ম্যাডাম, হিসেব চাই , হিসেব দিন ...

সুশোভন

 

আহা কি আনন্দ ...
২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে মিডিয়ার পরিবর্তনের প্রচারে আর তৎকালীন রেলমন্ত্রীর যখন-তখন, যেখানে-সেখানে শিলাবৃষ্টিতে আহত কিছু বেকার যুবক ভেবেছিলেন তাঁরা চাকরী পাননি, কারণ বামফ্রন্ট সরকার, কিছু সরকারী কর্মচারী ভেবেছিলেন সময়মত ৬% মহার্ঘ্য ভাতা পাই, ১০% পাইনা, কারণ বামফ্রন্ট সরকার, সিঙ্গুরের জমি ফেরত দেওয়া যায়নি, কারণ বামফ্রন্ট সরকার, নন্দীগ্রামে পরিবেশ বান্ধব শিল্প হয়নি, কারণ বামফ্রন্ট সরকার, এরকম আরও কত কি। তখন অগ্নিকন্যার কথা শুনে মনে হত, বাজারের আলুর একটা পচা বেরোলে, ঘরে বৌ-র সাথে ঝগড়া হলে, মাথার চুল পড়ে গেলে, এমনকি গরু দুধ কম দিলেও দায়ী বোধহয় বামফ্রন্ট সরকারই। পরিবর্তন হলেই আলু আর পচবে না, বৌ আর বকবে না, মাথার চুল আর পড়বে না, আর গরুও কম দুধ দেবে না। চরম ভজকট পরিমণ্ডলে ২০১১-র ১৩-ই মে বহুচর্চিত পরিবর্তনের সকাল দেখল বাংলা। দিস্তা দিস্তা নিউজ প্রিন্টে বাংলার সাধারন মানুষের ‘স্বপ্ন পূরণের’ খবর বেরোল। ‘পড়তে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়’ গোষ্ঠী সগর্বে ছাপল ‘বাম বিদায়’। শপথ নিয়েই ম্যাডাম সাধারন মানুষের স্বার্থে বিরোধীদের ১০ বছর মুখ বন্ধ রাখার হুকুম দিয়ে উন্নয়নের কাজে ডুব দিলেন। এবং ডুবন্ত অবস্থায় ঘুম দিলেন। এবং ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে দেখলেন ১০০% কাজই শেষ। যদিও সে কথা শুনে আমাদের পাড়ার নেড়িটা পর্যন্ত অবাক। ক’দিন আগেই গর্তে পড়ে ওর দুটো ছানা মরেছে। ম্যাডামের ১০০% কাজ সব ম্যানহোলের ঢাকনাও দিতে পারেনি। ঢাকনা না হয় দিতে পারেননি। কিন্তু আপনার আর্থিক দেউলিয়াপনার গল্প কি আদেও বাস্তব না নাটক সে হিসেব তো আপনাকে দিতেই হবে ম্যাডাম। আপনি তো সাধের মুখ্যমন্ত্রী তাই না ? আফটার অল টাকাটা আমাদের কষ্টার্জিত উপার্জন তাই আমরা তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলতে পারিনা। কি বলুন ?

