বিপ্লবের শরীর

বিশ্বজিৎ রায়

 

বিপ্লবের চেহারা কেমন ? মিছিলে, শ্লোগানে, জমায়েতে গেলে টের পাবেন । বিপ্লবের কোনও স্কুল- ইউনিফর্ম হয় না । ধর্মবাদীরা , সংস্কৃতির কুলগুরুরা কোনও মিছিল পরিচালনা করলে যেমন একরকম ভাবে একই জামা কাপড়ে লোকজনকে চালিত করতে চান, বিপ্লব তেমন নয় । বিশেষ মুহূর্তে কোনও একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ নানা সাজের, নানা ভাষার, নানা রুচির মানুষ একত্র হন । কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান । অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন । তাই বিপ্লবী মিছিলের চেহারা বড়ো বর্ণময় । তার মধ্যে একটা মুক্তি থাকে । কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, কেউ শ্লোগান দিচ্ছে, কেউ বুকের আগুনের বদলে মুখের আগুন অপরকে বিলোচ্ছে । বেশ একটা উৎসব – সাহসের মুক্তির । মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের প্রচলিত বিধি যেগুলোকে কেমন কেমন চোখে দেখে সেগুলো বিপ্লবের ময়দানে অনায়াস । কোনও ছেলে বন্ধু মেয়ে বন্ধুর হাত ধরল, কেউ কাউকে চুমু খেল এসবই সেখানে মানিয়ে যায় । কারণ এগুলো তখন আর ব্যক্তিগত যৌনতার প্রকাশ নয় এগুলো আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত চিহ্ন, কায়েমি প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে যাওয়ার শারীরিক প্রক্রিয়া । সবাই যে আবার এভাবেই আত্মপ্রকাশ করেন তা নয় । কেউ নীরবে পা মেলান । কারও চোখ দীপ্ত , কারও সজল । জামা-কাপড়ের ক্ষেত্রেও কোনও মান্য বিধি নেই । কেউ হাফপ্যান্ট, কেউ হাওয়াই চটি, কেউ জিন্স, কেউ পাজামা । ছেলে-মেয়ে ভেদ সেখানে জামা-কাপড়ের বিষয়ে থাকে না । যাদবপুরকে ঘিরে যে ছাত্র/ছাত্রী আন্দোলন গড়ে উঠেছে তার শরীর দেখতে দেখতে একথাগুলো মনে হল । এমনিতে যাদবপুরে ছাত্র-ছাত্রীদের জামাকাপড় ও স্পর্শ বিষয়ে মধ্যবিত্ত দ্বিধা নেই । জানি কথাটাকে ইচ্ছে মতো সম্প্রসারিত করে বাজে কথা বলা সম্ভব । তবু সচেতন ভাবেই লিখছি । বন্ধু-শরীর বলে একটা ভাবনা তৈরি হয়ে উঠেছে । প্রকাশ্যে পূজাবকাশের পর ছেলেরা যখন মেয়েদের সঙ্গে সাগ্রহ কোলাকুলি করত, মিলনদার ক্যান্টিনে প্রজাপতি বিস্কুট না খাওয়ানোর অপরাধে মেয়ে বন্ধু ছেলে বন্ধুকে হাসতে হাসতে লাথি মারত তখন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কোনও গোপন অবদমিত যৌনটান সেখানে থাকত না । সহজ বন্ধুতাই থাকত – এই বন্ধুতা আলাদা করে ‘সেক্স অবজেক্ট’ হিসেবে মেয়েদের দেখছে না । বন্ধু হিসেবে দেখছে । এই সহজ প্রকাশ একদিনে হয়নি । এর পেছনে সাহিত্যপাঠের বোধ ও বোধি ক্রিয়াশীল । কাজেই যাদবপুরের ছেলে-মেয়েদের জমায়েতের তো নিজস্ব বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ থাকবে । অন্য শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের জমায়েতের ছবি আরেক-রকম হত । যাদবপুরের এই সহজতার স্পিরিট যাঁরা ভেতর থেকে অনুধাবন না করে নিতান্ত বাইরে থেকে দেখছেন তাঁরা অকথা-কুকথা বলছেন । মনে রাখবেন এই সখ্য ও সহজতা লিঙ্গগত বৈষম্যের প্রতিষেধক । এই সহজতাকে যাঁরা ‘যৌনাচার’ বলে ভাবেন তাঁরা আসলে স্পর্শের মাত্রা সম্বন্ধে অসচেতন – সবই তাঁদের একরকম লাগে । যাদবপুরের ছাত্র/ছাত্রী আন্দোলনের বর্ণময় শরীরকে খণ্ডিত করে যাঁরা শুধু পদযুগল দর্শকামী ও প্যান্টের মাপ বিচারকারী তাঁদেরকে তো বলে কিছু বোঝানো যাবে না । তবে এঁরাই মনে করেন মেয়েরা ধর্ষিত হন জামাকাপড়ের জন্য – কাজেই মেয়েদের বস্তাবন্দী করে সন্ধে হতে না হতেই ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত । শেষে আর একটা কথা এই ছেলে-মেয়েগুলো কিন্তু চাইলে যে কোনও ভূমিকায় সমানে লড়ে যেতে পারে । হাফপ্যান্ট পরে শ্লোগান দেয় বলে শাড়ি পরে সুক্তো রাঁধতে পারে না তা নয় । , তবে রাঁধতে নাই চাইতে পারে ।

আপনার মতামত জানান