জগন্নাথ এখন সোজা হয়েই দাঁড়ায়

তুষ্টি ভট্টাচার্য

 


জগন্নাথ কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতো না আমার রথে । একটু করে টানতাম দড়ি ধরে , আবার দাঁড়িয়ে পড়ে সোজা করে দিতে হত । তখন মনে হত , ইস যদি জগন্নাথ দেবকে রথের গায়ে কোনোভাবে দাঁড় করানো যেতো ! অনেক ভেবেচিন্তে একবার দড়ি দিয়ে বাঁধতে গেছিলাম ওনাকে । যদিও রেরে করে তেড়ে এসেছিল অনেকে , তাই সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম । আমার ছেলের ক্ষেত্রেও দেখেছিলাম সেই একই সমস্যা । তার তো আবার হাইটেক রথ , আমাদের সময়ে এই এত্তটুকু রথ নিয়ে এসে মায়ের পুরনো কাপড়টাপড় দিয়ে ঘিরে তাকে সাজানো হত । কিন্তু এদের বেলায় এসব কি আর চলে ! কত ঢঙের মার্বেল পেপার , থার্মোকল এলো , কত বাহারী সাজে সাজল তার রথ ! আমাদের মত খরখরে রাস্তাও আর নেই , গলিটলিও এখন বেশ চকচকে । তাই রথ বেশ স্মুদলি চলছিল ওর । তবুও যেই একবার টাল খেলো জগন্নাথ , সে দেখি কোথা থেকে একটা স্ট্যান্ডের মত খাপ জোগাড় করে নিয়ে এসে তার মধ্যে জগন্নাথকে বেশ ফিট করে ফেলল ! এরপর থেকে জগন্নাথ দিব্যি দাঁড়িয়ে থাকছে দেখছি । এখন সে বড় হয়ে গেছে , তার সেই হাইটেক রথ ধুলো খেতে খেতে পঞ্চত্ব লাভ করেছে । অথচ এই মাহেশের রথকে দেখি কেমন দিব্যি সটান দাঁড়িয়ে আজও ।
মার্টিন বার্ন কোম্পানিকে দিয়ে শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র বসু মাহেশের এই রথটি তৈরী করান । ১৮৮৫ সাল থেকে ১২৮ বছর ধরে এই রথ আজও চলছে সমানে । সম্পূর্ণ লোহার কাঠামোর চারতলার এই রথটির উচ্চতা ৫০ ফুট , ওজন ১২৫ টন । ১২ টি লোহার চাকা রয়েছে যার এক একটির ব্যাস ১ ফুট । চারতলায় থাকেন দেবতারা । রথের সামনে এক বিদেশী সংস্থার তৈরি দুটি তামার ঘোড়া রয়েছে । রথযাত্রার আগের দিন রাজা হিসেবে অভিষেক হয় জগন্নাথ দেবের । সোজা রথের দিন রথে চেপে তিনি বলরাম ও সুভদ্রাকে সাথে নিয়ে চলেন গুন্ডিচাবাটিতে , যাকে মাসির বাড়ি বলা হয় । এ আসলে জগন্নাথের সখী পৌর্ণমাসির কুঞ্জ । ভক্তরা রথের রশি টেনে জিটি রোড ধরে জগন্নাথকে মাসির বাড়ি পৌঁছে দেন আবার উলটো রথের দিন তাঁকে ফিরিয়ে আনেন সেখান থেকে ।
রথের রশি ধরার লোভ না থাকলেও ওই মেলা দেখার লোভ ছিল ছোটবেলায় । কিন্তু মানুষজনের ওই ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও ছিল ষোলআনা । মনে হত যদি রাধারাণী হয়ে যাই ! এগারো বছর বয়সে শ্রীরামপুর নিবাসী যে রাধারাণী মালা বিক্রি করতে গেছিল আর অন্ধকার হওয়ায় হারিয়ে গিয়ে কাঁদছিল চিৎকার করে , আমি যেন মনে মনে সেই রাধারাণী হয়ে যেতাম রথের মেলায় যাওয়ার নাম করলে । আমি যেন ধরেই নিয়েছিলাম , আমার জন্য কোনো রুক্মিণীকুমার পরিত্রাতা হয়ে আসবে না । তাই রথের দিনে আমার রথ দেখতে যাওয়া হয়ে ওঠে নি এখনও পর্যন্ত । তবে রথের মেলা দেখতে ছাড়িনি তাই বলে । আমার কাছে রথ আর জিলিপি কখন যেন সমার্থক শব্দের মত হয়ে উঠেছিল নিজেই বুঝি নি । সোজা রথের দিন থেকে উল্টো রথের দিন পর্যন্ত রোজ জিলিপি খাওয়ার রেওয়াজ ছিল প্রায় সকল বাড়িতেই । এখনো নিশ্চই আছে অনেক ঘরে । নইলে এই যে এত গুমটি গজিয়ে ওঠে জিলিপি তৈরির , আর এত যে থালা থালা জিলিপি তৈরি হয় , সেগুলো যায় কোথায় ! গ্যাস-অম্বলকে বাঙালি আবার কবে ভয় পেয়েছে !
