একটি উত্তম প্রস্তাব

সরোজ দরবার

 




মান্যবরেষু,
জানি সব দিনে সব কথা বলতে নেই, কিন্তু কিছু কিছু কথা আবার না বললে কিছুতেই বোঝা যায় না। তাই আপনার প্রয়াণ দিবস আমাদের বয়ান দিবস হয়ে উঠল বলে অগ্রিম ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে হয়েছে কী, আপনি তো সেই আশিতে আসি করে চলে গেলেন। আপনার পদ্মপাতায় আর লাগবে না দাগ, সময়ের পাঁক যতই খাঁটি হোক না কেন। বাঙালির ঘরে ঘরে কুলগুরু আছেন, কুলুঙ্গিতে তাঁদের ফটো আছে, আর বুকসেলফে গুরুদেব আছেন। কিন্তু চার দেওয়ালের কোত্থাও একখানি ছবি না থাকলেও আপনিই অদ্বিতীয়ভাবে বাঙালি র ‘গুরু’, সে যে যেখানেই মেরে যেখানে লাশ ফেলুন না কেন। তো আপনি তো মহাপ্রস্থানের পথ ধরে হেঁটে গিয়ে মহানায়ক হয়ে থেকে গেলেন। কিন্তু তাবৎ বাঙালি যুবককুলকে যে কী সমস্যায় ফেলে গেছেন তা যদি জানতেন। কী কুক্ষণে যে চিন্ময় রায় মহাশয়ের বসন্ত বিলাপে নিজেকে উত্তমকুমার শোনার বাসনা জেগেছিল, সে তিনিই জানেন। যদ্দূর জানি পুরো সিনটা এবং সঙ্গলাপ নাকি তাঁরই ভাবনা প্রসূত। তো সেদিন থেকেই মোটামুটি বাঙালি প্রেমিকদের রোগা বুকের খাঁচার গোপনতম বাসনাটি সমস্ত নারীর কাছে একেবারে হাট হয়ে খুলে গেছে। আর যায় কোথায়! এদিকে উত্তমকুমার শোনার মৃদু বাসনা থাকতে পারে, কিন্তু তা শুনতে গেলে আর যে কী কী বিপাকে পড়তে হয়, সে সব প্রায়ই কাব্যে উপেক্ষিতা হয়ে থেকে যায়। চিন্ময়বাবু তিন লাফে পুকুরের জলে পড়েছিলেন, আর আমাদের তন্ময় পড়ল অথৈ জলে। আজকাল যে সব কাজল বেরিয়েছে সে সবের তো আপনি নামও জানতেন না। তো ওর বন্ধুনি নাকি সেদিন হালফ্যাশনের সেই কাজল পরে গাঢ় স্বরে জানতে চেয়েছিল, কেমন লাগছে। খুব ক্যাজুয়ালি তন্ময় উত্তর দিয়েছিল- বিন্দাস। ব্যাস যা হওয়ার হয়ে গেল। সমস্ত গাঢ়তা নিমেষে বিসর্জন দিয়ে, গলার স্বরের মাত্রার নানা বিন্যাসে বন্ধুনিটি মিনিট পাঁচেকের প্রবল ভৎর্সনায় যা বলেছিল, তার সারসংক্ষেপ এই- বেশ তো বাপু, ঘাড় হেলিয়ে, এদিক তাকিয়ে , ওদিক চেয়ে উত্তম উত্তম ভাব দেখাও। এর দু কলি গেয়ে বলতে পারলে না, ওগো কাজল নয়না হরিণী...। জিন্স-টপের বন্ধুনি যে এমন অতি উত্তম তন্ময় আগে তা ঠাহর করেনি, বেচারা মিনমিন করে বলতে চেয়েছিল, উত্তম কোথায়, ও তো হেমন্ত...। সম্বোধন গুলিয়ে বন্ধুনির সটান জবাব- থামুন তো। বিন্দাস বলে আমার বন্ধুটির তখন দেবদাস অবস্থা। বিলাপ করে বলল, একেবারে তুমি থেকে আপনিতে উঠে গেল রে। তো তাকে যে দু’কথা বলে শান্ত করব, এমন চুনীবাবু হওয়ার ধক আছে নাকি আমার। সেও তো আপনি যা করার করে দিয়ে গেছেন। শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে... ধুর ধুর মশাই... শাওন রাতে ইলিশকে স্মরণ করিবে তবু এ বান্দাকে কেউ নিশীথস্বপনসম ভেবেও মনে আনবে না।
শুধু এই ঘটনাই নয়। আমাদের অনেকে আরও নানা ঘটনার সাক্ষ্য দিতে পারবে। যেমন শংকরদার অভিজ্ঞতা। না না, আপনার থিয়েটার করা শংকরদা নয়, আমাদের পাড়ার। তবে হ্যাঁ একটু আধটু যাত্রার সখ ছিল। একবার বোধহয় আপনার কোন একটা ‘বই’য়ের যাত্রা ফর্মে আপনার চরিত্রেই অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু শংকর কুমারের কপালে উত্তম কুমার হওয়া তো হলই না, বরং নামের পাশ থেকে কুমারটা কাটা পড়ল। যাত্রা করে বেড়ানোর বাউন্ডুলেপনা ঘোচাতে বাপ-মা বিয়ে দিয়ে দিল। যথাসময়ে একটি পুত্র সন্তানের মুখ দেখে শংকরদা ঠিক করলেন, তাঁর নাম রাখবেন, উত্তম। সেকালের খাদ্য দ্রব্যের গুণে হোক কিংবা নিজের আয়ুরেখার জোরেই হোক শংকরদার ঠাকুমা তখনো