বিশ্বভারতীর স্বপ্নভঙ্গ, এবং পুনরাধুনিক

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 



বিশ্বভারতীর একটি ছাত্রীকে বিশ্বভারতীরই দুটি ছাত্র যৌন হেনস্তা করেছে। সেটা নিয়ে এখন এই রাজ্যে পরম উপভোগ্য নাটক চলছে। ধর্ষণ আজ শুধু একটা অপরাধ নয়, সে আজ রাজনৈতিক মূলধন। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দায়টাকে মাথা থেকে নামাতে। সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, অবশ্যই, এটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে জনমানস থেকে যত সম্ভব শীঘ্র সত্যিই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে। বিরোধী এবং সরকার-নিন্দুকেরা এটাকে আবার একটা পরম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
অবশ্য বিশ্বভারতী শুধু নয়, আমাদের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলেই এই একই ব্যাপার দেখা যেত।
এর মধ্যে আজ সংবাদপত্র নিগৃহীতা ছাত্রীটির বাবা একটি মন্তব্য করেছেন। সেটা হল, ‘আমার মেয়ে পড়তে চেয়েছিল। আমরাও চেয়েছিলাম। কিন্তু এ কোন শান্তিনিকেতন? এ কোন কলাভবন? এ কী হল?’
হতাশ বাবার এই প্রশ্নগুলোতে দীর্ঘশ্বাস আছে। সেটা কিন্তু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দীর্ঘশ্বাস নয়, বরং তা সামাজিক। এই প্রশ্নগুলো বিদ্ধ করছে আমাদের বর্তমান শিক্ষার পরিসরকে। আমাদের শিক্ষার ধারণাকে। সেই ধারণা আজ সম্পূর্ণরূপেই আধুনিকের গন্তব্যের সঙ্গে সম্পর্করহিত।
এ কোন শিক্ষাব্যবস্থা, যা শান্তিনিকেতনের মতো এক তীর্থভূমিকে কলুষিত করে ফেলেছে এতটাই যে, আজ সেখানে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক লোকটিকে গ্রহান্তরের মনে হয়? কিছু আচার ছাড়া, এবং অবশ্যপালনীয় প্রথা ও কিছু দর্শনীয় ও উপাস্য ফসিল ছাড়া রাবীন্দ্রিক উত্তরাধিকারের ছিটেফোঁটাও আজ বিশ্বভারতীতে বজায় আছে কি?
কিংবা, এভাবেই বলি, রাবীন্দ্রিক উত্তরাধিকারকে বজায় রাখার কোনো সুযোগ এই প্রতিষ্ঠান পেয়েছে কি?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমাদের আধুনিকের সর্বোত্তম ফসল। শিল্পবিপ্লবের পরে যে আধুনিক জন্ম নিয়েছিল, আমাদের এখানে রামমোহন -রামকৃষ্ণ- ডিরোজিও- মধুসূদন- বিদ্যাসাগর- বঙ্কিম- রবীন্দ্রনাথ- বিবেকানন্দর হাতে ও আত্মায়, বিশ শতক অবধি তা গড়িয়ে এসেহিল, কিন্তু বিগত শতকের পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ তাকে সরিয়ে দিয়েছিল, এবং উত্তর-উপনিবেশের হাত ধরে দেখা দিয়েছিল অধুনান্তিক। সেই আধুনিক, যা এসেছিল ব্রিটিশের হাত ধরে, শিল্পবিপ্লবের ফল হিসেবে... আমাদের উপহার দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ নামে এক আশ্চর্য পুরুষকে যিনি অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যকে এক করে ফেলতে পেরেছিলেন আলোর সাধনায়। আলোর প্রতি তাঁর মানসিকতার সবটুকু নির্যাস ছিল বিশ্বভারতী। বিশ্বভারতী নামক প্রতিষ্ঠানটিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর আধুনিকের প্রতীক বলতে পারি।
