চাবিটা কিন্তু এখনও রয়েছে ছাত্রদের হাতেই

ফুলমণি সরেন

 

একটা ছাত্র ভেন্টিলেশনে, কারুর ভেঙেছে হাড়গোড়, কারুর স্তনে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ –
সবারই মনে লেগেছে, সব থেকে বেশি। তাহলে কী আবারও ভয় পেতে হবে? গতকাল মানে ক্ষয়, আগামীকাল শুধু সংশয়?
এ মাসে প্রেসিডেন্সি তো ও মাসে যাদবপুর। দেড় দশক আগে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তো দূর্গাপুর আর ই সি। তার আগের দশকে খবরের কাগজ আর টেলিভিশন পৌঁছত না, কিন্তু ছিল, মহকুমা কলেজগুলোতে এসএফআই আর সিপি। তার দেড় দশক আগে ইস্কুল/ কলেজ/ ইউনিভার্সিটির পরীক্ষাতে ছাত্রদের খাতা লুঠ হয়ে যেত সাম্যের যুক্তিতে যাতে একজনের থেকে আরেকজন কম বা বেশি নম্বর না পেতে পারে। তার আগের দশকে কলেজে কলেজে ছাত্র ঠেঙিয়ে অশান্তি বুনে চলতেন আজকের প্রবীণ বিধায়করা। যাঁদের ঠেঙাতেন তাঁদের মুখেই শোনা যে সেই ঠ্যাঙানির ফলটাই ফলেছিল পরের দশকে.........
আজও, যে ছেলেটি ভেন্টিলেশনে মারটা তার পিঠে নয়, পড়েছে এই সমাজের পিঠে। এই সমাজে কেউ না কেউ তো মারের বদলে মার দিতে হাত বাড়াবে একদিন, এভাবে ক্রমাগত বিনা অপরাধে মার খেতে থাকলে। তবে না অশান্তি গাছে ফল ফলবে। মৌন মিছিল থেকে চৌরিচৌরা যে ঘনিয়ে তোলা যায়, তা তো আমরা জানি...
ভেন্টিলেশনে তো ছেলেটা নয়, আমরা সব্বাই। তাই বলি কী, প্রিয় ছাত্ররা, রাস্তায় নয়, ক্লাসে যাও। যুদ্ধ শুধু বলে নয়, ছলে আর কৌশলেও জেতা যায়। তাই প্রতিবাদের পোশাকে বল না দেখিয়ে, বোকা সেজে, ভীতুর ভান করে, চোর-চোর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ক্লাসরুমে ঢোকো। নিজেদের সময় নষ্ট কোরো না। এই সময় নষ্টের মূল্য কেউ দেবে না, বন্ধুরাও নয়, সমাজও নয়। তাছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে স্থায়ী বন্ধু হয় না। আর জীবনটাই তো যুদ্ধক্ষেত্র। কিন্তু এই যুদ্ধে কোনো হার-জিত নেই। শুধু একটা যাবজ্জীবন যুদ্ধ আছে। তাই কখনও কখনও দু-কদম পিছিয়ে এসে, ঘুরপথে আগিয়ে গিয়ে শত্রুকে পিছন থেকে আঘাত করতে হয়।
ক্লাসরুমে বোকা সেজে, ভীতুর ভান করে, চোর-চোর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ফিরে যাওয়াটা সেই ট্যাকটিক্যাল রিট্রিট। কোনো চীৎকার কেউ শুনবে না। প্রতিবাদগুলো শাসকের লাঠিতে আহত হবে, প্রতিরোধগুলোর গায়ে বিরোধীরা নিজেদের লেবেল সেঁটে নিজেদের মতো করে চালানোর চেষ্টা করবে। প্রথমে আড়াল থেকে তারপর খোলাখুলি। আর ছাত্ররা চলে যাবে ভেন্টিলেশনে, তাদের ন্যায়ের দাবি নিয়ে।
