বাল নরেন্দ্র

অভিজিৎ কুণ্ডু

 

লোকসভা নির্বাচন ২০১৪-র আগে লেখা।

বাল নরেন্দ্র।
অনেকটা অমর চিত্রকথা কায়দায় ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রীপদ প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির কিশোরবেলার চিত্রকথা। গ্রাফিক জীবন কথা ‘বাল নরেন্দ্র’ একটি কমিক বই। অমর চিত্রকথা চার দশকেরও বেশী সময় ধরে জনমানসে হৃদয়গ্রাহ্য করে তুলেছে ভুলে যাওয়া অনেক রূপকথা। অনেক রঙিন আর সহজ করে সনাতন ভারতবর্ষের উচ্চবর্গীয় গৌরবগাথা সাম্প্রতিক জনমানসে গেঁথে দেওয়াই এর সাফল্য।

কমিক বই ‘বাল নরেন্দ্র’ রঙিন পাতায় পাতায় ফুটিয়ে তুলেছে বিজেপি প্রার্থীর আপাত সহজাত বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার। হিংস্র কুমির অধুষ্যিত জলাধার সাঁতরে পেরোনোর গল্পে পাই এক বীর্যকাহিনী। সহমর্মিতার গল্প তার পাশাপাশি – ঘুড়ির সুতোর জটিল জটে জড়িয়ে পড়া এক পায়রাকে মুক্তাকাশে উড়িয়ে দেওয়া। কর্তব্যপরায়ণ ‘বাল নরেন্দ্র’ হাতে হাত মিলিয়ে দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনে বাবা-মা’র সাহচর্যে। সমাজসেবা আর কর্ম উদ্যোক্তা নরেন্দ্র – উৎসবের জন্য জমানো টাকায় চা-এর স্টল খুলে ফেলা আর চা বিক্রির টাকায় বন্যাত্রাণ সংগঠন। সিদ্ধান্তগ্রহণে পটু প্রাপ্তমনস্ক ব্যক্তিত্ব – সুচিন্তিত এই নির্মিত চরিত্র ‘বাল নরেন্দ্র’ সাধারণ নির্বাচনের প্রাকমুহূর্তে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর আর পশ্চিম ভারতের নানান প্রান্তে।

জাতীয় নির্বাচনী প্রেক্ষিতে একটাই মুখ সারা ভারত ছড়িয়ে রয়েছে। খবরের কাগজে প্রথম পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে, বিলবোর্ডে, এফ এম রেডিও প্রচারে বা টেলিভিশন পর্দাজুড়ে। আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর প্রচারশৈলীর অভিমুখ – ‘দেশের সম্মান আমি মাটিতে মিশতে দেবো না’। সংঘকে ছাপিয়ে যাওয়া এই ‘আমিত্ব’ একমাত্র তুলনীয় সত্তরদশকের স্লোগানের সাথে – ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা’। ১৯৭১ এর চূড়ান্ত নির্বাচনী সাফল্যতে যে ব্যক্তিপূজোকে উদযাপন করেছিলো স্বাধীন ভারতবর্ষ, তার পুনরাবৃত্তি হওয়া হওয়া প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিলো। ব্যক্তিপূজো ভিত্তিক রাজনীতি যে স্বৈরতন্ত্রের আঁতুরঘর, তা প্রত্যক্ষ হয়েছিলো ১৯৭৫-৭৭ জরুরী অবস্থার কালো দিনগুলোতে। সে সময়ের প্রায় চার দশকের মাথায় আবার সেই একক উদ্ধারকর্তার প্রতিচ্ছবি জাতীয় রাজনীতিতে।