আর, বলতে পারি তার অবক্ষয় আসলে আমাদের আধুনিকের অবক্ষয়কেই দর্শায়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বভারতী ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিকতা থেকে বিবিক্ত হতে শুরু করে। আজ সে একটি পাতি বাঙ্গালি ইউনিভার্সিটি হতে পেরেছে। আজ সে এক অধুনান্তিক পরিসরের একটি অসহায় বিদ্যায়তন মাত্র। তোতাকাহিনির সেই খাঁচায় পর্যবসিত হয়েছে।
এ তো হওয়ারই ছিল। একটা আধুনিক স্থায়ী হতে পারে না পরিসর বদলে গেলেই। পরাধীন ভারতের অর্ধ-স্বদেশী অর্ধ ব্রিটিশ আধুনিক তাই বিদায় নিল। প্রক্রিয়াটা বিশ্বযুদ্ধের পরেই শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭-এ পাকাপাকি হল।
এল অনিশ্চিত রাত। তার নাম উত্তর-উপনিবেশ। তার নাম... অধুনান্তিক।
স্বাধীনতা পরবর্তী অধুনান্তিক পরিসরে আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত হয়েছিল, বা এখনও রয়েছে, তা আস্থা নয়, সংশয়ের উদ্বোধক। যারা এই বোবা-কালা শিক্ষাব্যবস্থার নির্ণায়ক, তাঁদের মধ্যে আমাদের আলোকপ্রাপ্তির কোনো স্মৃতি বিদ্যমান নয়, আমাদের নবজাগরণের যে ইতিহাস, তার প্রতিও তাঁদের কোনো আন্তরিক শ্রদ্ধা নেই। শিক্ষাকর্তারা আজ নিজেদের প্রতাপের অংশ হিসেবেই দেখতে চান, পথিক নন তাঁরা।
যেদিন থেকে শিক্ষানীতি আর রাজনীতিকে আমরা আলাদা করতে ভুলে গেছি, আলো আমাদের ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। ডিরোজিও-র নামটা আজ শুধু পাঠ্যপুস্তকেই আটকে আছে।
আরেকটা ব্যাপার বলি? আমরা এখন সবচেয়ে প্রভাবিত হই সেলিব্রিটিদের দ্বারা, কারণ আজ আমরা মনে মনে সবাই সেলিব্রিটি। আর সেটা সবচেয়ে বেশি করে বলা যায় তরুণদের ক্ষেত্রে।
একটা সময় ছিল, আমাদের সিনেমায় প্রমথেশ বড়ুয়ার মতো অভিজাত পুরুষ ছিলেন অনুকরণীয় নায়ক, আজ সেই স্থান দেব-এর অভিনীত লুম্পেন চরিত্ররা নিয়েছে। ভেবে দেখুন, আজ বাংলা সিনেমার নায়কের আচরণ আশির দশকের হিন্দি সিনেমার শক্তি কাপুরের চেয়ে কিছুমাত্র দৃপ্ত নয়। ছাত্ররা আজ প্রমথেশ বা উত্তম-সৌমিত্র বা অমিতাভ বচ্চন নয়, দেব-জিত হতে চায়। ম্যাটিনি শো হাউস ফুল এই ছাত্ররাই করে। আজ সানি লিওনের মতো পর্ন নায়িকা হয়েছেন হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা। পর্নের বিরুদ্ধে বলছি না। নিজের জায়গায় তার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করছি না। সে শোবার ঘরে রাজত্ব করুক, কিন্তু পড়ার ঘরে নয়।
মুশকিলটা হল, আজ সানি লিওনরাই আইকন। আর... এঁদের অনুকরণ কারা করবে, আমাদের তরুণরা ছাড়া?
বিশ্বভারতীর পিছনে রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তার সামনে তো আজ এই নামগুলো! এই নামগুলোকে পেরিয়ে তাকে অর্জণ করতে হবে নিজের ভবিষ্য।
সেই ভবিষ্যের নাম পুনরাধুনিক।
সেই ভবিষ্যের নাম আভিজাত্য।
ব্রিটিশরা সেই অর্ধেক অবদান আর ফিরিয়ে দিয়ে যাবেন না। তাঁরা ফিরিয়ে দিয়ে গেলেও এই ফেসবুক প্রজন্মের তা কাজে লাগবে না।
নতুন করে বানাতে নিজেদেরই হবে।
নাহলে একটা ছাত্র বুঝতে পারবে না, সে বিশ্বভারতীর ছাত্র।
বি শ্ব ভা র তী ... একটা ইউনিভার্সিটি নয়।

আপনার মতামত জানান