বরুণ ছিল , আর নেই

অঙ্কুর কুণ্ডু

 


-‘Man who gave the poor a voice now silenced’

স্মৃতি নাকি কখনও মধুর , কখনও রোমহর্ষক , কখনও ‘আরব বেদুইন’ ; স্মৃতির একটা আলাদা মজা আছে –স্মৃতির সাথে জুড়ে থাকে ধারণা ও ছাপ ৷ এই দুইটি না থাকলে স্মৃতিকে যতই ডাকা হোক না কেন , তা মাথার ওপর দিয়ে চলে যাবে ৷ যাঁরা মানেন না যে স্মৃতির সাথে ধারণা ও ছাপ-এর সম্বন্ধ আছে অথবা যাঁরা দৃষ্টিপাত করবেন না বলে ঠিকই করে নিয়েছেন , তাঁরা আজ , ৫ই জুলাই,’১৪-তে , যে কোনো নিউজ্ চ্যানেলে , মদ-জুয়ার ঠেকের প্রতিবাদে খুন হওয়া কলেজ ছাত্র সৌরভ চৌধুরীকে দেখুন ৷ সেভাবেই দেখুন , যেভাবে দুইবছর আগে ৫ই জুলাই গণধর্ষনের প্রতিবাদে খুন হওয়া ‘সমাজবন্ধু’ স্কুল শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস-কে দেখেছিলেন ৷

আগে দেখে নেওয়া যাক্ , কে এই বরুণ বিশ্বাস ! সংক্ষেপে বলতে গেলে , বাংলায় স্নাতক পাশ করার পর , স্নাতকোত্তর ও বি.এড্ ডিগ্রীধারী এক পরিমার্জিত ও প্রতিবাদী যুবক বরুণ বিশ্বাস ; যে একইসাথে ডব্লু.বি.সি.এস্ এবং ডব্লু.বি.এস্.এস্.সি (স্কুল সার্ভিস্) পাশ করার পরেও এক অব্যতিক্রমী জীবন কাটাতে পারত –কিন্তু সমস্যা হল যে , তাতে সে পরিচিত থাকত ‘বরুণ বিশ্বাস’ নামে ৷ কিন্তু মিত্র ইন্সটিটিউশনের স্যর ‘প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস’ হতে গেলে মৃত্যুটা বোধহয় দরকার ছিল ৷ কতজন ট্রাফিক পুলিশ বাপি-কে চিনত , ওর মৃত্যুর আগে ? মৃ্ত্যু হল বলেই তো চিনল ৷ সেইরকমই যতই ‘বরুণ বিশ্বাস’ , ‘বরুণ বিশ্বাস’ করা হোক না কেন , নামটা কালবৈশাখীর মতই ; প্রত্যক্ষ করা যায় বছরে মাত্র দু’তিনবার , কিন্তু যখন প্রত্যক্ষ করা যায় , তখন বুক কাঁপতে বাধ্য ! মাঝে মাঝে ভাবি যে মিত্র ইন্সটিটিউশনের বেঞ্চগুলিতে যেমন সুপ্রিয়+প্রিয়া মার্কা প্রেমময় আঁচড় থাকে , সেইরকমই ক্লাসের টেবিলগুলোতে কি কেউ ‘প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস’ খোদাই করে রেখেছে ? নাকি ‘বরুণ বিশ্বাস’ নামটা কেবলই ফ্ল্যুকে !

