“মানুষ বড় সস্তা...”

সুশোভন পাত্র

 

জিৎ বাহান মুণ্ডাটাও মারা গেলো !!!
জিৎ বাহান মুণ্ডা ? মেসি, নেইমারের ভরা বাজারে জিৎ বাহান মুণ্ডা ? সেটা কে রে ? কোন দেশের স্ট্রাইকার ? কোন ক্লাবে খেলে ? কটাই বা গোল করলে ? হেয়ার স্টাইলটা কেমন ? এবারের বিশ্বকাপে ছোট টিমগুলোর দাপটে রোনাল্ড, আন্দ্রে ইনিয়েস্তা, বালতেলির মত বড় বড় মহারথীরা ঘাবড়ে গিয়ে সাবড়ে গেছে সেখানে জিৎ বাহান মুণ্ডা এতদিন করছিলটাই বা কি ? আর নামটাই বা কেমন ? জিৎ বাহান মুণ্ডা !! অমন নাম যখন, বিদায় হবে না তো কি হবে শুনি?
জিৎ বাহান মুণ্ডাটা হল গিয়ে উত্তরবঙ্গের রায়পুর চা বাগানের শ্রমিক। গত তিনদিন, প্রতিদিন, তিস্তার ধারে একে একে যে চিতা জ্বলেছে শোরাপিনী মুণ্ডা, বাসু মুণ্ডা, ক্ষেত্রী বরাইক দের, আজ তার চতুর্থ দিন । আজ জিৎ বাহান মুণ্ডার পালা । পড়ন্ত বিকেলে তিস্তার নদী পাড়ে চিতার আগুনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রায়পুর চা বাগানের মুষ্টিমেয় কজন শ্রমিক। চা বাগানটা বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবে । সরকার, প্রশাসন সবাই ‘দেখছি’ বলেছে। কিন্তু সে দেখার চোটে আজও পেটে ভাত জোটেনি ওদের। অনাহারে, অর্ধপুষ্টি তে এই নিয়ে রায়পুর চা বাগানেই মারা গেলেন ২১ জন । মোট ৩৭ ।
আবার অনাহার ? আবার খিদে ? এ তো মহা সমস্যায় পড়া গেলো । এত খিদে পায় কেন এদের ? সে কবে থেকে শুধুই খাই খাই । খাবার কি কোন শেষ নাই এদের? এত উন্নয়ন, পাহাড়ে এত হাসাহাসি, স্যুইজারল্যান্ডের গন্ধ, এর মধ্যে খিদে পায় কি করে ? যতসব জুটেছে আহাম্মকের দল । কাজ নেই কম্ম নেই শুধু খাই খাই ।
২৬ – ২৮ -৩৪-২৪ ঘণ্টা, দুঃখ, আনন্দ, প্রাইম টাইম থেকে ক্রাইম টাইম, সবাই এখন বিশ্বকাপ নিয়ে দারুন মেতে আছে। মনে হচ্ছে বিশ্বকাপটা কে পাবে সেটাই আমাদের রাজ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ব্রাজিল , আর্জেন্টিনা না জিতে অন্য কেউ জিতলে জিডিপির বড্ড ক্ষতি হবে যে। তাই ব্রাজুকা তে লাথি পড়লে খবর পাবে, ছাপবেও, চা শ্রমিক দের পেটে লাথি পড়লে খবরই পাবেনা, আর পেলেও বেমালুম চেপে যাবে। মরা শ্রমিকের দাম কি টি আর পি-র থেকেও বেশী ? কি যে বলেন !!!
কিন্তু বুদ্ধিজীবীগুলো ? যারা সমাজের ক্রিমি (কৃমি নয়) লেয়ার, তাঁরা কি করছেন ? ওনারা কি এখন ডাইনোসরের মত বিলুপ্ত ? না ম্যামথের মত বিলুপ্তপ্রায় ? ওনাদের বুদ্ধিটাই কি আর জীবি-ত নাই ? বিবেক কি বেচে দিয়েছেন ? যেগুলো পোষ মানে তাঁদের কি পদ দিয়ে গৃহে পালন করা হচ্ছে ? কিন্তু যারা বেয়াড়া ? বিবেক বেচবে না বলে পণ করেছেন ? তাঁরা কি সবাই কেস খেয়েছে ? পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে ? ভূষণ -টুশন কিছু একটা দিয়ে দিয়েছে ?
