চাদ্দিকে ট্রেন্ড -১

শবর মিত্র

 

বাক্য সম্প্রসারণ- লোকে কি বলবে

একটা মিক্সি এমনভাবে শব্দ করছে যে কি বলব। গাজা, আর্জেন্টিনা, হিটলার, পাপোষ তাল কোনটাই বাদ নেই। আর এর মধ্যেই কেউ কেউ বড়দা সেজে চোখের চশমা কপালে তুলে চোখ বড় বড় করে বলছেন “বিশ্বকাপ নিয়ে নাচানাচি করছেন? দেখুন গাজায় কি হল”। তারপর একটা অতিকায় ছি ছিক্কার তুলে বলে দিলেন “বাঙালির আর কি হবে”।
আমরা চিরকালই বড়দা মেজদা পরিবৃত হয়ে থাকতে ভালবাসি, “লোকে কি বলবে”র এই লোকেদের ভয়ে আমরা নিজেদের স্বাধীন মতামত দিতে পারি না, এদের জন্য আমাদের বিধবা মায়েরা মাছ খেতে ভয় পান, এদের কথাতেই আমরা প্রতি পাঁচ বৎসরান্তে ভোট দিই, এরাই আরেকটু সফিস্টিকেটেড ভাবে বুদ্ধিজীবী কিংবা সুশীল সমাজ সেজে ঘুরে বেড়ান এবং এদের কথাতে চলেই আমরা ভদ্র ভাষায় “পিছন মারাই”।
আমাদের এই বড়দা মেজদারা দিল্লি কানপুর নাগপুর সাংহাই ম্যাডাগাস্কার হনোলুলু নিয়ে ভীষণ চিন্তিত, চিন্তায় এদের রাতের নিদ্রা দিনের সিগারেট মাথায় উঠে যায়। কিন্তু যেই বাড়ির পাশের মেয়েটাকে ও পাড়ার কানা মস্তান টিজ করে যায়, এরা গম্ভীর হয়ে যায়। এদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না তল্লাটে। এরা ঠিক করে দেয় মস্কোতে বৃষ্টি পড়লে এখানে ছাতা খুলতে হবে, কিউবাতে কেউ পেচ্ছাপ করলে এখানের টয়লেটের জল খুলতে হবে।
নিজেদের পশ্চাদ্দেশ রক্ষা করতে এরা সদাই সচেষ্টপ্রাণ অথচ দেশের চিন্তায় এদের ঘুম আসে না। এফ ডি আই থেকে শুরু করে সানি লিওন সর্বত্র এদের অবাধ যাতায়াত। ঘরের পাশে কিছু হলে এয়ারা দেখতে পান না, এদের তখন অ্যালার্জি হয়, পেটে ব্যাথা হয় আরও অনেক কিছু হয়, তবে সব কিছুতে মাস্টারি এদের করতে হবেই।
‘ছি ছি, আপনি এটা ঠিক করলেন না দাদা’- মুখ করে ঘুরে বেড়াবে, বউয়ের থেকেও বেশি গিলটি ফিলিংসে ভোগাতে এদের জুড়ি মেলা ভার। গাজায় জঘন্য কাজ হয়েছে, সেটা আমি আপনি যতটা না বুঝব এরা অনেক বেশি করে বুঝবে এবং তারা যে সেটা বেশি করে বুঝেছে সেটা বোঝানোর জন্য দরকার পড়লে টুলে উঠে দাঁড়াবে।
কামদুনি কিংবা গেদে এসব জায়গা এদের ভূগোল বইতে নেই এবং এই নিয়ে কথা বলতে এয়ারা কখনোই রাজি নন। বরুণ বিশ্বাসের থেকে এরা বরুণ গান্ধীকে ভাল চেনেন এবং এই ব্যাপারে বেশি কথা বললে এরা এমনভাবে তাকায় যেন আপনাকে পাওলি দামে পেয়েছে।
এদের ফ্রাস্ট্রু বীর্যে এরা সব সময়েই আপনাকে ভাসিয়ে দিতে আগ্রহী, আর আপনিও পালাবেন না পালাবেন না করে শেষে এদের খপ্পরেই পড়ে যান। ভাল করে খুজলে অবশ্য দেখতে পেতেন এদের গাজা আর গাঁজার মধ্যে আসলে এমন কোন তফাৎ নেই।

কোথায় কোথায় পাবেন- প্রায় সর্বত্র, কবরডাঙা থেকে কদম্বগাছি, এদের জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, এদের প্রকোপ থেকে আমি আপনিও বাদ যাই নি, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই “লোকে”রা বাস করে যাদের ভয়ে আমরা সব সময় অস্থির থাকি যে “লোকে কি বলবে”।