১১ ই জুলাই , ২০১২ , ইন্ডিয়ান্ এক্সপ্রেসের পাতায় একটা খবর ছাপা হয়েছিল , হেডলাইনটা ছিল ‘Man who gave the poor a voice now silenced’ ৷ এতটাই ব্যঞ্জনাত্মক এই হেডলাইন , যা তাবড়-তাবড় ট্র্যাজেডিকে হার মানায় ৷ কারণ , এই ট্র্যাজেডিটা কাছের বাস্তব ৷ সুটিয়ার বাসিন্দা বরুণ বিশ্বাস এক অর্থে প্রতিবাদী ছিলেন , আবার ছিলেন না ৷ বরুণ হত্যার ষড়যন্ত্রকারী যখন জেলে যাওয়ার আগে অত্যাচার চালাত , তখন বরুণের বন্ধুরা বারবার বরুণকে বলত যাতে অত্যাচারের বদলা অত্যাচারেই নেওয়া হয় , কিন্তু বরুণ রাজি হত না ৷ এখানেই বরুণের ব্যর্থতা এক প্রতিবাদী হিসাবে ৷ একজন প্রতিবাদী যতটা না মানসিকভাবে আগ্রাসী , তর থেকেও বেশি তাকে শারীরিকভাবে আগ্রাসী হতে হয় ৷ এক-একটা সময় THOUGHT প্রসেস্ দুর্বল হয়ে যায় , তখনই MUSCLE প্রসেস্ সক্রিয় হয় ৷ INTELLECTUALITY মানুষের প্রথম ধর্ম ছিল না , ছিল INSTINCTIVE NATURE ৷ তাই মাঝে মাঝে আদিম মানুষকে আদিম পশু বলা হয় ৷ প্রতিবাদী বরুণের কি এটাই ভুল ছিল যে সে লড়েছিল নিপীড়িতদের পক্ষে হয়ে , কিন্তু নিপীড়নকারীদের বিপক্ষে নয় !

তখনও বরুণ সে অর্থে প্রতিবাদী হয়নি ; ছিল সমাজবন্ধু ৷ এমতাবস্থায় সে নক্সা করেছিল একটি ক্যানেলের যেটা ইছামতী ও যমুনা নদীর মিলিত জলের প্রভাবে বন্যা রোধ করতে পারে ! কিন্তু তখনকার ‘অপরিচিত বরুণ বিশ্বাস’-এর জন্য কোনো সাহায্যের হাত আসেনি ৷ পরে যদিওবা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সেই ‘প্ল্যান্’ বাস্তবায়িত করা হয় ৷ সেই শুরু , তারপর কয়েকজনের সহযোগীতায় গড়লেন ‘সুটিয়া গণধর্ষণ প্রতিবাদ মঞ্চ’ ৷ যদি বলা হয় যে এই প্রতিবাদ মঞ্চ গড়েছিলেন বরুণ , তাহলে বোধহয় সেই প্রতিবাদী যুবকের লজ্জা বাড়বে ৷ কারণ সে নিজেই বলেছিল প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তুলতে কিছু মানুষের সাহায্য ও উদ্যমটাই আসল ! কি অপূর্ব কাকতালীয় ব্যাপার আমি ইতিমধ্যেই অনুভব করছি –আজ সৌরভ চৌধুরীর মৃ্ত্যুর জন্য এক সংবাদমাধ্যমের আলোচনাসভায় আমন্ত্রিত হয়েছেন এক বেদনাক্লিষ্ট গর্বিত মুখের অধিকারী – জগদীশ বাবু ৷ কে এই জগদীশ বাবু ? একজন বাবা ; যিনি পেশায় শ্রমিক এবং কয়েক দশক আগে রাতে গ্রুপ থিয়েটারে গান গেয়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতেন ছেলের পড়াশুনার খরচ চালনোর জন্য , যাতে ছেলে মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচতে পারে ৷ কিন্তু ঈশ্বর একইসাথে রক্ষাকর্তা এবং নিষ্ঠুরও বটে ! তিনি সব আশা মেটান না ৷ তাই জগদীশ বাবুর ছেলে মানুষের মত মানুষ হয়েছিল এবং তার ফলস্বরূপ তাকে মরতেও হয়েছিল ৷ ছেলে – বরুণ বিশ্বাস , বাবা – শ্রী জগদীশ বিশ্বাস ৷ কিছুক্ষণ আগেই শুনছিলাম বাবা তার ছেলের গর্বিত ক্রিয়াকলাপের কথা শোনাচ্ছিলেন এক মৃতপ্রায় কন্ঠে ৷ স্বাভাবিক ! প্রায় সকলেই বরুণের ‘গণধর্ষণের প্রতিবাদের’ প্রথম ধাপটা জানেন ৷ কিন্তু তার বাবার মুখে আজও যেন ঘটনাটা কালকের ৷ সুটিয়ায় যখন গণধর্ষণ একটা ‘ট্রেন্ড’-এ পরিণত হয়েছিল , তখন বরুণ একদিন সকলের হাতে লিফলেট্ গুঁজে গণধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল ; কেউ শুনেছিলেন , কেউ শোনেননি ৷ বরুণ জানত বোধহয় :

“What though the field be lost?
All is not Lost; the unconquerable will,
And study of revenge, immortal hate,
And the courage never to submit or yeild.”

