সন্ত্রাসবাদী ক্ষুদিরাম এবং কয়েকটি কথা

সুমন্ত চ্যাটার্জী

 



“One murder makes a villain, millions a hero”.
:Bishop Beilby Porteus



ব্র্যাড পিট অভিনীত “Inglourious Basterds” সিনেমায় দেখানো হয়েছিল কিভাবে ফ্রান্সে নাৎসি বর্বরতার পালটা জবাব দেওয়ার জন্য একদল ইহুদী- আমেরিকান একটা স্কোয়াড গড়ে তুলেছিল। বর্বরতায় এরাও নাৎসিদের থেকে
পিছিয়ে ছিলনা। কিন্তু সিনেমাটা দেখতে দেখতে দর্শকের নৈতিক সমর্থন চলে যায়
এই জবাবী জল্লাদদের দিকে।
বিষয়টা এই কারণে উত্থাপন করলাম কেননা কয়েকদিন আগে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাস বইয়ে “বিপ্লবী” ক্ষুদিরাম বসুকে কার্যত “সন্ত্রসবাদী” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রথমেই জানিয়ে রাখি ঘটনাটি রাজনৈতিক আওতার বাইরে। কেননা ইতিমধ্যে অনেক মানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি তারাও ক্ষুদিরাম বসু বা ভগৎ সিং-দের ওসামা বিন লাদেন, আজমল কাসব বা অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকদের মুদ্রার অন্য পিঠ বলেই মনে করে।

তার আগে জেনে নেওয়া যাক, “বিপ্লবী” আর “সন্ত্রাসবাদী”-র মধ্যে তফাতটা কোথায়। বিপ্লবীরা মূলত চরমপন্থী বা “Extremist” হন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা যেতে পারে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুও চরমপন্থী ছিলেন, কিন্তু তিনি ব্যক্তিহত্যার রাস্তায় হাঁটেননি।
হেঁটেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়, বাদল বা দীনেশের মত
মানুষেরা।
কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, এঁরা কাদের বিরূদ্ধে এই সশস্ত্র বিপ্লবের পথ নিয়েছিলেন? অত্যাচারী-শোষক- ঔপনিবেশিকদের বিরূদ্ধে।
এর পিছনে ছিল একটা বিশাল ভূখন্ডের মানুষকে স্বাধীনতা দেওয়ার মত মহৎ
উদ্দেশ্য। তাছাড়া, এর কেউই কিন্তু নিরাপরাধ কাউকে মারতে চাননি (কিংসফোর্ডের বদলে যারা বলি হয়েছিল তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের শিকার ছিল)।
ভগৎ সিং স্যান্ডার্সকে মারলেও পার্লামেন্টে এমন বোমা ছুড়েছিলেন যাতে কেউ আহত না হয়। সবথেকে বড়ো বিষয়, এঁদের প্রত্যেকেরই কিন্তু সশস্ত্র বিপ্লবের পিছনে একটি গঠনমূলক উদ্দেশ্য ছিল যার উদাহরণ বহির্বিশ্বে অন্যান্য সশস্ত্র বিপ্লবী ভ্লাদিমির লেনিন বা চে গ্যেভারার মধ্যে দেখতে পাই। অন্যদিকে তালিবানি-মুজাহিদিনরা যাদের আমরা আধুনিক যুগে “সন্ত্রাসবাদী” বা “Terrorist” বলে জানি, এরা ধর্মের জন্য জেহাদ বা বিপ্লবের নামে নিজেদের ধর্মেরই শিশু-নারীদের অবলীলায় হত্যা করছে।
সন্ত্রাস সৃষ্টি করে নিজেদের দাবী-দাওয়া চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষদের
ওপর। না আছে এদের কোনো গঠনমূলক উদ্দেশ্য, না আছে মানবতার প্রতি কোনো
দায়িত্ববোধ। বামপন্থী Anarchist-দের মত এরাও নৈরাজ্যে বিশ্বাস করে।
কিছু মানুষ রয়েছেন যারা হত্যার তত্ত্বে একেবারেই বিশ্বাসী নন। যেকোনো রকমের মানুষ হত্যাকেই তাঁরা “সন্ত্রাসবাদের” সাথে তুলনা করেন। সেই হিসেবে দেখতে গেলে ইংরেজদের হাত থেকে ভগৎ সিং-কে বাঁচানোর সুযোগ পেয়ে তা হাতছাড়া করা মহাত্মা গান্ধীকেও “পরোক্ষ সন্ত্রাসবাদী” আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
সুতরাং, ক্ষুদিরাম বসুকে “সন্ত্রাসবাদী” আখ্যা দিলে কিন্তু পুরো ইতিহাসই বদলাতে হবে। জর্জ ওয়াশিংটন বা উইলিয়াম ওয়ালেশের মত ব্যক্তিত্বকে হিটলার-মুসোলিনি বা জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর সাথে একই আসনে বসাতে হবে। তাই আধুনিক ধ্যানধারণায় “সন্ত্রাসবাদী” শব্দটির পরিবর্তে “চরমপন্থী” শবটি ব্যবহার করাটাই বোধহয় শ্রেয়। আর এই পরিমন্ডলে যখন বারাক ওবামার মত ড্রোন হামলাকারী শান্তির জন্য নোবেলে ভূষিত, তখন ক্ষুদিরাম-মাস্টারদা সূর্য সেনের মত বিপ্লবীরা “নায়ক” হিসেবে সম্মান দাবি না করলেও যৌক্তিক পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে উপযুক্ত মূল্যায়ন আশা করতেই
পারেন। সবশেষে বলতে পারি, সঠিক ও নির্ভেজাল ইতিহাস কিন্তু কাউকেই “নায়ক”
বা “খলনায়ক” হিসেবে চিহ্নিত করেনা, শুধু অতীতকে তুলে ধরে নিরপেক্ষ
দৃষ্টিকোণ থেকে। বাকি সিদ্ধান্তটা মানুষের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হোক।

আপনার মতামত জানান