১৬.০৫.২০১৪

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতি,
এখনও যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।


একটা কথা প্রথমেই বলি, আমি মনে করি না আজ সবচেয়ে খারাপ সময় এসেছে। আমি অবিশ্যি সময় বলতে এখানে পরিসর বললাম। সময়ে আমার আস্থা নেই। উপরের কবিতাটা পড়লেই বুঝবেন, খারাপ সময়টা আবহমান চলছে। কোনো স্বর্ণযুগ নেই। কোনো যুগই অবিসংবাদীতভাবে অন্ধকার হতে পারে না। জীবনানন্দের এই কবিতাটি কি ২০১৪-র নয়? আমি কনটেন্টের কথাই বলছি অবিশ্যি, স্টাইলের কথা বলছি না।
আরেকটা কথা, আমি বামফ্রন্ট বলতে সিপিআইএম বুঝি। এবং পাঠক এখানে সেটাই বুঝে নিয়ে পড়ুন। এটা নিয়ে কোনো তর্কে যেতে চাই না। যাওয়ার মানে হয় না।
আমাদের বামপন্থীরা সম্ভবত মৃত্যু এবং বার্ধক্যে আস্থাশীল নন। তাঁরা নিজেদের প্রজন্মটাকে আলটিমেট জেনারেশন ভেবেছিলেন। কিংবা, সারা বিশ্বে বামপন্থার ভরাডুবি দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আত্মরক্ষার সংজ্ঞাটাই ফেলেছিলেন গুলিয়ে। এর ফলেই পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি রাখেননি। বয়স বেড়েছে ঢের, সিপিএমের নরনারীদের। আজ কোনো যুবক বামপন্থীকে দেখতে পাচ্ছি না। এর ফলেই মন্দাক্রান্তা সেন বা অভিনন্দন মুখোপাধ্যায়রা যখন সত্যিকারের শুদ্ধ বামপন্থার আহ্বান দিচ্ছেন ফেসবুকে, দেখতে পাচ্ছি তা শোনার লোক নেই।
জ্যোতি বসু গেলেন, অনিল বিশ্বাস গেলেন... তারপরেই দেখা গেল, ধরার কেউ নেই!!! বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আর যাই হোন জননেতা হতে পারেন না। উনি পন্ডিত মানুষ। বুদ্ধিজীবী। কিন্তু মঞ্চ মাতানোর ক্ষমতা নেই। জ্যোতি বসুরও সেটা ছিল না। কিন্তু জ্যোতি বাবুর ইস্পাতকঠিন উত্তরাধিকার ওঁর জন্য ছিল না। উনি সামলাতেই পারলেন না। তাছাড়া এখন রাজনীতি হল সবচেয়ে বড়ো এন্টারটেইনমেন্ট, সেটা সাপ্লাই দেওয়া ওঁর সাধ্যাতীত, রুচির বাইরে। সুকান্ত ভট্টাচার্য মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়বেন যে!
তবু নন্দীগ্রামের রাক্ষস হয়ে গেলেন। আসল ক্ষিদেটা আড়াল হয়ে গেল ঠোঁটে লেগে যাওয়া রক্তে।
কিন্তু কার জন্য জ্যোতি বসুর উত্তরাধিকার ছিল?
কেউ কি ছিলেন?
বিমান বসুকে তো বিদূষক ছাড়া আমার কিছু মনে হয় না কোনোকালে। ওঁর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন হবে না, কিন্তু রাজনীতির দিক থেকে ওঁর ‘সরলতা’ নিয়েও কোনো সংশয় নেই। অনিল বিশ্বাসের জায়গায় ওঁকে ভাবাটা শকুনির জায়গায় জয়দ্রথকে ভাবার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। উনি উত্তেজনা ছড়ানোর উপযুক্ত লোক। কিন্তু সংগঠনকে ধরা রাখা ওঁর কম্মো নয়।
চলে গেলেন জনপ্রিয়তার আরেক নাম, সংগঠনের আরেক না্ম সুভাষ চক্রবর্তী।
এই তিনজন চলে যাওয়ার পরেই মহাভারত থেকে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণের বিদায় হল।
আর গৌতম দেব? ওঁকে কি শল্য বলব? আসলে আমি মনে করি এ রাজ্য থেকে বামপন্থার বিদায়ের (?) পিছনে ওঁর টেলিভিশন উপস্থিতির অবদান মমতার সিঙ্গুরে উপস্থিতির চেয়ে বেশি কাজ করেছে। একবার করে টিভিতে এসেছেন, দাপটে হাত ঘুরিয়েছেন, দলের ভোট অনায়াসে কয়েক হাজার করে কমিয়ে দিয়েছেন।
