ভুলে যাওয়া রং ভলোবাসা যায় না

অঙ্কুর কুণ্ডু

 

স্বভাবতই মিলে যায় ২০১৪ থেকে আগামী কয়েক বছরের জন্য লোকসভার সংসদে অধিকাংশ রং , বিজয়ী দলের প্রতীকী রং এবং দেশের দ্বাদশতম হবু প্রধানমন্ত্রীর প্রায়শই পরিধেয় পোশাকের রং –গেরুয়া ৷ যদ ইন্টেলেকচ্যূয়ালি ভাবি , তবে গেরুয়া হল ত্যাগের প্রতীক , সন্ন্যাসের রং , সর্বোপরি প্রণম্য রং ; এবং যদি আঁতলামি করি , তবে শ্রী নরেন্দ্র মোদী দ্বারা উচ্চারিত ‘নমো’র অপর নামও কিন্তু ‘প্রণাম’ ৷ অতএব আপাতদৃষ্টিতে অঙ্কটা ‘(a+b)*(a+b)=a*a+2ab+b*b’ মিলে যাচ্ছে এবং যোগ্য হাতেই যাচ্ছে দেশের প্রধানমন্ত্রীত্ব -এটুকু বলা না গেলেও অন্তত আশা করা যায় ৷

লম্বা রেসের ঘোড়াও হাঁপিয়ে যায় ৷ বামফ্রন্ট বা লাল দূর্গ যাঁরা পাহারা দিয়েছেন , তাঁরা তো মানুষ ! চৌত্রিশ বছরে তিলে তিলে গড়া দূর্গ নিজেদেরই ক্লান্তিতে ভেঙেছেন ২০১১তে ৷ পশ্চিমবঙ্গে লাল দূর্গ ভাঙার সূচনা ২০০৬ বা তারও কয়েকবছর আগে ৷ অলিন্দে কী ঘটে , তা নিলয়ও জানতে পারে না ৷ কিন্তু অভূতপূর্ব দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তিনি জানতেন যে বাম দূর্গের ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয় ৷ অপরদিকে লাল দূর্গের প্রহরীদের আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হলেও নিজেদের জেদ ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে দুষ্ট হয়ে একে একে রতন টাটার সাথেই পশ্চিমবঙ্গের জমির শাসন ছাড়তে বড়তে বাধ্য হন ৷ এপর ২০১১ পূর্ব বিরোধ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত ২০১১ উত্তর কোনো শক্তিশালী বিরোধী বাম নেতৃত্ব ভ্রুনস্থ হতেই পারলেন না , যাঁরা কিনা বর্তমান শাসকশ্রেণীর ‘বদলা নয় , বদল চাই’ স্লোগনের উলটপূরাণটা ধরিয়ে দিতে পারেন ৷ যার ফলাফল পাওয়া গেছে রাজ্যের পঞ্চায়েত এবং সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী সিনেমা থুড়ি লোকসভা নির্বাচনে ৷

১৯শে মে ২০০৪ সালে যখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ইস্তফাপত্র সরকারীভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিলেন , ততক্ষণে ইউ পি এ-র সর্বময় কর্ত্রী শ্রীমতী সনিয়া গাঁধী ডঃ মনমোহন সিং-কে দেশের প্রধানমন্ত্রী করার কাজ সেরে ফেলেছিলেন ৷ যদিওবা সেই সময় ‘হর হাত শক্তি , হর হাত তরক্কি’ (প্রতিটা হাত শক্তি , প্রতিটা হাত প্রগতি) কোলাহল উঠেছিল কিনা আমার জানা নেই ৷ ২০০৪ থেকে ২০০৯/২০১০ পর্যন্ত ইউ পি এ-র কার্যক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা নিয়ে দেশবাসীর মনে খুব একট সন্দেহ ছিল না ৷ কিন্তু তারপর থেকেই বিভিন্ন কারণে (তা সে বিদেশী লগ্নিকরণ হোক বা মুদ্রাস্ফীতি বা অর্ন্তকলহ) ইউ পি এ-র হাত থেকে জনগণের হাত সরতে শুরু করেছে ৷ করমর্দনের বাঁধন আলগা হতে হতে একসময় জনগণ শান্তভাবে আশার আলো দেখতে চেয়ে বলে ওঠে ‘আবকি বার মোদী সরকার (এইবার মোদী সরকার আসুক) ৷ ম্যাক্রোকজমিক স্লোগান পরিণত হয় মাইক্রোজমিকে ; যেন এক স্বতন্ত্র মানুষ গড়তে চলেছে গোটা সরকার ৷ সেই স্বতন্ত্রীই হলেন ভাদোদরা ও বারাণসী কেন্দ্রের বিজয়ী প্রার্থী শ্রী নরেন্দ্র ‘ভাই’ মোদী ৷ পুত্রের বিজয়-সংবাদ আঁচ করতে পেরে যখন হবু প্রধানমন্ত্রীর বৃদ্ধ মা সূর্যালোক জীর্ণ হাতে তুলসীগাছে জল ঢালছিলেন , তখন বয়সের মলিনতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল মাতৃত্বের আদর ৷ সূর্যের কিরণ তো আমি গেরুয়াই দেখেছি , তার ওপরে যে কিছু আছে , তা জীবদ্দশায় আমার প্রত্যক্ষগোচর নয় কারণ ব্যোম্ একটি শূন্যস্থান ৷

