কাপ ও বাক যুদ্ধ শেষে

সরোজ দরবার

 


মিড ডে মিল দেওয়া হচ্ছে

অতএব দশমীও চলে গেল। বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে, কী কথা কহিব এবার বিশ্বকাপ শেষে? বেশ তো গুলতানি চলছিল। সৌরভ চৌধুরীর জায়গা নিয়ে নিয়েছিল, নেইমারের চোট। ভোট রাজনীতির কূটকাচালি দখল করে নিয়েছিল মেসির বাঁ পায়ের শিল্প। হঠাৎ এক ঝটকায় নটে গাছটা মুড়োল। মুড়োল বলতে মনে পড়ে গেল, ঐ যে শ্যামল সুন্দর গুন্ডাটি মাথাটি মুড়িয়েছিল, তাতে কি ঘোল কিংবা চুনকালি পড়ল? নাকি হালফ্যাশনের টুপি উঠে পড়ল সে মাথায়? কী জ্বালা! ক’দিন কাগজ টাগজ গুলো তেমন নেড়েঘেঁটে দেখা হয়নি তো। ওই একের পাতার পর সোজা তেরোয়...এর অ্যাটাক, ওর ডিফেন্স নিয়ে মশগুল থাকতে থাকতে নিজেদের কনফিডেন্সটাও তো প্রায় বিশ্বমানের হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মাস দেড়েক টানটান থাকার পর উত্তেজনার প্রশমনে আবার সেই আম বাঙালিয়ানায় শীঘ্রপতন। জলদি সব ক্যাচ আপ করে নিতে হবে। এক ছটাক সংস্কৃতি...দু’ছটাক রাজনীতি...চার ছটাক পরনিন্দা...তো বলি, হ্যাঁরে সেই যে আইপিএল মোচ্ছব দেখতে গিয়ে ছেলেটার মাথা ফেটেছিল, সে সব নিয়ে আর কিছু হয়েছে টয়েছে নাকি? আর গাজা নিয়ে যে বড় পোস্ট দেখছি ফেসবুকে। কেসটা কি? দূর মশাই, কেস তো এদিকে, জানেন তো, ২০ তে ২০ টি সোনা প্রকল্প চালু হল বলে? সেটা আবার কি? সোনা দোকানে বিয়ে ডিসকাউন্ট নাকি? কী যে বলেন না, খিক খিক...এ যে অলিম্পিক। আসলে এক ঢিলে দুই পাখি বধ... ব্লকে ব্লকে ছেলেপুলেদের খেলা, আর ভোটে ভোটে ছেলেখেলা। যা প্ল্যান অন্যেরা পুরো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাত গোল খাবে। অ্যাঁ সাত গোল!!!! ব্যাটা পেটে পেটে জার্মানি ছিলি নাকি এদ্দিন? যার মানিই বটে হে, কত মানি বিনিয়োগ আসছে খবর রাখেন? রোজ টিভিতে দেওয়া খতিয়ানের সাম টোটাল করলে, টাকার অঙ্কে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে দাদা। সব কোটিতে খেলা, মশাই, কৌন বনেগা কোটিপতি?
অর্থাৎ বাঙালির বিশ্বকাপ মদের সোনালি নেশার ঘোর ফিকে হয়ে অবশেষে ঘোলাটে দৃষ্টি কাটছে। শরীরের ঘড়িটা ব্রাজিলের সময়সূচিতে প্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পড়তে আবার খাঁটি দিশি নিয়মে ফিরছে। আর রোজ রোজ রাতজাগা নেই। সকালে অফিস যাত্রীর বাসে ঘুম ঘুম ঢুলুনি নেই। মেসির ম্যাজিক নেই, নেইমারের চোট নেই, সুয়ারেজের কামড় নেই, বাঙালির ঘরকন্নায় আর কোত্থাও বিশ্বকাপ নেই। সম্বল বলতে সেই পুরনো চায়ের কাপটা। জ্যাম জেলির বাজার শেষ, মন চলো নিজ নিকেতনে...