একটা ভরাডুবি যে কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, এখনকার বামপন্থীদের দেখেই টের পাচ্ছি। এঁরা যেন ... কী যেন বলে ওটাকে ... জোম্বি হয়ে গেছেন। একেকজন চলমান মৃতদেহ। আজ মোদী জেতার পরে, রাজ্যে মোটে ২টি আসন পাওয়ার পরে টিভিতে বিমান বসুর সাংবাদিক সম্মেলন দেখছিলাম। এত করুণ লাগল, বলার নয়। ‘জলসাঘর’-এর ছবি বিশ্বাসের মতো অবস্থা। ইংরেজিটা বলতে পারেন না, বলতেও ছাড়েন না। বাংলাতেও কী বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। একজন দোভাষী রাখলে তো পারেন, বিশেষ করে যখন বাক্যহারা অবস্থা। আর এরকম অবস্থাতেই উনি মাথা গরম করে সর্বনাশগুলো করেন।
আজ গ্রামাঞ্চলে বামফ্রন্ট নিজের কয়েন ফেরত পাচ্ছে। সংগঠন চুরমার হয়ে গেছে। বামফ্রন্ট যাদের প্রাইমারিতে চাকরি দিয়েছিল আনুগত্যের শর্তে, তারা আজ চাকরির কথা ভেবেই তৃণমূলকে মদত দিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে তৃণমূলের পেশিশক্তির একটা বড়ো অংশ প্রাক্তন বামফ্রন্টের ক্যাডার। যারা কট্টর ছিলেন বা আছেন, তাঁরা প্রাচীন হয়েছেন, ছেলে-মেয়ে-বৌমারা তাঁদের বেরোতে দিচ্ছে না। যুবশক্তি নেই। জমকালো পার্টি অফিসগুলো প্রত্নতাত্বিক ভবন হয়ে যাবে কিছুদিন পরে।
মানুষ অনেক আশা নিয়ে মমতাকে এনেছে। আজকের লোকসভা ফল বুঝিয়ে দিল মানুষ এখনও আশা ছাড়েনি। তবে পার্সেন্টেজ কমেছে, আসন বাড়লেও। কিছু মানুষ হতাশ হয়েছেন। তাঁরা কি বিকল্পও খুঁজছেন না? তবে সেটা বামফ্রন্ট নয়।
সন্ত্রাস বা কারচুপির কথা বলে লাভ নেই। ও দিয়ে কিছু আসন জেতা যায়। ৩৪টা আসন জেতা যায় না। ওটা হবে প্রলাপ, একমাত্র গৌতম দেবের মুখেই মানাবে। সন্ত্রাস আর পেশিশক্তি দিয়ে যদি নির্বাচন রক্ষা করা যেত, তৃণমূল গত বিধানসভায় আসতেই পারত কি? ২০১১-এ কি সিপিএমের ক্যাডাররা সব বৈষ্ণব হয়ে গিয়েছিল? তৃণমূল জিতল কী করে?
মানুষ ২০১১-র মতো যদি বেরিয়ে এসে তৃণমুলকে বলে, ‘এবার যাও!’... কেউ গদি বাঁচাতে পারবে না। মমতার বিরুদ্ধে সেই রোষ এই রাজ্যে এখনও নেই, এটা প্রমাণিত হল। সারদা-টেট কোনো কাজে এল না বিরোধীদের। কাজে লাগাতেই পারলেন না তাঁরা মমতা যেভাবে সিঙ্গুরের মতো একটা ফুলকিকে দাবানল বানাতে পেরেছিলেন। এখানে দাবানল দেখতে দেখতে উদ্যম এবং পরিকল্পনার অভাবে নিভে গেল।
সিপিএমের দেওয়াল লিখনগুলো দেখছিলাম আমাদের ঘাটাল শহরে। কোনো প্যাশন নেই। ফ্যাকাসে। দায়সারা। যেন ধরেই নিয়েছে হারতে হবে। তবু লিখছে কর্তব্যের খাতিরে।
মানুষ সিপিএমের পাশে নেই। এখনো বিপুলভাবেই মমতার পাশে আছে।
কিন্তু আশাভঙ্গের সুর অবশ্যই লেগেছে বাতাসে।
মমতা আর ক্ষমতা এক হওয়ার পর থেকে এই রাজ্যে কোনো বিরাট ঢেউ দেখা দেয়নি উন্নয়নের। চোরাগোপ্তা কিছু উন্নতি থাকতে পারে, সেগুলো আঞ্চলিকভাবে চোখে পড়ে, সারা রাজ্যে সাধারণভাবে যায় না। বরং সারদা এবং টেট কেলেংকারি রাজ্যের মুখ কালিমালিপ্ত করেছে। ধর্ষণ আগেও হয়েছে, এমন নয় যে তৃণমূল রাজ্য থেকে বিদায় নিলে ধর্ষণ আর হবে না। কিন্তু আমাদের রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষণের ব্যাপারে যে অবস্থান নেন, তা লজ্জাজনক।
তারপরেও জনরোষ নেই। বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ করে নিজেদের ভাবমূর্তি ঊজ্জ্বল করছেন।
সারা রাজ্যে একটা ক্যাওড়া কালচার চলছে। ভুল সংস্কৃতিকে তোল্লাই দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি তো আর গদার-ত্রুফো-ফেলিনি বোঝেন না, দেব আর হিরণকেই বোঝেন। একের পর এক লিটল ম্যাগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অথবা ধুঁকছে, প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।
