১৬ ই মে, মোদি দিবস

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

হাওয়াটা দু’বছর আগেই বইতে শুরু করেছিল। এমনিতেই এই দীর্ঘমেয়াদী শাসনকালে ‘অ্যাণ্টি ইনকাম্বেন্সি’ বলে একটা শব্দ জন্ম নেয়, যা নির্বাচনের আগে থেকেই ধুনোর ধোঁয়ার মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার ওপর বিদায়ী কংগ্রেসী সরকার (ইউ পি এ নামটা খুব ছেঁদো মনে হয়, কারণ অন্য জোট শরিকরা নিজের মন্ত্রীপদ গুছিয়েই চুপ থেকেছেন) এমন কিছু কাণ্ড বাধিয়ে বসল, এবং পারিপার্শিক আরও সব কিছু... ওই হাওয়াটাই যেন ক্রমে একটা ঝড় হয়ে আছড়ে পড়ল। গত বছরও, রাজ্যস্তরের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর একটা আস্থা ছিল, এরা সকলে ভাল ফল করলে কাজটা খুব একটা সহজ হবে না... ক্ষমতায় এলেও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আসতে হবে। এন ডি এ সরকার আসলে আসুক, কিন্তু যেন অন্য কিছু দলের ওপর নির্ভর করে সরকার চালাতে হয়, যাতে ‘জোর যার মুলুক তার’ না চলে। কিন্তু ক্রমে দেখলাম সব কেমন মিইয়ে গেল... আর হাওয়া হাওয়া, হাওয়া কোথায়? এ তো হারিকেন, টর্নেডো! খড়কুটোর মত সব উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল! বুথ-ফেরথ সমীক্ষা বা ‘এক্সিট পোল’ ব্যাপারটাও আমার একরকম প্রচারমাধ্যমের উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাঁওতা মনে হয়। কিন্তু এই ঝড় তো তাকেও দশ গোল দিলে! এক ঝটকায় তো পুরো দেশটা কেমন রাতারাতি গেরুয়া হয়ে গেল। তাই না? যদি বলি মোদি-ম্যাজিক, যদি বলি দেশ 'Modi'-fied, অথবা একেই বলে মোদি-ঝড়... তাতেও বোধহয় সবটা বলা হয় না। এই ‘মোদী’শব্দও তো আসলে একটা টটেম মাত্র। মোদী দাঙ্গাবাজ, মোদি কি বলছেন নিজেই জানেন না, মোদী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, মোদী সুযোগ সন্ধানী, মোদি আর তার দলবল মানুষকে প্ররোচিত করে, হিন্দুত্বর বাহুবলী... আরও কত কি। এইগুলোই তো হাতিয়ার ছিল এই ঝড়কে ঠেকানোর? সারা দেশ সব সচেতন মানুষ, যারা নাকি ২০০৩ থেকে ২০১৪ রোজ টিভি দেখেছেন, খবরের কাগজ পড়েছেন, কে কোথায় কি করেছে না করেছে এসব কিছু জেনেছেন, শুনেছেন, পড়েছেন... তাদের চোখের সামনেই সব ঘটেছে... যেভাবে ঘটে ‘মুন্নি বদনাম হুই’। তারপরেও তো আদালত কি সুন্দর ভোটের ঠিক আগেই ক্লিন চিট দিয়ে দিলো NaMo কে। একটি বিশেষ সংবাদ মাধ্যমের চ্যানেলে বসে বিশিষ্ট সাংবাদিক অর্নব গোস্বামী দাবড়ানি দিয়ে বলল “মাননীয় আদালত যেখানে থাকে ক্লিন চিট দেন… আপনারা কোন সাহসে তাঁর বিরুদ্ধে আঙুল তোলেন?” তারপরেও তো হই হই করে ভারতীয় জনতা পার্টি একাই লোকসভায় এমন সাংঘাতিক সংখ্যার আসনে জয়লাভ করল... যে গত ২৫ বছরে কোন একটা দল অত আসনলাভ করেনি। রাম-মন্দির, উগ্র-হিন্দুত্ববাদ, প্রতিবেশীরাষ্ট্রদের পায়ের তলায় রাখার হুমকি, সব কিছুকে কেমন ‘ভ্যানিশ’ করে দিয়ে দিল্লীর মসনদের এই গেরুয়া পদ্মফুল। তাবর সমাজ সচেতন শিক্ষিত সুধীজন, বিদেশী ইজ্‌ম উদরর্স্থ করা বুদ্ধিজীবী আর আমাদের মত বোকা-সোকা সাধারণ মানুষগুলো (যারা আজন্ম র‍্যাশন থেকে শ্মশান লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেই কাটাবে) পছন্দ করুন আর না করুন... গিড় অরণ্যের পুরুষ সিংহের মত কেশর আর পেশি ফুলিয়ে এই নরেন্দ্র মোদিই আগামী পাঁচবছর লালকেল্লায় তেরঙ্গা ওঠাবেন।

