদ্ভুত ঘটনা? বিনোদনের যে মাধ্যমের বিপুল আবেদন তা আমাদের যুবকটির অপছন্দ কেন? জবাবে সে জানায় “কিছুই বুঝতে পারি না”। প্রশ্ন করা যায়, বিনোদনে আর বোঝার কী আছে? বিনোদন তো উপভোগের, বোঝার তো নয় কখনোই। কিন্তু বিনোদন তখনই উপভোগ্য যখন তা থেকে সংকেত নিয়ে ইন্দ্রিয় সেই সংকেত স্নায়ু ও মস্তিষ্কে চালিত করে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। বান্টি বধির। সুতরাং শ্রাব্যদৃশ্য মাধ্যমে অনেকের বিনোদনের জন্য যা যথেষ্ট তাই বান্টির জন্য অপ্রতুল।
শুধুই কী বিনোদনে বান্টি বঞ্চিত? সেই তার জ্ঞানোন্মেষের দিনগুলোতে যখন সে পৃথিবীর লোকে কী বলছে সেটা বোঝার জন্য শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত বক্তার ঠোঁটের দিকে তখন সে শব্দগুলোকে বোঝার জন্য বক্তার গলাতেও হাত রাখত প্রায়শই। যার কাছে পড়তে বসত বাড়িতে, কখনও কখনও তার মুখের ভেতর জিভের চলনটা বোঝার জন্য বার বার একই জিনিস বলার জন্য অনুরোধ করত। কিন্তু ইস্কুলে সেটা সম্ভব ছিল না। একটা ক্লাসে আশিটা ছাত্র, একজন মাস্টার মশাই। মাস্টারমশাই একটি অন্যভাবে সক্ষম ছেলের জন্য আলাদা করে পড়া বোঝানোর সময় পান না। মাস্টারমশাইয়ের অন্যভাবে সক্ষম ছেলেটির পড়া বুঝতে পারা বা না পারা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কিংবা মাস্টারমশাইয়ের মনোযোগ নেই ক্লাসের কোনো কিছুতেই। শিক্ষাক্ষেত্রে অমনোযোগী মাস্টারমশাই ব্যাপারটা অবশ্য যে কোনো চাকুরিক্ষেত্রেই অমনোযোগী চাকুরেদের মতো। কিন্তু সেটা এখনকার আলোচনার বিষয় নয়।
বলাবাহুল্য, বাড়ির পড়া আর ইস্কুলের পড়ার মধ্যে বান্টি তাল মেলাতে পারত না। ফলে সাধারণ গড়পড়তা ছাত্রদের দলেই সে থেকেছে বরাবর। কিন্তু খেলার মাঠে প্রশিক্ষকের থেকে নির্দেশ বুঝে নিতে তার কোনো অসুবিধে হয় নি। বান্টি টেবিলটেনিস খেলায় রাজ্য দলের সদস্য হয়ে অংশ নিয়েছে জাতীয় দলে। হয়তো কোনো একদিন জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। এই অন্যভাবে সক্ষম ছেলেটির ক্ষমতা বিকাশে কিন্তু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির একটি প্রশিক্ষকের যত্ন ও মনোযোগ। লেখাপড়া অধিকাংশকেই শিখতে হয় সেটা জীবিকা নির্ধারণের সাধারণ উপায় বলে। কিন্তু খেলাধুলোয় যাঁরা প্রতিভাধর তাঁরা সুযোগ ও সাফল্য পাওয়া না-পাওয়ার সঙ্গে লড়তে লড়তে কখনও তাঁদের ভালোবাসার খেলার ওপর থেকে ভালোবাসাটা হারিয়ে ফেলেন না। তাই হয়তো প্রশিক্ষক হিসেবে শিক্ষানবিশকে তাঁরা খেলার প্রতি দরদটাও দেওয়ার চেষ্টা করেন। হয়তো সেই কারণেই বান্টির অন্যরকম সক্ষমতাটা ইস্কুলের ক্লাসরুমে না ফুটলেও, খেলার মধ্যে দিয়ে যথাযথ প্রকাশিত হল।