আর আমরা ? বিবেকবান জনগণ ? আমরা কি করছি ? আমরা কি বেঁচে আছি ? আমরা কি দিনে ঘুমোচ্ছি ? রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখছি ? সকালে উঠে ফেসবুকে রাত্রে খেলার দেখার বীরত্ব জাহির করা স্ট্যাটাস দিচ্ছি? না ফুটবল প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার অভিনয় করছি? আসলে আমরা এখন ফসিলসের ‘অ্যাসিডে’ মুখ পোড়াই, ইষ্টিকুটুমের মধ্যবিত্ত ইনটেলেকচুয়ালিটির নিরামিষ কেরামতিতে ডুবে , বৌ-র চোখ এড়িয়ে সানি লিওনের ছবিতে যৌন সুড়সুড়ি খুঁজি, আর খবর দেখ দেখতে কথার মাঝে ছোট্ট করে ইংলিশ গুঁজে বলি “দিস ইস নট হ্যাপনিং, এই দেশটার আর কিছু হবে না” । আমরা পারি গালে গাল ঠেকিয়ে সৌজন্য বিনিময় করতে । আমরা পারি পিৎজা আর মকটেল দিয়ে ডিনার সারতে। আমরা পারি ২০ টি বাংলার উপসর্গের মত ল্যাক্মির ২০ টি প্রোডাক্টের নাম বলে দিতে। আমরা পারি ক্লাসিকের মাইল্ডসের ছোট্ট ধোয়া উড়িয়ে সানন্দা বা ম্যাক্সিমের পেলবতায় ডুবে যেতে। আমারা পারি ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’ হয়ে উল্কি প্রদর্শন করতে। আমরা পারি মাইকেল শুমাখারের ডেলি খবর রাখতে । কিন্তু জিৎ বাহান মুণ্ডা ? নৈব নৈব চ । আর সময়ই বা কথায় বলুন তো ? ঐ তো সকাল বেলা ছেলেটাকে ঘুম থেকে তুলে দেওয়া। ও যখন পেপসোডেন্টের সতেজতায় ডুবে গেছে তখন ওর জন্য ব্রাউনব্রেডের টোস্ট বানানো। তারপর ওর গলায় ঠিক করে টাই টা বেঁধে দিয়ে স্কুল বাসে চাপানোর আগে দেখে নেওয়া যে, বইয়ের ভারে ওর কাঁধ ঠিক ঠাক ঝুলেছে কিনা । তার পর নিজের অফিস, ক্লাব ,জিম। ছেলে ফিরলে ওর হাতে প্লেষ্টেশন তুলে দিয়ে ঠিক তিনটে তে ড্রইং ক্লাস, তারপর সাঁতার হয়ে গান । সন্ধ্যেতে স্মার্ট কোচিং। বছর শেষে ছেলে ৯৫.৭% নম্বর পেলে মাল্টিপ্লেস্কে ‘স্পাইডার ম্যান’ আর আর ‘কেএফসি –র’ বার্গার । ফিরে আসার পথে বিদেশী কোম্পানির আইস ক্রিম চুষতে, চুষতে ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ছেলের বয়সি মেয়েটাকেই খুচরো ভিক্ষে দিয়ে নিজেকে মানুষের মত মানুষ মনে করা। এর মধ্যে জিৎ বাহান মুণ্ডা এল কোথা থেকে শুনি ?
