প্রসঙ্গঃ সানিয়া মির্জা

সুশোভন পাত্র

 

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সানিয়া মির্জা। টেনিস তারকা কে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত কিছু দিন আগে। সানিয়া মির্জা কে নবগঠিত তেলেঙ্গানা রাজ্যের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে ঘোষণা করার পরই বি জে পি সাংসদ ডঃ লক্ষ্মণ মন্তব্য করেন ,‘এই সানিয়া পাকিস্তানের গৃহবধূ। তাঁর তেলেঙ্গানার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগের কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। এই রাজ্য গঠনের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই।’ এই ধরনের মন্তব্যে স্বভাবতই হতাশ সানিয়া প্রকাশ্যে বিবৃতি দেওয়ার সময় দৃশ্যতই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বেসরকারি সর্বভারতীয় নিউজ চ্যনেলে তিনি বলেন ‘সাংসদের এই মন্তব্য আমাকে নিদারুণ আহত করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ভারতে জন্ম নিয়ে, ভারতে সারাটা জীবন কাটিয়েও আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আমি আদৌ ভারতীয় কিনা। আমি ভারতীয়, আমৃত্যু তাই থাকবো।’
প্রসঙ্গত সানিয়া ২০১০-র এপ্রিল মাসে পাকিস্তান ক্রিকেটার শোয়েব মালিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহ পরবর্তী সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে তিনি টেনিস জগতে ভারতীয় হিসেবেই প্রতিনিধিত্ব করেন এবং একাধিক বার দেশকে গৌরবান্বিত করেন। কিন্তু পাকিস্তানি নাগরিক কে বিয়ে করার ‘অপরাধে’ বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। একাধিক বার মিডিয়া, সাধারন নাগরিক তাঁর “ভারতীয়ত্বের পরিশুদ্ধতা’ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, প্রমান খুঁজেছেন।

লক্ষ্মণের এই অসংবেদী উক্তি তাঁর দল অবশ্য প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর এবিষয়ে সাংবাদিক দের প্রশ্নের উত্তরে বলেন ‘এই মত লক্ষণের ব্যক্তিগত, দল এই মত সমর্থন করে না। কারণ সানিয়া কার্যত সমগ্র ভারতেরই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডার।’ কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই পূর্বতন সময়ের ন্যায় এবারও কেন্দ্রীয় শাসক দলের এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং বিপরীত অবস্থানের মধ্যে দেশ জুড়ে ঘনীভূত তীব্র সমালোচনার ধাক্কা সামালের তাগিদই বেশী। কিন্ত এই তাগিদের আড়ালে যে গুরুতর প্রশ্নটি ‘গোকুলে বাড়িছে’ সেটা হল এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কি শুধু ঐ ব্যক্তি রাজনীতিকের নীতিগত অবস্থানের ত্রুটি বা খাম খেয়াল, না তার নেপথ্যে রয়েছে মৌলিক রাজনৈতিক আদর্শগত ত্রুটি? রয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রছন্ন মেরুকরণের ইঙ্গিত ? রয়েছে মৌলবাদী হিন্দুত্বের প্রশিক্ষণে সযত্নে লালিত চেতনার সঙ্কীর্ণতা ? লক্ষ্মণদের রাজনীতির বেড়াজালে সংঘ পরিবারের প্রভাব ঐতিহাসিক ভাবেই প্রকট । দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদী কলহের নিবৃত্তি হেতু ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা’র কাজ সংঘ পরিবারের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অতঃপর সেই শিক্ষায় সুশিক্ষিত সেবকরা যখন রাজনীতির বৃহত্তর জগতে প্রবেশ করেন, দেশ গড়ার কারিগর হয়ে ওঠেন, আমাদের ভবিতব্যের কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন তখন তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির আড়ালে, রাষ্ট্রের ক্ষমতার গোপন অলি গলি ভরে যায় এই ধরনের মন্তব্যের ছড়াছড়িতে।

আমাদের দেশের কোনও রাজনৈতিক দলই বাস্তবিক অর্থে ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। নীল,সাদা, সবুজ, গেরুয়া (লালই বা বাদ কেন ?) মেরুকরণের জ্যামিতিতে সবাই একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। কেউ কম কেউ বেশী। খাতায় কলমে ‘ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র-র’ তকমা সেঁটে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে ঘুরতে, বেশী কমের তুল্য মূল্য বিচার করতে করতে স্বাধীনতার পরবর্তী ৬৭ টি বসন্ত আজ অতিক্রান্ত। আজও আশ্চর্যরকম ভাবেই ‘ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের’ প্রসঙ্গটি পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সত্যতার মতই জ্বলজ্বল করছে। দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু বাস্তব। অবশ্য আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেই শুধু সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রতিষেধক দেওয়া হয় এমনটা অনুধাবন করলে বোধহয় বিষয়টির অতি সরলী ও লঘুকরণ করা হয়ে যায়। বিশেষত যখন আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাতেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর সামাজিক নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার উদাহরণ নিতান্তই কম নয়।