আর্জেন রবেন এবং বাঙালি- এডাল সেডাল

কে যে মশাই কি, জেতার পাঁচ মিনিট আগেও আপনি জানতি পারবেন না, জেতার পরে দেখবেন প্রোফাইল পিক চেঞ্জ হয়ে গেছে, “হে হে আমি তো চিরকাল জার্মান” সেই নচিকেতার গানের মত, “আজকে যিনি দক্ষিণেতে কালকে তিনি বামে, আজকে যিনি তেরঙ্গাতে কাল ভক্ত রামের”, এককালে বামপন্থা এখন মা মেসির সরকার ভক্ত পাবলিক কখন যে কি করে কেউ জানে না। কিং কং যখন জেতার পর ডিগবাজি খান তখন আম আদমি হুই হুই করে লাফাবে, ব্রাজিল জিতলে “দেখেচ এই হল ব্রাজিল”, সাত গোল খেলে “এই হল জার্মানি”... কখন যে কোন দিকে ডাইভ দেবে সিম্প্যাথি আদায়ের জন্য সেটা জ্যোতিষ ইউনিভার্সিটির প্রোফেসরেরাও বলতে হিমসিম খেয়ে যাবেন। এরা জেতার আগে নিউট্রাল, জেতার পরে বিজয়ীর দিকে ঢলে পড়াই এদের ধর্ম। যেহেতু এই লেখকের মত সবাই সব কিছু বোঝে সুতরাং এদের সব কিছু ডিগবাজিরই একটা বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে, তাই এরা খাসির মাংসের মধ্যে “নিও কমিউনিজম” এবং প্যান পিজ্জার মধ্যে “বুর্জোয়া” দেখতে পেলে অবাক হবার কোন কারণ নেই।



রোগ ও তার ফলাফলঃ
লাইক-
অর্কুট আমলে ছিল না, ফেসবুক আমলে এসেছে এবং এসে জাঁকিয়ে বসেছে। এই রোগের প্রভাবে ছোট থেকে বড় সকলেই শিকারি হয়ে পড়েছেন। আপনার মেসেজ বক্সে দন্ত বিকশিত অবস্থায় এই শিকারিদের আবির্ভাব হয় “হে হে, দাদা একটু দেখবেন”, ব্র্যাকেটে থাকে লাইক করবেন, যেন লাইক করলেই তার শিল্পকর্মটি নোবেলের জন্য বিবেচিত হবে, এই লাইকের জ্বালায় ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে ফেসবুক সমাজে তবু এত দ্রুত এর থেকে নিষ্কৃতি পাবার কোন আশা দেখা যায় নি। আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে আপাতত এবং “পাগলা লাইক করবি কি ঝাঁঝে মরে যাবি” হাবিজাবির ভয়ে সব থরহরি কম্পমান হয়ে পড়েছে। ব্রণভরা গাল, ভুল ছন্দের কবিতা, বাউল বাতাস, নুন ছাড়া তরকারি, হরিতকির টুথপেস্ট, বটতলার গল্প সবই এই লাইক আইনের আওতায় পড়ে গেছে। এখন যেহেতু ব্লগ থাকলেই কবি আর ব্লগে দুটো লেখা রাখলেই সম্পাদক তাই সবাই কবি আর সবাই সম্পাদক, মিনিটে মিনিটে একই কবির চারশো ম্যাগ থেকে কবিতা বেরুচ্ছে আর তাতে ঝেড়ে লাইক দেবার লাইন পড়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে কোন ক্লিভেজ ললনার বগল দেখা গেলে লাইকের ঝাঁঝে খানিক নালও গড়িয়ে যায়। বেশির ভাগ হাফ সেলিব্রিটিই এখন ট্যুইটারে বিশেষ পাত্তা না পেয়ে ফেসবুকে আস্তানা গাড়ছেন আর সেলিব্রিটি তাড়নায় বাঙালিও লাইকে লাইকে তাকে ভরিয়ে দিচ্ছে। এদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা এসে পড়ছে, নিজেদের পেজেই লিখে দিচ্ছেন “আমি পুজোয় বসেছি আমার জন্য কতগুলি লাইক?”
যেন লাইক না পেলে এনাদের পুজো নেবেন না ঠাকুরে। ঠাকুরের কথাই যখন এল তখন বলি ঠাকুর জীবিত থাকলে এনারা হয়ত ঠাকুরকেও পিছনে ফেলে দিতেন লাইকের হিসেবে।
ফলাফল- ঘুমের ঘোরেও মা টাকা না দে, লাইক দে বলে চিল চিৎকার।



নতুন শব্দ
ফেসবুক কমেন্ট্রি

“ঈশ” (গোল মিস হবার পর,অবিশ্যি এটা “আমার প্যান্টে হিসু হয়েছে” দিয়ে অনায়াসে রিপ্লেস করা যায়)
“গোওওওও ও ও ও ও ও ও ও ল” (গোল হবার পরে,অবশ্য নববিবাহিতা ভার্জিন কন্যায় ঠিকঠাক প্রবেশও হতি পারে)
“ভামোস, ভামোস” (ভাম বিলাইয়ের ভাষা নয় যদিও তবে বাঙালি বিশ্বকাপে বিদেশি ভাষা শিখছে, যদিও এই দুটি শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ জানে নাকি ওই ভাষার যথেষ্ট সন্দেহ আছে)
“হায় হায়”... “হায় হায়”... (প্রিয় দল গোল খেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে)
মোদ্দা কতা হল মোশাই, মাসাইমারার জঙ্গল ছেড়ে এয়ারা ফেসবুকে এসে পড়েচে, সবেতেই এদের ভারি চিন্তা ভারি দুঃখু... বিশ্বকাপের পরে এই কমেন্টেটর এবং বিশেষজ্ঞ প্রজাতি রিফিউজি হয়ে কোথায় যায় সেটাই দেখার।
(ক্রমশ)

sabarmitraq@gmail.com

আপনার মতামত জানান