ব+ব+ব

ইন্দ্রনীল বক্সী

 


হারের পর ভেঙে পড়লেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থক


কি সাংঘাতিক ব্যাপার ! গর্দান যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে এ লেখা পড়ে চাদ্দিকে যা দেখছি ! বিশ্বকাপ চলিতেছে ...বিশ্বকাপ চলিতেছে বলে বেজায় শোরগোল কদিন ধরেই । এই গ্রহের সেরা উৎসব । যথারীতি বঙ্গবাসীও মাতোয়ারা । এফ বি তে চলছে যথেচ্ছ চিমটি কাটাকাটি ! বিভিন্ন দলের সমর্থকদের বঙ্গ প্রতিনিধিদের মধ্যে । ঝগড়া –আড়ি পর্যন্ত গড়াচ্ছে । চলছে ক্যুইজ ,প্রেডিকসন , খেলা নিয়ে কত্ত কি লেখা লিখি । বঙ্গভূমিতে চিরকালই দলে ভারী ব্রাজিল সমর্থকদের বঙ্গীয় সংস্করনেরা , এর পরেই আছে আর্জেন্টিনা । প্রচুর হলুদ গেঞ্জীর পাশাপাশি বিকিয়েছে নীল-সাদা ডোরা গেঞ্জীও । এখানে একটা গল্প আছে , একদা এবঙ্গে ব্রাজিল ছাড়া আর কোনো ফুটবলদেশের সমর্থক ছিলোনা , তারপর ১৯৮৬ সালের পরথেকে সে জমিদারিতে ভাগ বসায় আর্জেন্টিনা – বলা ভালো মারাদোনা । বঙ্গবাসী চিরকালই ব্রাজিলের ভক্ত ছিলো কারন ‘সাম্বা ফুটবল’ , বা অসাধারন দৃষ্টিনন্দন মানবিক স্কিল নির্ভর ফুটবল –যার ঈশ্বর ছিলেন পেলে ও গারিঞ্চা । হ্যাঁ নিলে দুটো নাম একসঙ্গে নিতে হবে বৈকি ! সে বঙ্গজ ব্রাজিলীয়রা ভুলেও তাঁর নাম না নিলেই বা ! হয়তো অনেক নব্য তার নামও জানেননা ! কিন্তু জেনে রাখা ভালো ব্রাজিলের পাঁচ পাঁচটি বিশ্বকাপের দুটি যদি পেলে দিয়ে থাকেন দুটি গারিঞ্চার অবদান ! আরে ধুস ! কি কথা বলতে কোন কথা – গারিঞ্চার নিজের দেশের লোকই তাকে তেমন মনে রেখেছে কই !
এখন সমস্যা হচ্ছে একবগ্গা গোঁড়ামিতো আমাদের বঙ্গ-মানসে , সে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস হোক , সি পি এম হোক আর এখন ‘পরিবর্তন’এর টোটকা ! একবার যো কমিটমেন্ট করদিয়া তো ... ব্যাস । পৃথিবী বদলায় , ফুটবল বদলায় ,ব্রাজিল বদলায় ,বদলায় ব্রাজিলের ফুটবল । সেই বদলে যাওয়া ফুটবল নিয়ে তারা আবার কোনো রকমে মূলপর্বে উঠেও চ্যাম্পিয়ন হয় – ব্রাজিল বলে কথা । এর আগে ও পরের ওঠা নামায় কিন্তু বঙ্গব্রাজিলীয়দের সমর্থন ও তা নিয়ে আতিশয্য অটুট থেকেই যায় কোনো এক যাদুবলে ! কত দেশ জেতে , কতদেশ একাধিক বার জেতে কিন্তু তাদের ভাগ্যে বঙ্গবাসীর অমূল্য সমর্থন জোটেনা ! এরূপ অন্ধ সমর্থনের কারন বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলে উত্তর পেতে হয় – ১)পেলে ২) পেলে ৩) আরে ভাই লাতিন ঘরানার ক্লাসি স্কিল নির্ভর ফুটবল – এ শুধু ওই মহাদেশেই সম্ভব । ৪) আরে কেউ জিতে দেখাকতো পাঁচ-পাঁচটা বিশ্বকাপ ! ছোঃ ... এবং ৫) ঐতিহ্য(!)
