‘লর্ড ভানু’র চেম্বারে

সরোজ দরবার

 


তাঁর চেম্বারে ঢুকে পড়ার প্রণামী ছিল-আগে টিনের বাক্সে বারোটাকা...। ব্যস ‘লর্ড ভানু’র দরজা আপনার জন্য খুলে গেল। এরপর যে মহলে আপনি পৌঁছে গেলেন তার অন্দরে চ্যাপলিন সাহেবের একটি কথাই চিরসত্যি- ‘… life is still worthwhile, if you just smile’. তিনি আমাদের হাসিয়েছিলেন। অথচ সে বড় হাসির সময় তো ছিল না। বিশ্বজোড়া তিরিশের দশকের মন্দা, দেশভাগ, ৫০-এ দেশের দুর্ভিক্ষ বাঙালির মুখ থেকে হাসির যে রেশটুকু ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাই যেন ফিরিয়ে দিতে ইতিহাস নির্দিষ্ট দেবদূত হয়ে পর্দায় নেমে এসেছিলেন সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে পূবের ভানু। বাঙালি ‘লর্ড ভানু’।
কে জানত একদা ‘ল্যান্ড’হীন সাম্যময়ের বাঙালির ঘরকন্নায় ‘লর্ড’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে আছে এল ‘লাথি’র ইতিহাস। ‘তখন আমি ছোট, পাড়াতে স্টেজ বেঁধে অভিনয় হচ্ছে-মনে নেই কী বই। অভিনয়ের শিল্পীদের মধ্যে আমি নেই, তবু স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতিপর্ব দেখছিলাম। মাথাটা আমার স্টেজ পর্যন্ত উঁচু, হঠাৎ কে একজন যে নাটকে অভিনয় করছে আমার মাথায় ধাঁই করে একটা লাথি কষিয়ে দিল। আমি এই লাথিটা ঠিক হজম করতে পারিনি। সেই থেকে আমিও পণ করলাম আমাকেও স্টেজে নামতে হবে’-‘প্রসাদ’-এর পাতায় এ কথা জানিয়েছিলেন স্বয়ং।
বাংলাই সেই ভাষা, সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যেখানে আসি বলে স্বচ্ছন্দে চলে যাওয়া যায়। এ যেন ঠিক সেরকমই। যেখানে নেমেই অনেকখানি উপরে উঠে পড়া যায়। ভানু উঠেছিলেন। যে উচ্চতায় তাঁর আরোহণ, আমরা তার ঠাহর করতে পারিনি,সহজ লেবেল লাগিয়ে তাঁকে কৌতুক অভিনেতা করে রেখে দিয়েছি। আসলে এও তো সেই লাথিরই ইতিহাস। পূবের ভানু যখন কলকাতায় এলেন, তখন কারা যেন বলেছিলেন, অভিনয় করবে কি জিভের আড়ই তো ভাঙেনি। তিনি বলেছিলেন, ‘জিভের আড় তো কোনওদিন ভাঙবে না, সুতরাং পরিষ্কার ভাষা আমি কোনদিন বলব না।’ অতএব বাঙাল ভাষার সংলাপ তাঁর কণ্ঠে নিয়তি নির্দিষ্ট হয়ে দাঁড়াল। ‘মাসিমা মালপো খামু’ শুনে আমরা যত হাততালি দিয়ে উঠলাম ততই বিস্মৃত হলাম, এও আসলে এক আত্মপ্রতিষ্ঠারই আখ্যান। দেশভাগ ও তার পরবর্তী সময়কালে যখন একটা গোটা জাতিই ইতিহাসের উঠোনে হাস্যাস্পদ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন ভানু নিশ্চিতই বুঝেছিলেন, বিষাদ গাথার সৌন্দর্যে সমকাল আর মুগ্ধ হবে না। ইতিহাসই যখন পরিহাস করে, তখন নিজের সত্তাই হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার শেষ এবং অমোঘ ঢাল। তাইতো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ যখন সেরা কৌতুক অভিনেতার ‘উল্টোরথ’ পুরস্কার তিনি নিয়ে যাবেন তখন পূর্বসূরি তুলসী চক্রবর্তী সস্নেহে তাঁকে বলবেন, এই সেদিন এসে আমাদের হারিয়ে দিলি। প্রতিষ্ঠানের চেনা ছক যখন কাউকে ব্রাত্য করতে কোমর বাঁধে , তখন বিরোধিতা করা নেহাতই মুখের বুলি হয়ে থেকে যায়, যদি না নিজের ভিতরেই আর একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার সামর্থ্য থাকে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সমালোচনায় কান দেননি, অভিনয়ে মন দিয়েছিলেন। তিনি তাই প্রচলিত অর্থে প্রতিষ্ঠানও নন, বরং আরও ব্যাপক ভাবে তুলসী চক্রবর্তী-নবদ্বীপ হালদার পরবর্তী এবং রবি ঘোষ পূর্ববর্তী এক অনশ্বর যুগের কালচিহ্ন হতে পেরেছিলেন। অনেক পরে যখন তাই তিনি অডিও রেকর্ডে ‘বাঙাল’ ও ‘বাঙালি’র লিঙ্গ নির্ধারণ করে দিলেন, তখন মুখ টিপে কাষ্ঠহাসি হাসা ছাড়া আর বিন্দুমাত্র উপায় অবিশিষ্ট থাকল না।
