মহা(নায়ক)দেব

সরোজ দরবার

 


চলছিল বেশ পাগলু পাগলু হয়ে, চাপ হয়ে গেল ‘সন্মান’ টন্মান পেয়ে...!
বোঝো কান্ড! কোথায় নায়িকা শোভিত হয়ে এর দেওয়ালে ওর দেওয়ালে ঘুরে বেড়াবে, তা না হয়ে ফেবু পাড়া জুড়ে কী সব ছবির ছড়াছড়ি। এক ছবিতে লেখা, ‘দাদা শুনেছেন দেব নাকি ‘মহানায়ক পুরস্কার’ পাচ্ছে।’ শুনে মহানায়কের উত্তর, ভাগ্যিস আমাকে ‘দেব পুরস্কার’ দেয়নি। আর একখানা তো ষোলআনা বাঙালিয়ানায় টইটম্বুর। সেখানে আবার সপ্তপদীর সেই বিখ্যাত গানের দৃশ্য। বলা বাহুল্য মহানায়কের মুখ ফোটোশপের দৌলতে উধাও। বদলে দেব। তলায় লেখা, ‘এই ঢপ যদি না শেষ হয়’। বস, ঢপের চপও হয়, আর তোরা একটু চুপ থাকতে পারিস না। ওই যে বলতে না বলতেই ফের নোটিফিকেশন। আর একটু এগিয়ে একজন লিখেছেন, ‘দেব যদি মহানায়ক হন, তাহলে আমিও অমিতাভ বচ্চন, আর আপনি?’ আরে ব্যাটা তুই ‘যুদ্ধ’ হলে, এদিকেও যে ‘যোদ্ধা’ আসছে। একটু সবুর করলেই হয়ে যেত সলিড সেটিং। আহ, ফের টিং করে কিছু জানান দিচ্ছে ফেবুটা। হ্যাঁ এবারে ছবি না স্ট্যাটাস- ‘মহানায়কের প্রথম বই আসছে বিন্দাস/ দেখবে না? তুমি কোন হরিদাস’।
হরিদাস? পাল? মানে সেই ‘মাল’। নাহ এইবার কিন্তু দুয়ে চার হয়ে যাচ্ছে। আর দেরী না করে বরং এ সবের পিছন থেকে উঁকি দেওয়া প্রশ্নগুলোকে সামনে টেনে আনা যাক। বলি আপত্তিটা কিসে? পুরস্কার মহানায়কের নামে বলে? নাকি তার প্রাপকের নামে? নাকি গভীরে যাও আরও গভীরে যাও করে গেলে দেখা যাবে আপত্তিটা আসলে পুরস্কার দাতাতেই? একি মোটে তিনটে প্রশ্নতেই চলতি হাওয়া-মোরোগ অমন ঘুরতে শুরু করল কেন? বেশ ক’পাক ঘুরে সে যে পজিশনে স্থির হল, সেটাকে ফুটবল মাঠের ভাষায় দুরূহ অ্যাঙ্গেল বলা যায়। অর্থাৎ কিনা, আপত্তি আসলে তিনতেটেই।
ভালো কথা? তাহলে বলছেন পুরস্কারের নামের আদিতে মহানায়ক না থেকে বেচুবাবু থাকলে আপনার কোন সমস্যা নেই তো? অর্থাৎ বেচুবাবু সম্মান পেলে কারও কিছু বলার থাকত না? একি অমনি সজোরে দু’দিকে মাথা নাড়াচ্ছেন কেন? বুয়েচি, মানে তাতেও আপত্তি আছে। ঠিক, আপনার পয়েন্টটাও বেশ জোরদার। যারা শুনতে পাননি, আমি তাদের শুনিয়ে দিচ্ছি- আপনার বক্তব্যের সারমর্ম এই যে, বাংলা ছবির জন্য করলটা কি যে সম্মান পাবে? গাছের ডাল ফাল ধরে নাচলেই বুঝি...। এখনও উচ্চারণের আড় ভাঙল না। তা বটে, উচ্চারণে যে দোষ আছে তা ‘পত্যেকে’ মানবে, এমনকী জজেও মানবেন। কিন্তু বাংলা ছবির জন্য করলটা কি? তা একটু বক্স অফিসের দিকে নজর দিলেই তো পারেন। প্রযোজকরা তো আর মিশনারিজ অব চ্যারিটিতে দীক্ষিত নন, যে এমনি এমনি ওর উপর টাকা লগ্নি করছে। ব্যবসা দেয় মশাই, গ্রামে হলেও লক্ষ্মীলাভ হয়। গ্রাম শুনে অমন নাক সিঁটকোলেন কেন, গ্রামের মানুষ সংস্কৃতি-ফিতি বোঝেন না তাইতো? বেশ না হয় নাই বুঝল? তা গ্রামের লোকগুলোকে কি ফেলে দিতে পারেন? ভোটের সময় একবার গ্রাম বাদ দিয়ে ভোট করিয়ে দেখতে পারেন তো? এই যে তিন দশক সর্বহারার মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্যে কাটল, তো সেই হারানিধিদের অধিকাংশের দেখা মিলবে তো গ্রামেই। গ্রাম বাদ দিলে মশাই, তিন দশকের বেশিটাই তো বায়বীয় হয়ে যাবে। সুতরাং যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করুন না কেন, গ্রাম আছে, সেখানের লোক সিনেমাও দেখবে, দেবের ছবি বক্স