সেই কাসুন্দি আর আচারে। এবার আস্তে আস্তে ঠাহর হবে, এই যে বৃষ্টিটা হচ্ছে, এ কি বর্ষার নাকি নিম্নচাপের? আরও বেশি মালুম হবে উফফ এই চিড়ে চ্যাপ্টা হওয়া জার্নিটা যে কী চাপের! আহা, এ তো চিরকালই ছিল। তবে কি না, ক’দিন ওই স্কোলারি আর ভান গলের দৌলতে টাইম গলে যেত। এখন তো এর বিশ্বকাপের জলে চিড়ে ভিজছে না। তাই অসহ্য লাগে। এদিকে অসহ্য যাতে না লাগে তার জন্যই তো কতগুলো এসি বাস নামছে। ভিতরে নাকি ক্যাফেটেরিয়া। খেলে ভাড়া ফ্রি। ও হ্যাঁ রেলে তো বাংলা কাটা পড়ল, আর ট্যাক্সে কোথায় কদ্দূর অবধি ফ্রি আছে যেন? সে আর মনে আছে নাকি, আবার দেখতে হবে ঘেঁটে, এদিকে যত কোপ পড়েছে সিগারেটে। তা বটে, মেসি মেসি করে দাম বেশিটা ততো গায়ে লাগেনি, কিন্তু এ কি হল রে বাবা, এবার কি কার্ড পাঞ্চ করে প্যাকেট কিনতে হবে নাকি, পকেটের মালে তো আর কুলোচ্ছে না। এই না, ‘মাল’ নিয়ে কোনও কথা হবে না। পালে একবার মৃদুমন্দ হাওয়া লাগলে সোজা কভারেজে বিবিসি। মোদের গরব...মোদের আশা, আ মরি সাংসদ খাসা। ও সংসদ নিয়ে মনে পড়ল, কে নাকি সেখানে মাল খেয়ে...ধুত্তোরি মাল নয়, মানে ইয়ে ড্রাঙ্ক অবস্থায় কী সব বলেছে, আর সেই নিয়ে একদিন কলকাকলীতে শুনলাম মুখরিত দিল্লি। দিল্লি বহত দূর...এ পোড়া কানে ‘গর্মেন্ট’ আর ‘পোতিশ্রুতি’র ঝিল্লি রব ছাড়া আর কিছুই ঢোকে না। তবে হ্যাঁ চোখে পড়ে। কি আবার চোখে পড়ে, সুপার মুন? তা যা বলেছেন দাদা, সুপার তবে একটা মুন নয়, পাশে আরও একখানা। আকাশেরটা তো আর সেদিন রাতে দেখলামই না কাগজে যাস্ট সংসদে ঢোকার মুখে ছবিটা দেখে নিলুম। কী বলব, কতদিন বাদে যে নিজের মনেই কবিগুরু আওড়ে ফেললুম... ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে/ দেখি আজ শরতমেঘে/ কেমনে কেমনে আজকে ভোরে গেল গো গেল সরে/ তোমার ওই আঁচলখানি শিশিরের ছোঁয়া লেগে।।’... আহ, শরৎ কোথায় হে, এ তো ঘোর বর্ষা, আর এটা তো প্রকৃতি পর্জায়ের গান, তাছাড়া এখানে ছোঁয়ার অধিকারী শিশিরই বা কে...? ধুৎ,এই হল দোষ মশাই আপনাদের, নিজে যা বোয়েন তাই নিয়েই ড্রিবল করতে থাকেন, নিজের বোঝাতেই কুক্ষিগত হয়ে থাকেন...অন্য কনটেক্সটে একটু কেউ যদি এক্সপেরিমেন্ট করে আপত্তি কীসের? রবিবাবুর গানে কত ধুপাধপ অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়, ছেলেপুলে হু-লালা করে কোমর দুলিয়ে ফাটিয়ে দেয়, আর আমি এমন সুন্দরের বন্দনায় দুটো লাইন কোট করলেই দোষ? এই আপনারা না, কিছুতেই পাস দিতে চান না। জার্মানির থেকে এই শিক্ষেটাও নিলেন না আপনারা? দেখলেন না পাসিং ফুটবলে কীরকম সাত সাতটা ঢুকিয়ে দিল। এইবার কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে বস, আর একবার সাত গোলের কথা তুলে খোঁচা দিলে না, হাল্কের দোহাই দুজনের জায়গা দখল করে হয় বাসের গেটের মুখে দাঁড়িয়ে পড়ব, নয়তো দড়াম করে বারের উপর দিয়ে উড়িয়ে দেব। দূর মশাই রাখুন তো আপনার ব্রাজিল, দৌড় ওই বালিগঞ্জ ফাঁড়ি, তায় আবার কথা খরচ করছেন কাঁড়ি কাঁড়ি।
