ব্রাজিল লাইভ...

চৈতালি চট্টোপাধ্যায়

 



ব্রাজিলে আসবার কথা যখন ঠিক হলো, আমার খুব বেশি আনন্দ হয়নি, কারণ ব্রাজিল বলতে যেটুকু জানতাম তা হল শুধুই ফুটবল আর ফুটবল আমি খুব বেশি ভালোবাসিনা যদিও অনেকে বিশ্বকাপ করে নেচেছিল,এছাড়াও শুনেছিলাম ভারতীয় খাবার দাবার নাকি কিছুই পাওয়া যায় না। ফুটবল ব্যতীত ব্রাজিল সম্বন্ধে যেটুকু জানতাম গ্লবা হসার বা ভিদাস সেকাস সিনেমা দেখে। তবে দক্ষিণ আমেরিকাতে প্রথম পা দেব, সেইখানের অনেক কিছুই জানিনা,কিছু বাজে লাগার মধ্যেও ঐগুলো ছিল আনন্দের অন্যতম উপাদান। যদিও এখন ভাবি ব্রাজিলে না এলে এইখানের এই আবেগপ্রবণ মানুষগুলোর সাথে হয়তো আর কখনই দেখা হত না।
সাও পাওলোর বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন করাতে একঘণ্টা সময় লেগেছিল। দেখে অবাক হয়েছিলাম এরা আর ৩ মাসের মধ্যে কিভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করবে? ফুটবল বিশ্বকাপের কোনরকম সাজসজ্জা কিছুই দেখি নি শুধু মাত্র কোরিয়ান কোম্পানি স্যামসাঙের একটি বিজ্ঞাপন ছিল, বিশ্বকাপ নিয়ে।

ফুটবল ছাড়াও ক্রমে আবিস্কার করতে লাগলাম, সাওপাওলোর রাস্তায় গ্রাফিতি আর্টের। রাস্তায় পাঁচিলের ধারে যেখানেই ফাঁকা জায়গা সেখানেই বিবিধ রঙের পেইন্টিং চোখে পড়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্রাজিলিয়ানদের খাওয়া দাওয়া ভালো লেগে গেলো। চীজ আর মাংসের স্বর্গরাজ্য। এছাড়া দেখলাম যেকোনো অফিসিয়াল কাজে ফর্ম ফিল আপ করতে গেলে মায়ের নাম দিতে হয়, পিতার নাম নয়, স্বামীর নাম নয়, মায়ের নাম সবার আগে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব জগতের থেকে এই আলাদা নিয়ম আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করল। ব্রাজিলিয়ানরা অতিথিপরায়ণ, একটু কথা বললেই সহজে আলাপ হয় যায়, অনেক সময় দেখেছি ভাষা বুঝতে পারিনা, তবুও বক বক করে যাচ্ছে। তখনও বিশ্বকাপের আয়োজন কিছুই চোখে পড়েনি তারই মাঝে শুনলাম বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমকামী যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে আর কিছুদিনের মধ্যেই। সেই যাত্রায় দেখলাম উদ্দামতা। তখনই হাল্কার ওপর আভাস পেয়ে গেলাম বিশ্বকাপে কি কি হতে চলেছে!!


জুন মাস পড়ল , দোকানে দোকানে ,সুপারমার্কেটে বিক্রি হচ্ছে হলুদ সবুজ রঙের পতাকা, ভুভুজেলা, ব্রাজিলের জামা, হলুদ সবুজ রঙের ঝাঁকড়া চুল, বল, মেয়েদের নেলপালিশ,চোখের পাতা, মুখোশ, সব সব হলুদ সবুজ রঙের। এরই মাঝে বিশ্ব বিদ্যালয়গুলিতে ক্যান্টিন, হাসপাতালে ধর্মঘট শুরু হলো,অ্যান্টি ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ক্যাম্পেনের জন্য। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলের মহিলা প্রেসিডেন্ট অনেক কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু তার মধ্যে অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়নি। প্রতিশ্রতি ছিল অনেক, তাই বিশ্বকাপ ব্রাজিলে হোক সেই নিয়ে প্রথমে ভোট পড়েছিল ৭৯ শতাংশ কিন্তু এখন তা কমে ৫০ শতাংশতে নেমে গেছে। প্রায় অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ানদের দাবী ব্রাজিল এখনও প্রস্তুত নয় বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করার জন্য, যেখান শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে বিশাল পরিমাণ অর্থ নিয়োগ করার প্রয়োজন আছে। এছাড়া দেশে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে, বেতন বাড়ানোর দাবীও আছে। মূলত এই বিশ্বকাপ আয়োজনের বিরোধিতা করছে পাবলিক সেক্টারের চাকুরীজীবীরা, আর সাথে যোগ দিয়েছে বিশ্ব বিদ্যালয় পাঠরত ছেলেমেয়েরা। তবে সব বিরোধিতাই খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে করেছে, রাস্তায় কোন ঝামেলাই কখনও আমাদের চোখে পড়েনি আর তাছাড়া যারা রাস্তায় বিরোধিতা করতে নেমেছিল তাদের সংখ্যা খুবই কম, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ভিড় জমিয়েছিল সাংবাদিকরা। সেই যাই হোক, কাগজে অনেক অনেক বিরোধিতার ছবি দেখালাম, এত সাংঘাতিক কিছু চলছে বলে আমাদের কখনই উপলব্ধি হয়নি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কিছু দিন আগে স্টেডিয়ামের দিকে কাজ ছিল, গিয়েছিলাম, যাওয়ার পথে দেখলাম মেট্রোর দুটি লাইনের একটি বন্ধ করে রেখেছে বিরোধীরা , অন্য একটি খোলা আছে। কিন্তু স্টেশন থেকে বেরোতেই দেখালাম স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর রাস্তায় কিছু শিল্পীরা দেওয়াল জুরে গ্রাফিতি পেইন্ট করে চলেছে। আশে পাশে বাড়ির গায়ে ফুটবল নিয়ে হরেক রকম আঁকা। বুঝলাম খবরের কাগজ গুলি কয়েনের একটি মাত্র দিকই দেখিয়ে যাচ্ছে।


