আব কি বার, মোদী সরকার...

অতনু প্রজ্ঞান বন্দ্যোপাধ্যায়

 

আশপাশে এখন দুটো শব্দ ঘোরাফেরা করছে। কেউ বলছে, এই দেশ এখন "আমাদের"। আমরাই আসলি জাতীয়তাবাদী। কারন, আমরাই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ।
আরেকদল বলছে, একটা "সাম্প্রদায়িক" দল এখন পাহাড়চুড়ায়। গেষ্টাপো বাহিনী নিয়ে মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে ছুট্টে এল বলে। আগামী দিনে সাবধান বন্ধুরা... !!!

আমি কি করব? এই আমি, রাজনীতি নিয়ে যার ততটা আগ্রহই নেই। রাজনীতি মানে যার কাছে মানুষের কিংবা সমাজের 'ভালো' করা ছাড়া আর কিছু নয়। জানি এ অতিসরলীকরন, কিন্তু এর বাইরে কিছু ভাবতে মন ও মাথা দুইই চায়না । আমি যে বড় কনফিজড "সাম্প্রদায়িক" শব্দটা নিয়ে। কিন্তু তাও কিছু কিছু ভাবনা পায়রার মত খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে মগজের এলোমেলো দানাগুলো। নিউরোনের ফাঁকফোকর রক্তাক্ত হচ্ছে ।
আচ্ছা সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে আমরা ধর্মের সাথে মিশিয়ে দিচ্ছি কেন? আমি পলিটিক্যাল সায়েন্সের ডেফিনিশন চাই না। বই পড়া বিদ্যা নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। অনেক থিওরিষ্ট দেখলাম এই আটত্রিশ বছর বয়েস অব্দি। বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথাই হোক। এই সমাজে আশাপাশের অভিজ্ঞতায় আপনারা ঠিক কি ভাবেন, তাই জানতে চাইছি।
এভাবে যদি সাজিয়ে নিই,
গুজরাট দাঙ্গার নারকীয় হত্যালীলায় শত শত মুসলিম ধর্মের মানুষ প্রান হারালেন। ঐতিহাসিক হয়ে রইল কিছু ফটোগ্রাফ, গুজরাট দাঙ্গার মুখ হয়ে। তীব্র ভাবে নিন্দায় ফেটে পড়ল মানুষ। আপনি বললেন, "সাম্প্রদায়িকতা"।
গত দশবছর ধরে একের পর এক নারকীয় হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে উগ্রপন্থীরা, ইসলাম ধর্মের নাম নিয়ে, এদেশে, সারা পৃথিবীতে। এও কি কোনো ধর্মের মুখ? মহান ইসলাম ধর্মের জন্য বিপ্লবে বলি হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত সব তরুন, আর এই বিপ্লবে নাকি সাহাজ্য করে চলেছে অনেক ধনী ও শিক্ষিত মানুষেরা। আপনি বলবেন, "সাম্প্রদয়িকতা" !!
আমদেবাদাদে মুসলিম ধর্মের মানুষ হলেই নাকি, বাড়িওয়ালা মুখ কুঁচকোয়, সরকার অভিবাসনে গড়িমসি করে, খবরে প্রকাশ। আপনি বলবেন, "সাম্প্রদায়িকতা" !!
গোধরাতে কিছু মানুষ নির্মভাবে ট্রেন জ্বালিয়ে দিল। হিন্দুধর্মের মানুষেরা পোকারমাকড়ের মত পুড়ে গেল। আপনি বলবেন, "সাম্প্রদায়িকতা" !!
কিন্তু,
শাসক যখন সরকারে এসেই মরিচঝাঁপির সভ্যতাকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চাইল বারুদের গন্ধে ভরিয়ে, কিংবা নন্দীগ্রামের মত নারকীয় হত্যালীলাকে ধামাচাপা দিতেও যুক্তি খাড়া করতে চাইল মার্ক্সসীয় তত্ত্ব দিয়ে... আপনি কেন বলবেন না "সাম্প্রদায়িকতা"??
শাসক যখন পুলিশের বন্ধুক কোমরে গুঁজে গলা টিপে মেরে ফেলতে চাইছিল সত্তরের দশকের লাল বিপ্লবকে, নারকীয় হত্যালীলায়... আপনি কেন বলবেন না "সাম্প্রদায়িকতা"??
শাসকদলের নেতা যখন খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে বলছেন, "বিরোধীর সাথে চা খাবেন না, বাড়ি যাবেন না, তাহলে প্রতিশোধ নিতে পারবেন না!", আমরা দেখছি কি অবলীলায় বিরোধী পার্টি কর্মীদের ভিটেমাটি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে শাসক, বিরোধীশূন্য করে দিতে চাইছে রাজ্যকে ... আপনি কেন বলবেন না "সাম্প্রদায়িকতা"??