সত্যি মাস দেড়েকে কথা খরচ হয়েছে বিস্তর। অলিখিত স্ট্যাটাস প্রতিযোগিতায় শব্দ প্রয়োগের ব্যঞ্জনায় সকলেই যেন মিনি কবি। কথারও তো যেন ফুলঝুরি ফুটছিল। বাসে ট্রামে, মুদির দোকানে। এমনকী রিসেপশনিষ্ট মেয়েটা যার কিনা গুড মর্নিং আর গুড নাইটের বাইরে মুখে বাক্যি সরে না, সেও মিষ্টি দেখতে মেসির হয়ে দশটা কথা বলে ফেলত। আহা বাঙালির ফুটবলপ্রেম, নিকষিত হেম, যত ফেম সেই ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানে। ব্রাজিল ভ্রমণের ফুটবলান্তিক কর্তব্যটুকু সমাধা করে মিডিয়ার প্রভুগণ গায়ে আবার চাপিয়ে নেবেন সামাজিক কত্তব্যবোধের ব্লেজার । সেই একঘেয়ে কেন হবে, কেন বলবেন, কেন অমুখ কেন তমুখ...উফফ কটাদিন যে ছিল কী সুখ...আর কী কখনও কবে, সাম্বার দেশে ছুটে যাওয়া হবে? হ্যাঁ গোটাকতক বই প্রকাশ অবিশ্যি হবে, ডায়রি, ছেঁড়াপাতা ইত্যাদি নামে...। সে সবের দীপ জ্বালিয়ে রাখবে কোন না কোন প্রকাশন। সামনের বইমেলাতেই ‘ব্রাজিলের অমুখ জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখক’ এইসব পাতাদের তাদের সঙ্গে আপনার দেখা হব্বেই।
মাস দেড়েকের রুটিনটা এক ঝটকায় বাতিল হয়ে গেছে। বাঙালি আবার চেনা রোজনামচার বালিতে উটপাখি হয়ে মুখ গুঁজে দেবে। নাহ, আমাদের ফুটবল টুটবল বিশেষ কিছু এগোবে না। আবার আমরা ম্যাটাডোর ভর্তি করে দিস্তে দিস্তে খিস্তি দিতে দিতে জুবভারতী যাব। বিশ্বকাপ ফুটবল সংক্রান্ত যাবতীয় চর্চা আমাদের ঘরে বাংলা ক্যালেন্ডারের মতো অপ্রয়োজনীয় ভালো লাগা হয়ে তোলা থাকবে। মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলবেন তিনজনা, আর আমরা বাজিয়ে যাব আমাদের ফাটা ঢোল-কাঁসি জীবনের একঘেয়ে বাজনা। এই চলবে আপাতত বছর চারেক।
হুজুগে মাতার আগে ও পরে, বাঙালি কিন্তু জানত এবং জানে বিশ্বকাপ তাদের কাপ অব টি নয়। স্রেফ খানিকটা মেকি তক্ক-বিতক্কের এক্কা দোক্কা খেলা। মনের কোণে যে স্বপ্ন নেই তা নয়, তবে নেইমারের মার আছে আর স্বপ্নের মার নেই? সুতরাং স্বপ্নের চিলেকোঠায় প্রতিবার কাঁচা প্রেমে ধরা পড়ে যাওয়ার মতোই সে চার বছরে একবার করে ধরা পড়ে যায়। আর বুঝে যায়, এ জীবনে স্বপ্ন পূরণ হবে কি না কে জানে! যদি নাই-ই হয়, কী আর করা যাবে। এই তো জীবন কালীদা! তাই যতক্ষণ কিছু না হয়, ততোক্ষণ বিশ্বজোড়া কাপযুদ্ধে আমাদের এই বাকযুদ্ধই সই। আসলে চার বছর পর পর যতই মৌতাতে মজুক না কেন, বাঙালির থেকে ভালো আর কেই বা জানে, তাদের সঙ্গে বিশ্বকাপের দূরত্ব ঠিক ততোটাই, যতখানি দূরত্ব পিঙ্ক ফ্লয়েড আর সানি লিওনের ‘পিঙ্ক লিপস’-এ।

আপনার মতামত জানান