নস্ট্রাডামুসসাজ ইত্যাদি ইত্যাদি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 




(চিঠিটা কাকে লেখা সেই ব্যাপারে প্রেরক নিশ্চিৎ নয়, তাই ছাপানো হলো)

---,

তোমাকে চিঠি লিখতে লিখতেই প্রায় আদ্ধেক বেঁচে থাকা কেটে গেলো।

হয়তো এখন আমার চিঠি পেলে তোমার বোর লাগে। ভাবো ওই আরেকটা এসে জমা হলো ইনবক্সে। আবার ক,খ,গ,ঘ,ঙ পেরিয়ে যাওয়া ঘ্যানঘ্যানানি চলবে। সত্যি কথা বলতে ভাবাটাও অহেতুক নয়। আমরা তো প্রায় শেষ যৌবনকালে মিড লাইফ ক্রাইসিসের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি - দু'জনে - অনেকটা দূরে দূরে - সেখানে এই সামান্য সবুজ সময়ের কয়েকটা মিনিট-সেকেন্ড কে নষ্ট করতে চায় বলো?

আমার লেখার মান পড়ে যাচ্ছে আমি বেশ বুঝতে পারছি - তুমিই এককালে বলেছিলে আমার লেখা আলঙ্কারিক আর তুমি অলঙ্কারভূষিতা হয়ে থাকতে ভালোবাসো। কি করবো? বয়েস বাড়ছে - বাঙলা ভাষার প্রতি মোহও বেড়ে যাচ্ছে। এখন আর স্থানে অস্থানে অকারণ গুরুচন্ডালি করে নাম কিনতে ভালো লাগেনা।

(ভালো লাগার কারণ কমে যাওয়ার আরেকটা নাম বয়েস বাড়া নয়?)

তাও আমি যা বলার সেটা চিঠি লিখেই বলতে শিখেছি। তুমিও এককালে চিঠি শুনতে চেয়েছিলে।

তাই আরেকটা চিঠি - সেই পুরোনো ইনবক্সে - চিন্তা করার কারণ খুব বেশি নেই - জিমেইল আস্তে আস্তে অনন্ত ক্লাউডে স্থান খুঁজে পেয়েছে - এই বিশাল বিরাট মেমোরি স্পেসে - এক ফোঁটা - তোমার আর বেশিদিন চোখে পড়বেনা।

দেখো ভণিতা করতে করতেই প্রায় চার-পাঁচ প্যারাগ্রাফ পেরিয়ে এলাম। কাজের কথা বললে আরো বেশ কিছু চিত্তবিরাগের কারণ প্রায় অবশ্যম্ভাবী। তাই বেশি সময় না নিয়ে শুরু করা যাক।

ফেসবুকে একটা নতুন ইমোকশন চালু হয়েছে - অ্যামিউজিং বলে - আমার আজকাল বেশিরভাগ পোস্টের কমেন্টেই সেটা লাগিয়ে আসতে ইচ্ছে করে। তুমি বলবে ফালতু স্নবারি। পাঁচপেঁচিজনের থেকে নিজেকে এক প্ল্যাটফর্ম উঁচুতে রাখার চেষ্টা।

হয়তো।

কিন্তু কি করবো বলো?

ইজরায়েল - প্যালেস্টাইনের আবার মারামারি লেগেছে। সেই নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথাবার্তা চলছে। সে ভালো ব্যাপার - অবশ্য কিছুদিন আগে অবধি বিশ্বকাপ নিয়ে চলছিলো - এখন ইস্যুর অভাবে ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন বলেই বোধ হয়।

সে যাই হোক - সেই নিয়ে বেশ কিছু লোক, আচ্ছা আপনি শ্রীলঙ্কা নিয়ে পোস্ট করেননি কেন? আচ্ছা আপনি বাঙলাদেশ নিয়ে পোস্ট করেননি কেন? - এসব নিয়ে আরেকটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াচ্ছে।

আমার যদ্দূর জানা ছিলো এই পৃথিবীতে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা বলে একটা জিনিস আছে। কোন ইস্যুতে কে উঠে দাঁড়াবে, কে 'আমি আর জাস্ট পারছিনা' বলবে - সেটা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।

