সুয়ারেজের কামড় আর মারাদোনার কান্না

সৌরাংশু

 



গত চব্বিশে জুন এস্তাদিও দস দুনাস ক্রীড়াঙ্গনে উরুগুয়ের লুই সুয়ারেজ ইটালির জর্জিও চিলিয়েনির ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরকম ক্রিয়াকলাপ তিনি আগেও করেছেন বটে। খবরে প্রকাশ উনি এই কম্মটি আগেও করেছেন তার মধ্যে গত বছর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চেলসির বিপক্ষে ইভানোভিচকে কামড়ে দেওয়াটা এখনও সকলের মনে দগদগে হয়ে আছে। ফিফার শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি আগামী দু দিনের মধ্যে সুয়ারেজের শাস্তির বিধান দেবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে।
সুয়ারেজের আইনজ্ঞ অ্যালেহান্দ্রো বালবি, যিনি আবার উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাও তিনি বিষয়টিকে খেলার অঙ্গ বলে দেখতেই অনুরোধ করেছেন। উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান শ্রী উইলমার ভালদেজ বিষয়টিকে আবার তৃতীয় বিশ্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে ব্যাখ্যা করেছেন। দাঁত বসানোর ছবিটি নাকি ডিজিটালি নাড়াঘাঁটা করা হয়েছে যাতে ইংল্যাণ্ড এবং ইতালি হেরে যাবার প্রতিশোধ তুলতে পারে।
বালবি আরও বলেছেন, সমস্ত খেলোয়াড়ই যদি তাদের আঘাত দেখাতে শুরু করে তাহলে সুয়ারেজও দেখাতে পারে যে তার বুকে গোঁত্তা সিন বোনে আঘাত লেগেছে। খেলাকে নাকি খেলার অঙ্গ হিসাবেই মেনে নেওয়া উচিত। ভাল কথা। বিষয়টি বিচারাধীন তাই এই বিষয়ে এক্ষুনি কথা না বলে আসুন ফিরে যাই বছর আঠাশ আগে।
মেক্সিকোতে ফকল্যাণ্ড যুদ্ধের বছর চারেক পরের এক বিকালে দিয়াগো আর্মান্দো মারাদোনা নাম্নী বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল স্কিলের অধিকারী এক পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির এক তথাকথিত ফুটবলীয় ভগবান ছ ফুট এক ইঞ্চির পিটার শিল্টনের বাড়ানো হাতের উপর দিয়ে অভিযোগ মতো হাত দিয়ে ঠেলে বল গোলে ঢুকিয়ে দেন। যা রেফারির অগোচরে ছিল। যদিও তার মিনিট পাঁচেক পরেই ফুটবল স্কিলে তাঁর দক্ষতার নিদর্শন দিয়ে তিনি বিতর্কের সমাধা করে দেন বলে তাঁর ভক্তগণের বিশ্বাস।
তার পরের বছর গ্রুপ লিগের ম্যাচে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিশ্চিত গোল তিনি হাত দিয়ে বাঁচিয়ে দেন। যেটি অনেকেই মনে রাখেন নি। এর পর ১৯৯১তে ইটালিতে কোকেন সেবন এবং ১৯৯৪এর ইউ এস বিশ্বকাপে এফিড্রিন ড্রাগস সেবনের অপরাধে তিনি ফুটবল থেকে বিতাড়িত হন। শেষবারের বিতাড়ন তাঁর ফুটবল জীবন শেষ করে দিয়েছিল।
যদিও মারাদোনা আজও ভগবানের হাতের গোল নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন নি। বরং বলেছেন এটিই নাকি তাঁর ফকল্যাণ্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যের মানবতা বিরোধী আর্জেন্টিনীয় বন্দিদের নির্বিচারে হত্যা করার প্রতিবাদ। অথবা ৯৪য়ের ঘটনাটি আসলে ফিফার ষড়যন্ত্র। কারণ তিনি কখনই কারুর পা চাটা কুকুর নন। মারাদোনার ভক্তকূল সাধারণত ওনার কথা বিশ্বাস করে নেন অথবা যাঁরা একটু যুক্তিবাদী তারা আশ্চর্যভাবে এই সকল ক্ষেত্রে নীরব থাকেন। ভগবানের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কথা ওঠে না। তিনি সব পারেন।
যাই হোক, এসব ছেড়ে আসুন সুয়ারেজের ঘটনায় ফিরে আসি। সুয়ারেজ মারাদোনার মত প্রতিভাবান নন, তিনি বিখ্যাত হতে শুরুই করেছেন গত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একত্রিশ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার পরে- হ্যাঁ, ইভানোভিচকে কামড়াবার জন্য দশ ম্যাচ নির্বাসিত হবার পরেও। সুয়ারেজ আরও একটি কাণ্ড করেছিলেন গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিপক্ষে শেষ মিনিটে নিশ্চিত গোলে ঢোকা বলটি হাত দিয়ে আটকে দিয়ে লাল কার্ড দেখে। ঘানা কিন্তু সেই পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারে নি এবং বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। উরুগুয়ে সেমিফাইনালে প্রবেশ করে। ফলে সুয়ারেজ দেশপ্রেমী হিসাবে আপামর উরুগুয়েবাসীর কাছে প্রচারিত হন।
ঘটনাপ্রবাহে মিল দেখতে পাচ্ছেন কি? এগুলিকে কি আমাদের প্রচলিত ঠিক ভুলের ধারণা দিয়ে বিচার করতে পারবেন? নাকি লাতিন আবেগ, তৃতীয় বিশ্বের অন্য ধরণের বিশ্বচিন্তা বা সাধারণ মানুষের ঠিক ভুলের বিকল্প ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন? দু হাজার দুই সালের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের রিভাল্ডোর অভিনয় মনে পড়ে? রিভাল্ডো চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে উঠে এসেছিলেন ফুটবল বিশ্বের প্রথম সারিতে। অপুষ্টির কারণে তাঁর গাল ফুটো হয়ে গিয়েছিল। চোখ কোটরাগত, খালি ফুটবল যখন পায়ে পড়ত তখন তিনি সব কিছু ভুলে যেতেন বা ভুলিয়ে দিতেন। মারাদোনা বা সুয়ারেজের গল্পগুলোও কিন্তু এটাই।
যে ভ্রান্ত ব্যর্থ সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে চরমতম অপুষ্টি অশিক্ষা হতাশা এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এঁরা শুধু মাত্র ফুটবল স্কিল সম্বল করে সফলতার শিখরে উঠেছেন, সেই সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তথাকথিত প্রথম বিশ্বের ফিটফাট ধোপদুরস্ত সমাজের কোন মিল নেই। নেই আবেগ, সৎ- অসৎ, পাপ- পুণ্য, ন্যায়- অন্যায় বিচারে। যেখানে প্রতিদিন পাহাড় ছোঁয়া ভ্রষ্টাচারী প্রশাসন, সামাজিক অস্বাচ্ছন্দ্য এবং ধনী দরিদ্রের মধ্যে অন্যায্য পার্থক্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয় সেখানে নীতি দুর্নীতির বিভেদ মিশে যায়। অধিকার, হক জোর করে ছিনিয়ে নিতে হয়। তাতে ভুল ঠিক ন্যায় অন্যায় বলে কিছু থাকে না। সর্বহারার সব হারানো যুদ্ধে একমাত্র জয়কেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যে কোন মূল্যে।
বিশ্বকাপের শুরু এবং তারও আগের ব্রাজিলের বিক্ষোভকেই দেখুন। ব্রাজিলের মতো ফুটবল পাগল জাতির একাংশ বলছে যে তাঁরা স্টেডিয়াম, বিশ্বকাপ সংগঠন বা জাঁকজমক চায় না। চায় সকলের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং জীবনধারণের ন্যূনতম সুবিধা। সেই উনিশশো ছত্রিশের হিটলার সরকার থেকে শুরু করে আটাত্তরের আর্জেন্টিনার ভিদেলার সামরিক সরকার খেলাধূলোকে নিজেদের কুশাসনের প্রতিভূ এবং আপামর জনসাধারণের সাধের চুষিকাঠি হিসাবে ব্যবহার করেছে। মানুষ বার বার প্রতিবাদ করেছে, লড়াই করেছে, কিন্তু আবার তাদের সাধারণ আবেগকে মূলধন করে বর্ণচোরা শোষকরা শাসকের পোশাকে অবতীর্ণ হয়েছে ধরাধামে। অদ্ভুত তাদের ইতিহাস, ভূগোল, ভাবাবেগ, মানবতা এবং নীতি বোধ।