তাই ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়া জরুরি। শান্ত হওয়া জরুরি। যে মাস্টারমশাইয়ের জন্য গতমাসে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি উত্তাল হয়েছিল, তিনি কিন্তু বলেন, “বিপদে পড়লে মাথাটা ঠান্ডা রাখতে হয়।” তাঁর ছাত্র হিসেবে আমিও তাই বলছি। যখন ছাত্ররা বুঝতে পারছে যে আমরা সবাই বিপদে সে সময়ে মাথাটা ঠান্ডা রাখতে হবেই। আর শান্তিতে বসে দেখতে হবে যে প্রতিপক্ষের খুঁত কী কী। তারপর সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মমাফিক প্রথামতো ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই হিসেবে যাদবপুর (নাকি দানবপুর বলব?) বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির যে সদস্যারা কটু প্রশ্ন করেছেন শ্লীলতাহানির শিকার মেয়েটিকে তাঁদের অপসারণের দাবি না করে, তাঁদের কটু প্রশ্ন করার আইনি অপরাধটাকেই লিখিত অভিযোগ হিসেবে থানায় দায়ের করতে হবে। থানায় থানার বিরুদ্ধে দায়ের করতে হবে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে লাঠিচার্জ করার অপরাধের অভিযোগ, মহিলা পুলিশ না নিয়োগ করে আন্দোলনকারী মেয়েদের ছত্রভঙ্গ করার মতো বেআইনি কাজ করার অভিযোগ, পুলিশের চোখের সামনে অনামী, পরিচয়হীন লোকেরা বিক্ষোভে সামিল ছাত্রদের মারার সময় পুলিশী নিষ্ক্রিয়তা ও ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশী মদতের অভিযোগ, এবং অবশ্যই উপাচার্য শ্রী অভিজিৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে গুণ্ডা দিয়ে ছাত্র পেটানোর ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি-র অভিযোগ। সমস্ত অভিযোগ প্রত্যেক ছাত্রকে আলাদা আলাদা ভাবে, প্রত্যেক দিন প্রত্যেক মিনিটে একজন করে, এবং দলবদ্ধভাবেও দায়ের করতে হবে। এই সমস্ত অভিযোগের কপি/প্রতিলিপি অবিলম্বে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য মহিলা কমিশনে (কারণ রাজ্যে মহিলা কমিশন যে আছে এবং সক্ষম কর্মীরা সেখানে কাজ করেন তা টের পাওয়া ভার), রাষ্ট্রপতিকে, প্রধানমন্ত্রীকে, রাজ্যপালকে ও মুখ্যমন্ত্রী (যিনি পুলিশমন্ত্রীও) –কে পাঠাতে হবে, প্রত্যেক ছাত্রকে আলাদা আলাদা ভাবে, প্রত্যেক দিন প্রত্যেক মিনিটে একজন করে, এবং দলবদ্ধভাবেও। তারপর সপ্তায় সপ্তায় অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেন বিলম্ব হচ্ছে জানতে চেয়ে চিঠি লিখে তাগাদা করতে হবে, প্রত্যেক ছাত্রকে আলাদা আলাদা ভাবে, প্রত্যেক দিন প্রত্যেক মিনিটে একজন করে, এবং দলবদ্ধভাবেও। এই সব চিঠির কপির ওপর সমস্ত পদাধিকারিকদের আপিসের রিসিপ্ট সিল লাগিয়ে নিতে হবে যদি তাঁরা চিঠিগুলো নেন, না হলে রেজিস্টার্ড/ স্পীড পোস্টে চিঠি পাঠিয়ে ট্র্যাকিং রিপোর্ট প্রিন্ট আর কপি করে রেখে দিতে হবে, প্রত্যেক ছাত্রকে আলাদা আলাদা ভাবে, প্রত্যেক দিন প্রত্যেক মিনিটে একজন করে, এবং দলবদ্ধভাবেও। চিঠি না নিলে, ফিরতি স্পিড পোস্টটাও নথি হিসেবে রয়ে যাবে। এর বিনিময়ে যে সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা দেখতে পাওয়া যাবে সেটা গণমাধ্যমে এবং সামাজিক মাধ্যমে জানিয়ে যেতে হবে, বলাবাহুল্য। এই সমস্ত অভিযোগ এবিপি টিভির সমস্ত দর্শকও দায়ের করতে পারেন। বরং করলে ভালো হয়, আমাদের সব্বার।
