অভিজাত বিশ্বাসের ছবি

সরোজ দরবার

 





‘চাওয়া পাওয়া’র হিসেব নিকেশ তখন প্রায় মিলেই যাচ্ছিল। দু’পক্ষের বেশ একটা শুধু আধোখানি ভালোবাসা বলা না বলায় মিশে যে মুহূর্তে প্রায় অনির্বচনীয় হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই চিত্রনাট্যের সিঁড়ির উপর তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিলেন পরিচালক। অমন রাশভারী লোকটাকে আচমকা দেখে আমাদের এযাবৎ দর্পিণী-অভিমানীনি নায়িকাও থমকে গেলেন। চমকে গেলেন নায়কও। ভাগ্যিস তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। নয়তো, এতক্ষণের তৈরি করা মায়াজাল যদি ওখানেই সমাপ্তির ফ্রেমে চলে যেত, তবে ছবিটাই যেন ঠিক বিশ্বস্ত হত না। তিনি এলেন বলেই কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে গেল নায়কের প্রেম। অর্থলিপ্সার দ্বিধা কাটালেন বলেই শেষ দৃশ্যখানা অমন দ্বিধাথরোথরো কবিতার পংক্তি হয়ে থেকে গেল। আর আমরা দেখলাম, ‘মিঞা বিবি রাজি তো ক্যায়া করেগা কাজি’ এহেন টোটকা অন্তত বাঙালি প্রেমে তেমন খাটেনা। যতখানি প্রভাব ফেলে এই অভিভাবক স্থানীয়ের উপস্থিতি। নয়তো সপ্তপদীর সামিয়ানা তো প্রায় বাঁধাই হয়ে গিয়েছিল।
আসলে বাঙালির যৌথ পারিবারিক অভিধানে এই সেদিনও ‘গুরুজন’ শব্দটির আলাদা একটা ওজন ছিল। একজন বাবা- জ্যাঠা- কাকা কেউ না কেউ বাড়িতে থাকতেন যাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে খানিকটা ভয় মেশানো সম্ভ্রমে আপনা আপনিই মাথা নীচু হয়ে আসত। বাংলা ছবির জগতেও স্বমহিমায় ছিলেন তাঁরা। তার মধ্যে পাহাড়ি স্যান্যাল যদি হন অপার স্নেহে নদী আপন বেগে পাগলপারা, তবে কমল মিত্র নিসন্দেহে গভীর চলা গোপন রাখা জাঁদরেল কেউ। আর তিনি, ছবি বিশ্বাস সেই পরিবারেরই এমন একজন রাশভারী কর্তা যাঁর উপস্থিতিই সংলাপের অধিক হয়ে ওঠে। যাঁর ধমকে থমকে না গেলে হয়তো নায়ক থেকে মহানায়ক কিংবা নায়িকা থেকে মহানায়িকার পথটা খুঁজে পাওয়া এত সহজ হত না।
কলেজ ছাত্র শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস যেদিন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অভিনয় দেখেছিলেন, সেদিনই বোধহয় অভিনয়ে একধরনের আভিজাত্যের মুদ্রা নিজের জন্যও তুলে রেখেছিলেন। ভবিষ্যতে যে মুদ্রার সহজাত প্রকাশে তিনি সত্যিজিতের জলসাঘরে গোবিন্দ গাঙ্গুলিদের হারিয়ে দেবেন, তাঁর জন্য যে ইন্সিওরেন্সের চাকরি বা পাটের ব্যবসা ললাটলিখন নয়, সে যেন নির্ধারিতই ছিল। ‘নদের নিমাই’ নাটকের পর, ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ দিয়ে ঢুকে পড়লেন আলোছায়ার জগতে।
আজ আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই অভিভাবকের ভূমিকায় তাঁর স্ক্রিন প্রেজেন্স কতখানি সমীহ আদায়কারী ছিল, তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপনে কতখানি সম্ভ্রমের দাবীদার ছিল। ‘শাপমচোন’ থেকে ‘শুনো বরনারী’ পর্জন্ত এই যে সবার উপরে থেকে অনুনকরণীয় আভিজাত্যের নমুনা তিনি নির্মান করে চলেছিলেন,তাইই তো একদিন ‘পথের পাঁচালী’র পরিচালককে বলতে বাধ্য করবে, ‘ বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রে ছবি বিশ্বাস ছাড়া আর কোন অভিনেতার কথা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না।’ ফলত ১৯৫৮-র জলসাঘরে যখন দেখা গেল, ছড়ি দিয়ে বিশ্বম্ভর রায় মহিম গাঙ্গুলির হাত টেনে ধরেছেন, এবং কেটে কেটে উচ্চারণ করছেন, প্রথম ইনাম দেওয়ার অধিকার গৃহস্বামীর, তখন আমরাও যেন সমবেত এই সম্মতিতে পৌঁছলাম যে, ধসে পড়া ফিউডাল সিস্টেমের মধ্যে মাকড়সার ঝুল সরালে আভিজাত্য আর রুচিবোধের যদি কোনও অংহ মুদ্রা চোখে পড়ে তবে তাঁর নাম নিশ্চিত ছবি বিশ্বাস। একটু পরে সঙ্গলাপেও তো তিনি তাইই বলবেন, মহিম গাঙ্গুলি জিততে পারেনি, কেননা –রক্ত। সেই আত্মতৃপ্তির হাসি, সেই বিজয়োল্লাসের ক্লোজ আপ শটের সামনে সময়ও খাসচাকর অনন্ত হয়ে অপেক্ষা করে থাকে। কিন্তু তিনি স্বয়ং তো জানতেন, এই বিশ্বম্ভর হয়ে ওঠা কতখানি মিথ্যের সাধনা। বলা বাহুল্য যে, সে সাধনায় তিনি এতখানিই সিদ্ধিলাপ করেছিলেন যে সত্যজিতের ‘জলসাঘর’ ডিরেক্টরস মিডিয়ামের শিরোভূষণ মাথায় নিয়েই ছবি বিশ্বাসেরও বটে।
বস্তুত বাঙালি কাবুলিয়ালাকে আমাদের হয়তো দেখাই হত না ছবি বিশ্বাস না থাকলে। রহমতের ভিতরে যে আদ্যন্তে একজন বাঙালি বাবা বসে আছে, ছোটগল্পের ভিতর থেকে তাকে ছেনে বের করে এনেছিলেন তিনি। টিঙ্কু ঠাকুরের সামনে রহমত রূপী তাঁর চোখের ভাষাই বোধহয় রবি ঠাকুরের ‘সেও পিতা, আমিও পিতা’র সার্থক অনুবাদ। আর ৬২ তে আঠেরো ক্যারাট খাঁটি দাদাঠাকুরের শংসা মিলেছিল তো স্বয়ং বাইশ ক্যারাট শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের থেকেই।
মাইলস্টোন ধরে ধরে সামগ্রিক রাস্তার হয়তো একটা রূপরেখা পাওয়া যায়, কিন্তু রাস্তার সৌন্দর্য আরও ব্যাপ্ত। পথচলার যে বৈভব, নমুনার নিশান তার সবটুকু নয়। তাই গোটা কয়েক ছবির উল্লেখে ছবি বিশ্বাসকে ধরার চেষ্টা বৃথা। ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র কথা বলতে গেলেই, সামনে এসে দাঁড়ান ‘সপ্তপদী’র ওই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাবা, পলক ফেললেই দেখি, ‘শুনো বরনারী’র উদাসীন বাড়ির গৃহকর্তা একরাশ গাম্ভীর্য নিয়ে তাকিয়ে আছেন।
আসলে ছবি বিশ্বাস আমাদের সেই অভিজাত ধারকমুদ্রা, যা মনে করিয়ে দেয় মধ্যবিত্তের ছায়া রোদ্দুরে জন্ম নেওয়া সাদা কালো ফ্রেমের ভিতরও একধরনের গুপ্ত অহংকার লুকিয়ে থাকে। সে অহংকার রুচির। পণ্যসভ্যতা বিনিময়মূল্যে যার বহিরঙ্গ কিনতে পারে, অন্তরাত্মা ছুঁতে পারে না।
আজ ‘সুদ খোরের ব্যাটা’- দের হাতে হাতেই যখন সংস্কৃতির লাগাম, আজ বেরসিক বেতালা হয়ে মেকি সমঝদারির পরকাষ্ঠা দেখিয়ে সকলেই যখন মহিম গাঙ্গুলি, তখন ছবি বিশ্বাস আমাদের সেই ধারণা যা মনে করিয়ে দেয়,পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ।
হ্যাঁ চরিত্রাভিনেতার পদ থেকে বহুদিন আগেই তিনি উত্তীর্ণ হয়ে গেছেন। বিপথগামী সময়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে উত্তমকুমার যেমন মহানায়ক হয়েই থেকে গেছেন, তেমনই ছবি বিশ্বাসও থেকে গেছেন বাংলা ছবির ঘরদুয়ারে একজন সম্ভ্রান্ত অভিভাবক হয়েই। ৬২ তে দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া যেন সময়ের বুকে দেগে দিয়ে গেছে সে সিলমোহর, যা আজও মনে করিয়ে দেয় আমাদের হৃত বনেদিয়ানাকে। আমাদের স্মৃতির খাসতালুকে তাঁর অভিজাত পদচারণা যেন বারবার করে বলে ওঠে বাংলা সিনেমার আজ প্রযুক্তি থেকে মাল্টিপ্লেক্স সবই আছে, শুধু সেই অর্থে কোনও গুরুজন নেই, ছবি বিশ্বাসের মতো।

আপনার মতামত জানান