আমার কি মত, আমি কি চাই না চাই, আমার কি প্রতিক্রিয়া, আমি সমাজতন্ত্রের কি বুলি আওড়ে নিজেকে না অন্য কাউকে কতটা উদ্ধার করলাম... তাতে কি কিছু যায় আসে? দেশের এত গুলো রাজ্য মিলে তো হই হই করে তাদের জনমত দিয়ে দিলো। পশ্চিমবঙ্গতেও দেখলাম একাধিক কেন্দ্রতে ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট শতাংশ বেড়েছে। এমন কি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড় মান্দারণ ‘কলকাতা দক্ষিণ’-এও তো একসময় বিজেপি প্রার্থী এগিয়ে ছিলো! ঝড় তীব্রতা অনুভব করতে পারছেন? আসলে ঠিক যেমন এমার্জেন্সি, পাঞ্জাব, খলিস্তান, অপারেশন ব্লু-স্টার, শিখ-নিধন... এসব কিছুকে পেছনে ফেলে কংগ্রস ‘হাত’-তুলে বরাভয় দেখায় এখনও। মরিচঝাঁপির মত ধামাচাপা হত্যাকাণ্ডের পরেও বামফ্রণ্টকে লাল সেলাম জানানো হয়, ঠিক সেইরকম রামজন্মভূমি-বাবরিমসজ দ, গুজরাত-দাঙ্গা প্রভৃতি সব কিছুকেই ‘ও সব পুরনো কথা’ বলে বিজেপিও এগিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদীকে দেশবাসীর সেবায়। আর ১৬ই মে প্রমাণ করে দিলো কি ভাবে গোটা দেশ (তা মাথা পেতে হোক আর দু’হাত বাড়িয়ে হোক) মেনেও নিয়েছে চমৎকার। কর্মসূত্রে যেহেতু রাজ্যের বাইরে থাকতে হয়, তাই চোখের সামনে দেখছি... মানুষ কি সাংঘাতিক খুশি ‘স্থায়ী-প্রগতিশীল’ সরকার আসছে বলে। মোদী এবং বিজেপির সমর্থনে এতগুণ বেড়ে গেছে এই ঝড়ের দাপটে, যে কেউ ‘গুজরাত দাঙ্গা’-র প্রসঙ্গ তুললেই বলছে “আরে আপ অউর কিতনে বার উস মুদ্দে কো উঠাও গে! হাইকোর্ট নে তো ক্লিন চিট দে দিয়া মোদী জি কো... কংগ্রেস কভি দাঙ্গা নেহি করওয়ায়েয়া ক্যায়া?” সত্যিই তো এ মহা মুশকিল... যে ছিল তার গুণের শেষ নেই, যে এলো সেও মহামহীম... তাহলে এত তর্ক করাই বা কেন? গোটা দেশ তো নরেন্দ্রমোদী কে মার্ভেল কমিক্সের সুপার হিরো বানিয়ে ফেলেছে। মোদিজী চাইলে সব করতে পারেন, কারণ উনি সেইরকম আশ্বাস দিয়েছেন। অথচ কর্ণাটকের যে লোকটা মোদিজীর দলকে ভোট দিয়েছে গুজরাত-মডেলের কথা ভেবে, সে নিজে কোনওদিনও মধ্যপ্রদেশও পার হয়নি। জানে না এবং জানার কথাও নয় গুজরাতের গ্রামে মানুষ ঠিক কী অবস্থায় থাকে। আমরাই বা কতটুকু জানি? অথচ প্রচার কি সাংঘাতিক জিনিস! নরেন্দ্র মোদীর চা বিক্রী করা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠা অমর চিত্রকথার মত কথা ও ছবিতে প্রকাশ হয়ে গেল... বাচ্চাদের স্কুলে স্কুলে হয়ত ওই বই ছড়িয়ে গেছে। জীবদ্দশাতেই উনি নিজেকে প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ করে ফেলেছেন। এখন এই মহাপুরুষ দেশকে উদ্ধার করতে আসবে না তো কে আসবে? উনি যদি নিজেকে কলকী অবতারও বলেন তো ঠেকায় কে? 'In Democracy, people get what they deserve', এই জনমত তো মেনে নিতেই হবে। দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ যদি এই মার্ভেল কমিক্সের আয়রন-ম্যানকেই চান, তাহলে গুটি কয়েক বামপন্থী, আর কিছু দাঙ্গা-সহ্য করতে না পারা, বিশ্ব-ভাতৃত্বের কথা বলা মানুষ নাকে কাঁদলে কি হবে? নিজেকে বোঝাচ্ছি, দেশের এতগুলো মানুষ নিশ্চয়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। এত কোটি মানুষের জনমত কে ভ্রান্ত বলার অধিকার কি আমার একার থাকতে আছে?

