বোঝার চেষ্টা বেশি জরুরি

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

শেষ অব্দি কলমটা ধরতেই হল।
কেননা ফেসবুক জনতা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ প্রো মোদি, আশার স্বপ্ন দেখছেন ভারত সম্পর্কে, কেউ কেউ ভয়াবহ অ্যান্টি মোদি, কাঁদছেন, হায় হায় করছেন। দেশ এবার গোল্লায় গেল।
দেশ উন্নতির চরমে পৌঁছবে না গোল্লায় যাবে? কোনটা? এই বিষয়ে আমার যে মত টুকরো টুকরো ভাবে আমি নানা স্ট্যাটাসে তুলে ধরছিলাম, তার সঙ্গে আরো কিছু কথা মিলিয়ে এই লেখাটা লিখলাম।
১। আমি এবার নোটায় ভোট দিয়েছিলাম। কেননা নোটায় ভোট দেওয়া এইবারই প্রথম সম্ভব হয়েছিল।
আজ আনন্দবাজার পড়ে জানলাম যেঃ
এ রাজ্যে এমনই সাড়া জাগিয়ে আত্মপ্রকাশ করল ইভিএম বাক্সের ‘নোটা’। মুখে মুখে যা ‘না-বোতাম।’ কোনও দলের প্রার্থীকে পছন্দ না হলে তা বোঝানোর জন্য এ বার লোকসভা ভোটে ‘নান অব দ্য অ্যাবাভ,’ সংক্ষেপে ‘নোটা’ বোতাম কমিশন যোগ করেছে। নয়া এই ধারণা রাজ্যবাসী কতটা গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে ধন্দ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিক মেরুকরণের রাজ্যে ‘না’ বোতাম টিপে ভোটদাতারা নিজের ভোটটা ‘নষ্ট’ করবেন কিনা, সে প্রশ্নও উঠছিল।
ফল বেরোতে স্পষ্ট হল, ‘নোটা’ বোতাম টিপেছেন যাঁরা, তাঁদের সংখ্যাটা খুব কম নয়। গোটা রাজ্যে ৫ লক্ষ ৮৩ হাজার। প্রতি আসনে গড়ে ১৩,৮৮৮। আরামবাগ, বালুরঘাট, বনগাঁ, বীরভূম, বোলপুর, দমদম, কলকাতার দুটি আসন-সহ বেশ কিছু আসনে বড় চারটি দলের প্রার্থীর পরেই ভোট পেয়েছে ‘নোটা।’ দু-এক জায়গায় প্রথম পাঁচের বাইরে ঠেলে দিয়েছেন খানিক জোরদার প্রার্থীরা, যেমন বসিরহাটে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী, বা দার্জিলিঙে মহেন্দ্র লামা। মথুরাপুরে বেশ কিছুক্ষণ এসইউসিআই প্রার্থী পূর্ণচন্দ্র নাইঞাকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল ‘নোটা’। পরে ৮৭৪ ভোটে শেষরক্ষা হয় পূর্ণবাবুর। পুরুলিয়াতে অবশ্য হাজার পাঁচেক ভোটে এসইউসিআইয়ের সুবর্ণ বণিককে পিছনে ফেলেছে ‘নোটা।’ কিন্তু সমাজবাদী পার্টি, বিএসপি, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা, ঝাড়খন্ড দিশম পার্টির মতো ছোট দলগুলোকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে। আম আদমি পার্টি তো ধারেকাছেই আসতে পারেনি।
আরো পড়লাম, ওই খবরেইঃ
দেশ জুড়ে না-ভোটে মত দিয়েছেন ১.১% ভোটার, যার অর্থ, ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ। সব চেয়ে বেশি না-ভোট পড়েছে পুদুচেরিতে, তার পর মেঘালয়ে। নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাতে না-ভোট পড়েছে ১.৮%। দেশজুড়ে তাঁকে নিয়ে যতই মাতামাতি হোক, মোদীর নিজের ভোটকেন্দ্র বডোদরায় কোনও প্রার্থীকেই না-পসন্দ করেন ১৮,০৫৩জন।

দেখুন, আমার আপনার না পসন্দে কারুর কিছু যায় আসেনা। কিন্তু ৬০ লক্ষ মানুষের মনে হয়েছে তাঁর কেন্দ্রে তাঁর ভোটের যোগ্য প্রার্থী নেই। এটা ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে খুব সুখের দিন কি? বোধ হয় নয়! ৬০ লক্ষ মানুষের পছন্দ দিয়ে একটা ভাল ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট মার্কেটিং করাই যায়। তাহলে , যোগ্য প্রার্থীর অভাব, এটাই বা প্রমাণ হবে না কেন নোটার ভোটের সংখ্যাটা দিয়ে?
২। আমি মোদি বিরোধী হতে পারি, কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই সার্বিক , সার্বজনীন ক্রন্দনে নেই। কেন নেই? একটা স্ট্যাটাসে লিখেছিলামঃ
“বয়স হচ্ছে বুঝতে পারছি। তোমাদের হায় হায়, মন নাহি দেয় সায়। একবার এক সাধুর গল্প পড়েছিলাম, আমার মত মন তাঁরও ছিল। চোর চুরি করবে, পলিটিশিয়ান পলিটিকস করবে, ব্যবসায়ী ব্যবসা করবে... এ নিয়ে হায় হায়ের কি আছে। নিজের কাজটা নিজে মন দিয়ে কর। সর্ষের মধ্যে ভূত আছে তাড়াও। নিজের মধ্যের পাপটা আগে নিজে দেখো! নিজেদের অক্ষমতা আর কদর্যতাটা বাইরে দেখলেই হায় হায় বাড়ে। উই ডিজার্ভ ওয়াট উই গেট।“