কমিউন বা সম্প্রদায় শব্দটা ধর্মের গন্ডীতে বেঁধে ফেলা কি ঠিক? এই আমি, অতনু, আমি তো আমার পায়ের তলার মাটি নিয়ে তীব্র সেনসিটিভ। আমার অর্থনীতি, শিক্ষা, মাতৃভাষা, রাজ্য, দেশ, দর্শন , ধর্ম যেকোনো কিছু নিয়েই আমি তীব্র মতামতপ্রবন ও স্পর্শকাতর। আমাকে এসব নিয়ে কেউ অপমান করলে আমি মেনে নেবো? কিন্তু তা বলে অন্ধভাবে আমার পায়ের মাটি আঁকরে ধরে থাকবোনা নিশ্চয়ই, কোনো মিথ্যে যুক্তি দিয়ে, ক্ষমতা দিয়ে বিরোধীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে। এর নামই তো অন্ধতা !! অন্ধতাই তো অশিক্ষার তীব্র লক্ষন।
বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, মানুষের শিক্ষা দীক্ষা যুক্তিবোধ যত এগিয়েছে ধর্মান্ধতার কবল থেকে মানুষ মুক্ত হচ্ছে। ধর্ম মানেই তো ধর্মান্ধতা নয়। দর্শন, এথিক্স, আধ্যাত্মিকতার সাথে সাথে জড়িয়ে থাকে নানা সংস্কার। সে সংস্কারগুলোর ততটুকুই ইতিহাসে রয়ে যায়, যতটুকু জাষ্টিফায়েড। আমাদের দৈনন্দিন জীবন তারই প্রমান। তারই মধ্যে কুসংসস্কারও টিকে থাকে কিছু কিছু(বা টিকিয়ে রাখা হয়), ধর্মান্ধ মানুষেরাও বেঁচে থাকে - হয় ক্ষমতা দখল করে আগুন জিইয়ে রাখতে কিংবা অশিক্ষায় !! এ দুটোই তো যে কোনো ধর্মেই পরিত্যাজ্য। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা অপেক্ষাকৃত বেশি। আমাদের দেশ ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত নয়, কিন্তু হিন্দু ধর্মের মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো তীব্র সত্য। কিন্তু তা স্বত্তেও, এদেশে যখন তখন মুসলিম ধর্মের মানুষকে পোকামাকড়ের মত পুড়িয়ে ফেলা হয় না ধর্মান্ধতার নাম করে যে কোনো ছলছুতোয়, যা আমরা প্রতিবেশী দেশে চোখ রাখলেই দেখতে পাই, যেটা শিক্ষিত দেশে অভিপ্রেত নয়। তার জন্য কি আর ধর্ম দায়ী হয়? দায়ী হয় ধর্মের ব্যবসায়ীরা, পৃথিবী জুড়ে যাদের নেটওয়ার্ক, যাদের সাধারন মানুষ, স্রেফ ভয় পায় কিংবা চোখ বুজে নিজের পিঠ বাঁচায়!
কোনো ধর্মান্ধতাই গ্রহনযোগ্য নয়। আমার কাছে সাম্প্রদায়িকতা মানে, "দলীয় অন্ধতা"। এর কারন শিক্ষার অভাব। সাধারন মানুষের মাথায় হাত বুলিয়ে ধর্মান্ধ মানুষই শুধু নয়, দলীয় স্বার্থান্ধ মানুষ ফায়দা তুলতে চায়, মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলে অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের লড়াই এ । সাধারন মানুষের মৃত্যু হয়। ক্ষমতা বেঁচে থাকে।
নরেন্দ্র মোদী সরকারে এসেছেন। আমি সাম্প্রদায়িক শব্দটা উচ্চারন করাটাকেই বিরক্তিকর মনে করি। বরং দেখতে চাই, পাঁচ বছরে কি কি করেন উনি, যা যা বলেছেন। ওনার ইস্তাহারে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতার রেশ দেখতে পাইনি। বরং পেয়েছি বলিষ্ঠ কিছু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। আমি দেখেছি খুব বলিষ্ঠ কিছু নেতার মুখ। আমি দেখতে চাই, তার খানিকটাও এই দল পালন করতে পারেন কিনা। আর চাই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিরোধীশূন্যতা কেটে যাক সময়ের দাবীতে, শুধু বাম-ই নয়, বিজেপি ও অন্যান্য দল আসুক মৌরসীপাট্টা গড়তে, তীব্র প্রতিযোগীতার রাজনীতিতে অংশ নিতে। সম্প্রদায় বুঝিনা, বুঝি উন্নতি।
মাসলোর পিরামিড ষ্ট্রাকচারের একেবারে তলার দিকের স্তরগুলোর গুরুত্ব ইন্ট্যালেকচুয়াল আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি আমার কাছে। সাধারন মানুষ বেসিক বেঁচে থাকার সুবিধে পাক, সুরক্ষা পাক, এই চাহিদাই আমার মত সাধারন দেশবাসীর।

আপনার মতামত জানান