মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে খোলা চিঠি

রিঞ্চু ডোমা ডুকপা

 

প্রিয় মহোদয়া,
২০০৬ সালে আপনি যখন ন্যানো কারখানা নির্মাণের জন্য সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন তখনই আপনি প্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আমি তখন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে স্নাতক স্তরে পাঠ রত। আমি তখন জীবনের এমন একটা পর্যায় যখন শিক্ষণের নির্বাচিত বিষয়ের বাইরে আমার দৃষ্টি ভঙ্গী, আমার বিশ্ব দর্শন, গঠিত হচ্ছে অনেকটাই আমার বাম ঘেঁষা শিক্ষকদের প্রভাবে। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম যে টাটার স্বপ্ন প্রকল্প নতুন চাকুরী ক্ষেত্র সৃষ্টি করে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বিনিয়োগের উপযোগী একটা বাতাবরণ তৈরি করবে যার সুফল তলার দিকে চুইয়ে পরবে ফলে বাংলা এবং তার মানুষজন উপকৃত হবে। সংক্ষেপে আমি ন্যানো কারখানার পক্ষে গলা ফাটাচ্ছিলাম আপনার ওপর আক্রমণের ঘটনা পর্যন্ত।
আমার পরিষ্কার মনে আছে পঁচিশে অক্টোবর ২০০৬ সালে সিঙ্গুর যাওয়ার পথে আপনি পুলিশের দ্বারা আক্রান্ত হন। নানা টিভি চ্যানেলে আক্রমণের পর দেখা আপনার অবিন্যস্ত চুল আর চোখে আতঙ্কের ছায়া আমাকে একই সঙ্গে ক্রুদ্ধ ও ভিত করে, হয়তো সেই প্রথম জাতীয় বৈদ্যুতিন মাধ্যমে কোন নারীর ওপর আক্রমণ প্রত্যক্ষ করছিলাম বলে। হয়তো আর একজন নারীকে ও ভাবে টিটকিরি দিতে দিতে রাস্তা দিয়ে টেনে, হিচড়ে, চড়, থাপ্পড়, গুঁতো মারতে মারতে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমার নারী সত্ত্বাকে গভীর ভাবে আহত করে। আমার ভিতরে তোলপাড় শুরু হয়। আপনার ব্যথা, আপনার বিহ্বলতা, এবং সর্বোপরি আপনার লাঞ্ছনা আমি অন্তরে অনুভব করি। আমার বিশ্ব দর্শন বদলাতে শুরু করে এবং তার সঙ্গে ন্যানো প্রকল্প সম্বন্ধে আমার উৎসাহে ভাটা পরে। আমি বুঝি যে আপনার সঙ্গে প্রতিকার-হীন ভীষণ অন্যায় হয়েছে। আমি ভিতরে ভিতরে গুমরোতে থাকি। এই সময় আমার এক ঘনিষ্ঠের কাছ থেকে জানি যে এর আগে আপনি আরও ভয়ঙ্কর ভাবে আক্রান্ত হয়ে ছিলেন। আমি জানি যে ১৯৯১ সালে আপনি যখন হাজরার মোড়ে একটি কংগ্রেসের মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন সিপিআইএমের এক গুন্ডা আপনাকে মেরে খুলি ফাটিয়ে দেয়। আবার ১৯৯৩ সালে জ্যোতি বসুর দফতরের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে পুলিশ আপনাকে জোর করে রাইটার্স বিল্ডিং-এর বাইরে টেনে ফেলে দেয়।
আপনার সম্বন্ধে আরও জানার আগ্রহ হয়। যত জানি ততই আপনার প্রতি আমি আকৃষ্ট হই। ক্রমশ নিজের বিশ্বাসের জন্য সারা জীবন আপোষ হীন সংগ্রাম করা একটি নারীর ছবি আমার মনে ফুটে ওঠে। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও গুণমুগ্ধতা বাড়তে থাকে। এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আপনাকে নারীর শক্তি, তার ক্ষমতা এবং তার অধ্যবসায়ের প্রতীক বলেই মনে করি। আপনি ছিলেন একজন যোদ্ধা যে কখনও হার স্বীকার করে না। আপনি যখন ২০১১ সালে পশ্চিম বাংলার প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হলেন তখন আমার গর্ব আর আনন্দ বাঁধ মানে না। আপনার সমস্ত পূর্ব অভিজ্ঞতায় যে ধাতুর পরিচয় পেয়েছি তার ভিত্তিতে আপনি যে আমাদের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নতুন দিগন্ত খুলে দেবেন সে ব্যাপারে আমার মনে বিন্দু মাত্র সংশয় ছিল না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমাদের নেতা হিসাবে আপনার সাফল্য শুধু মাত্র আপনার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। বরঞ্চ তা অনেক বেশী নির্ভর করবে অন্যের প্রতি নারীর সহজাত সমবেদনা, সহানুভূতি, এবং সর্বোপরি আমাদের সমস্যার, বিশেষ করে নারী সমস্যার, ন্যায় সংগত ও পক্ষপাত হীন ভাবে সমাধান করার আপনার ক্ষমতার ওপর।
তিন বছর হয়ে গেছে আপনি একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে আমার সমস্ত প্রত্যাশা ধূলুন্ঠিত। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুসারে নারী জাতির বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে বাংলার স্থান সমস্ত রাজ্যের মধ্যে তৃতীয়। যা আমাকে সব চেয়ে শঙ্কিত করে তা নারী জাতির বিরুদ্ধে এই ক্রমবর্ধমান অত্যাচারের খতিয়ান নয়, তা হল এমন প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে আপনার নীরবতা এবং অপরাধী যদি আপনার দলের হয় তার পক্ষ নেওয়ার প্রবণতা। ২০১২ সালে পার্ক স্ট্রীট ধর্ষণ কাণ্ডে ধর্ষকের পক্ষ নেওয়া; পরবর্তী কালে ঘটনাটির সঠিক অনুসন্ধান করে আপনার দলের একজন দোষী সাব্যস্ত করার 'অপরাধে' আই জি দময়ন্তী সেনের বদলি এই ধরনের দুষ্কৃতিদের মনে সাহস সঞ্চার করেছে যে তৃণমূল জামানায় দিদি আমাদের রক্ষা করবে। আপনার দলের এমএলএ, এমপি, এমন কি জেলা স্তরের নেতারা যে নির্লজ্জ ভাবে ধর্ষণের পক্ষে সওয়াল করে তা, আমার ধারণা, ধর্ষিতদের প্রতি আপনার সহানুভূতির অভাবের ফলশ্রুতি। আপনি যদি অপরাধীদের পাশে, যারা বলছে 'ধর্ষণ আগেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে', না দাঁড়িয়ে অপরাধের যারা শিকার তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন তা হলে আমি নিশ্চিত যে পশ্চিম বাংলার নারীদের বর্তমান অবস্থা অন্য রকম হত।