হিসেব নিকেশ...
গরীব সংসারে ছেলে-মেয়ের অন্যায় আবদার ক্ষান্ত করতে মা-রা যেমন সারা মাসের হিসেব মুখস্থ বলেন ঠিক তেমন মঞ্চে উঠে ম্যাডাম মাঝে মাঝেই ঋণের ব্যাপারে ‘গল্প’ শোনান। কিন্তু ম্যাডামের পিএইচডি ডিগ্রিটা যেমন আজও খুঁজে পাইনি তেমনই ম্যাডামের হিসেব ওনার অর্থমন্ত্রীর বাজেটের মিলও খুঁজে পাইনি।
‘বাজেট অ্যাটে গ্লান্সের’ ১৪-১৫ পৃষ্ঠার হিসাবে রাজ্যের ২০১৩-১৪ তে রাজ্যের মোট আয় ১,১১,৮৪৮.৯ কোটি, ঋণশোধ ( ২৮,৩৫৮.১ কোটি), বেতন (৩০,৩২১.৮১ কোটি), পেনশন (১২৩৭০.৫ কোটি) সহ মোট ব্যায় ৭১,০৫০.৪১ কোটি। উদ্ধৃত, ৩৫% হারে, ৪০,৭৯৮.৪৯ কোটি। ম্যাডাম, এরপরও কি করে সরকারী কর্মচারীদের ৪৯% মহার্ঘ্য ভাতা বকেয়া থাকে? বর্তমানে একজন গ্রুপ ডি কর্মচারীর এক শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতার পরিমান ৬৬ টাকা। অর্থাৎ ৪৯% মহার্ঘ্য ভাতা না পাওয়ায় প্রতিমাসে একজন গ্রুপ ডি কর্মচারী প্রতি মাসে (৬৬ x ৪৯ ) = ৩,২৩৪ টাকা এবং বছরে ( ৩২৩৪ x ১২) = ৩৮,৮০৮ প্রাপ্য টাকা পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রুপ সি কর্মচারী দের এক শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতার পরিমান ৮৮ টাকা। একই হিসেবে গ্রুপ সি কর্মচারীরা প্রতিমাসে ( ৮৮ x ১২) = ৪,৩১২ টাকা এবং প্রতিবছর (৪৩১২ x ১২ ) = ৫১,৭৪৪ প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এক শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা দিতে রাজ্য সরকারের ২৫ কোটি টাকা খরচা হয়। সুতরাং বকেয়া মহার্ঘ্য ভাতা না দেওয়ার জন্য প্রতিমাসে (২৫ x ৪৯) = ১,২২৫ কোটি, প্রতিবছরে (১,২২৫ x ১২) = ১৪,৭০০ কোটি, শেষ তিন বছরে (১৪৭০০x ৩)= ৪৪,১০০ কোটি টাকার ব্যয় সংকোচ হয়েছে। ২০১৪-১৫-র রাজ্য বাজেট অনুযায়ী শিক্ষক দের বেতন বাবদ অনুমিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ হাজার ৩২১ কোটি ৮১ লক্ষ টাকা। এর অর্থ বকেয়া মহার্ঘ্য ভাতায় গোটা রাজ্যে এখন কর্মরত শিক্ষকদের সম পরিমাণ শিক্ষক নিয়োগ করা যেত। বাস্তবে হয়েছে কিনা সে আলোচনা অবশ্যই অবান্তর এবং নিষ্প্রয়োজন। অথচ ২০০৯ এবং ২০১১ ভোটের আগে ম্যাডাম আপনি নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারের বলেছিলেন আপনি ক্ষমতায় এলে রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের কেন্দ্রের ন্যায় শুধু মহার্ঘ্য ভাতাই নয় পরিবহন ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হবে। ম্যাডাম সে না হয় আপনি ‘উন্নয়ন যজ্ঞের চাপে’ ভুলেই গেছেন ধরে নিলাম। কিন্তু কই আমাদের কষ্টার্জিত রোজগারের পয়সায় আপনার স্নেহধন্য সংবাদপত্রে পাতাজোড়া নিজের ছবি ছাপতে তো ভোলেননি ? জামা-কাপড় উৎসব, ঘটি-বাটি উৎসব, মা-মাটি উৎসব, টলি-বলি উৎসব, ইলিশ-চিংড়ি উৎসব, মানুষ-ফানুস উৎসব, শিল্প- গল্প উৎসব, জগা-খিচুড়ি উৎসব করতে ভোলেননি ? ৪০ ঘণ্টায় ৫০ লক্ষ ভাড়ার হেলিকপ্টারে চড়তেতো ভোলেননি ? নিজের আর মন্ত্রী-পারিষদের বেতন বাড়াতে তো ভোলেননি ? ম্যাডামের অধিষ্ঠানস্থল শুধু মহাকরণ থেকে নবান্ন-র ১৬ তালাতে নিয়ে যেতে খরচা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা?
সরকারি হিসাব পরীক্ষক প্রিন্সিপ্যাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের (পিএজি) দফতরও চলতি আর্থিক বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, বাজেট বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ পরিকল্পনা খাতে রেখেছে রাজ্য। অর্থাৎ বাকি ৭৩% পরিকল্পনা বহির্ভূত। বাজেট নথিই বলছে, চলতি অর্থবর্ষের গোড়ায় রাজ্যের ঘাড়ে থাকা প্রায় ২ লক্ষ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা বছর শেষে বেড়ে হবে ২ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি। সরকার পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে এড়িয়ে গিয়ে যথেচ্ছ নিয়োগ করছে। অর্থ দফতর সূত্রের খবর, ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক পুলিশের বেতন বাবদ বছরে ২২১ কোটি, প্রায় ৫০ হাজার ইমাম-মোয়াজ্জিনের ভাতা বাবদ ২০০ কোটি, ক্লাবের জন্য ৮০ কোটি, জঙ্গলমহল-সুন্দরবনে ফুটবল প্রতিযোগিতার জন্য ৩০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এ ছাড়া, মাটি উৎসব, বঙ্গ সম্মান, ১ লক্ষ বেকারের জন্য যুবশ্রী ভাতা ইত্যাদির পিছনেও খরচ আরও ২০০ কোটির বেশি।


