স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ...

সুশোভন

 



ছোটবেলার এক গ্রীষ্ম কালীন সন্ধ্যে। ঝড় বৃষ্টির পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আমাদের গঞ্জে তখন কোনও ‘বিক্ষিপ্ত ঘটনা’ নয়। অগত্যা মায়ের বকুনির ভয়ে বাধ্য হয়েই উঠোনে পাতা দড়ি খাটে হ্যারিকেনের আলোয় বইয়ের পাতা খুলে বসলাম। বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকার ছবি আঁকা তাতে। আমেরিকা, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, কোরিয়া, রাশিয়া, চিন, কিউবা, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, বলিভিয়া কত শত দেশের পতাকার মাঝে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি, ছোট কাকু পাশে এসে বসে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “এর মধ্যে কোনও দেশের জাতীয় পতাকা তোর সবচেয়ে প্রিয় ?" অনেক ভেবে চিন্তে, ভালো করে আরও একবার বইয়ের পাতায় চোখ রেখে, জাতীয় পতাকার সমুদ্র থেকে তুল্যমূল্য বিচার করে অল্পের জন্য জাপান কে হারিয়ে আমি বলেছিলাম “নেপাল।” সস্নেহে কাকু মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন “ধুর বোকা ! নিজের দেশের জাতীয় পতাকা সবসময় সবচেয়ে সুন্দর”। ছোট মাথায় সেদিন কারণটা বোধগম্য হয়নি। আজ হয়। আজ বুঝি কত শত শহীদের রক্তে ভেজা আমাদের ঐ তিরঙ্গা। আজ জানি কত হাজার আত্মবলিদানের বিনিময়ে ঐ তিরঙ্গা। আজ জানি কত লক্ষ মায়ের কান্না ভেজা ঐ তিরঙ্গা। আজ জানি কত বুলেট আর অত্যাচারের সাক্ষী ঐ তিরঙ্গা।
১৫ অগাস্টের কয়েক দিন আগে থেকেই একটা আলাদা অনুভূতি হত। বিশেষ করে স্কুলে যখন প্রভাত ফেরী বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলত । ফিরে এসে রাত্রে আবার বাড়িতে ‘স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিছু বলার’ প্রস্তুতি। কল্পনা থেকে নেতাজী, ভগত সিং, বিনয়, বাদল, দিনেশ , ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীর লড়াইয়ের সঙ্গে কখন যে একাত্ম হয়ে যেতাম বুঝতেই পারতাম না। আমার একটা কাপড়ের তৈরী ছোট্ট জাতীয় পতাকা ছিল। ১৫ অগাস্ট সকাল বেলা উঠে, স্নান করেই সেটা নিয়ে এক দৌড়ে স্কুলে পৌঁছে যেতাম মহা আনন্দে। প্রথমেই শুরু হত প্রভাত ফেরী। আমি শ্লোগান দিতাম প্রভাতফেরীর দুটো লাইনের মাঝে চলতে চলতে। গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে বলতাম ‘গান্ধী জী কি...’ সহপাঠীরা সবাই একসাথে বলতো ‘জয় !’, সহপাঠী দের গলার জোরে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেত এক-ধাক্কায়। তারপর একে একে ‘নেতাজী কি...’ ‘জয়’!, ‘ক্ষুদিরাম বসু কি...’ ‘জয়’! প্রভাত ফেরী তখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাস্তায়, আড় চোখে লক্ষ্য করতাম সবাই আমাদেরই দেখছে, উৎসাহ পেয়ে সবাই কে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম ‘বিনয় বাদল দিনেশ কি...’, ‘জয়’, ‘প্রফুল্ল চাকী কি...’ ‘জয়’ ‘মাতঙ্গিনী হাজরা কি...’, ‘জয়’ । মাঝে মাঝে পাঞ্চ লাইন হিসাবে চিৎকার করে বলতাম ‘বন্দে মাতরম...’। সারা গ্রাম ঘুরে যখন আবার স্কুল হয়ে বাড়ি ফিরতাম মা আদরের গলায় বলতেন ‘ঐ যে এলেন, দেশ জয় করে !!’ বুকটা ভরে যেত।