ঝড়ের দাপট দেখে আগেই বুঝেছিলাম, এন ডি এ সরকারই আসতে চলেছে, তাই ফলাফল নিয়ে উৎকণ্ঠার প্রশ্নই ওঠে না, খুব একটা আগ্রহ বা দুশ্চিন্তাও ছিল না, এমন কি প্রতিবারের মত টিভির পর্দায় সকাল থেকে নজর রাখার কৌতূহলটাও অনুভব করিনি। কিন্তু এত কিছু প্রেডিক্টেবিলিটির মাঝেও যেন চমক ছিল। দেখলাম বীতশ্রদ্ধ রাষ্ট্র একশ ত্রিশ বছরের জাতীয় কংগ্রেসকে কেমন গুটিয়ে রাজ্যস্তরের সংগঠনের পাশে নামিয়ে দিলো। দেখলাম বামদূর্গ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দেখলাম দৃশ্যত শৈরাচারী একজন রাজনৈতিক নেতার হাতেই কেমন বিপুল শক্তি তুলে দিলো সমগ্র দেশবাসী। জোট সরকার হ’লে, দু-তিনটে রাজ্যস্তরের দলের ওপর নির্ভর করে ২৭২ পেতে হ’লে হয়ত একটু লাগাম থাকত, এখন আশঙ্কা একটাই, বিজেপি একাই সরকার চালানোর এবং বানানোর ক্ষমতা রাখে। নরেন্দ্র মোদীর মত বেপরোয়া শাসক কে কারও কাছেই দায়বদ্ধ থাকতে হবে না। আগামী পাঁচ বছর উনি এবং ওনার দলবল যা করবেন, তাই হবে। দেশের বৃহত্তর জনমত বলছে ‘উনি মঙ্গলই করবেন’, ‘উনিই এই দেশের শাসনভার গ্রহণের উপযুক্ত’... তাই যাদের স্মৃতিশক্তি অতটাও দুর্বল নয়, তাদেরও এই আশ্বাস মেনে নিতে হবে... আগামী পাঁচ বছরের জন্য। এ ছাড়া আশার কথা এই মুহূর্তে আর কী বা মাথায় আসতে পারে? এই ১৬ই মে যে কিছু জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল –
১) দেশের অবস্থা স্পষ্টই বোঝা যায়, হয় কংগ্রেস না হ’লে বিজেপি, এই ভাবেই চলবে।
২) জোট রাজনীতি একেবারে বাই-বাই হয়ে যাওয়া স্থানীয়দলগুলোর পাঁচ বছর বিশেষ কিছু ট্যাঁ-ফোঁ চলবে না।
৩) দূর্নীতির হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর লড়াইটা যারা শুরু করেছিল, তারা এখন ‘ড্রামেবাজ’। এমন কি পাঞ্জাব থেকে আম আদমী পার্টি যে তিনটি আসন পেয়েছে, তার জন্য সরাসরি ‘জোক’ এসে গেছে বাজারে “আপ-কা ৩ সিটেঁ পাঞ্জবা সে... ইস-ই লিয়ে সরদারও পে জোক বনা হ্যায়”
৪) নিজেদের ইন্টেলেকচুয়াল, দেশ-বিদেশের সমাজতন্ত্র নিয়ে পড়াশুনো করা বিজ্ঞ, এবং রাজনৈতিক ভাবে সামাজিক বিবর্তনের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে বামপন্থীরা নিজেরাই নিজেদের শেষ করছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশেই বামপন্থা ব্রাত্য। শুনতে ভাল লাগুক আর না লাগুক, পরিসংখ্যান তাই বলছে।
৫) বৈদ্যুতিক প্রচার মাধ্যম ভারতবর্ষের অত্যাধুনিক মগজধোলাই যন্ত্রতে রূপান্তরিত হয়েছে। কে কি ভাবে এর শিকার হয়ে যাবে, সে নিজেও জানে না।
৬) ‘মোদি সরকার’-ই একটা কিংবদন্তী হয়ে গেল (এন ডি এ কে ছাপিয়ে)। তার আগমনের যে পদধ্বনি তার অনুনাদ এক সঙ্গে ব্যারাক ওবামা থেকে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র সকলের কপালে চারটে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে এখন থেকেই।