গরীবের পাশে দাঁড়ানো , ধর্ষিতা মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করা , নিজের খাট দান করে নিজে প্লাস্টিকে শোয়া , অন্যের পড়াশুনার খরচ চালানো , বিভিন্ন অসুবিধা সরকারকে চিঠি মরৎ জানানো , রাতে মানুষদের পাহারা দেওয়া প্রভৃতির নেপথ্যে বরুণ বিশ্বাস ৷ সরকার আসে আর যায় , বরুণের সৌরভ থেকে যায় ৷

জগদীশ বাবু একটা ভালো কথা বললেন যে বরুণ যখন প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তোলে ‘অন্যায়’-এর বিরুদ্ধে , তখন শাসকবর্গের কেউ কেউ ‘শান্তি-রক্ষা কমিটি’ গড়ে তোলেন বরুণকে হত্যা করার জন্য ৷ বরুণ বিশ্বাসের সার্থকতা এখানেই ৷ বরুণ বিশ্বাসের জয় এখানেই ৷ যেখানে বরুণ প্রতিবাদ করেছিল মুষ্টিবদ্ধ মানুষের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সেখানে শাসকবর্গের প্রভাবশালীরা দুষ্কৃতীদের নিয়ে লড়লেন একা বরুণ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ৷ তাতে হলটা কী , দাদা , লোকে কাকে মনে রাখল ! ৫ ই জুলাই সন্ধ্যায় খুনীদেরকে যে মানুষটি বরুণকে ‘আইডেন্টিফাই’ করিয়েছিল , এবং তাকে মারতে অংশগ্রহণ করেছিল সেও খেতে পায়না বলে কয়েকদিন আগেই বরুণের কাছ থেকে চাল পেয়েছিল ! তাতে ওর বয়েই গেল ! যখন গোবরডাঙ্গা স্টেশনে বরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল , তখন ‘পুলিশ কেসের’ ভয়ে কেউ এগোল না সাহায্য করতে . . . সম্ভবত সেইরকমই হওয়া উচিত ছিল , কারণ সেখানে ‘প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস’ একজনই ছিল !

বরুণ বিশ্বাসকে কি ঠিক ভুলে যাবে সকলে , ও কি বা করেছে ; প্রতিবাদ ? লাভ ? ওকে জীবন দিতে হল ; লাভ ? কিন্তু বরুণ বিশ্বাস তো মাঝে-মাঝেই মনে আসবে , আর যখন আসবে , তখন বোধহয় শক্তির মত বরুণও বলবে . . . ‘বাড়ি আছো?’ সাবধান , রাতের কড়া নড়তেই পারে , বরুণ বিশ্বাস কিন্তু এখনও ঘোরে রাতের বেলায় ৷

কিছুদিন পরে আবার যদি মনে হয় –বরুণ কে ?

“If we can't protect our daughters, sisters, wives and mothers, then we shouldn't be living in a civilized society. If we lack the courage to take on the rapists, we deserve more severe punishment than they do.... So come and join us to protect the honour of our women.”

- বরুণ বিশ্বাস ৷

কিছুদিন পরে আবার যদি মনে হয় –বরুণ কে ?
“I am a proud mother who has lost her son. Barun, my youngest, never went on the backfoot despite knowing there was a threat to his life. Till the day Pratibadi Mancha (a social service organization set up set by Barun) raises its voice against all atrocities, my son will remain immortal.” “ Barun chilo, Barun ache, Barun thakbe (Barun was, Barun is, and Barun will be)”
— শ্রীমতী গীতা বিশ্বাস (বরুণ বিশ্বাস-এর মা) ৷

আপনার মতামত জানান