আবার বান্টির পরিবারের কৃতিত্বও এখানে অনেক। বান্টির বাবা-মা কখনও বান্টির বধিরতাকে বান্টির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেন নি। বরং প্রগতির হাত ধরে ছমাস বয়স থেকে সন্তানকে চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণের মধ্যে রেখে তিন বছর বয়সের মধ্যেই তাকে সবাক করে দিয়েছেন। তারপর থেকে সাধারণ শিশুদের সাথে পাল্লা দিয়ে তার পড়াশুনা এবং খেলাধুলো শুরু হয়ে গিয়েছে, জীবনে স্বনির্ভর ও প্রতিষ্টিত হওয়ার জন্য। সেই বান্টি এখন তাই শুধু সফল খেলোয়াড় নয় কলাবিদ্যার স্নাতকস্তরের ছাত্রও।
এই প্রান্তবন্ত যুবকের জীবনে বিনোদন কিন্তু খেলা। সেখানে স্কোর লেখা থাকে। সেখানে অ্যাকশন রিপ্লে দেখা যায়। সেখানে নির্দিষ্ট নিয়মে কতগুলো অ্যাকশন ঘটে। অ্যাকশন যদি নিয়মের বাইরে হয় তাহলে ফাউল কিংবা পেনাল্টি কিংবা ওয়ার্নিং হয় নিয়মমাফিক। কিন্তু মানুষের জীবনের বিচিত্র গল্পে বাধা ছায়াছবির জগতে বান্টির আনন্দ নেই। সুর কিংবা সংলাপ মাত্রেরই তো আর ক্যাপশন হয় না। যে সুর-কে স্পিকারের কাঁপনে একজন বধিরও চিনে নিতে পারে, সেই সুরের হৃদয়বৃত্তিতে, বিনোদনে এবং ব্যবসায় যত বিশাল ভূমিকাই হোক না কেন তা আপাতত বান্টির আনন্দের জগতের বাইরে। যে সংলাপ পড়েই গল্পের ক্ল্যাইম্যাক্স বা মূহুর্তের কমেডি বা ট্র্যাজেডি বোঝা যায় তা বান্টি বুঝতে পারে না শুধুমাত্র ক্যাপশন থাকে না বলে।
অবাক এই কারণে লাগে যে, যে বিনোদন ব্যবসা দরজায় কড়া নেড়ে উপভোক্তার সংখ্যা বাড়িয়ে চলে, সেই বিনোদনও উপভোক্তা সমাজের অংশ হিসেবে এই অন্যভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কথা মনে রাখে না। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে তাঁদের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করে না। এর মধ্যে শুধু বিনোদন বিপণনে যাঁরা যুক্ত বা বিনোদন নির্মাণে যাঁরা যুক্ত তাঁদের চিন্তার সংকীর্ণতাই ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে সমগ্র সমাজের ক্লীবত্ব ও অসহমর্মিতা।
তবে বর্তমান প্রজন্মের অন্যভাবে সক্ষম ভারতীয় মানুষেরা সমাজের চিন্তার প্রতিবন্ধকতাকেও আমল দেয় না। তারা সেল ফোন তো ব্যবহার করেই। ইন্টারনেটও ব্যবহার করে। বান্টিই তার বাবার ফোন ভাইব্রেশন বা ফ্লাশিং লাইট মোডে রিং হলে ফোন রিসিভ করে। অনর্গল সামাজিক কুশল প্রশ্নে ফোনের ওপারের মানুষকে ব্যস্ত রাখে উত্তরের প্রত্যুত্তর না দিয়ে (কারণ সে শুনতেই পায় না বক্তার উত্তর) যতক্ষণ না হ্যান্ডসেটটা বাড়ির অন্য কারুর হাতে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু স্কাইপে সে বেশ স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারে। সমাজের সহানুভূতিশীল হওয়া না হওয়ায় সত্যিই বান্টিদের কিছু যায় আসে না। তবে সমাজ কী ভাবে তার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বান্টির মতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে সেটা সমাজের মাথাব্যথা, আমার বা বান্টির নয়, আমরা আমাদের মতো করে অপ্রতিরোধ্য।

আপনার মতামত জানান