আর সরকার, প্রশাসন ? তাঁরা কি করছে ? প্রশাসন বলেছে খবর পায়নি । ব্লক থেকে জেলা । কেউই খবরই পায় নি। আসলে প্রমোশনের পাওয়ার জন্য খবর না পাওয়াটা আবার খুব জরুরী। আর সরকার ? আমাদের জন্য, উন্নয়নের জন্য সরকার কি কম করছে নাকি ? এই তো আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলেই সরকারি কর্মচারী দের একটা হাফ ডে ছুটি দেবে । নীল সাদা বলে কথা । ছুটি দিলেই অনেক উন্নয়ন হয়। হাফ ডে ছুটি, শুনেই সরকারী আপিসে এক বেলা বিদ্যুৎ কম পুড়বে। চা, চিনি,জলের ব্যবহার কমবে। এটা সরকারী সম্পত্তির অপব্যহারের প্রতিষেধক মূলক উন্নয়ন। দুপুরের মধ্যেই বাড়ি ফিরে গেলে শহরে সন্ধ্যে বেলা গাড়িতে ভিড় কম হবে। এটা ট্রাফিকের উন্নয়ন। ট্রাফিক জ্যাম কম হলে লাল আলো কম জ্বলবে, তাই রবীন্দ্র সঙ্গীত কম বাজবে । এর থেকে যে পরিমান রবীন্দ্র সঙ্গীত সাশ্রয় করা যাবে সেটা দিয়ে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক বা বিদ্যুৎ ব্যঙ্কের মত একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত ব্যাঙ্ক বানানো যেতেই পারে। আর একসাথে বাড়ি ফেরা আবার কর্ম সংস্কৃতির উন্নয়ন। সর্বোপরি যখন তখন ছুটি দেওয়াটা একটা উদারতার উন্নয়ন । এর বেশী কিছু হলে সরকার না হয় একটা মেলা করে দেবে। নাম হবে ‘শহীদ জিৎ বাহান মুণ্ডা মেলা’। সেই মেলাতে কেউ শেখাবে পুডিং বানাতে কিম্বা চিংড়ি মাছের চটপটি। কেউ বাজাবে মাদল। ভেজাল মার্কা কলকাতার রসগোল্লার নাচ হবে। কচিনেতার গানে কখনো আবার হবে হালকা একটু শহীদ স্মরণ। এর সাথে মাঝে মাঝে জিৎ বাহান মুণ্ডার নামে শিলা পুঁতে পুঁতে উন্নয়নের ঘোষণা হবে । সরকার প্রেসকনফারেন্স করে বলবে “পাহাড় এখন খিলখিল করে হাসছে । আমাদের নীতি জনগণের নীতি । এখানে কেউ অনাহারে মরেনি, মরবেও না । জনগণের স্বাস্থ্যের খেয়াল রেখেই সরকার ‘অনাহারে নেই খেদ, বেশী খেলে বাড়ে মেদ’ এই স্লোগানে, গ্রামে গঞ্জে প্রচার চালাচ্ছে। জিৎ বাহান মুণ্ডাকেই দেখুন, মরতে পারে, ওটা তো ‘ছোট ঘটনা’, কিন্তু মরার সময়ও বেশী খেয়ে ওঁর পেটে কিন্তু মেদ জমে নাই।”
আর কিছু আহাম্মক আছেন। ভালো দেখতে পারে না, ভালো শুনতে পারেন না, ভালো বলতে পারেন না । ওঁরা নাকি এখনও ভাবেন। ভাবা প্র্যাকটিস করেন । এঁরা কাইট রাইদারসের বিজয় জলসা তে না এসে প্রশ্ন করেন, বুঝতে চায়, জোট বাঁধেন, তৈরি হন, প্রতিবাদ করেন। যতসব জুটেছে অকর্মণ্যের দল। কোথায় কে না খেতে পেয়ে মরল সেটা নিয়েই এঁদের যত মাথাব্যাথা। এঁরা হচ্ছে সেই আঁতেল যারা পরজীবী, মৃতজীবী, মিথোজীবি , গিরগিটি, সরীসৃপ না হয়ে মানুষ হবে পণ করছেন। এঁরা আর কি করবে ? কিস্যু করতে পারবে না । বড় জোর শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ভাড়া করে দু-লাইন লিখবে যে ......
“ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে
মানুষ ছিল নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো |
অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায় !
পাথর কেটে পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ |
মাথায় ক্যারা, ওদের ফেরা ...যতোই থাক রপ্ত
নিজের গলা দুহাতে টিপে বরণ করা মৃত্যু...
ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে
মানুষ ছিল নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো |
পথের হদিস পথই জানে, মতের কোথা মত্ত...
মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো !”

আপনার মতামত জানান