সশরীরে বর্তমান ছিলেন। শংকরদার এহেন বাসনা শুনে বুড়ি ফোকলা দাঁতে নাকি লাজে রাঙ্গা হল কনে বউ গো মার্কা হাসি এনে বলেছিলেন- দুধের সাধ কী ঘোলে মেটে রে ভাই। তবু, নেই মামার থেকে... বাকীটা শোনার মতো আর ধৈর্জ ছিল না শংকরদার। তবে নিকটজনেরা বলে, তিনি নাকি শেষমেশ বলেছিলেন, আসলটিকে তো ছোঁয়া হল না, নকলটিকেই না হয়... । কিন্তু ঘটনা হল আপনার পরবর্তী যে কোন উত্তম নামের ছেলেই যেন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন প্রবাদটির সার্থক বাক্যরচনা হয়ে গেছে। নাহ তাদের কোন দোষ নেই। শুধু আক্ষেপ করে কেউ কেউ বলেছে, কই যাদের অরুণ নাম, তাদের তো কেউ কিছু বলে না।
সুতরাং বাঙালি রোমান্সের মাধবীকুঞ্জে আপনিই যে পিয়ালতরু এ কথা অতি সৌমিত্রভক্তও মানবেন। আর হবি নাই বা কেন, বাঙালি চোখ বুজে পদাবলী গেয়েছে, আর চোখ খুলে দেখেছে বনপলাশীর পদাবলী। সংসারে সং সাজাটাই যে সার এ কথা বোঝা হয়ে গেলে আপনার নামে মনটা যে খানিকটা উদাস বাউল হয়ে যাবে সে কথা বলাই বাহুল্য। এখনও হয়। জেন ওয়াই টার্মটা আপনি শোনেননি বোধহয়, কিন্তু পুরো বকওয়াস মশাই। এই জেন ওয়াইয়ের মহিলাকুলও আপনাতে আকুল। ফেসবুক স্ট্যাটাসে এরা যত প্রগতিশীল আর কমেন্টে প্রতিক্রিয়াশীল হোক না কেন, আসলে সেই মা ঠাকুমার দেওয়া টিকলির মতোই বয়ে নিয়ে চলেছে উত্তম প্রেম। মুখে না বলুক, ভাবখানা এই , তুমি উত্তম নয় বলে আমি অধম হইব (পড়ুন সুচিত্রা না হইব) কেন? বিশ্বাস না হয়, একবার টালিগঞ্জ মোড়ের বেদী থেকে নেমে দেখুন। দেখুন মেট্রোর ভিতর বিএফের হাত ধরেই কেমন আপনার দিকে সপ্রেম তাকিয়ে আছে।
হিংসে নয় জানেন, হতাশা আসে। সত্যি বলতে কী অতিবড় দুস্বপ্নেও কোন যুবক আপনার মতো হওয়ার কথা ভাবে না। আর হবেই বা কী করে ওই অনিন্দ্যসুন্দর কান্তি কোথায়? সিক্স প্যাক ফ্যাক বানিয়ে, নেচে কুঁদে কত হৃত্বিক রোশন ফেল করে গেল, আপনার ক্যারিশমার কাছে কত শাহরুখ খানের পোস্টার ছিঁড়ে গামছার দোকানের মাথায় সামিয়ানা হয়ে গেল, তো আমরা কোন ছাড়। আর আপনিও বলিহারি। সত্যজিতের অরিন্দম তো আপনার কাঁটায় কাঁটায় বাঁধা। কী করে যে সব পারতেন। এটা-ওটা-সেটা। এদিকে এ বাঙালি প্রোগ্রামিং জানে তো গান জানে না, গান জানে তো পাঞ্জাবির বোতামে হিসেব ভুল করে হউ উলুঝুলু কবি নয়, চিত্রকর হয়ে ওঠে। আর আপনি ফসফস করে সুচিত্রা সেনের স্কেচ এঁকে ফেললেন। চোখে দুষ্টুমি, হাতের কাজটিতে কোন খুঁত নেই। সুতরাং কার বাপের সাধ্য যে আপনার পরে বলবে, তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি যেন বাঁকা সাপ...।
তবু অঙ্গে অঙ্গে যৌবনের ছাপ তো আর বিলীন হয় না। আর এই দশকে দশকে বাঙালি যুবক আপনার ছিঁটেফোঁটা হতে চেয়ে, শেষে ধরা টরা পরে হার মানা হার গলায় ঝুলিয়ে সপ্তপদীর দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
না এত কথা আপনাকে নালিশ করে লিখছি না। আমাদের নাগরিক কবিয়াল লিখেছেন, দোষ দিয়েই বা কী... সব এক একই(হতাশাজনিত কারণে পঙক্তিটি বোধহয় এদিক ওদিক হয়ে গেল)। আমরা জানি আগামী বহু দশক ওই এক একই অবস্থা থাকবে।
তাই একটা অনুরোধ সকলের তরফ থেকে আপনাকে জানাই। আমাদের গুরুদেব বলেছিলেন, রাত পোহালে বাঁশিটি নাকি কারও হাতে দিয়ে যেতে চান। আমরা বলি কি, আপনি যেখানেই থাকুন, একটু ভেবে দেখুন না, আজকের রাত পোহালে শুধু আপনার হাসিটি যদি কাউকে দিয়ে যেতে চান।
পোয়াটাক না হোক অন্তত এক ছটাক।
বিশ্বাস করুন তাতেই আমাদের বিড়ম্বিত বাঙালি প্রেমিক-কপাল বর্তে যাবে।

ইতি
তাবৎ বাঙালি প্রেমিককুল

আপনার মতামত জানান