বিজেপির এই অগ্রগতি, হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ওঠা, আম আদমি পার্টির মত নাবালক দলেরও ভোটের বাজারে এই মরিয়া প্রচার, অন্য স্থানীয় দলগুলোর মোটামুটি ভাল প্রদর্শন... আর কংগ্রেস নামক টাইটানিকের ভরাডুবি; এই সব কিছুর ভিড়ে বামফ্রণ্টের ক্রমাগত নিশ্চিহ্ন হওয়াটা কেমন যেন সংবাদমাধ্যমের চোখেই পড়ল না (কেবল বাংলা চ্যানেলগুলো ছাড়া, যাদের কাছে এটা সরাসরি প্রাসঙ্গিক)। অন্যান্য বা নির্দলের পর্যায় চলে গেছে বামফ্রণ্ট এই গণতান্ত্রিক মানচিত্রে। সাধারণ মানুষ, গ্রামের ক্ষেত-মজুর, বসতিবাসী ভোটাররা কেউ মার্ক্‌স-লেনিন কি বলেছিলেন বুঝতে চাইবেন না, বোঝার প্রয়োজনও মনে করেন না, এসব বক্তিমে শুনে তাদের কিচ্ছু আসে যায় না। আর শহরের মানুষ এতটাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আছে, তাদের বামপন্থী আদর্শ বোঝাতে গেলে কপালে ঘটি ঠুকতে হবে। কিন্তু পলিটব্যুরো বার বার ‘ইন্ট্রোস্পেকশন’-এর কথা বললেও তা যেন খাতায়-কলমেই থেকে যায়। এত বছরেও তিনটে রাজ্যের বাইরে বেরোনোর সদিচ্ছা নেই। মানুষের কাছে পৌঁছতে কার্যত ব্যর্থ। আর মানুষও ক্রমে ভুলেই যাচ্ছে এই লাল পতাকার দলগুলো কে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থা আবেগ আঁকড়ানো মানুষদের কথা ভাবলে চলবে না, এটাই নির্মম সত্য – দেশের অন্য সব রাজ্যেই বামপন্থা এবং বামপন্থীরা হয় ম্লান হয়ে গেছে না হ’লে একেবারেই নিশ্চিহ্ন। পশ্চিমবঙ্গও তো এই দেশেরই রাজ্য, সেখানেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে পড়বে বই কি! আর এই একতরফা বিজেপি শাসনে বিজেপিও নিজের সংগঠন আরও মজবুত করবে এই রাজ্যে। যদি বামফ্রণ্টের মধ্যে সত্যিই নিজেদের পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা না দেখা যায়, আগামী রাজ্য নির্বাচনে সরকারের বিকল্প দল হিসেবে মানুষ বিজেপিকে বেছে নিলেও আশ্চর্য হ’ব না। কি চমৎকার কন্ট্রাস্ট, এক দিকে আবেগসর্বস্ব মৃয়মান বামফ্রণ্ট... আর একদিকে তীব্র বাস্তববাদী, হিসেবি (একবারে ব্যবসায়ী বুদ্ধি) উজ্জ্বল গেরুয়া পদ্মফুল। এ কি কারও খুশি হওয়া বা কারও ক্ষেপে যাওয়া, কিংবা কারও ক্ষুব্ধ হওয়ার অপেক্ষা রাখে... একেই তো বলে অগ্রগতির যুগে রাজনৈতিক বিবর্তন। নিজেদের অনমনীয় সেকেলে বোধগুলোকে আঁকড়ে ধরে আর কতদিন ‘গ্রাউণ্ড রিয়েলিটি’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন বামপন্থী নেতারা? শুধু ‘ওরা আমাদের ভোট দিতে দিচ্ছে না’ বলে কি টিকে থাকা যায়?