আসলে তখনও স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের পার্থক্য বুঝতাম না, তখনও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের চাওয়া পাওয়ার ত্রৈরাশিক অঙ্ক কষতাম না, তখনও বন্দে মাতরমের রাজনৈতিক সংস্করণ খেয়াল করতাম না, তখনও নেতাজী, ভগত সিং-র বঞ্চনার জবাব চাইতাম না, তখনও এ আর রহমানের গান উচ্চস্বরে বাজিয়ে ‘মা তুঝে সালাম’ করতাম না, তখনও অশোকচক্রের জায়গায় হাত বা ঘাসফুলে লক্ষ্য করতাম না, তখনও দেশভাগের অর্থ জানতাম না, বাজারে পেঁয়াজ থেকে রাহুল দ্রাবিড়ের কভার ড্রাইভ সব কিছুই বিক্রি হত না, তখন তিরঙ্গা চাইলে দোকানী গুটখার প্যাকেট দিত না । তখন, সেই তখন, স্বাধীনতা দিবসের মানেটাই ছিল একে বারে অন্যরকম ।
এরকম কত শৈশব ,কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের সাথে পা মিলিয়ে স্বাধীনতা আজ বার্ধক্যে। স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক স্বার্থ রক্ষার্থে মূলত সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয়বাদ ও সামাজিক ন্যায় বিচারের প্রশ্ন কে সামনে রেখে গৃহীত হয় আমাদের সংবিধান। তারপর রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাতের চোরা গলিতে প্রায় সাত দশকের পথ চলা ক্লান্ত, জীর্ণ নাগরিক স্বাধীনতা দিবসের পূত লগ্নে চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষে, যদি বলে ‘রাষ্ট্র স্বাধীনতা পেয়েছে, স্বাধীনতা দিতে পারেনি’ তাহলে কি সত্যি অত্যুক্তি করা হয় ? যদি বলে স্বাধীন ভারতবর্ষের সাধারন মানুষ আজ শুধু আর শুধুই রাষ্ট্রের অন্নদাস তাহলে কি ভুল বলা হয় ? তাকিয়ে দেখলেই স্পষ্ট হয়, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের বেশী এখনও প্রতিদিনের খিদে মেটানোর তাগিদে স্বাধীন রাষ্ট্রে কাছে হয় পাত পাতে, নইলে হাত পাতে। সাচার কমিটির রিপোর্টে সংখ্যালঘুদের হাঁড়ির হালের যে চিত্র উঠে আসে তা ভয়াবহ। যতবার “গরিবি হাটাও” শ্লোগান উঠেছে ততবার গরিবি মাপক যন্ত্রেরে মাপকাঠি বদলেছে খালি। রাষ্ট্র ঠিক করে দিয়েছে দিনে গ্রামে দৈনিক ২৫ টাকা আর শহরে ৩২ টাকা রোজগার করলেই সেই আর গরীব না। তবুও স্বাধীন ভারতবর্ষের ৭০% মানুষের দৈনিক রোজগার বাস্তবে ২০ টাকার কম, গ্রামের ৮০% এবং শহরের ৬৪% মানুষ দৈনিক জরুরী ক্যালোরি থেকে বঞ্চিত, শুধুমাত্র ২১.২% মানুষ নিশ্চিত বৈতনিক চাকুরে, প্রায় ৫০ লাখ শিশু পেট চালানর জন্য পড়াশুনোর অব্যহাতি দিয়ে আজ শিশু শ্রমিক, ১৯৯৬-২০১৩-র মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৯০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।
স্বাধীন ভারতবর্ষে আজও নির্বাচনী প্রচারে সর্বাধিক গুরুত্ব পায় দুর্নীতি। আজও অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়, সবরমতী এক্সপ্রেস পোড়ান হয়। গুজরাট থেকে মুজাফরনগর হয়ে শাহারানপুরে দাঙ্গার আগুন জ্বলে। খোদ রাজধানীর বুকে নির্ভয়া ধর্ষিত হয়, নিডো তানিয়া দের রাস্তার মাঝে দিনের বেলা স্রেফ পিটিয়ে মারা হয়। আজও বিনায়ক সেন, অসীম ত্রিবেদী, অম্বিকাশ মহাপাত্র দের জেল খাটতে হয় আর সৌরভ চৌধুরী, বরুণ বিশ্বাস দের প্রতিবাদের মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। স্বাধীন ভারতবর্ষে আজও কখনও বিধায়ক শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুঁড়ে মারেন আবার কখনও সাংসদ বিরোধী দলের সমর্থক মা বোন দের ‘ঘরে ছেলে পাঠিয়ে রেপ করার’ হুমকি দেন। পূর্বপ্রান্তের অঙ্গ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান যখন ধর্ষণ “ছোট্ট ঘটনা” বলেন তখন পশ্চিমপ্রান্তের জেল ফেরত আসামী দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান মনোনীত হন। শিল্পপতি নেতা জন্মদিনে যখন ৪ কেজি সোনার জামা পরেন তখন চা বাগানে শ্রমিকদের অনাহারের মৃত্যু মিছিল ক্রমশ দীর্ঘায়িত হয়। সকালে উঠলেই পার্কস্ট্রীট, কামুদুনি, খরজুনা, মধ্যমগ্রামের লজ্জায় মুখ পোড়ে। কোনো গ্রামে যখন দুর্বল অসহায় কোনো বৃদ্ধা কে আজও 'ডাইনি' সন্দেহে গ্রামবাসীরা পিটিয়ে মারেন, তখন রাষ্ট্র নেতারা ৪২% মহার্ঘ্য ভাতার বিনিময়ে ১২ মাসে ১৩ বার ফুর্তি করেন। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র আজও জোর গলায় ‘গাজার মৃত্যু মিছিলের’ প্রতিবাদ করতে পারে না, আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে ‘সংখ্যালঘু’ ,‘সংখ্যাগুরু’ বিচার করতে পারেনা, ভোপালের মৃত্যু মিছিলের কাণ্ডারি ওয়ারেন অ্যান্ডারসন কে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দিতে পারে না। স্বাধীন ভারতবর্ষের শাহাজাদারা আজও বলেন “Poverty is a state of mind !!”
এরপর যদি বলি গণতন্ত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার মাত্রাহীন নিষ্কাশনে ও প্রবল মেরুকরণে স্বাধীনতা আজ উন্মাদ্গামী, তাহলে কি ভুল বলা হয় ? যদি বলি পেটচুক্তি আর ভোটচুক্তির আড়ালে গণতন্ত্রই আজ মনে হয় গলদঘর্ম, তাহলেও কি অত্যুক্তি করা হবে ? যে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ নাগরিক সুরক্ষা দেওয়া ,মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, নাগরিক দায়িত্ব অধিকারের সদ্ব্যবহার করা সেই রাষ্ট্রই যখন ভগত সিং কে ৬৭ বছর পর শহীদ ঘোষণা করতে সংকোচ বোধ করে, নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের তথ্য অজানা কারণে সযত্নে গোপন রাখে, দেশ জুড়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যখন ‘ভারত-পাকিস্থান’ যুদ্ধের সিনেমা রমরমিয়ে বাজার গরম করে, সোশ্যাল স্ট্যাটাস পুনরুদ্ধার করতে যখন বাবা-মা তার ২ বছরের বাচ্চার সাথেও ইংরেজি তে কথা বলেন, ১৫ অগাস্টের সকালে যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় তা সেদিন বিকেল বেলা থেকে যখন এক বছরের জন্য বাক্সবন্দী হয়েই পড়ে থাকে, সমাজের সিংহভাগই যখন এসব নিয়ে চিন্তা করাই পরমপরাধীনতা বলে মনে করেন, স্বাধীনতা দিবস কে যখন জাতীয় ফুটবল দিবস মনে করা হয়, অসম সাহসী স্বাধীনতা-সংগ্রামী দের অকৃপণ আত্মত্যাগ প্রাপ্যমূল্যে যখন নিদারুন ভাবে বঞ্চিত হয়, তখন স্বাধীনতার মানে খুঁজতে বসে আমার মত তুচ্ছ সাধারন নাগরিকের হোঁচট খাওয়াটা কি খুব অন্যায় ? আর যদি অন্যায়ই হয় তাহলে স্বাধীনতার মানে খুঁজতে বোধহয় শিলাজিত কি ধার করে বলতেই হয় ..
তুমি হায় বুঝবে কি ভাই
ফুরফুরে দিন কেটে যায়
বোঝাচ্ছ স্বাধীনতার মানে
যে অধীন দিনে রাতে
বুলেটে যে বুক পাতে
সে বুঝেছে স্বাধীনতার মানে

সে বুঝেছে খাঁচায় থেকে
গরাদ ভাঙায় কী দম লাগে
লাগে কতো রক্ত কতো ঘাম
স্লিম জিমে ফেলে আসি ঘাম
ফরেন জিন্স কিনতে দিই দাম
স্বাধীনতার কেন বদনাম?

পাড়ার নালায় লাশ ভাসলে
পারাবারে ভাসাই জাহাজ
বিপ্লব ঘর-ছাড়া এক পাখি
বাঁচলে পাখি তারই ঠোঁটে
খাবে ধান যেমন জোটে
ধানে ধ্যান, জ্ঞানে বোল হাঁকি

মন তার যতোই না চায়
যে পাখির বাঁচাই খাঁচায়
সেই বোঝে ভাঙা কতো কঠিন
তুমি হায় বুঝবে কি ছাই
গান গেয়ে দিন কেটে যায়
আমি হায় বুঝব কি ছাই
শান্তিতে দিন কেটে যায়
স্বাধীন থাকা আমার রোজের রুটিন
স্বাধীন থাকা তোমার রোজের রুটিন


আপনার মতামত জানান