আচ্ছে দিনের ১০০ দিন

সুশোভন

 



সর্বশেষ সাধারন নির্বাচনের ফলাফল প্রধানত বিগত ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দুর্নীতি, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানহীনতা, মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রতি রাষ্ট্রের অবজ্ঞা, কৃষির সংকট এবং বিশ্ব জুড়ে আর্থিক মন্দার কারণে তৈরি হওয়া শিল্পসহ জরুরী পরিষেবায় ঘাটতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ। অনুঘটক হিসেবে ছিল বোকা বাক্সের পর্দায় পর্দায় কর্পোরেট মিডিয়ায় পরিবেশিত নরেন্দ্র মোদীর ফেরী করা ‘গুজরাট মডেল’ এবং ‘আচ্ছে দিনে’-র সোনালী স্বপ্ন। স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে অভূতপূর্ব সেই স্বপ্নের জোয়ারে ভেসেই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচকমণ্ডলীর শতকরা প্রায় ৩১ ভাগ সমর্থনপুষ্ট নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ –র নবগঠিত সরকারের ১০০ দিন অতিক্রান্ত। আসন সংখ্যার বিচারে নির্বাচনের ব্যাপক জনাদেশ যখন দীর্ঘ এবং পাঁচবছর মেয়াদী তখন স্বল্প সময়ে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিশ্লেষণ নিতান্তই অপ্রতুল। কিন্তু রাজনীতি ঐতিহাসিক ভাবেই ধারাবাহিক, অরৈখিক এবং গতিশীল। সেই নিয়মেই দেশ বদলানোর প্রতিশ্রুতি বদ্ধ নরেন্দ্র মোদীর সাধারন মানুষের কাছে চেয়ে নেওয়া ৬০ মাসের মধ্যে এই ১০০ দিনও গুরুত্বপূর্ণ। আসলে ১০০ দিন সাফল্য বা ব্যর্থতার গবেষণা করার জন্য অপ্রতুল হলেও অভিমুখ ও গতিপথ অনুধাবনের জন্য নিতান্তই কম নয়। তাই বর্তমান সময়ে অভিমুখ ও গতিপথের আলোচনা, বিতর্ক সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ।
এটা বাস্তব কিছুক্ষেত্রে জোট রাজনীতির চাপে বিগত কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘পলিসি প্য।রালাইসিসে’ ভুগতে হয়েছে । কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী দৃষ্টিতে, বৃহত্তর ন্যায়ের ভিত্তিতে জোট সরকার গুলির মাধ্যমে দেশের বহুত্ববাদ প্রকাশের পরিসর যে অনেক বেশী তা অনস্বীকার্য । দলে ব্যক্তির এবং সরকারে বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একদিকে যেমন স্বেচ্ছাচারের রসদ থাকে অন্যদিকে তা সাধারন মানুষ এবং দেশের আর্থিক ভাবে সংখ্যাগুরু অংশের স্বার্থরক্ষাকারী নাও হতে পারে।
ক্ষমতায় এসেই সরকার দ্রুততার সাথে জমি অধিগ্রহণ বিল, শ্রমআইনের মত কিছু বিতর্কিত এবং বহুল চর্চিত বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সরকারের প্রাথমিক কর্মসূচীতে ব্যাপক ভাবে অবহেলিত হয়েছে এনআরইজিএ, তপশিলি জাতি ও উপজাতি, নারী ও শিশু কল্যাণ, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র সহ সমাজকল্যাণে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ। ১৫ অগাস্টের সকালে লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার একটা লাইনেই স্বাধীন ভারতের উচ্চক্ষমতাশীল যোজনা কমিশনের অপমৃত্যু ঘটেছে। খাদ্য সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করার থেকে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে গঙ্গা বাঁচানোর পরিকল্পনা। প্রশ্ন উঠতে বাধ্য ১১টি রাজ্যের ৮.৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার কথা ১৯৮৫ সালে ঐ বেনারস ঘাট থেকেই ঘোষণা করেছিলেন রাজীব গান্ধী। কিন্তু গত তিন দশকে ২০,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরেও গঙ্গাকে দূষণ মুক্ত করা যায়নি। শহর থেকে নদীমুখী সব নালার মুখ বন্ধ করে বর্জ্য জল পরিশোধন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে দূষণমুক্ত করার কাজ যখন গোটা দেশে কোথাও সফল হয়নি তখন শুধু আবেগ দিয়ে গঙ্গা বাঁচবে তো ? ১০০ দিনে দেশবাসী প্রকৃত অর্থে ‘আচ্ছে দিনে’-র সুফল কতটা পেয়েছে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও দুর্নীতির প্রশ্নে এই সরকার ব্যতিক্রমী পথ খোঁজায় নিতান্তই অপারগ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীসভায় এমন অনেক মন্ত্রী রয়েছেন যাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে গুরুতর মামলা ঝুলছে। ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-র ছেলের ওপরে পুলিশের বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারী প্রভাব খাটানোর এবং রেলমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়ের ছেলের বিরুদ্ধে আরোপিত ধর্ষণের মত গুরুতর অভিযোগ। ‘সাজানো এনকাউন্টার’ মামলায় জেল ফেরত অভিযুক্তের কোনও অঙ্গরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবার ঘটনাও স্বাধীন ভারতবর্ষে অভূতপূর্ব তো বটেই । সেই অমিত শাহই যখন লোকসভা ভোটে উত্তরপ্রদেশের বিপুল জয়ের উপহার হিসাবে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হয় তখন সেই রাজনৈতিক দল কি সত্যি নিষ্কলঙ্ক ? মোদী-শাহ জুটি অনবদ্য তৎপরতায় বাজপেয়ী, আদবানি ও মুরলী মনোহর যোশি কে ‘মার্গদর্শক মণ্ডল’ নামক বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালেও দলে এবং সরকারে এখনও রমরমিয়ে চলছে সংঘের আধিপত্য। আরএসএস ইতিমধ্যেই রাম মাধব ও শিব কুমার কে বিজেপি-র নির্ণায়ক নেতৃত্বে প্রত্যক্ষ ভাবেই রপ্তানি করেছে। টুজি কেলেঙ্কারিতে স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের কাছে তীব্র নিন্দিত এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সিআইএ-র সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় গুরুতর অভিযুক্ত বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশানাল ফাউন্ডেশনের নৃপেন্দ্র মিশ্র এখন সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের শিক্ষা উপদেষ্টামণ্ডলীতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। এবারে রমজান মাসে প্রধানমন্ত্রী কোনও ইফতার পার্টি দেননি। এড়িয়ে গেছেন রাষ্ট্রপতির ইফতার পার্টিও। ইফতার পার্টির নোংরা রাজনীতি, সরকারী কোষাগারে বেমক্কা অর্থব্যয়ে ভুরি ভোজের আয়োজন বন্ধ করা মহৎ উদ্যোগই হত, যদি প্রধানমন্ত্রী সরকারী কোষাগারের অর্থ ব্যয়ে নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরে ২৫০০ কেজি উৎকৃষ্ট ঘি আর ২৪০০ কেজি চন্দন কাঠ সহযোগে পূজা না দিয়ে আসতেন। এছাড়াও সীমান্তে ক্রমবর্ধমান অশান্তি, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বিচার পতি নিয়োগে সরকারী প্রভাব খাটানো, একাধিক রাজ্যে ইউপিএ আমলে নিযুক্ত রাজ্যপাল দের ক্ষমতা ছাড়ার ব্যাপারে প্রশাসনের তরফে চাপ সৃষ্টি, ন্যাশনাল বোর্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে সরকারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, বিরোধী দলনেতা প্রসঙ্গ, লোকপাল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সরকার বিরোধী অবস্থানের মত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইতিমধ্যেই সরকারের বিড়ম্বনা বাড়িয়েছে।
সরকারে ক্ষমতাসীন হবার ১০০ দিনের মধ্যেই উত্তরাখণ্ড ,কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, বিহার এবং পাঞ্জাবের ২১টি উপনির্বাচনের ১৩টিতেই পরাজিত হয়েছে বি জে পি। নজিরবিহীন উত্থানের পর এত কম সময়ের ব্যবধানে এই নির্বাচনী ফলাফলে অনেকেই প্রমাদ গুনছেন। নির্বাচনী অঙ্কের জটিল পাটিগণিতে অনেক সময় আসন সংখ্যা রাজনৈতিক চিত্রের ও শক্তির সঠিক পরিমাপক নয়। কিন্তু শতাংশ ভোট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে উত্তরাখণ্ডে তিনটি আসনের সকটিতেই বি জে পি পরাজিত হবার পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশ এবং কর্ণাটকে একটি করে আসন হাতছাড়া হয়েছে। বিহারে লালু -নীতীশের জোটের কাছে কার্যত ধরাশায়ী বি জে পি। ১০ টি কেন্দ্রে একাধিক জেতা আসন হাতছাড়া ( লোকসভা ভোটের হিসেবে ৮ টি কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল বি জে পি) হয়েছে। লোকসভা ভোটে ঐ ১০টি কেন্দ্রে এন ডিএ-র শতকরা ভোট ছিল ৪৫.