উপরে একই আকাশ, নীচে একই মায়ের কোল

মাসকাওয়াথ আহসান

 

১৯৪৭ সালের চৌদ্দই অগাস্ট। বাঙ্গালীর পরিবারটি ভেঙ্গে যাবার দিন। ১৯৪৭ সালেবৃটিশ কেরানী র‍্যাডক্লিফের পেন্সিলের নিষ্ঠুরতায় বাংলার হৃদপিন্ড দু’ভাগ হয়েছিলো সেদিন। বৃটিশ কেরানী, উচ্চবর্ণের হিন্দু ও মুসলিম আশরাফ শ্রেণীর পঞ্চায়েতীতে বাঙ্গালীর গভীর আত্মীয়তাকে ধর্মপরিচয় দিয়ে বিভাজিত করাহয়েছিল। এযেন রাতারাতি যৌথ পরিবারের উঠোনে জোর করে প্রাচীর তুলে দেয়া।
বাঙ্গালী-হৃদপিন্ড কেটে দুভাগ করে দেবার ফলে পশ্চিম-বঙ্গের বহু সংখ্যক মুসলমান বাঙ্গালী পূর্ববঙ্গে পালিয়ে গেলো, অসংখ্য হিন্দু বাঙ্গালী পূর্ববঙ্গ(পাকিস্তান) থেকে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে গেলো। রাতারাতি বাঙ্গালীর ঠিকানা হারিয়ে আত্মপরিচয় ক্ষয়ে যাবার সেই শুরু।আজো দুই বাংলার অনেক মানুষ মনটা এক বাংলায় রেখেশরীরটা অন্য বাংলায় বয়ে চলেছেন। বাঙ্গালীর সম্পন্ন পরিবারটিকে ভেঙ্গে দিয়ে তাদের অর্ধেক জমিদখল করে নিয়েছিল পাকিস্তান আর অর্ধেকটা ভারত। সেই থেকে ভূমিহীন বাঙ্গালী জমিজমা নিয়ে লড়ছে। নতুন প্রজন্মের পক্ষে বাংলাভাগের এই বেদনা উপলব্ধি করাপ্রায় অসম্ভব। কারণ ১৯৪৭ থেকে ২০১৩ এই সময়েরমাঝে বাঙ্গালী আত্মপরিচয়কে ছাপিয়ে ধর্ম-পরিচয় একটি কট্টর মনোজগত তৈরী করেছে।বইপুস্তকে ইতিহাস কতটুকু জানা যায় আমি জানিনা;কিন্তু দেশভাগের ক্ষত নিয়ে যারা এখনো বেঁচে আছেন তাদের সঙ্গে কথাবললে জানা যায় এক নির্মম বাস্তবতার কথা। প্রান্তিক মানুষের মনে ধর্ম পরিচয় আর জাতিগত পরিচয় নিয়ে কোন জটিলতা ছিলো না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মিলেমিশে বসবাস করতো। বৃটিশেরা হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তৈরীর মৌল উপাদান ঈর্ষা বুনে দিয়েছিল অভিজাত বাঙ্গালীর মনে।এছিলো সুযোগ সুবিধার ইঁদুর দৌড় লাগিয়ে দিয়ে আরামে ভারতবর্ষ শোষণের কৌশল।এর সঙ্গে প্রান্তিক কৃষিজীবী সমাজের কোন সম্পর্ক ছিলোনা। এরা অল্পে তুষ্ট মানুষ; কে হিন্দু কে মুসলমান এতো ভাবার সময়ছিলো না তাদের। হঠাত ইথারে ভেসে এসেছিল দেশ ভাগের খবর। আশ্চর্য এক খবর। এখন থেকে বাঙ্গালী মুসলমানেরা থাকবে পাকিস্তানে (পূর্ববঙ্গ) আর বাঙ্গালী হিন্দুরা থাকবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বাঙ্গালী মুসলমানকে শোষণ করবে রাওয়ালপিন্ডির অবাঙ্গালীরা আর বাঙ্গালী হিন্দুদের শোষণ করবে দিল্লীর অবাঙ্গালীরা। এরকম পরাধীনতার শৃংখল বাঙ্গালীকে আগে কখনো পরতে হয়নি। অন্তত নিজের ঘরে বসবাসের অধিকারটুকু তাদের ছিলো।