ক্রমে বিশ্বকাপ শুরু হলো, বিরোধীরা মেট্রোর লাইনে আর কোন ঝামেলা করল না। সাওপাওলোর রাস্তায় ভিখারি, যারা রাস্তায় শুয়ে থাকে তাদের পাশে দেখলাম অন্য দেশ থেকে আসা ফুটবলপ্রেমী মানুষ শুয়ে পড়ছে অনায়াসে। এ দৃশ্য মহা মূল্যবান। যেদিন ব্রাজিলের খেলা থাকে, সেইদিন সব কিছু ছুটি। বারে বা রেস্তোরাঁতে ভিড় উপচে পড়ে। যারা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতে পারেন না তাদের জন্য বিশাল এক পিয়াজ্জাতে ফিফা থেকে দানব আকারের টিভি স্ক্রিন লাগানো হয়েছে আর তাকে কেন্দ্র করে চারপাশে কোকাকলা, সনি, বিভিন্ন খাবারের দোকানের পসরা বসেছে। ঠিক তার বাইরেই পার্কের মধ্যে বিদেশ থেকে আসা ফুটবল প্রেমীরা তাঁবু খাঁটিয়ে বসবাস করছে।ঐ ফিফা ফ্যান ফেস্ট গ্রাউন্ডে ব্রাজিলের খেলা দেখতে হলে প্রায়ে ৫ ঘণ্টা আগে থেকে ঢুকে যেতে হয়।ব্রাজিলিয়ানদের খেলা দেখার নিয়ম হল হলুদ সবুজ রঙে সেজে বন্ধু বা পরিজনদের সাথে মিলিত হয়ে খেলা উপভোগ করা।যেনতেন প্রকারেণ একসাথে বসে খেলা দেখতেই হবে। ক্রমে ক্রমে আমাদের বাড়ির সামনে দেখলাম ব্রাজিলের পতাকার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, কোরিয়া, জাপান, ফ্রান্স, ইটালির পতাকাও বিক্রি হছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন পিটবুল, শাকিরার পাশাপাশি ব্রাজিলিয়ান ব্যান্ড অলোদুমের গান শুরু হতেই বারে, রেস্তোরাঁতে বসে থাকা জনগণ সকলেই একই সুরে গলা মেলাল।


একে একে ব্রাজিল খেলাতে জিতছে,এখন আর কোন বিক্ষোভ চোখে পড়ছে না।ব্রাজিলের খেলা ব্যতীত অনেক খেলাই ঘরে টিভিতে দেখছি। খেলার মাঝে মাঝেই থাকছে ক্যারেফুর সুপারমার্কেটের হয়ে পেলের বিজ্ঞাপন বা মিনিস্ট্রি অফ এডুকেশনের বিজ্ঞাপন।খেলার শেষে বিশেষজ্ঞরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছে। গ্রুপ লীগ খেলার শেষে একদিন হঠাৎ দু ঘণ্টার জন্য বিরোধিতা দেখলাম। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, যারা বিশ্বকাপের বিরোধিতা করছিল তাদের মধ্যে দুজন সামাজিক কর্মীকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে, বিনা কোন কারণে, তারা নাকি সামাজিক কর্মী হিসেবে খুব পরিচিত মুখ, তাদের মুক্তির দাবীতেই এই বিরোধিতা চলেছিল ২ ঘণ্টা, তবে আবার সেই একই চিত্র, খুব বেশি জনতা দেখলাম না, বিরোধীদের সংখ্যা ২৫০ জন মত হবে, সাওপাওলোর মত জনবহুল শহরে এই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। আর তার মধ্যে ছিল ৩০০ জন পুলিশ ৫০ জন মত সাংবাদিক। তবে এইটা সকলের জেনে রাখা প্রয়োজন যে ,ইন্টারনেটে বিরোধের সে সকল ছবি বেরোচ্ছে সেইগুলো সব এখনকার নয়, অনেক পুরনো ছবিও আছে, এক বছর আগেও কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ হয়েছিল।


সেই যাই হোক, ব্রাজিলিয়ান বন্ধুদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানতে পেরেছি, ব্রাজিল এখন জিতছে, অনেক বিদেশী অতিথি এসেছে এই শহরে তারা সকলেই খুব খুশি, এমনকি অনেক কাগজে নারীদের জোর করে যৌন কর্মী বানানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ দেখছি। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান বন্ধুরা এইসব অভিযোগ একেবারেই পাত্তা দিচ্ছে না, ফুটবল যাদের সংস্কৃতি সেই ব্রাজিয়ানদের একটাই দুঃখ ব্রাজিল এখনও ঠিক মত প্রস্তুত নয় বা সেই অবস্থানে নেই যে বিশ্বকাপ ফুটবলের মত বিলাসবহুল উৎসব আয়োজন করতে পারে।



সাওপাওলো, ৩০শে জুন, ২০১৪
ছবি স্বত্বঃ লেখক এবং রাজু রায়চৌধুরী

আপনার মতামত জানান