তবে এতো কিছুর পরেও দু’টো রাজ্যের অবস্থা দেখে না হেসে পারলাম না, যে শব্দটা মাথায় আসে তাহ’ল ‘বেচারী’ - একদিকে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী জয়ললিতা, অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এত এত আসন পেয়েও, বাস্তবে কোনও কাজে লাগবে না, ভেবেছিলেন সমর্থনের লড়াইয়ে ‘কিং মেকার’ হয়ে যাবেন, ‘মাইটি-মোদী’ কে উদ্ধার করে সব স্পট লাইট এসে পড়বে মুখে... কিন্তু এখন যা অবস্থা – “কই পুছেগা ভি নেহি!” উলটে এই দু’টো রাজ্যকেই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে আগামী পাঁচ বছর। অনেক ক্ষেত্রে হয়ত বঞ্চিতও হবেন এরা রাজ্য সরকার-কেন্দ্রীয় সরকার সংঘাতের কারণে। আবার এটা ভেবেও কেমন লাগছে, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে ‘NOTA’ এলো, তাকেও কেমন কায়দা করে ধামা চাপা দিয়ে রাখা হ’ল এই ১৬ই মে’র ফলাফল ঘোষণার সময়। কোন কেন্দ্রে কোন প্রার্থী কত ভোটে জিতে দিগ্বিজয় করলেন, কোন মহারথী ধূলো চাটলেন এসব তো খেলিয়ে খেলিয়ে সারা দিন খুব বললি... কই একবারও তো বললি না কোন কেন্দ্র থেকে কত শতাংশ ভোটার ‘NOTA’ কে বেছে নিয়েছে? ‘NOTA’-র অভিমত জানার প্রয়োজন কি নির্বাচন কমিশনও বোধ করেন না? মতদাতা হিসেবে যেমন আমাদের অধিকার আছে জানার যে কে কত ভোট পেলেন, তেমন এটাও জানার অধিকার আছে যে কতজন মনে করেন ‘একজন প্রার্থীকেও আমি যোগ্য মনে করি না’। এই সহজ সত্যটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এত পণ্ডিত ব্যক্তি তথা সাধারণ মানুষ সকলের চোখ এড়িয়ে গেল কি করে... শুধু সবাই আজ 'Modi'-fied বলে? এই ‘NOTA’-র অভিমত কি তাহলে তার যথাযোগ্য সম্মান পেলো? নাকি একটা পর্দার আড়ালের খেলা হয়ে গেল, যা আমরা ভেড়া-ছাগলের দল জানতেও পারলাম না! এই প্রশ্ন কোন দলের সাংসদ করবেন আগামী সংসদ-অধিবেশনে?

বাংলার কপাল তো ১৯০৫-এই পুড়েছিল, সে পোড়া কপাল নিয়ে আর বার বার বলতে বা ভাবতে এখন খুঁচিয়ে ঘা করার মত লাগে। আর এখন দেখছি গোটা দেশই একটা ইউটপিয়া-কে বুকে জড়িয়ে নিলো। আমার বসে বসে হা-হূতাশ করতে ভাল লাগে না, এর ওর দিকে আঙুল তুলে দোষারোপ করাকেও সময় নষ্ট মনে হয়। আর দিনের শেষে সবাই তো আমরা আদার ব্যাপারী, এটা-সেটা থেকে উদ্ধৃতি তুলে, খানিক মন খুলে নিন্দে করে নিয়ে অথবা সেই একইরকম নাকে কান্না কেঁদে স্নান করতে হবে, খেতে যেতে হবে... আরও নিত্যনৈমিত্তিক যা কিছু। এখন বসে এই প্রতিক্রিয়া লিখতে গিয়েও এক একবার সব কিছু ভেবে বিরক্ত লাগছে, এক একবার মনে হচ্ছে বিকল্প নেই বলে মানুষ এত অসহায়, এক একবার সেই ক্ষোভের মধ্যেই মনে মনে বলছি ‘বেশ হয়েছে... এদের জন্য এই মোদীই ঠিক’। আবার সেই একই প্রশ্ন... আমি কে কোনও কিছুর এত সরল সার-সংক্ষেপ করার? বৃহত্তর গণতন্ত্র তো মানুষের অভিমতকেই সম্মান করার জন্য। এত কোটি মানুষের জনমত কে ভ্রান্ত বলার অধিকার কি আমার একার থাকতে আছে? তবু, দেশের সচেতন নাগরিকদের একজন বলেই নিজেকে ভাবতে ইচ্ছে হয়, সচেতনার কিছটা অবশিষ্ট আছে বলেই ১৬ই মে কোথায় একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে তা অনুভব করতে পারছি। কিন্তু ভাঙাগড়া যখন চলে, তখন তো সব ঘটনা অভিপ্রেত হয় না, ভবিষ্যৎ যে সবটাই খারাপ নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে আছে তাও মেনে নিতে ইচ্ছে হয় না। দেশের আপামোর জনগণের মিলিত সিদ্ধান্তে দেশের মঙ্গল হোক, এইটুকুই কামনা করতে পারি।

আপনার মতামত জানান