এখন যদি আরও বিনম্র স্বরে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে “ ওই মহা দেশে আরও কয়েকটি দেশ আছে যারাও ফুটবল খেলে ” উত্তর পেতে হবে “ হ্যাঁ , অফকোর্স ...নেক্সট টু ব্রাজিল , আর্জেন্টিনা ...” আরও কটা দেশ ওই মানচিত্রে রয়েছে এটা যাস্ট চেপে গিয়ে যদি বলি যে “ আজ্ঞে ইতালি বলে একটা দেশও চার চার বার বিশ্বকাপ জিতেছে কত্তা !” শুনে একটু হকচকিয়ে গেলেও ব্রাজিলীয় স্পিরিটে ফিরে আসবে বলবে “ মে বি ( !) বাট ব্রাজিল ইস ব্রাজিল ” এবার সহজাত বুদ্ধিতে বুঝে নিতে হবে এর পর আর কথা চলে না । ইতালিতো এই বঙ্গে সব থেকে উপেক্ষিত দেশ ! অনেকে জানেই না চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে কোনো দেশ ! জানলেও বলবে “আরে বাবা পাঁচবারতো জেতে নি !! হুঃ হুঃ হুঃ ...”
কথায় আছে দুর্জনের ছলের অভাব নেই , এখানে অবশ্যি দুর্জন কেউ নেই কিন্তু ছল আছে । একটু আঁতেল গোছের মানুষ যাঁরা তাঁরা ব্রাজিলয়দের গায়ের রঙের সঙ্গে ভারতীয়দের গায়ের রঙের কাছাকাছিত্বের কথা বলেন , বলেন আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশ –তাই আমাদের একটা নরম কোন থাকবেই । আমিতো বাপু ইতিহাস-ভূগোল কোনো দিক দিয়ে ব্রাজিলের সঙ্গে ভারতের কোনো যোগ খূঁজে পাইনা , ব্রাজিল ছোটবেলায় চিনেছি শুধু ফুটবল আর বড় হয়ে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্বার উত্তেজনা । হ্যা শুনেছি ব্রাজিলের ফুটবল ছাড়াও আর একটা জিনিস আছে পৃথিবীসেরা – কফি , জেনেছি ব্রাজিলীয় সাহিত্যের সামান্য কিছু । কিন্তু বুদ্ধিজীবি গোঁড়া ব্রাজিল সমর্থকেরা ঠিক জুড়ে দেবে কোনো না কোনো কারন –সে রাজনৈতিক হোক কিংবা অর্থনৈতিক । যদি ফুটবলের সমর্থনের জন্য ফুটবল কোনোদিন কম পরে যায় !