আসলে প্রতিবাদ জিনিসটাই নিজস্ব - আমি কোনোকালে বিপ্লবে বিশ্বাস করে উঠতে পারিনা পুরোপুরি - কারণ ওটা অনেক মানুষকে একটা কালেক্টিভ রূপ দেয় - একটা মতাদর্শে - কিন্তু মানুষ তো জন্ম ঠেকে নিজস্বতা নিয়ে জন্মায় - বিপ্লব তো যেকোনো রকম চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে থাকার রূপ - সেটা সামাজিক, রাজনৈতিক যাই হোক না কেন - তো সেখানেও একটা মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া থাকবে কেন? সেই মতাদর্শ যতোই মহান হোক।

আসলে মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ থেকে শুরু করেছিলো - কারণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে চিন্তা করলে প্রাগৈতিহাসিক ভীষণদর্শন বেঁচে থাকা মানুষকে খেয়ে ফেলতো। এখন পৃথিবীর শ্রেষ্ট প্রজাতি হয়ে গিয়েও - রক্তে সেই লোমশ পূর্বপুরুষের পরমাত্মা জানান দেয় - যে 'বস, ওই মালটা কালেকশনের বাইরে - অতএব বিপজ্জনক - নিকেশ করো, কিম্বা অপাঙক্তেয় করে দাও।'

অবশ্য তুমি বলতে পারো, ফেসবুকে নিজের ওয়ালে পোস্ট করা কি প্রতিবাদ? সম্ভবতঃ নয় - কিন্তু সেখানেও অন্যের মতকে মেনে নিজের মতটুকু জানাবার মধ্যে একটা লং লস্ট বেসিক বস্তু বেঁচে থাকে - সহিষ্ণুতা। যেটা জানায়, মতের অমিল মানেই আক্রমণের অধিকার জন্মানো নয়।

এই আক্রমণের অনধিকার চর্চা নিয়েই আসলে এই চিঠিটা।

কি হচ্ছে বলতো?

হঠাৎ করে কেউ বা কারা, অনেকদিন ধরে ঘুমিয়ে আবার জেগে উঠেছে মনে হচ্ছেনা?

আমাদের দেশটাকে দেখো - কেউ ভাষার গৌরবে মানুষ মারার অধিকার ভেবে নিচ্ছে, কেউ জাতির গৌরবে - সবাই নিজের নিজের গোষ্ঠীতে শেয়াল রাজা হিসেবে ইতিহাস বই লিখতে চায়।

শ্রীলঙ্কা ওইটুকু একটা দেশ - কদ্দিন ধরে মেরে যাচ্ছে তো মেরেই যাচ্ছে, এদিকে ওখানকার ফিল্মমেকারদের নাকি ফিল্ম বানাবার পয়সা নেই।

পাকিস্তান - আজ পর্যন্ত একটা গ্লোবালাইজড ইন্ডাস্ট্রিতে মুখ দেখাতে পারেনি, অথচ নিজেকে মহামহিম ভেবে যাচ্ছে যুদ্ধ বিলাসে।

চিন - ঠিক করতে পারছে না সামরিক না ব্যবসায়িক সুপার পাওয়ার হবে। মুক্ত পৃথিবীতে ড্রাগনরাজ করবে না নাগরিক স্বাধীনতা বলে বস্তুটার গলা টিপবে।

মিডল ইস্ট - ধর্ম বাঁচাবে? আরো রক্ষণশীল হবে? নাকি নিজেদের দেশের ফুটন্ত জনমতের গলায় পা দিয়ে টিকে থাকবে?

ইজরায়েল, প্যালেস্টাইন - সোজা ভাষায় বলা যাক ইজরায়েল দেশটা অন্যায়ভাবে বানানো - ওদের এতো খবরদারি দেখলে গা জ্বালা করে। কিন্তু সমান সোজা ভাষায় প্যালেস্টাইনে হামাস যদি ভেবে নেয়, প্যালেস্টাইনিদের না বাঁচিয়ে ইজরায়েলি মারাই সমাধানের পথ, তাহলে এই গল্পের শেষ লেখার পক্ষে এই চিঠিতে জায়গা অকুলান।

আমেরিকা - দুখানা রিসেশনের ধাক্কা কাটিয়ে এখনো বুঝতে পারছেনা, গোটা পৃথিবীটা এখন কার বশ?