সিঙ্গাপুরি শিল্প কলা ও আমরা

ম্যাডাম ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যেই সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে দেবার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এখন রাজ্যে ভারি শিল্প বলতে শুধু সিঙ্গুরের ঘাস শিল্পই। জমি ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা। ম্যাডাম গত দুবছর সিঙ্গুর মুখো হয়েছেন বলে তো মনে করতে পারছি না। নন্দীগ্রামের ‘পরিবেশ বান্ধব’ শিল্প করতে একথান ইটও পড়েছে বলে কেউ খবর দিতে পারেন ? শালবনীর স্টিল প্ল্যান্টের জমি তে এখন দিনের বেলায় গরু চরে বেড়ায় আর রাত্রে বাদুড় । চলে গেছে এ বি জি। একের পর এক প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এর মধ্যে ম্যাডাম শিল্প খুঁজতে সিঙ্গাপুর গেলেন। আপত্তি থাকার কারণ নেই। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সরকারী পয়সায় ৫০ জন গিয়ে কি ঠিক কি শিল্প নিয়ে এলেন ? কোন ক্ষেত্রে কত বিনিয়োগ এল ? আর ভ্রমণ পিপাসু মুখ্যমন্ত্রীর সখ-আহ্লাদের জন্যই বা সরকারী কোষাগার থেকে কত ব্যয় হল তাও রাজ্যের মানুষের জানা দরকার। আমাদের পয়সায় যখন ৫০ জন দেব-দেবী দের নিয়ে সিঙ্গাপুর ঘুরতে যাচ্ছেন তখন কমপক্ষে ডজন খানিক সিঙ্গাপুরি কলা তো আমাদের প্রাপ্য তাই না ?