৩% তা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৩%। নির্বাচনী ইতিহাসে ১০০ দিনের মধ্যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের ৮% নেতিবাচক সুইং কিন্তু সত্যি বিরল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, জম্মু কাশ্মীর এবং হরিয়ানা, এই চার রাজ্যের বিধানসভা ভোট। ইতিমধ্যেই হরিয়ানাতে বিজেপি র সাথে তিনবছরের পুরনো জোট ভেঙ্গেছে জনহিত কংগ্রেস। জম্মু কাশ্মীরে মিশন-৪৪ প্লাসে নেমেছেন অমিত শাহ। রাজনৈতিক মহলের মতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে শক্ত পরীক্ষার সামনে পড়তে হবে ঐ নির্বাচন গুলিতে।
১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী মনোমোহন সিং উদার অর্থনীতির রূপরেখা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘সরকার নিশ্চিত এই পদক্ষেপ প্রথমে কঠিন মনে হলেও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচী অচিরেই আর্থিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে। সামাজিক সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে। সম্পদ সৃষ্টির জন্য সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় সংকোচের পথে হেঁটে সাধারন মানুষের সার্বিক জীবনযাপনের পথে বাধা সরিয়ে পাঁচ বছর পর দেশে আর গরীব থাকবে না।’ ১৯৯১ থেকে আজ ২০১৪, ২৩ বছর পর ভারতবর্ষে গরীব আছে কি নেই সেই প্রশ্ন আজ নিতান্তই নিষ্প্রয়োজন। রেলে ভাড়া বৃদ্ধি, কেরোসিন ও গ্যাসের উপর সম্পূর্ণ বিনিয়ন্ত্রন, স্বাস্থ্য শিক্ষা পানীয় জল সড়ক পরিষেবা ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ, খাদ্য-কৃষিপণ্যের উৎপাদন, বণ্টন, দাম নির্ধারণ সম্পূর্ণ বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়া, ব্যাঙ্ক- বিমা- রেলে এফডিআই- র রমরমা এই সমস্ত ক্ষেত্রে নতুন সরকারে উন্নতির ‘বিশল্যকরণীর তেতো ওষুধ’ বিগত ইউপিএ সরকারের সমতুল্য নয় কি ? ভোটের আগে যে প্রচার করা হল “ মোদী নতুন ধারার, নতুন ভাবনার প্রধানমন্ত্রী”, কি সেই নতুনত্ব ? কংগ্রেসের হাত ধরে চলা অপশাসনের অবসানের স্বপ্ন দেখিয়ে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের’ দায় কার ? সামাজিক প্রকল্পে ভর্তুকি দিলে রাজকোষে ঘাটতি হয় কিন্তু কর্পোরেট কর ছাড় দিলে হয় না ? হাওলা থেকে গাওলা কমনওয়েলথ গেমস থেকে সোনালি চতুর্ভুজ যোজনার দুর্নীতি থেকে শিল্পপতিরাই কি লাভবান হননি ? তাহলে নতুন সরকার এই শিল্পপতি দের পুনরায় কর ছাড় দেওয়ার কারন কি? কেন ১০০ দিনেও সুইস ব্যাঙ্কের কালো টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনও সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া গেলো না ? সাধারন নির্বাচনের আগে এই অভিনয় তাহলে কাদের স্বার্থে ? মোদীর নেতৃত্বে কি বকলমে ইউপিএ-২ সরকারই কি চলছে না ? সাধারন মানুষের দুর্দশার অন্তরালে তাহলে, নেতা নয় চাই নীতির বদলের প্রশ্নই কি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে না ? পরিশেষে সেই রবীন্দ্রনাথ ‘... ইলেক্‌শন ব্যাপারটার অর্থ কী? তোমরা মুখে বল, তাহার অর্থ জনসাধারণের দ্বারা প্রতিনিধি নির্বাচন। কিন্তু তোমরা মনে মনে কি নিশ্চয় জান না তাহার অর্থ তাহা নহে ? বস্তুত এক-একটি দলীয় স্বার্থেরই প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। জমিদার, মদের কারখানার কর্তা, রেল-কোম্পানির অধ্যক্ষ–ইহারাই কি তোমাদিগকে শাসন করিতেছে না ? ...’ (চীনম্যানের চিঠি)

আপনার মতামত জানান