কত্তা,কাবাব ও স্বর্নযুগের পেঁপে!

ইন্দ্রনীল বক্সী

 



“জানোস , শক্তিদা পাকা পেঁপে দিয়ে চোলাই মারতো !!” বলেই ঢক করে পাত্রের তলানীটুকু গলায় চালান করে কাঁটায় গেঁথে একপিস রেশমী তুলে সামনের দাঁত দিয়ে অদ্ভুত দক্ষতায় কামড়াতে লাগল আমাদের মেজোকত্তা । “তা তুমিতো কত্তা স্কচ সাঁটাচ্ছো কাবাব দিয়ে ! এর সঙ্গে তার কি যোগ !” (এখানে বলে রাখি আমাদের কত্তা বেশ একজন জাঁদরেল কবি ডাকসাইটে, এমনিতে ছাপোষা সরকারি চাকুরে মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে ব্যাঙ্কে লাইন দ্যান নিয়মিত , অনেক স্তাবক তাঁর , ঝুড়ি ঝুড়ি জ্ঞান ,সবমিলিয়ে বেশ মান্যি-গন্যি...আর মাঝে মাঝেই কবতের আখড়া বসান ,সেখানে মদ্য সহযোগে পদ্যচর্চার মুগুর ভাঁজা হয়ে থাকে – যার ছবিটবি মাঝে মধ্যেই বেশ ফলাও করে অন্তর্জালে বিশেষতঃ ফেসবুকে দেখা যায় )
“দূর হালায় ...আমুও খেতাম রে , সে এক জামানা ছেলো ...এখন সে সব ফার্স্ট কাটের মাল পাওয়া যায় নাকি! সব ভেজাল ...বুঝলি কিনা ...আহা কি স্বাদ ! কি লেখা ! কি পার্সোনালিটি ! ...সব শাসন কত্তাম ,শুধু কোলকাতা নয় , জামশেদপুর , কুল্টি, দূর্গাপুর ,বরানগর ,কৃষ্ণনগর সব..। তখন চাদ্দিকে আগুন জ্বলতেছে -নকশাল পিরিয়ড...রোজ অলি-গলিতে লাশ বেরোচ্চে ...ওসবের মর্ম তোরা কি বুঝবি ...” বলতে বলতে কত্তার চোখ চকচক করে উঠলো ...
“হুম ...কোনটার মর্ম কত্তা ...চোলাই না লেখা ..নাকি লাশ....!”
বেশ গরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে হিস হিস করে ওঠে “কোনটার বুঝস ! ক্রাইসিস বুঝস ক্রাইসিস !! ...ওটা না থাকলি কিস্যু হয়না ...তোরা দুচার কলম ন্যাকা ন্যাকা লিখে ভাবতেচিস ...বিরাট ছিঁড়লি...”
কত্তা বিস্তর রেগে আছে বোঝা গেলো আর একটু রাগিয়ে দিতেই হয় এবার...
“কিন্তু তোমার ক্রাইসিসটা কি ছিলো ! বুঝলাম না কত্তা ,টাকা-পয়সা ! নাকি ...বেশ ভালোইতো ছিলে রসে বসে , তাও যদি বুঝতাম খাঁকি পরা দেখে বিপ্লবের স্বার্থে দুচারটে দুধওয়ালা মেরেছো ! ...বাপের পয়সায় পড়াশুনা করে দিব্যি সরকারি চাকরি করছো ,তাও তিন বছর বয়স ভাঁড়িয়ে ...”
“তোর ন্যাশা হইয়েচে! ,যা দিকি ...বেরো এখান থিক্যে.....
“আহা রাগো কেন কত্তা ! বুঝতেই তো এসছি...”
“আরে বুরবাক , ক্ষিদে বুঝস ! হাঙ্গার ! তখন ছেলো সেই সর্বগ্রাসী ক্ষিদে ...তোরা হলি গিয়া কতায় কতায় ফেসবুক – ইস্মার্টফোন মারানো গাম্বাট নেকুপুসু... ...তখন ছিলো সেই ক্ষিদে ...ক্ষুধার্ত ...হাংরি..”
“...এখন ওভার ইটেন !”
“চোপ শালা ...কিস্যু বুঝোস ! কি জানিস কি ? ”
“এই দ্যাখো ! ...কোথায় জানি বললাম ...ঐ যতটুকু ওই গুগল...মানে ...ওখানেইতো...”
“হঃ ...ওই তোরা হলি গিয়া ফেসবুকিয়া মাল ...তোদের দৌড় জানা আসে ...”
“আরে না না শুধু ফেসবুক নয় ...গুগুল...এখন থাক পুরোনো ঘিএর গল্প...”