এটা ছিল একটা আত্মসমালোচনা, বা বলা ভাল গৌরবে বহুবচনের উল্টোদিকে গিয়ে অগৌরবে একবচন। আমি খারাপ, আমি অযোগ্য , এটার মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছিলাম আমরা , ভারতবাসীরাই অযোগ্য । আমি কাউকে ধমকি দিতে চাইনি। বা দিদিমণির মত বকিনি। একটা আত্ম অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলাম মাত্র।
এটা পড়ে কেউ কেউ তর্ক করেছেন, অনেকে সমর্থন করেছেন। আমি নিজে মনে করিনা এটা আমি খুব ভেগ বা অর্থহীন বা অ্যামবিগুয়াস কিছু লিখেছি। আমি লিখেছি যে আমাদের মত ভোটাররাই তো বেছে নিয়েছি মোদিকে। আমাদের দেশ ভারত ১৯৮৪ র পর এক ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে মোদিকে তথা বিজেপিকে। এটা ইতিহাস হয়েছে তো বটেই। এটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার দরকার আছে। কেননা, কেন এমন হল, এটা তলিয়ে দেখার দরকার।
১৯৮৪ র রায় ছিল, সিমপ্যাথি ওয়েভ। ইন্দিরা গান্ধির মৃত্যুর পরের দেশ শোকার্ত হয়ে ভোট দিয়েছিল রাজীবকে। এবার মানুষ তিতিবিরক্ত, অতিষ্ঠ এবং হতাশার শেষ তলানিতে গিয়ে ভোট দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টিকে।
এই ডেসপারেশনটাই ভয়ের। কেননা, মানুষ এখন খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরেছে, মনমোহনের নীরব শান্ত মূক বধির মূর্তির উল্টোদিকের চীৎকৃত, চওড়া ছাতি প্রদর্শনকারী, উল্লম্ফনশীল, নাট্য রঙ্গে পারদর্শী এক ব্যক্তিকে। উনিই আমাদের সেই লিডার। বলে চীৎকার চলছে।
আনন্দ, উদ্দীপনা আছে আগামী পাঁচ বছরে ভারতীয় অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়া নিয়ে। হু হু অরে বাজারে টাকা ঢুকবে, বিদেশি পুঁজি ঢুকবে, অনেক ইনফ্রাস্ট্রাকচার হবে... সবকিছুর দাম কমে যাবে।
যাঁরা ক্রন্দনরত, তাঁরা ভাবছেন, আরো কতগুলো দাঙ্গা হবে, আরো কত মুসলিম ঘর হারাবেন, নিধন হবেন... সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলবে।
দুটোর কোনটাই আসলে হবে না। কী হবে তা আমরা জানি না। দায়িত্ব নিচ্ছে যে সরকার সে দাঁত নখ বার করে হিন্দুত্ব দেখাবে, নাকি, প্রচন্ডভাবে বিদেশি সংস্থাদের কাছে দেশের কয়লা তেল লোহা আকরিক ও অন্যান্য জিনিসপত্র বেচে দেবে... দুটোই মনে হচ্ছে কিছুটা খুব খারাপ , আর অনেকটাই মাঝামাঝি খারাপ হবে। কেননা , ভাল হওয়াটা একটা ফ্রিক।
সারা পৃথিবীতে কোথাও তো ভাল কিছু হতে দেখছি না। টার্কিতে, মিশরে, আমেরিকায়...
আশায় বাঁচার চেষ্টা করছেন করুন । কেউ কেউ বলছেন, ভয়ানক খারাপ হল। তাঁদেরও বলি, ভোটব্যাংক পলিটিক্স আর ফেডারাল স্ট্রাকচার মিলিয়ে, আর একটা গুজরাট পুরো দেশটাকে করে দেওয়া যাবে না মনে হয়। তা ছাড়া ২০০২ তে মিডিয়ার এমন সর্বাতিশায়ী ভূমিকা দেখিনি তো আমরা। প্রতি কোণে ক্যামেরা ফিট করা আছে এখন। হয়ত সেভাবে সবাইকে অন্ধকারে রেখে কিছু করা যাবে না। হয়ত যাবে।
৩। ফেসবুকের এই ছোট্ট পরিসরে , সোশ্যাল মিডিয়ার ভেতরে বসে বসে আমরা যে পরিমাণ কথা খরচ করছি, সেই ফেসবুকের জগৎটাকে আসল জগতের মাইক্রো রূপ হিসেবে দেখে আপাতত আমার একটাই কথা মনে হচ্ছে, একটাই কষ্ট হচ্ছে।
২০০৬-০৭ এ যে বিভাজন দেখেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে, সেইরকম দাঁতনখ বের করা বিভাজন আবার যেন না দেখি আমাদের নিজেদের মধ্যে। আমরা আদার ব্যাপারি ছিলাম, জাহাজের দরাদরি নিয়ে এত বন্ধুবিচ্ছেদ আর সহ্য হচ্ছে না। এখন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলী আর সি পি এমের সঙ্গে আর একটা নতুন বিভাজিত শ্রেণী, নিউট্রাল, যারা নোটা-পন্থী। কৌশিক সেনের মত আমাদেরও কেউ কেউ নতুন কোন পার্টির অপেক্ষায় বসে আছি।
আম আদমি পার্টি আশা জাগিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি।
এখন কান্না নয়, ভাবনাচিন্তা, বোঝার চেষ্টা, দেখা, শোনা, জানা, এগুলো বেশি জরুরি নয় কি?

আপনার মতামত জানান