রথের মেলায় আরও একটা জিনিস আমাকে মারাত্মক টানতো – গাছ ! সবুজ সবুজ কচি কচি গাছের চারারা মেলা বসিয়েছে এই মেলায় । কত যে ফুলের গাছ, ফলের গাছ, পাতাবাহারী বা ক্যাকটাস । এই মেলাই আমার গাছের নেশায় ডুবিয়েছে পাকাপাকি ভাবে । চারা মানুষ করতে গিয়ে কত যে শিক্ষা পেলাম , কত যে নখরা জানে এই বাচ্চাগুলো ! আগে জানলে কি আর ঘরে ঢোকাতাম এদের ! একেক জনের একেক বায়নাক্কা । কেউ বলে আমি ওই কম রোদ আসে যেখানে , ওইখানে থাকবো । কেউ বলে আমার মাথায় একটা পাতলা কাপড়ের শামিয়ানা টানাও । কেউ বলে আমায় একটু কম জল দেবে খাবার সময়ে ! আমি তো এতগুলো কচিকাচা নিয়ে নাজেহাল একেবারে । যাই হোক কোনোমতে ‘মানুষ’ করেছি ওদের । এখন আর লেন্ডিগেন্ডি নিয়ে ছোটাছুটি করতে পারি না । মেলা থেকে চারা আনা হয় না আর । আগের বাচ্চাগুলোই যথেষ্ট বড় হয়েছে , কেউ আবার অকালে চলেও গেছে আমায় ছেড়ে ।
শুধু এই জিলিপির ব্যাপারটায় দেখি আমাদের প্রজন্ম আর এখনকার প্রজন্মে খুব মিল । ওজন বেড়ে যাওয়ার কথা জিলিপি খাওয়ার সময়ে ওদের মাথায় থাকে না খুব একটা ! আমরা যখন খুদেবেলায় রথ নিয়ে চর্কি দিতে বেরোতাম , আর ওই যে প্রতিবেশি কাকু-জেঠু-কাকিমা-জেঠিম ারা জগন্নাথ দেবের থালায় দশটা বিশটা পয়সা ফেলে দিতেন , চোখ সরত না ওখান থেকে তখন । সন্ধ্যে হলেই ছুট দিতাম ওই পয়সা নিয়ে জিলিপির দোকানে । কোনো হীনমন্যতা কাজ করত না আমাদের ছোটদের বা বড়দের মধ্যেও কোনো দাতার শ্লাঘা বোধ করতে দেখি নি । রথের মেলাতে যাওয়ার সময়েও ছোটোদের পয়সা দেওয়ার চল ছিল । বেশ একটা আনন্দ , আনন্দ অনুভূতি ঘুরঘুর করত চারদিকে । এখন দিন বদলেছে , আসলে দিন এভাবেই বদলায় । ছেলেমেয়েরা পড়ার চাপে সব আনন্দ ভুলতে বসেছে । তবুও রথ এলে এখনও ওদের জিলিপি খেতে দেখি । রথের মেলায় গিয়ে ভেঁপু বা কাঁচের চুড়ি কিনতে না দেখলেও চাইনিজ খেলনা কেনে ওরা । নাহ , খারাপ লাগে না , পরিবর্তন তো আসবেই সময়ের সাথে সাথে । মেনে নিতে হয় , মানিয়েও নিতে হয় ।
এখন রাধারাণীরা মেলায় হারায় না ইলেক্ট্রিসিটির দৌলতে । মানুষ বাড়ছে , ভিড় বাড়ছে , মেলাও বাড়ছে আয়তনে । রথযাত্রা আছে , থাকবেও । তার জলুস বাড়বে বৈ কমবে না । আমাদের বয়স বাড়বে , আরও বদল দেখবো সব ক্ষেত্রেই । মন বলে - শুভ হোক এই বদল । শুভ হোক মানুষের , উৎসবের । উৎসব তো মানুষেরই তৈরি , সবাই যাতে একসাথে থেকে আনন্দ পেতে পারে , একা হওয়ার অভিশাপ থেকে কিছুক্ষণের জন্যও মুক্তি পেতে পারে । রথের চাকায় টান পড়বে কিছুক্ষণ বাদেই , ভক্তরা পাবেন আশীর্বাদ , কৌতূহলীরা মজা দেখবেন আর কলা বেচার লোকজনের অভাব তো কোনোকালেই কম ছিল না , তাঁরা কলা বেচুন কিম্বা জিলিপি । আমরা আনন্দে ভাসি আজ ।

আপনার মতামত জানান