ইউ পি এ-র ‘ভরাডুবি’ নিয়ে বলার কিছুই নেই ৷ কংগ্রেস সরকারের ভাষা সদ্য সমাপ্ত ভোটের পূর্বেই পরিষ্কার ছিল ৷ আমাদের দেশে আত্মসমর্পণকারী দোষীদের এখনও একটু হলেও ভালো চোখে দেখা হয় ৷ পলায়মান দোষী কবে ধরা পড়বে , তা নিয়ে আমরা উদগ্রীব্ থাকি ;কিন্তু এই কৌতুহল আত্মসমর্পণকলে আমরা কখনওই দেখি না ৷

সারা দেশে লাল দূর্গ হয়তো মোটামুটি দশটি আসন পেয়েছে ৷ পশ্চিমবঙ্গে লালের অবস্থা দুই আঙুলেই দেখানো যায় ৷ কিন্তু তৃণমূল সরকার দুই আঙুল (ভিকট্রি সিম্বল্) চৌত্রিশটি আসনে দেখিয়ে তারও পথ বন্ধ করে দিয়েছে ৷ নির্বাচনের পূর্বেই দেখা গিয়েছে যে একের পর এক হেভিওয়েট বাম নেতারা লাল দূর্গ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন ৷ উচ্চপদস্থ নেতাদের পাশে না পাওয়া , দলীয় কর্মীদের সাথে যোগাযোগ না রাখা , শাসকশ্রেণীর গদিতে দাঁত বসাতে না পারা আলিমুদ্দিনের তথাকথিত জয়ধ্বজার উড়ান বন্ধ করে দিয়েছে ৷ যখন তৃণমূল ‘স্টার’ আনছে , তখন বাম দূর্গের ‘পোয়েটাস্টার’ নেতারা কৌশলী প্রচার করতেই পারেননি ৷ কিছুদিন আগে যার অন্দরে শোনা যেত গোঙানি , এখন সেই আলিমুদ্দিনে চরম বিরক্তি দেখা দিয়েছে ৷ যতদিন না এই বিরক্তি কাটিয়ে নব্বইয়ের নতৃত্বের শক্তি ফিরছে , যতদিন না নতুন হাওয়ায় আন্দোলিত হচ্ছে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা চিহ্নিত লাল পতাকা , ততদিন পর্যন্ত মম-নমো-সম-র পাশে লাল দূর্গকে ‘দমো’’ বলতে হবে ৷ হয়তো প্রবীণ হাড়ে এবার নতুন ক্যালশিয়াম্ দরকার ৷

মোদীর পশ্চিমবঙ্গে আগমন , মমতাকে কটাক্ষ , অথবা মোদীকে মমতার কৌশলী কটাক্ষ –সবটাই নির্বাচনের জাল ! সেখানে ভোট কাটাকাটি হবে , বিরোধী দুর্বল হবে , শাসকশ্রেণী লাভবান হবে –সেটাই স্বাভাবিক ৷ বামপন্থী নামটা সার্থক ৷ তারা এখনও মধ্যপন্থাটাই শিখলেন না ৷

গেরুয়া পতাকা উড়ছে , তার প্রধান কারণ মোদী নন , বরং দেশের জনগণ ৷ মোদী হয়তো গেরুয়া পতাকাটা , পালে লাগানো সেই হাওয়াগুলো হল প্রতিটা দেশবাসীর আঙুল ও ই.ভি.এমের বোতামের মধ্যবর্তী ফাকা স্থানের হাওয়া ৷ কিন্তু তা বলে কখনওই গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীত্ব থেকে দিল্লির মসনদে যাওয়ার যাত্রাটা ছোট করে দেখার প্রশ্নই ওঠে না ৷ যে দিল্লিতে কয়েকদিন আগে ‘আপ’-এর জয়জয়কার ছিল , যেখানে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে দিল্লির সাতটি আসনই পাবে ‘আপ’ , সেখানে বিজেপি-র আধিপত্য তো মোদীর মগজাস্ত্রের পরিশ্রমেই সম্ভব হয়েছে ৷ নির্বাচনের আগে আমেঠি নিয়ে রাহুলকে কটাক্ষ , পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে একপ্রকার ‘দাদাগিরি’ মোদীর জয়েরই পরিপূরক ৷ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র অঙ্কুরোদগম্ দেখা যাচ্ছে দেশের হবু প্রধানমন্ত্রী-র জন্যই ৷

পরিশেষে বলব যে , পশ্চিমবঙ্গে ভবিষ্যতে যাঁরাই দুই আঙুলে ভিকট্রি দেখান না কেন , ঐ দুই আঙুলের চাপে যেন রাজ্যবাসী না থাকেন ; মুশকিলে পড়বে বিজয়ীরাই ৷ ভারতে অন্য কেউ হোক বা ‘মোদী সরকার’ , দেশ ও দশের ‘প্রগতি’ দরকার ৷ মানুষ কিন্তু WRONG মনে রাখেন , রং ভালোবাসেন , রং ভুলেও যান ৷

আপনার মতামত জানান