অফিসে পয়সাও দেবে। এর পরেও বলবেন বাংলা ছবির জন্য কী করল? সত্যি বলতে কি লম্বা মানুষটি আর ঐ খ্যাপা মানুষটিকে বাদ দিলে, হাতে গোণা আর ক’জন বাংলা ছবির জন্য কী করলেন বলুন দিকি। স্বয়ং উত্তমকুমার নাকি শেষজীবনে বলেছিলেন, তিন দশক কাজ করেও আড়াই তিন জনের বেশি পরিচালক নাকি তিনি পাননি, যাঁদের থেকে শিখতে পারেন। সুতরাং ও প্রসঙ্গ থাক। কথা হল, শেষ কয়েক বছরে, এই ছেলেটির কাঁধে ভর করেই কিন্তু বাংলা ছবি চলছে। এযাবৎ বাংলা ছবিতে সবচেয়ে বড় লগ্নিটা তার উপরেই হয়েছে। আর যদি নিয়মমাফিক অফিস করে, মাইনে নিয়েও আপনি প্রোমোশনের আশা করে থাকেন, তাহলে এ ছেলেটিরও সম্মান পাওয়ার হক আছে বৈকি। নাহ, আপনার রিমেক তত্ত্বটা এখানে আর হালে পানি পাবে না, কেননা ওটা পুরোটাই পরিচালকের ব্যাপার। অভিনেতার সেখানে কী করার আছে? ব্যাস অভিনেতা শব্দটা নিয়ে আপনার গোঁসা হয়ে গেল তো? ভাবছেন তো, ডাল ভাতও কি কখনও বিরিয়ানি হয়? হয় না তা বটে, তবে ডাল ভাতেরও কিন্তু মহিমা আছে। আপনার নির্বাচিত তাবড় অভিনেতাটিকে বলুন তো ওই ডাল ভাত অভিনয়টা করতে। আপনি নিজেই বুঝবেন ব্যাপারটা ঠিক যায় না। মাস হিরোরা একেবারেই জিরো নয়।
তা এই যে এতক্ষণ মুখে ফেনা তুলে সওয়াল করে যচ্ছি তাতে আমার কি স্বার্থ আছে? স্বার্থ নেই বরং কিঞ্চিত স্বাস্থ্যকর আলোচনাই করতে চাইছি। স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা তো উপেক্ষার নয়, এই যেমন আপনি আপনি এবং আপনি দুধের সাধ ঘোলে মেটাচ্ছেন, এটাই কি স্বাস্থ্যপ্রদ হচ্ছে? আরে না না, প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছি না, বলছি ক্ষোভটা আপনার যতখানি না দেবে, ততোটাই তো –পুরস্কার দেওয়ায়। অর্থাৎ দেবের জায়গায় অভীক দত্ত থাকলেও আপনি সমান বিরক্ত হতেন। তা সে কথাটা খোলসা করে বলছেন না কেন? এই যে একদা আপনার এবং আপনাদের পুজনীয় মাননীয় বিশিষ্টগণেরা হঠাৎ অতিষ্ঠ হয়ে অন্য কাজে নিবিষ্ট হয়ে পড়ল সে বুঝি আপনার নজরে পড়ছে না? নাকি পড়ছে অথচ বলতে পারছেন না। এদিকে চেয়ারের জল যে কোত্থেকে কোথায় গড়িয়ে গেল, কে যে মুছে নিল, আর হাতে থাকল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট, তার তো হিসেব মেলানো ভার আয়-ব্যয় একাকার। সুতরাং আপনার কি গোড়ায় গলদে সরব হওয়াই উচিত না? মনে করুন সেই পংক্তিগুলো, ব্রেখট যা বলেছিলেন, 'I sit by the roadside/the driver changes the wheel./I do not like the place I have come from/ I do not like the place i am going to/why with impatience do I /watch him changing the wheel?' এই চাকা ঘোরা তথা ‘চেঞ্জিং দ্য হুইল’ কি আপনিও স্বচক্ষে দেখছেন না? নাকি, ‘কেননা তুমি তো ফেটে পড়ছ না রাগে/ এখনও তোমার ভন্ডামি ভালো লাগে।/কেননা তুমি তো ইচ্ছে করেই অন্ধ/ চেয়েছ বলেই তোমার দুচোখ বন্ধ’।

এক অনিচ্ছে থেকে আর এক অনিচ্ছের দিকে যেতে, এক অপ্রিয় থেকে আর এক অপ্রিয়কে মেনে নিতে নিতে একবার তো প্রতিবাদ হতেই পারে রক্তপলাশে, রক্তজবায়।

পারলে বরং গোটাকয় ওই রক্তপলাশ কিংবা রক্তজবা জোগাড় করতে পারেন, খামোখা দেবের মুন্ডপাত করে কী লাভ? আর রং-ব্যাঙ্গেরই বা তেমন রসদ কই, কেননা আমাদের সুকুমার রায় তো সেই কবেই বলে গিয়েছেন, জল আর জলপাই কি এক জিনিস?

আপনার মতামত জানান