থাকুকনা সমর্থন ! তোমার কি যায় আসে হে ! ...ঠিকই তো, কিন্তু এই মিথ্যে দম্ভের কি করা যায় ! যা অন্যদের অস্বীকার করে চলে নির্দ্বিধায় হেরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এবং পরেও অক্রীড়াজনিত কারণ খূঁজে বের করার চেষ্টায় মত্ত হয়ে ওঠে শুধুমাত্র তাদের অহং আহত হয়েছে বলে । চুপ করে পরাজয় মেনে না নিয়ে ভারি ভারি কথায় যুক্তি সাজায় পালটা আক্রমন শানায় । অস্বীকার করে অন্য ফুটবল খেলিয়ে ঐতিহ্যকে ,তাদের স্কিলকে , পাশিংকে , টিম এফোর্টকে , লড়াইকে, গেমপ্ল্যানকে ,‘জঘন্য’ ‘কুৎসিত’ ইত্যাদি পদবাচ্যে নামকরন করে ! নিজেদের ফুটবলীয় চেতনার থেকেও বেশী প্রশ্রয় দেয় আবেগতাড়িত অন্ধ সমর্থনকেই । আবার অন্যদিকে দাবী করে গভীর ফুটবল প্রেমের –তখন অস্বস্তি হয় বৈকি ! তাদের দাবী ব্রাজিল = ফুটবল ! এবং দাবী-এটিই নাকি ইতিহাস ! নাঃ বেকেনবাওয়ার , ম্যাথুজ ,লিনেকার , প্লাতিনি , গুলিট, বাস্তেন আরও কত কত মহানায়কেরা শুধু হাপু গাইতেন ফুটবল মাঠে ! কারন এঁরাতো ব্রাজিলের ফুটবলার নন ! এরা নাকি ‘কুৎসিত মারদাঙ্গার’ অফুটবলের প্রতিনিধি ! এবং এঁদের এবং এঁদের সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে নাকচ করছেন এই গ্রহে একমাত্র বঙ্গীয় ফুটবল বিশারদরাই (স্বঘোষিত)তাঁদেরই নাকি দায়ীত্ব ফুটবলে ‘শিল্প’র মান নির্নয় করার !!এর থেকে ফুটবল কে আর কিভাবে অপমান করা যায় ? বাদবাকি এতোগুলি দেশ যারা ফুটবল খেলে ,যারা চ্যাম্পিয়ন হয় ঘাম ঝড়িয়ে ,রক্ত ঝড়িয়ে তারা নিমিত্ত মাত্র ! ভাবা যায় কি আবিষ্কার কি উপলব্ধি ! ফুটবল প্রেমের কি অনন্য নিদর্শন !
স্বস্তির কথা এসব ব্যামো শুধু ব্রাজিলের বঙ্গীয় সমর্থকদের , ব্রাজিলের সত্যিকারের ফুটবল উন্মাদ ,ফুটবলভোগী জনতার নয় , নয় সে দেশের ফুটবলারদের । যখন সমর্থনের ফুটবলীয় কারনে টান পড়বে , এবং দেশ প্রেমিক হয়ে আবেগে যুক্তিহীন ভেসে যাওয়ার ছাড়পত্র থাকবেনা তখন বড্ড অসাড় লাগবেই এইসব অপযুক্তি ।
একথা হলফ করে বলা যায় যে দৃষ্টিনন্দন শৈলীর ফুটবলের প্রেমে বাঙালি একসময় মজেছিলো ,তখন ‘লাইভ’ খেলা দেখার সুযোগ ছিলোনা ,তবুও বিভিন্ন মাধ্যমে ,রেডিও –সিনেমার মাধ্যমে সেই অপূর্ব শৈলী পৌঁছেছিলো ফুটবল প্রেমী বাঙালীর আঙিনায় । কিন্তু নতুন প্রজন্মের ফুটবল বোধ তৈরি হওয়ার দিন গুলোয় কোথায় সেই খাঁটি শিল্প ? তখন সক্রেটিস – দুঙ্গা - বেবেতো - রোমারিও দের ব্রাজিলের সামান্য নান্দনিক ছোঁয়া ! তাহলে তাদের ব্রাজিলের দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের প্রতি এত প্রবল সমর্থন এলো কোথা থেকে ? এলো ওই ‘ঐতিহ্য’ ধরে , বাবা - কাকাদের মুখে শুনে , অনেকটা ৯০ এর দশকে একটি বামপন্থী পরিবারের ছেলে কিংবা মেয়ের এস এফ আই জয়েন করার মতোই । সেখানে যেমন ছিলোনা গড়ে ওঠা নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা ,এখানেও তেমনি নেই নিজস্ব ফুটবল চেতনা । শুধু বহন হতে লাগলো বিশ্বকাপের পর বিশ্বকাপ অন্ধ ‘সমর্থন’এর ব্যাটন । চলতে লাগলো অন্য ফুটবল শক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করার বিচিত্র দর্শন । আজ যখন ব্রাজিল এই বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে মুখ থুবড়ে পড়ছে ,তখন জার্মানদের কৃতিত্ব দেওয়ার বদলে বলা হচ্ছে ব্রাজিল ভালো খেলেনি তাই এই ফল ! জার্মানরা রোবট,ডাচরা মারকূটে ইত্যাদি । যদিও হলুদ কার্ড দেখায় ব্রাজিল খুব একটা পিছিয়ে নেই ,পিছিয়ে নেই অনবদ্য ‘প্লে একটিং’ করে পেনাল্টি আদায় করায় , হেরে যাওয়ার পর খুঁজে ফেলা হচ্ছে গত কয়েকটা বিশ্বকাপের ধারাবাহিক ব্রাজিলীয় অবক্ষয় ! তার মধ্যে একবার নাকি চ্যাম্পিয়নও হয়েছে ব্রাজিল ! কাল অবধি পূজ্য কোচ স্কোলারির জন্যই নাকি এই পরিনতি ! জোয়াকিম লো বলে লোকটাতো বাদাম বেচ্ছিলো এতদিন !