তবু বিস্মৃতির অধ্যায়ও তো কম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে তাঁর চলে আসার তথ্যটুকুর পুনশ্চতে আমরা ভুলে বসি, আসলে তা ছিল বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ারই ফলশ্রুতি। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির রেখা চাপা পড়ে যায় তাঁরই অজস্র বাঙাল সংলাপের তলায় তলায়। আমরা ভুলে গেছি এই মানুষটাই বলেছিলেন, ‘ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দীনেশদা বিনয়দা যদি বিদেশে জন্মাতেন, তবে তাঁদের জীবনী পাঠ্যপুস্তক হত- আমাদের দেশে খাঁটি মানুষ তৈরি হত। আমার আজো মনে পড়ে, ‘দীনেশদার ফাঁসির পরের দিন, ঢাকার বিখ্যাত (কুখ্যাত) গুণ্ডা ভোলা মিঞাকে রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে বুক চাপড়ে হা-হুতাশ করতে দেখেছি। অথচ এই ভোলাকেই দীনেশদাদের হাতে কী মারটাই না খেতে হয়েছে, ওর অসামাজিক কাজের জন্যে। ... এবার আমি বলছি, ছোটবেলা থেকে বিপ্লবীদের মূর্তি মনে মনে কল্পনা করেছি। তারপর দীনেশদা বিনয়দাদের দেখার পর বিপ্লবীদের পুজো করেছি। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পরে দু-চারজন বাদে , যে সব গজিয়ে ওঠা বিপ্লবীদের দেখলাম, তাদের যে কেন দেখলাম বুঝে উঠতে পারিনি। তবে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি, আমার শরীর খারাপের কারণ এই সব গজিয়ে ওঠা, সাজা বিপ্লবীদের বড় বড় বাক্যবাণ শুনে শুনে।’ হায় কৌতুক! এরপরেও শুধু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কৌতুক অভিনেতাই হয়ে থাকবেন! তাও ভাগ্যিস আজকের এই ইংরেজি বইয়ের সাফাই গেয়ে সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠার অসামান্য কৌতুকটুকু তাঁকে আর দেখতে হয়নি।
কৌতুক অভিনেতার সহজ স্বীকৃতি দিয়েই আমরা ভুলে মেরেছি বাংলা রঙ্গমঞ্চের এক অসামান্য অভিনেতাকে। চাণক্যের মতো চরিত্রতে যিনি প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাঁর কণ্ঠে ‘আলমগীর’ নাটকের অংশবিশেষ শুনে ছবি বিশ্বাসের মনে হয়েছিল, স্বয়ং শিশির ভাদুড়ীই যেন পাঠ বলছেন। তুলসী চক্রবর্তীর তাও একখানা পরশপাথর ছিল, কিন্তু দু-একটা সিরিয়াস চরিত্রের ব্যতিক্রম বাদ দিলে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাও ছিল না। আসলে সংস্কৃতে রচিত মহাকাব্যের মতো সম্ভ্রান্ত দূরত্ব বোধহয় তাঁর বিধির বিধান নয়। তিনি আমাদের মঙ্গলকাব্যের লৌকিক দেবতা। দেবতা, তবু দেবতা নন। তাঁকে তাই বলতে হয়, ‘ আমার সম্বন্ধে একটা কথা চালু আছে শুনেছি যে আমি নাকি কিঞ্চিৎ dull brain. –এর অধিকারী। হতে পারি তা। আর তাই হয়তো এখনো রোলটাই খুঁজি অভিনয়ের জন্য ভাঁড় হতে রাজি হই না।’ সেকালে পরমাণিকদের বাক্স থাকত না। ভাঁড়ে করে কামানোর মালপত্র নিয়ে তাঁরা বাবুদের বাড়ি আসতেন। তাদের কথা জানান দিতেই বলা হত ভাঁড় এসেছে। গোপালের রসালাপের সঙ্গে যোগ হয়ে যা প্রায় অন্য একটা মানে নিয়ে বাঙালির অভিধানে ঠাঁই করে নিয়েছে। ভানুকে তাই রীতিমতো ডিসক্লেমার দিয়ে বলতে হয়, ‘ আমি খাঁটি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নিজের কামানো ছাড়া কখনো কারুর কামিয়ে দিইনি, তাই কোন অর্থেই আমি ভাঁড় নই বা হতেও চাই না।’ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাই খুব সঙ্গত কারণেই বলেন, ‘ আমাদের শিল্প সংস্কৃতি জগতের এটা একটা দুর্যোগের চিহ্ন যে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাকে আমরা ঠিক চিনতে পারলাম না। বা তাঁকেও শুধু হাসির অভিনেতা করে রেখে দিলাম।’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাই খেদ করে লেখেন, ‘ আজ যদি সাহেবদের দেওয়া কোন পুরস্কারে তিনি চর্চিত হতেন, কিংবা সাহেবদের দেশে যে সব ছবি ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে যায় সে সব ছবিতে ঘন ঘন তাঁকে দেখা যেত তাহলে হয়তো তাঁর সত্যিকারের মূল্যায়ন না হোক অন্তত কফির পেয়ালার উপরে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বিবেচিত হতেন।’
বিবেচনার ভার তো প্রজন্মের উপর। সে দায় নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। তিনি তো তাঁর সহজাত কথকঠাকুরের ভঙ্গিমাতেই বাঙালির চরিতকথা ব্যাখ্যা করে গেছেন। কর্তার চোখে ধুলো পড়লে ২০ কিংবা ২৫ টাকা আর গিন্নির চোখে শাড়ি পড়লে গচ্চা ২৫০র হরগৌরী কাব্য থেকে ইলেকশনের কৌতুকে তিনি যখন আউড়ে গেছেন- নেতা ধর্ম, নেতা স্বর্গ, নেতাহি পরমং তপ- তখনও আমরা শুধু হেসেছি। আমরা খেয়াল করিনি তার বাচনভঙ্গির পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল- রাজা তোর কাপড় কোথায় বলে ওঠা শিশুটি। তাঁর মুখ পেশীর সংকোচন প্রসারণ যে বাঙালিয়ানার কেন্দ্র ছুঁয়ে গভীর জীবনবোধের পরিধি অবধি প্রসারিত সে বৃত্তের ছবি আমরা ধরতে পারিনি। ধণতান্ত্রিক যে সমাজব্যবস্থায় শিল্পীর শিল্পও পণ্য, সেখানে তাঁকে আমরা চিহ্নিত করেছি এক নেহাতই কমিক ফেরিওয়ালা হিসেবে।
আর সেই চিহ্ন ধরেই জন্ম নিয়েছে আর এক ট্র্যাজেডির বয়ান’। তবে কমেডিয়ানদের সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি কি জানেন, আমার মা যেদিন মারা গেলেন, কেওড়তলা শ্মশানে তাঁর শবদেহ নিয়ে চলেছি । আশেপাশের জনসাধারণ আমায় দেখে হাসছে আর বলছে, ওই দেখ ভানু কাঁদছে। আমি জানি, যেদিন আমিও মরব, আমাকে শ্মশানে নিয়ে যাবে তখন ওই জাতের লোকই হেসে বলবে, ওই দেখ শালার মাথাটা কেমন অদ্ভুত নড়ছে।’
চ্যাপলিন সাহেব তো বলেছিলেন, ‘life is a tragedy when seen in close up, but a comedy in long shot.’ আজ অতল জলের সব আহ্বানই আমরা লং শটেই ধরতে শিখে নিয়েছি। আর তাই বোধহয় তেলে জলে এক করে রেকর্ড করা হাসির ছররায় ‘ওই জাতের’ জাতভাই হয়ে এখনও আমরা ক্রমাগত হেসেই চলেছি। আজ আমরা মালপো চাইতেও শিখিনি, তাই আমাদের কপালে মালপো জোটেও না। সাত মণ খাঁটি সরষের তেল পুড়িয়ে তাই আমাদের হাসির রান্না হয় এডিট টেবিলের কপি-পেস্ট কড়াইয়ে। মৌলিকানার এই উদ্বাস্তু দশায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যেন সত্যিই সময়ের দেওয়ালে এক অকৃত্রিম কৌতুক হয়ে জেগে থাকেন। এখন সে কৌতুকেও আমরা হেসে উঠন না আত্ম সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড়াব- আজ সেটুকুই যা বিবেচ্য।



photo credit: Wikipedia

আপনার মতামত জানান