এই ব্যক্তি ব্র্যান্ডের উত্থানের পিছনে রয়েছে দৃষ্টান্তমূলক রাজনৈতিক ব্যক্তিনির্মানের এক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া কিন্তু একমাত্রিক নয়।
“... না মুখে কিসি নে ভেজা হ্যায়, না ম্যাঁয় ইহান আয়া হুঁ। মুঝে তো মা গঙ্গা নে বুলায়া হ্যাঁয়। অউর এক বালক য্যায়সে আপনা মাকা গোদ মেঁ ওয়াপাস আতা হ্যাঁয়... ওয়াইসে ম্যাঁয় অনুভূতি কর রহা হুঁ।”
(বারানসীতে নিজের প্রার্থীপদ মনোনয়নের পর নরেন্দ্র মোদী, ২০১৪)
লৌকিক, পার্থিব রাজনীতির ময়দানে এই অতিপার্থিব অনুপ্রবেশ যেন বিগত সময়ের বলিউডি সিনেমার সাফল্য সূত্র তুল্য। অতিবাস্তব ফ্যানটাসিই আমাদের দৈনন্দিন ব্যর্থতার কষ্ট-ঘাম মুছিয়ে দিতে পারে। জনপ্রিয় ও সফল চরিত্র আমাদের লোকপ্রিয় সংস্কৃতিতে কিন্তু কোনো রোল মডেল নয়, শহীদও নয়। সে ভীষণ নায়কোচিত। দুষ্টের, দুর্নীতি, অনচার দমনের জন্য আমাদের কল্পকাহিনীতে উদয় হয় এক এক অতি মানব/মানবী। তাই যেন শুনি “মা গঙ্গা নে বুলায়া”।

ঐশ্বরিক এক অমোঘ আহ্বানে অধিষ্ঠিত কোনো চরিত্র একবিংশ শতাব্দীর বস্তুগত রাজনীতির তুরুপের তাস হতে পারে না। অতিপ্রাকৃত শক্তিধারী কোনো দুর্জ্ঞেয় চরিত্র ফ্যানটাসি বা কল্পিত জগতের নায়ক। অথচ তার ব্যতিক্রমী কৃতিত্বের পরিসর কিন্তু এই মর্ত্যলোকে। এর পাশাপাশি ম্যাজিকোত্তর মোহযুক্ত জগতের দৃষ্টান্তমূলক চরিত্র হলো রোল মডেল। অতিবাস্তব উদ্ভূত নয়, রোল মডেলের উৎস হলো জাগতিক জীবনচর্চা সম্পর্কিত জনমানস। জনগোষ্ঠীর রুচি, পছন্দ-অপছন্দের মূর্তপ্রকাশ এই রোল মডেল।

আরোপিত নয়, তাই রোলমডেল হলো কর্মদক্ষ কৃতিমানুষ। দৈবিক নায়করূপের সাথে জাগতিক রোল মডেলের অতিসূক্ষ্ম মিশেল হলো সাম্প্রতিকতম নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তি ব্র্যাণ্ড। সামান্য চা-বিক্রেতা থেকে এই কল্প-চরিত্রের উত্থান হয় বিকাশপুরুষে, আর পূর্ণতা পায় মা গঙ্গার নির্দিষ্ট পূণ্যজনে।

বাস্তব আর অতিবাস্তব, একে অপরকে সমৃদ্ধ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা দেখতে পেতে পারি ঘরের খুব কাছেই। মহানগরী কলকাতার দক্ষিণপ্রান্তে সন্তোষপুর বটতলার মোড়ে। চমৎকার আর্টওয়ার্ক সম্বলিত বিরাট এক রাজনৈতিক পোস্টার। এই নির্বাচনী প্রেক্ষাপটেই।
“ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত / আমরা আনিবো রাঙা প্রভাত” –
উদ্ধৃতির নিচেই সেই কালজয়ী সিনেমা মাদার ইন্ডিয়ার আইকনিক ইমেজ। ১৯৫৭ সালের মেহবুব খানের সিনেমার পোস্টারে ছিলো কৃষকরমণী রাধার কাঁধে মস্ত এক লাঙ্গল। নার্গিসের পরিবর্তে আজকের পোস্টারে অগ্রনী মুখটি তৃণমূল নেত্রী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

