সাত সর্বনাশের পরদিন

সরোজ দরবার

 


মঙ্গলে ঊষা, বুধে পা... তবু যথা ইচ্ছা তথা যাওয়ার তো কথা ছিল না।
অথচ তাইই হল, ঠিক যেখানে শঙ্কা ছিল সেখানেই হল নৌকাডুবি।
হাফটাইমের বাঁশি বাজতেই ক্লাবঘরের মাথায় পতাকাগুলো সিগারেটের ধোঁয়ার এপার থেকে কীরকম ঝাপসা ধোঁয়াটে দেখাচ্ছিল। দাভিদ লুইসকে যখন থিয়োগা সিলভা হাত ধরে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সেগুলো ভাঁজ হয়ে ক্লাবের আলমারিতে চালান হয়ে গেল। পাশেই নীল সাদা পতাকার যে কোণটা এতদিন চাপা পড়েছিল, সে এবার হাওয়া পেয়ে দিব্যি প্রাণ খুলে উড়ে বেড়াতে লাগল।
সাতে সর্বনাশ হওয়ার পরের একটা গোটা দিনেও দেখলাম লোকের মুখে তেমন রা নেই। চায়ে চায়ে যে সব তর্কের তুফান উঠত তারা আজ আশ্চর্জ ভাবে বেমানান। অফিসে কাজকম্মের ফাঁকে একপ্রস্থ গা গরম করা তর্ক বিতর্কের একেবারে সলিলসমাধি। আওয়াজ দেওয়ার এমন মোক্ষম সুযোগ আর কখনও অন্য দলের সমর্থকরা পাবেন কিনা কে জানে, কিন্তু এ যে প্রায় প্রিয়জনের বিচ্ছেদবেদনা জাতীয় শোক। শোকের বাড়িতে নীরবতাই ভাষা। আকস্মাৎ আলোচনা-সমালোচনার ভাষা হারিয়ে অতিবড় আর্জেন্তিনার ভক্তরাও তাই যেন কেমন বিমর্ষ। হাসিতে যথাসম্ভব ভদ্রতার সঙ্গে পরিমিত শ্লেষ ঝুলিয়ে তাঁরা শুধু মৃদু ভাষায় বলছেন, এটা গল্প হলেও পারত।
টিভি চ্যানেলগুলো তো কুষ্ঠি-ঠিকুজি ঘেঁটে লজ্জার কালি কতখানি গাঢ় তার ফিরিস্তি দিতে ব্যস্ত। ভাগ্যিস কাগজগুলো ছাপার সুযোগ পায়নি, নইলে আর এক দফা শোকগাথা গিলতে হত। তবে এই বাজারে যে লোকটা এতটুকু রেয়াত পাচ্ছেন না তিনি লুই ফিলিপ স্কোলারি। টিভি যারা ফুটবলে অন্ধ, আর পাশবালিশ ছাড়া যাদের লাথির জোর আর কেউ জানে না, তারাও অবলীলাক্রমে ভদ্রলোকের মুন্ডপাত করে চলেছেন। আর জার্মানির পাসিং ফুটবলের কথা ঐ কাগজও লিখেছিল যার সার্কুলেশন ১০,০০০ নয়, আর তুই ব্যাটা বুঝলি না!!!
ব্রাজিল সমর্থকরা মোটামুটি দুভাগে বিভক্ত। একদল চাইছেন, আর্জেন্টিনা ফাইনালে যাক, তারপর, মেসি মশাই ইন্দ্রজাল, কালা জাদু যে করে হোক মুলারদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলুক। আর একদল বলছেন, না ভাই, বরং নেদারল্যান্ডস জিতুক তবু আর্জেন্তিনা নয়। কিন্তু সাত গোলের চিরতা এতটাই তেতো যে তাঁদের সংখ্যা নগণ্যপ্রায়। পরিস্থিতি এমন যে চিরশত্রু হিসেবে আর্জেন্টিনার জায়গায় এবার থেকে না জার্মানিরই অভিষেক হয়ে যায়।
এদিকে ফেসবুকে কে যেন ‘করণ- অর্জুন’-এর রাখি গুলজারের ছবি পোস্ট করেছেন, তাতে লেখা মেরে পেলে-রোনাল্ডো আয়েঙ্গে। ওদিকে পেলের ছবিতে লেখা, তিনি ব্রাজিলের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে বলছেন, ঘানার লোক। কে একজন লিখলেন, জার্মানির প্রিয় ঠান্ডা পানীয় নাকি, সেভেন আপ। আর সাত ভাই চম্পা (জার্মানির সাত, অস্কারের ১) টা তো নানাজনের স্ট্যাটাসে ঘুরে ফিরে আসছে দেখলাম, কে কাকে কপি করছে ভগবান জানে।
যাদবপুরের পালবাজারের মুখে একটা ছোট্ট হোটেল আছে, নাম লোকনাথ হোটেল। এই ক’দিন সেখানের কর্মীরা সবাই হলুদ-সবুজ জার্সি পরে থাকত। আজ বেরিয়ে দেখলাম, সবাই নিজের নিজের টি-শার্ট পরে আছে। শুধু যে দুই মক্কেলকে হলুদের অরণ্যে তেমন চোখে পড়ত না তারাই আজ পোস্টম্যান হয়ে সামনে হাজির। বলা বাহুল্য তাদের পরনে নীল-সাদা জার্সি।
বোলো হরজাইন্তে জানতেও পারল না ব্রাজিল বিরহে ফিফা র্যা।ঙ্কিংয়ে তলার দিকে থাকা একটা দেশের অধিবাসীদের কার কার একখানা করে সিএল খতম হল। ফ্রেন্ডলিস্টে কে যে কাকে আনফ্রেন্ড করলেন, কে হঠাৎ উত্তেজনার পারদ ছোটাতে গিয়ে ব্লক হয়ে গেলেন স্বয়ং জুকারবার্গও বোধহয় সে ইমোশন ঠাহর করে উঠতে পারলেন না।
সত্যি, সেলুকাস বড় বিচিত্র এই দেশ! ততোধিক বিচিত্র এই শহর। এই যে একটু পরে খেলা শুরু হবে, দেখা যাবে রাশি রাশি হলুদ মিশে যাচ্ছে নীলের আবেগে। আরে বিশ্বকাপটা তো সত্যিই আমাদের নয়! তবু সমর্থন! তবু গলা ফাটানো! তাতে দোষের কী আছে মশাই! এই যে এদ্দিন ধরে মার্কসবাদ মার্কসবাদ করে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে আকুল জমায়েত হত, মার্কসবাদ কি সবার নখদর্পণে ছিল নাকি! আমরা এরকমই, ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি।
দুপুরে কাল রাতের স্ট্যাটাসগুলো ঘেঁটে দেখতে গিয়ে দেখলাম, শ্রীদর্শিনীদি লিখেছে, নেইমারের মনের অবস্থা কেমন তা অনুমেয়। মনে হল, হ্যাঁ শিরদাঁড়াটা আসলে সেদিনই ভেঙ্গেছিল। এক্স রে রিপোর্টাই যা সেমিফাইনালে দেখা গেল।
খবরে দেখলাম, চিকিৎসার জন্য নেইমার নাকি কেরলে আসবেন। যদি বছর চারেক পরে জার্মানির জালে গোটাকয় জড়াতে পারেন, তাহলে অন্তত খানিকটা মানসিক শান্তি মিলবে।
ব্রাজিল সমর্থকরা অন্তত সেদিন বলতে পারবেন, আমরা কেঁদেও ছিলাম, আয়ুর্বেদেও ছিলাম।

আপনার মতামত জানান