এই কাজগুলো কর্তব্য। মিছিল কিংবা অবস্থান বিক্ষোভ করে বা স্লোগান দিয়ে এগুলো করা যাবে না। সমস্ত অভিযোগের প্রত্যেকটা শব্দ যথাযথভাবে লিখতে হবে। তাই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। সংরক্ষিত করতে হবে সমস্ত কাগুজে আর বৈদ্যুতিন প্রমাণ (যেমন এবিপি-র ইউটিউব ভিডিও)। আক্ষরিক অর্থে পথে নামা নয়, আটঘাট বেধে পথে নামতে হবে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। না হলে যে শোরগোল তৈরি হয়েছে, যেটা আরও বাড়ানো হবে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য, তাতে কে দোষী আর কে নির্দোষ সেই ব্যবধানটা মুছে দেওয়ার মোক্ষম চেষ্টা করা হবে একটা। এখনও দোষী আর নির্দোষ নিয়ে কোনো কনফিউসন নেই, এরপর জোর দিয়ে কনফিউশন তৈরি করা হবে যাতে অরাজনৈতিক মানুষরা ছাত্রদের থেকে নিজেদের দূরত্ব বাড়িয়ে নেন, সেই সুযোগে যাতে ছাত্রদের অরাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে রাজনৈতিক মদত দিয়ে, তাদের মধ্যে দলাদলি তৈরি করে, রক্তপাত ঘটানো যায়। যাতে মূল অভিযোগ আর সমস্যা লঘু হয়ে যায়। তাই স্লোগান নয়, সাইলেন্স জরুরি।
ষাট-বাষট্টি সাল থেকে কলকাতার কলেজে কলেজে ছাত্র পিটিয়ে বেড়াতেন আজকের প্রবীণ কিছু বিধায়ক। ষাটের দশকের শেষে পৌঁছে সফলভাবে মারের বদলে মারের সংস্কৃতি তৈরি করে ফেলেছিলেন তাঁরা। রাস্তায় রাস্তায় মারপিট আর রক্তারক্তি, গলিতে গলিতে গোলাগুলি ঘনিয়ে তুলেছিলেন পেশাগত দক্ষতায়। তখনও তাঁরা ডাকনামে কুখ্যাত ছিলেন। একাত্তরে রাস্তার রক্তপাতকে নকশাল আন্দোলন নাম দিয়ে বিকিয়েছেন তাঁরা। শাসক বা বিরোধী সেজে সেই বিপণনের লাভ তুলেছেন তাঁরা, ভালো/ পোশাকি নামে নির্বাচিত হয়েছেন বিধানসভায়, সংসদে, তৎকালীন পালাবদলের নির্বাচনে।
আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, বা ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্ররাই ঠিক করবেন তাঁরা অবস্থান বিপ্লব থেকে মারকুটে রাজনীতির ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন নাকি আপাত ঔদাসীন্য আর নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে, আইনের পথে বেআইনির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করে পশ্চিমবঙ্গের সমাজে আইনি শাসন স্থাপনের পথটা চওড়া করবেন।
পছন্দটা আজকের যাদবপুরের ছাত্রদের হাতে। আশা করি তাঁরা দায়িত্বটার গুরুত্ব বুঝে পরের পদক্ষেপ নেবেন, আমরা যারা তাঁদের সঙ্গে আছি, আমরাও তাঁদের পদক্ষেপের সাথে পা মেলাতে পারব।
পুনশ্চ:
প্রাথমিক নোটিস বদলে বলছি, এই পরিস্থিতির আরোগ্য কামনায় আসুন সবাই সবাই-কে বলি “দ্রুতারোগ্য কামনা করি”।
(মতামত ব্যক্তিগত)

আপনার মতামত জানান