দেশ মাতৃসম – এই রূপকসৃষ্টি ‘মাদার ইন্ডিয়া’ আখ্যানের অবদান। মাতৃরূপেন নারীই একাধারে সহনশীল দুঃখভোগী, সংরক্ষক, বিনাশকারী আর স্রষ্টা। পুরাণসমৃদ্ধ এই প্রতিমূর্তি হিন্দুনারীর এক সাংস্কৃতিক নির্দেশক। এই ইমেজ বা প্রতিমূর্তি নির্মাণ শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিহ্নিত করে এক অনন্য স্বকীয় চরিত্রে। এর ঠিক বিপরীত এক নির্মাণ আমরা পাই আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে। শহর কলকাতায় এক উজ্জ্বল দেওয়াল লিখনের আখ্যান ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিচয়’ উদ্ধৃতঃ
“মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক”। উদ্ধৃতির সাথেই নেত্রীর আবক্ষ ছবি তৈরী করেছিলো এক সর্বজনগ্রাহ্য, হৃদয়গ্রাহ্য রাজনৈতিক বচন। এই ব্যক্তি নির্মাণের প্রকল্পে ছিলো স্বতস্ফূর্ত এক জনমন্থন সংগঠিত করা। দ্রষ্টব্য, যে রাজনৈতিক ব্যক্তি নির্মান এক স্বতস্ফূর্ত জনমন্থন তৈরী করে, সেই আবার আশ্রয় নিতে চায় অতি-উক্তি নির্মিত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ইমেজে। এই সহাবস্থান যেন অনিবার্য – আদর্শ এক সকল-দুর্দশা সংহারী অতিমানবিক রাজনৈতিক ব্যক্তি নির্মাণে।

প্রাক-স্বাধীনতা থেকে সাম্প্রতিককাল – আধুনিক ইতিহাসের বিভিন্নক্ষণেই ভারতীয় সমাজ/রাষ্ট্রজীবনে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এক একজন মহাত্মা বা দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যক্তির উত্থান। এই উত্থান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরেও লক্ষণীয়। কেন একইরকম মহাত্মা নির্মাণ বা উত্থান আমরা দেখতে পাই না উন্নততর গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়?

এর উত্তর সন্ধানে ফিরে দেখতে হবে আমাদের দেশের বহু আকাঙ্ক্ষিত, চর্চিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকল্পকে । ঐতিহাসিক কারণেই পশ্চিমী উদার-গণতান্ত্রিক ধাঁচে এদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে কোনো উদার রাষ্ট্র বা সমাজ ছিলো মা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্বস্বর্ত হলো মানুষে মানুষে স্বাধীন সম্পর্ক, সমাজ আর রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীন প্রতিদ্বন্দিতামূলক সম্পর্ক, সমার আর বাজারের মধ্যে ন্যায্য প্রতিদ্বন্দিতামূলক সম্পর্ক। এগুলোই প্রাথমিক ধাপ।

ঔপনিবেশ বিরোধী এক ভিন্নতর প্রক্রিয়ায় এদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আমাদানী আর অনুশীলন। জনজীবনে পারস্পরিক সম্পর্কে বিভিন্ন সামন্তচিহ্ন, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ, জাত ইত্যাদির মধ্যস্থতা পরিবর্তিত হলেও চলমান বাস্তব। ইতিহাসের ভিন্নপথে এগিয়ে আসা আমাদের মতন সমাজে এসব প্রতিহত করে পারতো সৃষ্টিশীল নাগরিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ। প্রতিষ্ঠানিক অনুপস্থিতি বা অক্ষমতাই গণতন্ত্রের পরিপন্থী। যে সমাজে গণতন্ত্র অনুন্নত বা ব্যর্থ, সে সমাজেই সময়ের এক এক বাঁকে উঠে আসে দৃষ্টান্তমূলক রাজনৈতিক/সামাজিক ব্যক্তিত্ব।

...     ...     ...

দিল্লী আর তার চারপাশে নির্বাচন সমীক্ষায় শুনতে পেয়েছি খুব সরল মতপ্রকাশ। ‘বিজেপি কোনো অংশেই কম নয় দুর্নীতি বা অপশাসনের প্রশ্নে। দল হিসেবে পছন্দ করি না, শুধু ভরসা নরেন্দ্র মোদি। পারলে, উনি-ই পারবেন’। কলকাতার আশপাশেও কান পাতলে শুনতে পাচ্ছি – ‘ওটা কোনও দলই নয়, শুধু মোচ্ছব। দিদির লড়াই কিন্তু জেনুইন, টোটাল’।

আপনার মতামত জানান