তাই মারাদোনা, সুয়ারেজরা বারবার শাস্তির মুখে পড়েন প্রথম বিশ্বের নিয়মকানুন না মেনে। তাই তারা মানুষের আবেগকে নাড়া দিয়ে যান বার বার প্রতিবাদী প্রতিভূ হিসাবে। আপাত বিশ্বের হিসাবে তাঁরা পথভ্রান্ত প্রতিভা। কিন্তু সাধারণ থেকে সাধারণতম খেটেখাওয়া মানুষের আবেগ তাদের বীরের বেশে বরণ করে হৃদয়ের রাজা করে রেখে দেয়। ধর্ম আর ফুটবলের আফিমে মজে তাই আজও মারাদোনার ভক্তদের কাছে তিনি বিপ্লবকামী যিশুর অবতার।
পারলে তিনিই পারেন, পারলে তারাই পারে ধনী বিত্তশালী দেশগুলোকে নব্বই মিনিটে পায়ের নীচে করে নিতে। তাদের ব্যর্থতা তাই সার্বিক সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা। তাদের সাফল্য অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশটির অতিসাধারণ বাসিন্দাদের একমাত্র আশার কিরণ। সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন না হলে মারাদোনা সুয়ারেজরা বার বার নিয়ম ভেঙেও হৃদয়ের আসনে বসে পড়বেন। যা টুক্সাডো আর বেঞ্জ সম্পন্ন প্লাতিনি বা পেলেও ভাবতে পারবেন না।
সুয়ারেজের শাস্তি হওয়াই উচিত, কারণ তিনি ফুটবল খেলাটিকে কলুষিত করেছেন। ফুটবলারদের পেস্ট্রি মনে করে দাঁত বসিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর ফুটবল স্কিল বার বার আপামর জনতাকে বিমুগ্ধ করবে। আজ থেকে দশ বছর পরেও তিনিই হয়তো না পাওয়ার সম্রাট হিসাবে হাজির হবেন। মারাদোনার স্কিলের দু শতাংশ নিয়েও মারাদোনার ভ্রান্ত সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে।

আপনার মতামত জানান