আপাত দৃষ্টিতে এই ধরনের মন্তব্য গুরুত্বহীন বলে মনে হলেও, আমাদের মত বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের সাধারন মানুষের সীমাবদ্ধ শিক্ষার পরিসরে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অসংলগ্ন মন্ত্যবের প্রতিক্রিয়া যে কি বিষাক্ত হতে পারে তার সাক্ষ্য ইতিহাস আজও বহন করে চলছে। প্রশ্নটা কখনই মন্তব্যের নয়। প্রশ্নটা মানসিকতার। যে মানসিকতার প্রধান সমস্যা, ব্যক্তিকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার। বিশেষত, মেয়েদের। যে মানসিকতার গোপন মণিকোঠার অন্ধকারে শায়িত আছে মেয়েদের কে বিবাহের পরে পতিগৃহের পরিচয়েই পরিচিত করার সুপ্ত অভিলাষ। আজও সেটাই, আর শুধু সেটাই মেয়েদের একমাত্র পরিচয়। আর এই ‘একে চন্দ্র দুইয়ে পক্ষে’র গতানুগতিক পরিমণ্ডলেই সানিয়া মির্জা ভারতীয় হলেও পাকিস্তানি পুরুষের সাথে বিবাহের ফলে তিনি পাকিস্তানি হয়ে যান। নারীর এই প্রাচীন সামাজিক অবস্থান, পরিচিতির সাথে সযত্নে দ্রবীভূত হয় জাতীয়তাবাদের আধুনিক মিশ্রণ। সম্পৃক্ত এই দ্রবণ বর্ণে, গন্ধে পাকিস্তানকে ভারতের ‘শত্রু’ হিসাবে নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করে। আর আকণ্ঠ নিমজ্জিত আমাদের কাছে দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধিতা দুই দেশের শত্রুতা হিসাবে পরিগণিত হয়, সন্ত্রাসের কারবারিরা জনসাধারণের প্রতিভূ হয়ে ওঠে, নাগরিকত্ব, দেশাত্মবোধের ‘লিটমাস টেস্ট’ দিতে হয় কখনও আপনাকে কখনও আমাকে। অবশ্য রাম-লক্ষ্মণের বক্তব্য শুনে অন্য এক ইতিহাস মনে পড়ে যায়। আসলে রাজনীতিবিদ দের স্মৃতিশক্তি খুব পরিবর্তনশীল । প্রয়োজনে অন্নপ্রাশনের ভাতের গন্ধ মনে পড়লেও , বিয়ের ভোজের কথা বেমালুম ভুলে যান। রাম-লক্ষ্মণের দলই এক সময় রাজীব-জায়া সনিয়া গাঁধীকে ভারতীয় বধূ রূপে শিরোধার্য করতে সম্মত ছিলেন না। ‘ইতালিপুত্রী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর বিদেশিনিত্ব প্রতিপন্ন করতে তখন রাম-লক্ষ্মণরা প্রবল উৎসাহী ছিলেন, রাজনৈতিক প্রচারেও বিষয়টি প্রাধান্য পায়। অথচ এখন রাম লক্ষ্মণরাই সানিয়া মির্জাকে ‘ভারতপুত্রী’ বলতে নারাজ। আচ্ছা আপনিই বলুন এমন এক যাত্রায় পৃথক ফল কতদিন চলবে ? কতদিন ধর্মীয় মেরুকরণের আঙ্গিকে গুরুত্ব পাবে রাজনৈতিক কুশীলবরা ? কতদিন মনুষ্যত্বের মাপকাঠিতে ধর্ম বাটখারা হিসাবে ব্যবহার হবে ? কতদিন আমাকে আপনাকে ভারতীয়ত্বর শুদ্ধতার পরীক্ষা দিতে হবে? কতদিন নামাজ আর অঞ্জলির ঘেরাটোপে আবদ্ধ থাকব আমরা ? কতদিন আর কতদিন চিৎকার করে বলব আমরা চাই, আমি চাই ...

আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে
আমি চাই মহল ফুটবে সৌখিনতার গোলাপ কুঞ্জে।
আমি চাই নেপালি ছেলেটা গিটার হাতে
আমি চাই তার ভাষাতেই গাইতে আসবে কলকাতাতে।
আমি চাই ঝাড়খণ্ডের তীর ধনুকে
আমি চাই ঝুমুর বাজবে ঝুমুর বাজবে তোমার বুকে।
আমি চাই কাশ্মীরে আর শুনবে না কেউ গুলির শব্দ
আমি চাই মানুষের হাতে রাজনিতিহবে ভীষণ জব্দ।
আমি চাই হিন্দু নেতার সালমা খাতুন পুত্র বধূ
আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু,
আমি চাই বিজেপি নেতার সালমা খাতুন পুত্র বধূ
আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।
আমি চাই গাছ কাটা হলে শোক সভা হবে বিধান সভায়
আমি চাই প্রতিবাদ হবে রক্ত পলাশে রক্ত জবায়।
আমি চাই পুকুর বাঁচালে আকাশ ভাসবে চোখের জ্বলে
আমি চাই সব্বাই জানও দিন বদলের পদ্য বলে।
আমি চাই মন্ত্রীরা প্রেম করুন সকলে নিয়ম করে
আমি চাই বক্তৃতা নয় কবিতা বলুন কণ্ঠ ধরে।
যদি বল চাইছি নেহাত...যদি বল চাইছি নেহাত চাইছি নেহাত স্বর্গ রাজ্য
আমি চাই একদিন হবে একদিন হবে এটাই গ্রাহ্য।।



ভিডিও সৌজন্য- এন ডি টি ভি

আপনার মতামত জানান