মুনমুন সেনের মতো একজন মানুষ সংসদে যাচ্ছেন, যিনি একজন নির্লজ্জ শরীরসর্বস্ব স্টার ছাড়া কিছু নন, নিজের মায়ের থেকে চেহারা আর অহমিকা ছাড়া কোনো কিছুই নিতে পারেননি, বিস্কুটের বিজ্ঞাপনটাও ঠিকভাবে দিতে পারেন না। যাচ্ছেন সন্ধ্যা রায়। এগুলো দেখলে বাঙালি হিসেবে লজ্জা হয়। রাজনীতি কবে থেকে এত গরীব হয়ে গেল! সুপ্রিয়া দেবী নেহাত চলাফেরা করতে পারছেন না, নাহলে ওকেও মমতা এম পি বানিয়ে দিতেন। উনি সংসদে গিয়ে ভারতবাসীকে ‘দাদার প্রিয় তরকারি’-র রেসিপি দিতেন।
যা অনিবার্য ছিল, তাই হল। তবে আমার ধারণা নরেন্দ্র মোদী খারাপ চালাবেন না। অন্তত কংগ্রেসের চেয়ে ঢের ভাল চালাবেন। বাজপেয়ী জমানার কথা মনে করা যেতে পারে। অন্তত দেশের চামড়াটা ঢের চকচকে হবে। সবকিছুর পরেও এই জয়কে অস্বীকার করা যায় কি? আমি পারি না। ইচ্ছে করে, কিন্তু পারি না।
এই রাজ্যেও কি ভবিষ্যত বিকল্প বিজেপি ? সেটাই হবে যদি মোদী খুব বড়োরকমের আশাভঙ্গ না করেন। সেটার আশু সম্ভাবনা মনে হয় নেই। লোকটি মস্তিস্ক দিয়েই এতদূর এসেছেন। সেটা বাদ দিয়ে কাজ করবেন না। গুজরাট দাঙ্গা ক্রমে ৮৪-র দাঙ্গার মতো আবছা হয়ে আসবে। ইহাই আমাদের জনমানস। তবে একনায়কত্ব শুরু হল। এখানে তো বটেই।
মমতা নিও-কমিউনিজমের জননী, সুবোধ সরকার লিখেছেন সেটা এই অর্থেই আমি মানতে পারি যে ওঁকে দেখে আমার স্তালিনকে মনে পড়ে যায়। আর ইন্দিরার পর আরেক একনায়ক মোদী। মিলিয়ে নেবেন। তবে আবার বলছি, দেশের চামড়া আগামীতে খুব চকচকে হবে।
এ রাজ্যেও গেরুয়া হইহই করে এসে পড়ল। এই আসা নেগেটিভ ভোটকেই রেফার করে, আমার ধারণা। গত বিধানসভায় যারা অনেক আবেগ নিয়ে বামফ্রন্টকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আজ তাঁরা বামফ্রন্টে বিকল্প খুঁজবেন না বর্তমান শাসকের। সেটা এক কাপড়ে লম্পট প্রেমিকের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালানো মেয়েটির আবার সব হারিয়ে মাথা নিচু করে বাপের কাছে ফিরে আসার মতো লজ্জাজনক হবে। তাঁরা আশ্রয় খুঁজছেন অন্য কোথাও। সেই অন্য কোথাওয়ের নাম হয়ে উঠছে বিজেপি।
লেখালেখির, এমনকি আবেগ, বুদ্ধি নিয়ে বেঁচে থাকার খুব খারাপ সময় আসছে কি পশ্চিমবঙ্গে? যারা এখন আমাদের হাল ধরে আছে, রাজ্যে-কেন্দ্রে বা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রে, এরা কেউ কি মেধার তোয়াক্কা করেন? মনে হয় সবচেয়ে ভয়টা এরা মানুষের আবেগ, মণীষা, আর মেধাকেই পায়।
যারা মোদীকে ভিলেন বলছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন আজকের রাজনীতিতে কোনো নায়ক নেই। নায়কদের দিন শেষ। প্রতিনায়কদের দিনও শেষ। ভিলেনরাই বিষে বিষে বিষক্ষয় যদি ঘটাতে পারেন, একটু বাতাস নিয়ে বাঁচা যাবে। বিষে অমৃতে যোগ ঘটলে অমৃতটাই নষ্ট হবে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। মানুষ মমতাকে চেয়েছে। মোদীকে চেয়েছে। বাংলা সিরিয়ালকে চায়। আপনি যদি তার থেকে আইপিএল কেড়ে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ধরিয়ে দিতে চান, চলবে না, মনুষ্যত্বের অপমান হবে। তাই, আইপিএলকে তুচ্ছ করবেন না। বরং ‘ঘরে-বাইরে’-কে বইয়ের আলমারিতে লুকিয়ে রাখুন।
আপনি কি চেয়েছিলেন রাহুল গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রী হোন? আপনি কি চেয়েছিলেন গ্রামে-গ্রামে ঝাঁ-চকচকে রাজকীয় পার্টি অফিসগুলো ধুলো-টুলো ঝেড়ে আবার গমগমিয়ে উঠুক?
জানবেন, আমার সমবেদনা রইল।

আপনার মতামত জানান