“ওই হইলো ...তোরা যারে ভগবান কস এহন...কি তাইতো ! ...মালটা বেশ কাজের ...”
“ আরে কত্তা ! তুমিতো বেশ আপডেটেড ! ...”
এবার একটু বিগলিত হেসে ফেললেন কত্তা
“ ফেসবুক প্রোফাইলও আছে রে ...কাল শুধু ‘ হ্যাঁচ্চো’ লিখলাম ১০ মিনিটে ৪২টা লাইক ! ১৬টা কমেন্ট ..কত্ত আলোচোনা ,তাদের কেউ কেউ আবার বিদেশে থাকে ...” এতদূর বলে বেশ একটা তৃপ্তির হাসি খেলে গেলো কত্তার মুখে ...
“হুম...প্রচুর চামচা করেছো দেখছি!‌ সেদিন দেখি তোমার বন্ধু অমলকত্তা স্ট্যাটাসে ‘টল’ লিখেছে ,তাই অণ্ডকোষ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে ! যাই বলো তোমাদের মতো বয়ঃজেষ্ঠ্যদের হাঁটুর বয়সী ছেলে-মেয়েদের সামনে এসব বলা মানায় ?”
“মানায় মানায় ...এ হলো গিয়া বয়স্কদের যেখানে সেখানে বাতকম্মের মতো ...এতে অসভ্যতা নাই...নির্দোষ...”
“আচ্ছা এর আগে তোমার লেখা ,ওই যা লেখো টেখো আরকি জেলা বা কলকাতার বাইরে কেউ পড়তো ?”
একটু চুপ করে থেকে কত্তা বলে “ ...পড়তো বইকি ! উত্তর বঙ্গে ...বাঁকুড়ায়...”
“সেতো মালদায় পুটুমাসি থাকে আর বাঁকুড়ার মৃণালদার ম্যাগাজিন চলে তাই ! তাবলে দিল্লি , ব্যাঙ্গলোর,দক্ষিন আফ্রিকা, আমেরিকায়..যাই বলো এসব কিন্তু এই অনলাইনের ম্যাজিক ! এই যে বিরাট বিরাট কপচানি গুলো ঝাড়ছো এসব কি অনলাইন ম্যাগগুলো না থাকলে এত লোকে পড়তো ? তোমাকে কেউ চিনতোই না ”
“এইডা এবার বাজে কতা হয়ে গেলো কিন্তু ...তোরা তোদের মতো ভাবস নাকি আমাদের! ...তুদের মতো ১০০ ফেসবুকিয়া লেখক-কবি আমরা পকেটে রাখি বুঝলি ...”
“হুম তা রাখো ...১০০ নাহোক ...১০-২০টা পকেটে রয়েছে ...জানি ,কিন্তু এই কথায় কথায় ফেসবুকিয়া কবি , ফেসবুকিয়া আঁতেল –এসব কেন বলো বলতো ? তোমরাওতো দিব্যি লেগে আছো ...”
এই বার ফিচিক করে হেঁসে উঠে বুড়ো দাঁড় কাকের মতো মুখ করে কত্তা বলে ওঠে ...
“ গুড কোয়েশ্চন...আরে মাথামোটা ...যদি বারে বারে তোদের বা তোদের মতোদের টেনে না নামাই ,তোদের মেলাইন না করি , আমরা টিকবো কি কইর্যা !! বেশী বাড়তে দেওয়া যাইব না যে ...নইলে আমরা হাপিস ...নে ঢাল আর এক পাত্তর...কি যে জলমাল খাস না তোরা !...তাড়াতাড়ি মোবাইলে একটা ছবি তোল এইডাও তুইলা দিতে হইব আমার স্টেটাসে ...কি বুঝছস! ” ফিক করে হেঁসে কত্তা গ্লাসটা বাড়িয়ে দেয় ...
হাঁ হয়ে কত্তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলামর কয়েক মুহুর্ত ...পাকাপেঁপে ...চোলাইয়ের ফার্স্ট কাট...কবিমস্তান মেজোকত্তা আর ফেসবুকের মধ্যে একটা দ্বন্দমূলক বস্তুবাদের ছায়া আবিষ্কার করে ফেলতে ফেলতে একটুকরো কাবাব তুলে মুখে দিলাম...ওয়েটার কে ডেকে গম্ভীর ভাবে বললাম পরের বারে যেন অবশ্যই পাকা পেঁপের পাক্কা ব্যাবস্থা থাকে টেবলে...

আপনার মতামত জানান