অথ রথ-কথা

সরোজ দরবার

 


photo courtesY: the guardian

রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম... ভর দুপুরে ভরা গাছে কে পাড়লি আম? ... জানলা দিয়ে সাধের গাছের ডানা ঝাপটানি দেখে মা ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল। গিয়ে অবিশ্যি কাউকেই দেখল না। শুধু রাস্তার পাশের তিনটে আমের মধ্যে মাত্র একখানি লুটেরার হাত থেকে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পেরেছে, সেটুকুই বোঝা গেল। কিন্তু এত্ত অল্প সময়ে কম্মটি করল কে? বাবা হেসে বলল, বোধহয় জগন্নাথের তোমার গাছের আম খেতে বড় সাধ জেগেছিলে...নিজের হাত নেই তো, তাই কোনও ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ কাজটি সুসম্পন্ন করেছে।
সত্যি সেই সব দিনে ভেবে পেতাম না দেবতা হয়ে একজন ঠাকুরের কী করে হাত না থাকে। ওদিকে দুর্গার দশ, কালী ঠাকুরের চার, মায় রবি ঠাকুরেরও দুই হাত...আর জগন্নাথ - বলরাম - সুভদ্রার হাত নেই? কী কান্ড! পরে গল্পে গল্পে যখন বিশ্বকর্মার কীর্তির কথা জানলাম, তখন তো আর এক দফা অবাক হওয়ার পালা। দরজা খুলে ফেলল বলে, হাত হল না? আমাদের বিমল পটুয়ার কাজের ঘরের দরজা খুলে স্কুলফেরতা আমরা কত উঁকিই তো মারতাম, তাতে তো কোনওদিন কোনও দেবতার অঙ্গহানির সম্ভাবনা দেখা যায়নি। তবে যেহেতু আমরা বুঝেছিলাম, দরজা বন্ধ হলে শিল্পের হানি হয়, সেহেতু দিদির গানের মাস্টারমশাই যেদিন দরজা ভেজিয়ে দিয়েছিল, সেদিন বাড়িতে পাহারাদার পদে থাকা সত্ত্বেও আমাদের সতু দরজা খোলেনি। চোস্তা-পাঞ্জামি পরা মাস্টারমশাই যেদিন ধুতি-পাঞ্জাবিতে ছাঁদনাতলায় দাঁড়াল দিদির পাশে, সেদিন শেষপাতে আরও ক’পিস রসগোল্লা নিতে নিতে আমরা খুদে বন্ধুদল বুঝেছিলাম, বিশ্বকর্মা লোকটা আসলে করিৎকর্মাই ছিলেন। বলা বাহুল্য সেই দরজা বন্ধের প্রথম দিনে সতুর মা কাকিমা গিয়েছিলেন মাসির বাড়ি।
এই মাসির বাড়ি হল আর এক ধাঁধা। পাড়ার রথের প্রতি আমাদের সমীহ ছিল একটা কারণেই যে, তা পাড়ার ভোলাকাকুর থেকেও মাথায় লম্বা। এবং আমরা ছোটলোকের দলেরা সেই রথের কোমর পর্জন্তই উঠতে পারতাম। এর একধাপ উঁচুতে বসে থাকতেন ঠাকুরমশাই। রেকাবিতে ষোলআনা দিয়ে আমরা হাত পেতে দিতাম, এবং তিনি চরণামৃত দিতেন। কিন্তু চরণামৃত পানেও কৌতূহলের পিপাসা মিটত না। ফলত ঠাকুরমশাইয়ের কাছেই প্রশ্ন যেত, রথে করে ঠাকুর কোথায় যাবে? উত্তর আসত, মাসির বাড়ি। একটু পরে রথতলার মাঠের একপ্রান্ত থেকে আর এক দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে রথ। প্রতিবারই তাই হয়। সেখানে থোড়াই মাসির বাড়ি আছে, আছে বলতে আটচালা, আর তার পাশে দীপুর দশকর্মা ভান্ডার। সেদিন এই মাসির বাড়ির ধাঁধা স্বপনকুমারের গল্পের থেকেও ছিল রহস্যময়।