আর বাকিটা

২০১১ -র নির্বাচনী ইশতেহারের ৩৪ পাতায় ম্যাডাম বলেছিলেন “গ্রামে আধাবেকার সহ বেকারের সংখ্যা ১ কোটি, এদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেবে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক”। দুর্নীতিতে ভরা প্রাথমিক টেটে, পরীক্ষার্থী ১৭ লক্ষ ২২ হাজার, শূন্যপদ ৩৪,৫৫৯, আর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১.০৭% হারে ১৮,১৭৩ জন। এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম লিখিয়েছে ১৮ লক্ষ যুবক যুবতী । বেসরকারী ক্ষেত্রে নিয়োগ হয়েছে মাত্র ১৮৫ জনের।
আগে ম্যাডাম কলকাতার রাস্তায় তেলো ফাটা রোদে ‘এত দাম খাব কি?’ লিখে ঘুরে বেড়াতেন । এখন মুড়ি ৬০ টাকা কেজি, মোটা চাল ২৮ টাকা। জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া। কখনও পেঁয়াজ কান্দায় তো কখন আলু ভোগায় । বড় জানতে ইচ্ছে হয় ম্যাডাম এখন খাচ্ছেন কি ? উপোষ নাকি আবার ২৬ দিনের অনশন ?
এর সাথে আছে ব্যাপক গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব আর সিন্ডিকেট । যার ফলে রাজ্যের শ্রম দপ্তরের রিপোর্ট অনুসারে ২০১২-১৩তে ২৯৪টি লক আউটের ঘটনা ঘটেছে, নষ্ট হয়েছে ১৫৭ লক্ষ শ্রমদিবস, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯১ হাজার শ্রমিক। ম্যাডামের রাজ্যে অম্বিকেশ মহাপাত্র কার্টুন শেয়ার করে গ্রেপ্তার হন কিন্তু প্রকাশ্যে রেপ ও খুন করার হুমকি দিয়ে শাসক দলের সাংসদ তাপস পাল দিব্যি কলার তুলে ঘুরে বেড়ান। ম্যাডাম আপনার রাজ্যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। প্রশাসনে স্বচ্ছতা নেই। আছে বলতে আপনার কচিনেতাদের তোলাবাজি আর দাদাগিরি। আর আছে ত্রিফলা কেলেঙ্কারি, ৭ কোটি টাকার গম বীজ কেলেঙ্কারি, ১৮ লক্ষ মানুষ কে সর্বস্বান্ত করা ১০০০০ কোটি টাকার সারদা কেলেঙ্কারি। সারদা কাণ্ডে ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছে তৃণমূলের একাধিক নেতা , মন্ত্রী বা ঘনিষ্ঠরা। ম্যাডাম তো সততার প্রতীক। ম্যাডামই তো বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন বর্ষা কালে ব্যাঙ ডাকলেও আর কালবৈশাখীর ঝড়ে আমের মুকুল ঝরে পড়লেও ‘সি পি এমের চক্রান্ত’ বলে সিবিআই তদন্ত দাবী করতেন। এখন সিবিআই তদন্তে এত এলার্জি কিসের ? অবশ্য অনেকদিন চাওয়ার পরে কোনও জিনিস পেলে ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাদের মাঝে মাঝে একটু অভিমান হয় বৈকি।
সঙ্গে রয়েছে ম্যাডামের সীমাহীন ‘আমিত্ব’ । “আমি আছি বলেই সব কাজ হচ্ছে”, “আমি জেদি”, “আমি ভাঙ্গি ,কিন্তু মচকায় না”, “আমি ঘরের কাজ জানি”, “আমি মাইনে নিই না”, “আমি সরকারী পয়সায় এককাপ চা খাইনা”, “আমি রাঁধি আবার চুলও বাঁধি”, “আমি রাফ অ্যান্ড টাফ” আমি উমুক ,আমি তুমুক। এই যে এত ‘আমি’ এর সাথে রাজ্য চালানোর কি সম্পর্ক কেউ বলে দিতে পারেন ?
আসলে ক্ষমতাই মানুষকে মুখ আর মুখোশের পার্থক্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। ৩৯ মাসে ম্যাডাম নিশ্চয় বুঝেছেন চালানোটা, না চলতে দেবার মত সহজ নয়। চাবুক দিয়ে মানুষ কে শায়েস্তা করা যায়না। বরং চাবুকই মানুষ কে প্রতিবাদ করতে শেখায়, প্রতিরোধ করতে শেখায় । তাই দেব-দেবী, গায়ক-নায়করা, হরনাথ-ভোলানাথ, বুদ্ধিজীবী-পরজীবী- মিথোজীবী- মৃতজীবী-সরীসৃপ- গিরগিটি- কচিনেতা- যুবনেতা- দুষ্টুনেতা, দোলা- গোলা, সোনালি- রূপালী দের নিয়ে আপনি যতই নাচ-গান আর উৎসব করুন মানুষ কিন্তু চাওয়া পাওয়ার হিসেব চাইছে, পরিবর্তনের হিসেব চাইছে, ম্যাডামের দেওয়া প্রতিশ্রুতির হিসেব চাইছে, নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের হিসেব চাইছে । ম্যাডাম শুধু সততার প্রতীকের কাটআউটে চিড়ে ভিজবে না আর । অনেক হল এবার আমাদের হিসেব চাই হিসেব দিন ...


(মতামত ব্যক্তিগত)

আপনার মতামত জানান