গণতন্ত্রের চরম অপমান?

আবেশ কুমার দাস

 

প্রতিটি ব্যক্তিমানুষেরই যার যার মতো নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকে। আমিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নই। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক পটভূমিতেই এই রাজনৈতিক বিশ্বাসটুকু আদপে দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের নামান্তর। তাই এ দেশের সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলেরই ভোটব্যাঙ্ক থাকে। আমাদের রাজ্যের প্রেক্ষিতেই যেমন বুদ্ধিজীবী মাত্রেই বামপন্থী, শহরের সাবেকি পাড়ার বাসিন্দা মাত্রেই কংগ্রেসি বা বড়বাজারের অবাঙালি ব্যবসায়ী মাত্রেই বিজেপি সমর্থক বলে ছকে নেওয়াটা কেন যে জানে একরকম স্বতঃসিদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। বোধহয় তাই এককালের স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট কবি অধুনা তৃণমূলের ঘনিষ্টতার দোষ কাটাতে মমতা ব্যানার্জির মধ্যে নিও কম্যুনিজমের ছায়া খোঁজেন। যাকগে, এই ভোটব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটের রাজনীতি যে কত মারাত্মক সেকথা এদেশের মানুষ যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবেন ততই মঙ্গল। আর সারা দেশের মধ্যেও এই পোড়া বাংলার মানুষের সম্ভবত আরও পোড়া কপাল। ভোটব্যাঙ্কের দাপট এখানে এতই মারাত্মক যে একটা রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থেকে যায় একাদিক্রমে ৩৪ বছর। দুঃস্বপ্ন দেখা যেতে পারে বর্তমান শাসক দলও অন্তত বছর কুড়ি তো আরামসে কাটিয়ে দেবেই।
এ আমাদের সীমাহীন নির্বুদ্ধিতা যে আমরা ভুলে গেছি গণতন্ত্র আমাদের ভোটের বুথে পাঠিয়েছিল একজন নির্বাচক হিসেবে কোনও দলের বিশ্বস্ত ক্যাডার হিসেবে নয়। আমাদের বোতামখানা টেপার কথা ছিল যুক্তি বুদ্ধি সর্বোপরি শাসকের পাঁচ বছরের কাজের খতিয়ান বিচার করে। পরিবর্তে আমরা বুথের পথে পা বাড়ালাম অন্ধ আবেগ ভরসা করে। বিজেপি আজ দিল্লীর মসনদের পথে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে পা বাড়াল ভেবে যাঁরা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যাকুল তাঁদের জিজ্ঞেস করি বিজেপির এই বাড়বাড়ন্তের দায় কি প্রকারান্তরে আমার আপনারও নয় ? আমরা ২০০২ গুজরাট দাঙ্গার নিন্দা করি। ভুলে যাই ১৯৮৪-র শিখ বিরোধী দাঙ্গাও সমান নিন্দনীয় ছিল। নাকি শিখ নিধনে অতখানি দোষ লাগে না যতখানি লাগে মুসলিম নিধনে! প্রসঙ্গত মনে পড়ে ‘আদিম রিপু’-র সেই ১৯৪৬ দাঙ্গার জ্বলন্ত কাহিনি যেখানে কলকাতার কোনও এক থানা থেকে বলা হয় একজন হিন্দু নিহত হলে অত চেল্লামেল্লির কি আছে, লাশটাকে রাস্তায় ফেলে দিলেই তো হয়। স্বাধীনতার পর যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এমন নির্লজ্জ সংখ্যালঘু তোষণের পথ ধরেই কি আজ উঠে আসেনি বিজেপি ? গ্রাহাম স্টেইনের নারকীয় হত্যার নিন্দার ভাষা নেই একথা যতখানি সত্য ঠিক ততটাই সত্য বিজন সেতুর ততোধিক নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও আমাদের বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীকুলের নির্লজ্জ বংশবদপনা। মমতা ব্যানার্জি এবারের লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে এত কথা বললেন। তাঁর মনে পড়ল না একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পুরোহিত ভাতা বা ফাদার ভাতার ব্যবস্থা না করে ইমাম ভাতা চালু করা কত বড় সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ।
আমার এইসব কথাগুলোর নির্যাস এই নয় যে বিজেপির এই বাড়বাড়ন্তে আমি উদ্বাহু। কিন্তু আমার উদ্বেগ কেন হচ্ছে জানেন ? বিজেপি এবারে একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে এসে অভিন্ন দেওয়ানিবিধি চালু করবে কি না এই অলীক চিন্তায় আমার কিচ্ছু এসে যায় না। আমার চিন্তা হয় ব্যাঙ্কে গচ্ছিত অর্থের উপর সুদের হারে এবারে আবার কতখানি কোপ নেমে আসবে। অনেকেই হয়ত জানেন না সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গোয়ায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনের উপর অনেক বিধিনিষেধ ধার্য হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে নাকি দুর্নীতি হয় না! দুর্নীতি নাকি কংগ্রেসেরই একচেটিয়া। ভাবুন, ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবাবেগ ভুলে একটু বাস্তব বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন। ভোটের আগের দিন নিম্নবিত্ত বসতি এলাকায় গিয়ে বেছে বেছে বামপন্থী ভোটারদের শাসানি দিয়ে এসে শাসক দলের এই রাজ্য থেকে ৩৪ টি (কি মুশকিল আবার সেই ৩৪-এর গেরো) আসন নিশ্চিত করার মধ্যে শুধু দুর্নীতি নয় সংসদীয় গণতন্ত্রের চরম অপমান লুকিয়ে নেই ?
আবার একথাও বলব শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন সবসময় দরকার। সেই হিসেবে কংগ্রেসের অপসারণে খুব একটা অখুশিও নই আমি।

আপনার মতামত জানান