১৯৭১ সালে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু পূর্ববঙ্গকে পরাধীনতা মুক্ত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলেন। বাঙ্গালীর একটা ঠিকানা হলো। কিন্তু বাঙ্গালী হিন্দুদের একটি বড় অংশ দেশান্তরী হয়েছে ৪৭ থেকে ৭১ এর মধ্যে। আর বাঙ্গালীর হৃদপিন্ডের আরেকটি খন্ড পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেলো। একটি নদীকে দুটি নাম দিয়ে আলাদা করার ট্র্যাজেডি নিয়ে বয়ে চলতে থাকলো বাঙ্গালীর বিখন্ডিত জীবন।আমরা যতই এখন বৃটিশ-অভিজাত হিন্দু-মুসলমান আত্মকেন্দ্রিক নপুংসক নেতাদের দোষ দিইনা কেন; এখন মেনে নিতেই হবে যে, নদী মানুষ বাঙ্গালীর সরলতাই তাদের কাল হয়েছে। বাংলা মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া সহোদর; যে আমার মায়ের ভাষায় কথা বলে, তাকে আমি ধর্ম-পরিচয়ে আলাদা করে দেবো;এরকম নিবোধ রাষ্ট্রসূত্র যারা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন; তারা আসলে ঘৃণ্য কট্টরপন্থার কাছে হেরে গেছেন। এ আসলে ছিল ধর্ম ব্যবসার কাছে মানবিক মূল্যবোধের অসহায় আত্মসমর্পণ।এতে বাঙ্গালীর যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়।অপেক্ষাকৃত অযোগ্য বাঙ্গালীরা ধনসম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের জন্য এবং টিকে থাকার প্রয়োজনে বাঙ্গালীর মেধা ও সাংস্কৃতিক মননকে বিভাজিত রাখতে বেশসফল হয়েছে বলাই বাহুল্য। শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় বাঙ্গালীর একীভূত প্রয়াস জারী রাখা গেলে আজ বাঙ্গালীর ইতিহাস অন্যভাবে লেখা যেতো। আজ বাঙ্গালীর মনে যে প্রতিহিংসা আর ঈর্ষার প্রকট উপস্থিতি তা বিভাজিত বাঙ্গালীর হতাশার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।বৃটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হবার পরে অন্যান্য জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে গেছে; বাঙ্গালী তা পারেনি। ফলে বাঙ্গালীর যে সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানে আজ থাকার কথা ছিলো, যেরকম জীবনমান অর্জন করার কথা ছিল তা ঘটেনি।কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষ নতুন টাকা পয়সার মালিক হয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক মননের অভাবে এরা বাঙ্গালীর প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেনি। প্রান্তিক বাঙ্গালীরা সেই অন্ধকারেই রয়ে গেছে;নতুন উপসর্গ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ধর্ম প্রদর্শনের রোগ।

আমরা শিশুকালে জেনেছিলাম মুসলমানদের আল্লাহ আর হিন্দুদের ভগবানের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। মুসলমানদের আল্লাহ নিরাকার, আর হিন্দুদের ভগবানকে বোঝার সুবিধার জন্য কিছু প্রতীকী আকার দেয়া হয়েছে। মানুষের সৃষ্টিকর্তা একজনি। সত্য - সুন্দর - মঙ্গলকে যিনি ধারণ করেন। ব্যাস মিটে গেলো। সত্য সুন্দর মঙ্গলকে ধারণ করে কে মসজিদে গেলো আর কে মন্দিরে গেলো তা নিয়ে এতো বিভাজন,এতো কোন্দলের কী কোন প্রয়োজন আছে!১৯৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত মনোজগতে যে বিভাজনের ক্ষত নিয়ে বাঙ্গালী বিখন্ডিত তার রাষ্ট্রিক কোন সমাধান আর সম্ভব নয়। বাঙ্গালী শরীরকে মেনে নিতেই হবে যে তার হৃদপিন্ড বিখণ্ডিত। কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে পড়ে থাকবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অলিন্দ-নিলয়। উপরে একই আকাশ, নীচে একই মায়ের কোল।


লেখক কাবেরী রায় চৌধুরী ও চলচ্চিত্রকার আশরাফ শিশির। দুই বাংলার প্রেম ও পরিণয়ের উপাখ্যান

আপনার মতামত জানান