ব্রাজিল হারায় কিছু ব্রাজিল বিরোধী সুযোগ বুঝে মাত্রা ছাড়া আক্রমন শানাচ্ছেন , কেউ কেউ বেশ বাড়বাড়িও করে ফেলেছেন – যা ফুটবল জনিত নয় মোটেও । সমর্থন যোগ্য নয় মোটেও । আপনি যদি “জার্মানরা গ্যাং রেপ করলো ব্রাজিলীয়দের”- বলেন তাহলে দেব-তাপস কি দোষ করলো !! আমার বন্ধু তালিকায় এক মহিলাবন্ধুও দেখলাম এই কমেন্ট করেছে । কিন্তু ঐ , এসব সেই হেয় প্রতিপন্ন করারই ফল! ক্রীয়ার প্রতিক্রীয়া । এর বিপরীতে আবার ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে হারের গ্লানির থেকেও নিজেদের ‘উচ্চকোটি’র ফুটবল সমর্থক প্রমান করার তাগিদ দেখা যাচ্ছে বেশী । বিশ্বকাপ জেতাটাই নাকি সব নয় – এ বোধিলাভ নাকি হলো এতদিনে ! কেন বাপু ! এতদিন যে পাঁচ বিশ্বকাপের বড়াই কত্তে ! তার বেলা ? । সত্যিই ‘ট্রু স্পিরিট’ !
অনেক হলো , এতক্ষন পড়ে নিশ্চয়ই আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ব্রাজিল সমর্থক তারা তেড়ে গালাগাল দিতে শুরু করেছে । কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ব্রাজিল বিরোধী নই ,আর্জেণ্টিনার অন্ধ সমর্থকও নই , আমার পাঁচ বছর পৃথিবী শাসন করা স্পেনের খেলাও ভালো লাগে, মুগ্ধ হই ‘তিতিকাকা’তে, আমার কাছে এ এক অনবদ্য শিল্প ! জার্মানদের টিম গেম, সংকল্প দেখে তৃপ্ত হই ! এবার তো চিলিও দারুন উপভোগ করেছি ।
৭ – ১ ফলাফল আমাকেও স্তম্ভিত করেছে । মনে করি এটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র । নাঃ কোনো সভ্যতা ধবংসেরও ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছিনা আমার সীমিত ফুটবল জ্ঞানচক্ষুতে । ব্রাজিলবাসীরাও এ শোক ঠিক কাটিয়ে উঠবে ,মেতে উঠবে তাদের চিরকালের ফুটবল উন্মাদনায় । পাঠক আপনিও ফুটবলে ফিরুন খাঁটি ‘ফুটবল’ সমর্থন নিয়ে । প্রিয়দল হেরে যাওয়ার পর লম্বা লম্বা বুদ্ধিজীবিজাত দার্শনিক গদ্যের আড়ালের নিজের গোঁড়ামি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে নয় , নিজের নির্ভেজাল ফুটবল চেতনার সামনে দাঁড়ান ।
ফুটবল দীর্ঘজীবি হোক । আমেন ...

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

আপনার মতামত জানান