হ্যারি এস ট্রুম্যান, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের ৩৩ তম রাষ্ট্রপ্রধান মনে করতেন যে তার দেশে যা ঘটে তার সমস্ত কিছুর অন্তিম দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়। তাই তার দফতরে লেখা ছিল 'দ্য বক স্টপ্স হিয়ার' অর্থাৎ আর কারও দিকে আঙুল তোলা যাবে না: দায়িত্বের বোঝা অন্য কারও কাঁধে চাপান যাবে না। পশ্চিম বঙ্গে দায়িত্বের সূচনা ও সমাপ্তি আপনার দফতরে। কিছু দিন আগে ধুপগুরীতে ১৪ বছরের বালিকার ধর্ষণ ও হত্যার ব্যাপারে আপনার সম্পূর্ণ নীরবতা, সিকিম থেকে আগত বিশ্ব ভারতীর একটি প্রথম বর্ষের মেয়ের ওপর জঘন্য যৌন নিগ্রহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং গোপন তত্ত্ব ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এ সবই আপনার দায়িত্বে থাকা নারীদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবজ্ঞা ও অবহেলার নিদর্শন। একজন নারী হিসাবে, যে আপনার নেতৃত্বে আশার আলো দেখেছিল, আমি শুধু হতাশ হই নি, আমি গভীর বেদনাহত যে আপনি, যে কিনা 'মা, মাটি, মানুষ' এই ডাক দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই 'মা'য়ের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন যার আপনার সাহায্য সব থেকে বেশী প্রয়োজন ছিল।
তিরিশ বছরের বাম শাসন বাংলার আর্থিক ও চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্র ধ্বংস করেছে আর আমি দু:খ সঙ্গে লক্ষ্য করছি মহোদয়া যে আপনার শাসনে বাংলার সামাজিক ভিত যা একদা রাজা রাম মোহন, রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মত বিরাট ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছিল ক্রমশ দুর্বল হয়ে চলেছে।
মহোদয়া, আমার কিছুতেই বোধগম্য হয় না কি ভাবে একজন নারী যে সারা জীবন শারীরিক নিগ্রহ, লিঙ্গ বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মধ্যে কাটিয়েছেন; এ সমস্তের বিরুদ্ধে লড়াই যার রাজনৈতিক জীবন ধাপে ধাপে গড়েছে কি ভাবে আজকে অন্য নারী এমন কি শিশুর ওপর একই ধরণের অত্যাচার দেখে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকতে পারেন।
কেউ একজন যথার্থই বলেছেন যে দু:সময় হয় আপনার মনকে বিষিয়ে দেয় অথবা আপনাকে সংবেদনশীল করে। মনে হয় যে আপনার সারা জীবনের সংগ্রাম আর কষ্ট ভোগ আপনাকে এতটাই রুক্ষ ও কঠিন করেছে যে আজ আর মমতা ব্যানার্জীর অন্তরে কোন মমতা অবশিষ্ট নেই। অন্যের, বিশেষ করে নারীদের, প্রতি আপনার সংবেদনশীলতার অভাব শুধু দৃষ্টি কটু নয় আমাদের প্রভূত ক্ষতি করছে। হয়তো আপনার দল এবং বিরোধী দলগুলিরও অনেক সদস্য আপনার নীরবতাকে তাদের কুকর্মের পরোক্ষ মদত হিসাবেই দেখছে।
আমি একজন অদম্য আশাবাদী যে এত কিছুর পরেও খড়-কুটো আঁকড়ে সুন্দর ভবিষ্যতের একটা ক্ষীণ আলো দেখি। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছি যখন যারা বলে 'ধর্ষণ ভবিষ্যতেও ঘটবে' তাদের সঙ্গে গলা না মিলিয়ে আপনি বলবেন 'আমার পশ্চিম বঙ্গে কোন যৌন হেনস্তা বা ধর্ষণ আর ঘটবে না'।
এত গুলো কথা বলে মনটা অনেক হাল্কা লাগছে। আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে আপনি সেই মাতৃ রূপ ধারণ করবেন যে রূপে আমি চিরকাল আপনাকে কল্পনা করে এসেছি।

বিনীত,
রিঞ্চু ডোমা ডুকপা

(মতামত ব্যক্তিগত)

আপনার মতামত জানান