লালবর্ণ শৃগাল

প্রকল্প ভট্টাচার্য

 

একদিন একটি শৃগাল কুকুরদের তাড়া খাইয়া পলাইতে গিয়া একটি চৌবাচ্চার ভিতর পড়িয়া গেল। সেই চৌবাচ্চায় কেহ লাল রঙ গুলিয়াছিল। তাহাতে পড়িয়া শৃগালটি লালবর্ণ হইয়া গেল।
তাহার লালবর্ণ দেখিয়া অরণ্যের অন্য জীবজন্তু ভয় পাইয়া গেল। স্বয়ং পশুরাজকেও ভয় পাইতে দেখিয়া ধূর্ত শৃগাল বুঝিল যে এ হেন রক্তিম বর্ণের সাহায্যে সে সমস্ত অরণ্যবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করিতে সক্ষম হইবে। সে অবিলম্বে নিজেকে তাহাদিগের নেতা ঘোষণা করিল এবং নূতন নিয়ম কায়েম করিল। সেটি হইল, কোনও প্রাণী কোনও শিকার ধরিলে তাহা হইতে সকলকে ভাগ না দিয়া খাইতে পারিবে না। ইহার ফলে দুর্বল প্রাণীগণ আনন্দিত হইল, তাহারাও ব্যাঘ্র এবং সিংহের শিকারের ভাগ পাইতে লাগিল। শৃগাল বিনা পরিশ্রমে তাহার খাদ্য জুটাইতে পারিল। সকল প্রাণী সেইমতো চলিতে লাগিল। সকলেই অল্পাহারী হইল, কিন্তু অনাহারী কেহই রহিল না। শৃগালও মহানন্দে কেবলমাত্র উপদেশ এবং বুজরুকি ভাষণ দিয়া দিন কাটাইতে লাগিল। ব্যঘ্রের যেইরূপ ফেউ থাকে, তাহারও সেইরূপ কিছু ‘ঘেউ’ জুটিল। তাহাদের সে আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করিত।
তাহার দাপটে অরণ্যে সবুজের কিছুমাত্র বাকী রহিল না। উন্নয়ন করিবার বাহানায় সে সমস্ত শিল্পকেন্দ্র একে একে বন্ধ করিয়া দিল, বিজাতীয় ভাষা বেআইনি ঘোষণা করিয়া কেবলমাত্র ‘হুক্কা হুয়া’ ভাষায় সকলকে কথা বলিতে বাধ্য করিল, যাহার ফলে অত্যাচারিত অরণ্যবাসীদের পলায়নের সুবিধাও রহিল না। যে কয়জন প্রতিবাদ করিতে চাহিল, রক্ষীদের সাহায্যে শৃগাল তাহাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছিয়া দিল। শেষে প্রাণভয়ে এবং স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অধিকাংশ জীবজন্তু শৃগালের ন্যায় লালবর্ণ ধারণ করিল।
ক্রমে শৃগাল বৃদ্ধ হইল। অত্যাচারের সাথে যোগ হইল জেদ এবং বুদ্ধিনাশ। তাহার রক্ষীগণও ক্রমে বিরক্ত হইয়া উঠিল। যে অরণ্যে সবুজের বিন্দুমাত্র স্থান ছিল না, সেই অরণ্যে প্রতিবাদের ঘাস গজাইল, ঘাসফুল ফুটিল। লালবর্ণ ধারণ করা কিছু জন্তু পুণরায় সবুজ বর্ণ ধারণ করিল। শৃগাল তাহাদের অরণ্য হইতে বিতাড়ন করিল। সকলকে ধ্বংস করিয়া দিবার হুমকি দিল। কিন্তু তাহার রক্ষীগনই তাহার বিরোধিতা করিল। শেষে অরণ্যে লালবর্ণের আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট রহিল না, সবুজে ভরিয়া উঠিল।
বৃদ্ধ লালবর্ণ শৃগাল বৃথাই আস্ফালন করিতে লাগিল, অথচ নিজের ভুল বুঝিতে পারিল না।

আপনার মতামত জানান