রথতলার বড় রথ বাদ দিয়ে পাড়ায় ছিল আরও গুটিকয় ছোট রথটানা। মাসির বাড়ি টাড়ি নয়, সে রথের দৌড় ছিল, সতুদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি অবধি এরকম। তবে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, রথের চাকা যেন ভেজা রাস্তায় পিছলে না যায়। আর সেই রথটানায় ছিল সর্বধর্ম সমণ্বয়। তখন কে জানত, জগন্নাথদেবের মূর্তির মধ্যেই নাকি এই সমণ্বয়ের বার্তা খোদাই করা আছে। আমরা শুধু এটুকু জানতাম, আমাদের রথটানায় তাহির আর তাহিরের দিদিও থাকবে। তাহিরদের যখন তাসা বেরোত কী চমৎকার করে সাজানো থাকত। ছোট ছোট রথগুলোও চমৎকার করে সাজিয়ে দিত দিদিরা। তাসার আর রথের চূড়োর মধ্যে তফাৎ করার মতো অহেতুক বড় আমরা তখনও হয়ে উঠিনি।
সেই সব বিকেল-সন্ধেরা আক্ষরিক অর্থেই মৃত। দুপুরে রেডিওয় নাটকে রাধারানির গল্প শুনে আজ আর অবিবাহিত ললিতকাকু রথতলার পাশের রাস্তায় একা উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। বঙ্কিম চাটুজ্জের সাহিত্য নয়, তার খোঁজ ছিল শুধু একটা রজনীগন্ধার মালার। আর আমাদেরও তো খোঁজ ছিল, দুঃখের বরষায় চক্ষের জল যেই নামবে, একদিন বন্ধুর রথ এসেও বক্ষের দরজায় থামবে। হ্য়তো বন্ধুর রথ রওনাও দিয়েছিল, কিন্তু তার আগেই আমরা অনেকখানি বদলে ফেললাম। আজ আর কোথায় সেই ঘনঘোর বরষা, কোথায়ই বা রথতলার মাঠ, নিম্নচাপে বৃষ্টি এলে শহরের জলনিকাশি ছড়িয়ে লাঠ। ফলে অফিসফেরতা একরাশ বিরক্তি। ফলে আজ রথযাত্রা, নয় বরং ‘rath Yatra’র বিজ্ঞাপনে আমাদের কেবলই মুখ ঢেকে যায়। শপিংমল আর বুটিকের রথযাত্রার ছাড়ের হিসেব কসতে কসতে একদিন আমরা বুঝলাম, একদিন যখন কর্পোরেটের কাছে ভিক্ষে মেগে আমরা বাড়ি ফিরছি, তখন আমাদের সেইসব দিন ফিরে আসছে স্মৃতির স্বর্ণরথে। সেই সব দিন, সেই সব অনাবিল আবেগ আজও আমাদের সামনে হাত পেতে দাঁড়ায়, কিন্তু আমাদের হিসেবি ডেবিট কার্ড সকল শূন্য করে দিতে আজও নারাজ। ফলত আজ ইংরিজিতে কৃষ্ণচর্চাকারীদের দেশজোড়া রথ থাকল শুধু আমাদের ব্যক্তিগত রথযাত্রাগুলো আর থাকল না। আজও বর্ষা আসে বটে, তবে রথের দুপুরে কোথাও কোনও ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ জগন্নাথের জন্য আম চুরি করছে কিনা জানার জন্য মা-ও তো আর থাকল না।
তবু রথ তো থাকবেই। রথের রসিতে হাতবদল হয়, কিন্তু রথের গরিমা কমে না। আজ অ্যাপার্টমেন্টের বাঁধা চৌহদ্দিতে নামি ইঙ্গলিশ মিডিয়াম বালকের হাতে ওঠে বাজার সাজানো রথের দড়ি। খুপরি নগরীর পড়শিরা, তার ডালায় প্রণামী দিতে গিয়ে খুচরো সংকটে পড়ে। স্ট্যাটাসের পতাকা হয়ে পতপত করে দু’একটা করে নোট ওড়ে। আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে কবেকার এক গ্রামবালকের মনে পড়ে যায় রথের কথা, রথ সাজানোর কথা, মাসির বাড়ি... পুরুতঠাকুর... সতুর দিদির গানের মাস্টারমশাই...আর ভাবতে ভাবতে অল্প অল্প বর্ষা নামে। ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতে সে আর কোথাও পালাতে পারে না, শুধু নেরুদার থেকে শব্দ ধার করে বলে ওঠে-
‘ As if suddenly the roots I had left behind
Cried out to me, the land I had lost with my childhood…
And I stopped, wounded by the wandering scent.’

আপনার মতামত জানান