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন - শুভবুদ্ধির লংজিভিটির ওপর ফাইন ব্যালেন্সে দাঁড়িয়ে আছে।

ল্যাটিন আমেরিকা - জীবনে প্রথমবার দেখলাম একটা ল্যাটিন অ্যামেরিকান দেশ ফুটবল বিশ্বকাপ চায়না। সেই দেশ যাকে পরবর্তী চার সুপার পাওয়ারের তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে শেষ দশকেই।

এরই মাঝে পূর্ব ইউরোপ কি করে ফেললো, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা। মানে, সাতজন এইডস বিশেষজ্ঞ, এতোগুলো বাচ্চা, এর আগের মালেশিয়ান এয়ারলাইন্সের হারিয়ে যাওয়া ফ্লাইটের একজনের আত্মীয় এতোগুলো লোকের জীবনের চেয়ে রাশিয়া আর ইউক্রেনের জমির গুরুত্ব বেশি? সত্যি তাই? যুদ্ধের শেষটায় তো মানুষ জেতে - জমি নয়। অস্ত্র তো মানুষ বানায়, মানুষ ছোঁড়ে - জমি নয়। অপযুক্তি তো মানুষ দেয় - জমি নয়। জমিটাকে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় ওই প্লেনটায় মিসাইল ছোঁড়ার জন্য ক্ষমা চাইতো, এভাবে বাক পাসিং করতো না - রাশিয়া, ইউক্রেন, জঙ্গিরা যেটা করছে।

কিছুর গন্ধ পাচ্ছো না প্রিয়তমা?

একটু মহাভারত তথা নৃসিংহপ্রসাদ থেকে টুকলে রাগ করবে? যদিও আমার মহাভারত প্রীতিটা বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। তাও।

শ্রীকৃষ্ণ একটা ধর্মরাজ্য চেয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্র তিনি চেয়েছিলেন কি চাননি সেই তর্কটা বাদ দিয়েও - এটা ঠিক যে যুদ্ধের পর তিনি সেটা পেয়েছিলেন। তবে একটা ট্যুইস্ট ছিলো সেই পাওয়ায় - ভোগ করার জন্য থেকে গিয়েছিলো তার বংশ, পান্ডবরা আর জনশূণ্য উত্তর ভারত।

একটা গন্ধ পাচ্ছো না প্রিয়তমা, যে গন্ধটা গত শতাব্দী দু'দুবার পেয়েছে।

বাবা ছোটোবেলা বলতো - তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর হবেনা। কারণ সবার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র, যুদ্ধটাকে সেই অস্ত্রভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

আমি অতোটা আশাবাদী নই।

পৃথিবীতে আমেরিকা এবং তার পক্ষে বিপক্ষে অসংখ্য পাওয়ার পকেট দেখতে পাচ্ছি এবং তাদের মধ্যে সৌহার্দ বাড়ার ক্ষীণতম আশাও দেখিনি জ্ঞান হবার পর থেকে। এদের সবাই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ক্ষণজন্মা দিয়ে চলবে আগামী কয়েক শতাব্দী - মানুষের ইতিহাস মানুষের ওপর অতোটা বিশ্বস্ত হতে শেখায়নি।

খোলাখুলি বলি? আমি একটা বড়োসড়ো যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছি, বেশি দূরে নয় সে'টা। জানিনা সেটা পৃথিবীর প্রলয়ের জন্মকাল কিনা।

অনেকখানি প্রলাপ হয়ে গেলো, যুদ্ধটা যদ্দিন না লাগে তদ্দিন ভালো থেকো - চেষ্টা করো। হয়তো চেষ্টা দিয়েই বাঁচা যেতে পারে।

~ কৌস্তভ

পুনশ্চঃ একটা বাঙ্কার বানাতে পারি বাড়ির তলায়, আজ থেকেই কাজ শুরু করি? যদি পারমাণবিক গলে পচে যাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে, সেই ভবিষ্যতে, সেই পাতালে - তোমার সহজাত সম্ভ্রম ভেঙে - সঙ্গমের আশ্বাসটা দাও।

আপনার মতামত জানান