আশ্বিনের শারদ প্রাতে...

কেয়া মুখোপাধ্যায়

 




সেদিন বিকেলে অফিস ছুটির পর ফেরার পথে সিগন্যালে আটকে, সামনে তাকিয়ে দেখি অনেকটা দূরে পেঁজা তুলোর মত সাদা সাদা মেঘ যেন মাটিতে নেমে এসেছে! যেন এই রাস্তা ধরে সোজা এগোলেই পৌঁছে যাব মেঘের বাড়ি! আকাশটা ঝকঝকে নীল। মায়াবি উজ্জ্বল রোদ। বুঝলাম শরৎ এসেছে। বাড়ির পথে হঠাৎই চোখে পড়ল কাশফুল। হ্যাঁ, এই দূর প্রবাসেও। এখানে শিউলি নেই, কাশফুল আছে। এই কাশ ফুল মনে করিয়ে দিল শরতের এক ভারি উজ্জ্বল স্মৃতি। বাড়ির কাছেই কুমোরটুলি। পুজোর আগে মাঝে মাঝেই বাবার সঙ্গে যেতাম আর দেখতাম কেমন করে একটু একটু করে সেজে উঠছে সপরিবার অসুরদলনী দশভুজা দুর্গা। অপরূপ এক ট্রানজিশন ঘটে যেত চোখের সামনে ধীরে ধীরে। এইভাবেই ‘আসছি আসছি’ করে শিউলির গন্ধমাখা এক ভোরে আলোর বেণু বাজিয়ে এসে পড়ত মহালয়া।
সময় পাল্টে গেছে। ভুবনীকরণের দুনিয়ায় বদলে গেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, স্মৃতি-জুড়ে থেকে যাওয়া কিছু ছবি পাল্টেছে, কিছু ছবি আজও এক। সেইরকম এক ছবি মহালয়ার। আজ শুভ মহালয়া। আজ পিতৃপক্ষের অবসান, কাল দেবীপক্ষের সূচনা। পুরাণ-মতে, অসুর শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। চারদিকে অশুভের প্রতাপ। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্রিত হলেন দেবতারা। অশুভ শক্তির বিনাশে প্রয়োজন হল এক মহাশক্তির। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূতা হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। প্রতিষ্ঠা হল শুভশক্তির। আকাশে বাতাসে যখন শরৎ হাজির তার অরুণ আলোর অঞ্জলি নিয়ে, তখনি দেবীপক্ষের সূচনায় মর্ত্যে শারদোৎসবের আয়োজন। তবে কোনও উৎসবই পূর্ণ হয় না শিকড়ের সন্ধান ছাড়া। প্রিয় যে মানুষেরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরা যেন এই মহালয়ায় ফিরে আসেন শরতের রোদ্দুর হয়ে। মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের হিরণ্ময়-কণ্ঠে মহালয়া শোনার পর গঙ্গার তীরে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তাই তর্পণের আয়োজন।
জানি না এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মনেও মহালয়াকে ঘিরে কোন নস্ট্যালজিয়া কাজ করে কিনা! তবে ভোরবেলার মহালয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও উৎসব থেকে তো তারা বিচ্ছিন্ন নয়। ভোররাত অবধি ফেসবুক কি ট্যুইটারে ডুবে থাকার পাশাপাশি তারা অনলাইন শপিং করবে, জমিয়ে পুজোর দিনগুলোর প্ল্যানিং করবে, আর নস্ট্যালজিক আমাদের মতই পুজোর আগের ছুটির দিন বলে হয়তো ভিড় ঠেলে আজ শেষ মুহূর্তের শপিংও করবে।
এমনি করেই হৈ-হৈ করে এসে পড়বে পুজো। আর তারপরেই বছরভরের হাজারো চিন্তা যেন এক নিমেষে কোন এক আশ্চর্য জাদুতে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে ক’দিনের জন্যে। ভোজবাজির মতো বদলে যাবে গোটা শহর। চেনা অলি-গলি-মাঠ আলো আর রঙ মেখে অচেনা। শুরু হবে আমাদের বচ্ছরকার থিম পার্বণ। মন্দির কি বনেদি বাড়ির আঙিনা ছেড়ে মা দুর্গা আগেই হয়ে উঠেছিলেন সর্বজনীন। ভুবনীকরণের দুনিয়ায়, বিশ্বায়িত অর্থনীতির দুনিয়ায় তিনি এখন বিশ্বজনীন। তাঁকে নিয়ে মেতে উঠব আমরা বিশ্বজুড়ে।
শিউলির গন্ধ মাখা ভোর, মহালয়া, পিতৃপুরুষের তর্পণ, ঢাকের বাদ্যি, ধূপ, ধুনো আর কর্পূরের গন্ধ, অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, একশো-আট গোলাপি পদ্ম কি ঝলমলিয়ে ওঠা একশো আট প্রদীপের আলো নিয়ে যে মিথ, যে ম্যাজিক রিয়্যালিজম, সেসব নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে আমরা বেশ কাটিয়ে দেব কয়েকটা দিন।
হ্যাঁ, বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেই।
উৎসবের এই ক’দিন আমরা ভুলে যাব, আমাদের সমাজে নারীর প্রাপ্য মানবিক মর্যাদা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি আজও। যে দেবীকে পুজো করি এত বাহুল্যে আর এত আড়ম্বরে, তিনি নারী; আদি শক্তি, সব শক্তির আধার। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করাই তাঁর ধর্ম। দেবী দুর্গার প্রতিরূপ নারীরা সবসময় শ্রদ্ধাস্পদ। অথচ নারী পুরুষের যৌথ প্রয়াসে সভ্যতার যে গতি সচল রয়েছে, সৃষ্টির সেই সহজাত ধারায় নারী-পুরুষের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য না থাকলেও যুগে যুগে নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উৎসবে মেতে আমরা ভুলে যাব স্বাধীনতা আর স্বকীয়তা হারিয়ে বার বার নিগৃহীত হয়েছে এবং হচ্ছে নারী। ভুলে যাব, নারীহিংসার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমরা ভুলে যাব ১৬ ডিসেম্বর ২০১২-র মর্মান্তিক গণধর্ষণ। ভুলে যাব মাত্র ক’দিন আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্যাতিত ছাত্রীটি আর তার পরিবারের নিদারুণ অসহয়তা।
কিন্তু বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু উৎসব আর নস্ট্যালজিয়ায় কি বাঁচা যায়? ২০১২-র ডিসেম্বরে দিল্লি গণধর্ষণের পরে দিল্লি আর দেশের অন্যান্য শহর জনজাগরণ দেখেছিল। দেশ জুড়ে সেই আন্দোলনকে জিইয়ে রেখে নারীসুরক্ষার দাবির পাশাপাশি ধর্ষক ও নারী-অত্যাচারীর কড়া শাস্তির দাবি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রকে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। গত শনিবার ২০- শে সেপ্টেম্বর ২০১৪ আমরা দেখলাম আমাদের ছাত্রদের জাগরণ। যাদবপুরে নির্যাতিত মেয়েটির পাশে দাঁড়াল শুধু কলকাতা শহর নয়, সারা দেশের ছাত্ররা। এটা সূচনা। একে থামতে দেওয়া যাবে না। সঠিক পথে একে চালিত করতে হবে। শুধু প্রতিবাদী মিছিল নয়, আরো বড় আর নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করুক ছাত্রদের এই অরাজনৈতিক আন্দোলন। যাদবপুরের মেয়েটি একটি প্রতীক, ছাত্ররা লড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে শুরু করে সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে মেয়েদের সার্বিক অসম্মানের বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ে অসুর বিনাশে আজ স্বর্গ থেকে কেউ নেমে আসবেন না। সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদেরই রুখে দাঁড়াতে হবে।
সেইসঙ্গে ঘরে নারীর অবহেলা আর বাইরে নারীর লাঞ্ছনার নিদারুণ অবস্থাটা পাল্টাতে গেলে নারীদেরও নিজেদের অন্তরের শক্তি উপলব্ধি করতে হবে। নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হতে হবে। আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। নিজেদেরকেই অসুরদলনী দশভুজা হয়ে উঠতে হবে। এটা ১৪২১। আজ থেকে অনেক বছর আগে, ১৩৩৩-র প্রবাসী পত্রিকার এক সংখ্যায় লেখা হয়েছিল- ‘আত্মরক্ষার সামর্থ্য থাকা নারীদের রক্ষণের সর্বোৎকৃষ্ট ও একান্ত আবশ্যক উপায়।’ নারী প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন- “মেয়েদের জীবনে আজ সকল দিক থেকেই স্বতই তার তটের সীমা দূরে চলে যাচ্ছে। নদী উঠছে মহানদী হয়ে।...কালের প্রভাবে মেয়েদের জীবনের ক্ষেত্র এই-যে স্বতই প্রসারিত হয়ে চলেছে, এই-যে মুক্তসংসারের জগতে মেয়েরা আপনিই এসে পড়ছে, এতে করে আত্মরক্ষা এবং আত্মসম্মানের জন্যে তাদের বিশেষ করে বুদ্ধির চর্চা, বিদ্যার চর্চা, একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠল।” আজও কি ভীষণ প্রাসঙ্গিক কথাগুলো!
পুরাণ-মতে, আষাঢ় মাস থেকে নিদ্রায় থাকার পর মহালয়ার দিনে নাকি দেবতারা জাগ্রত হন। সে সব তো মিথ। চলুন না, এই মহালয়ায় আমরা জাগি! চলুন না, কাল থেকে যে দেবীপক্ষ, তার সূচনায় আমরা সবাই মিলে আর একবার স্মরণ করি- একটা খুব বড় যুদ্ধ আমাদের জেতা বাকি, নারীহিংসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ! কথায় কথায় আমরা নিজেদেরকে বড় বড় তকমা দিই- আমরা প্রগতিশীল, আমরা সংবেদনশীল। সেটা অন্তত একবার সত্যি করার চেষ্টা করি! চলুন না, এই দেবীপক্ষে নারীর প্রাপ্য মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার শপথ করি সব্বাই!
ঘরের মেয়েটিকে নির্ভয়, নিশ্চিন্ত আকাশটুকু দিতে না পারলে কি হবে দেবীপক্ষের এত আড়ম্বরে?

আপনার মতামত জানান