মোদী-মডেলে যাঁরা আস্থা রাখলেন...

সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী

 

মোদী-মডেলে যাঁরা আস্থা রাখলেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি জরুরী কথাঃ
মোদী-জমানায় গুজরাতের ‘উন্নয়ন’! মানব উন্নয়নের তথ্য কি বলছে?


২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রধানমন্ত্রী পদ-প্রার্থী তথা দেশের বর্তমান ভাবী প্রধানমন্ত্রী শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র মোদী তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে যে বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা হল তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব-কালে গুজরাতে যে ‘উন্নয়ন-বন্যা’ বয়েছে; তা সর্বভারতীয়স্তরে এক নিদর্শনস্বরূপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মোদী গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন ২০০১ সালে। নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে তাঁর নিন্দুকেরা বলে থাকেন, তিনি হিন্দুত্ববাদের পূজারী এবং চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সে বিষয় অবশ্যই বিতর্কিত, তাই সে বিতর্ককে উস্কে না দিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ২০০১ সাল থেকে ২০১৩-১৪ - এই সময়কালকে যদি মোদী-জমানা বলে অভিহিত করা যায়, তবে এই সময়কালে গুজরাতের ‘উন্নয়ন’-এর দিকে আমরা কিঞ্চিৎ নজর রাখব। অর্থনীতি’র সঙ্গে যুক্ত নন, এমন মানুষজনের পক্ষে সহজবোধ্য মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index: HDI, যার মান ‘০’ এবং ‘১’ এর মধ্যে) নিয়ে কথা বলা যাক।
যোজনা কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হওয়া জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন (তথ্য প্রকাশঃ ২০০২, ২০১১) অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে গুজরাতের HDI-এর মান ০.৪৩১, ১৯৯৯-২০০০ সালে সেই মান বৃদ্ধি পেয়ে হয় ০.৪৬৬, ২০০১ সালের (তৎকালীন আগাম) হিসেব অনুযায়ী সেই মান ০.৪৭৯ এবং ২০০৭-২০০৮ সালে গুজরাতের HDI-এর মান আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ০.৫২৭। মর্যাদাক্রম অনুযায়ী গুজরাত ১৯৯৯-২০০০’এর দশম স্থান থেকে ২০০৭-০৮’এ এগারো-তম স্থানে নেমে গেলেও ‘নিম্ন’ মানব-উন্নয়ন তালিকাভুক্ত থেকে ‘মাঝারি’ মানব-উন্নয়নের তালিকায় উন্নীত হয় ২০০৮ সালেই। এখন লক্ষণীয় যে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৭-০৮’এর মধ্যে কেন্দ্রশাসিত দিল্লী ছাড়া অন্যান্য সকল রাজ্যই HDI-এর মানের ভিত্তিতে ‘উন্নীত’ হয়েছে। কেবলমাত্র মর্যাদাক্রম অনুযায়ী রাজ্যগুলির অবস্থান বিচার করলে যে ফলাফল পাওয়া যায়, তার থেকে এই ‘উন্নীত’ হওয়ার চিত্রটি খানিক অন্যরকম। দুই সময়কালের HDI-এর মান তুলনা করলে দেখা যায় যে যেখানে ‘উন্নীত’ হওয়ার হার জাতীয়স্তরে ২১ শতাংশ(%), সেখানে গুজরাতের ‘উন্নীত’ হওয়ার হার মাত্র ১৩%। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে উত্তরাখণ্ডের সাফল্য সবচেয়ে সমীহযোগ্য (৪৫%), এমনকি পশ্চিমবঙ্গের সাফল্যও গুজরাতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভাল (১৭%)। যদি ‘উন্নীত’ হওয়ার হার অনুযায়ী মর্যাদাক্রম তৈরি করা হয়, তবে সাফল্যের নিরীখে গুজরাতের স্থান ১৭-তম (ঝাড়খণ্ড, আসাম, ওড়িশা, কেরালা, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, বিহারেরও নীচে)। অতএব, মোদী-জমানায় মানব উন্নয়নের কিছুটা আঁচ পাওয়া গেল।
এবার মানব উন্নয়ন সূচকের বিভিন্ন উপাদান, যা নিয়ে এই সূচক তৈরি হয়– অর্থাৎ আয়-সূচক (Income Index), শিক্ষা-সূচক (Education Index) এবং স্বাস্থ্য-সূচক (Health Index)-এর আলোচনায় আসা যাক। যোজনা কমিশনের তরফে যে আয়-সূচক ব্যবহৃত হয়, তা মুদ্রাস্ফীতি ও অসাম্য-নিয়ন্ত্রিত মাথাপিছু ভোগব্যয়ের উপর ভিত্তি করে নির্ণীত। শিক্ষা-সূচক তৈরি করা হয় স্বাক্ষরতা ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনার গড় বছরকে ব্যবহার করে। অপরদিকে, স্বাস্থ্য-সূচক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় জন্মের সময় জীবন-প্রত্যাশার তথ্য। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৭-০৮’এর মধ্যে আয়-সূচকে ‘উন্নীত’ হওয়ার তথ্যে যদি নজর দেওয়া যায়, তবে দেখা যাবে জাতীয় আয়-সূচকের ‘উন্নীত’ হওয়ার হার (প্রায় ২১%) মানব উন্নয়ন সূচকের ‘উন্নীত’ হওয়ার জাতীয় হারের সমান। এই বিভাগে গুজরাতের মর্যাদাক্রম ১৪ এবং জাতীয় হারের তুলনায় রাজ্যের আয়-বৃদ্ধির হার কম, অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও গুজরাত অন্যান্য রাজ্যগুলির তুলনায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে। জাতীয় মানব উন্নয়ন সূচকের উন্নতিতে শিক্ষান্নয়নের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতীয়স্তরে শিক্ষা-সূচকের ‘উন্নীত’ হওয়ার হার প্রায় ২৮%। শিক্ষার ক্ষেত্রে গুজরাতের অবস্থা শোচনীয়, ‘উন্নীত’ হওয়ার হার মাত্র ১৩%। যোজনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গুজরাত দেশের মধ্যে ২০-তম স্থানে আছে। যদি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ- স্বাক্ষরতার দিকে সূক্ষ্ম নজর দেওয়া যায়, তবে জাতীয় আদমসুমারি’র তথ্য (তথ্য প্রকাশঃ ২০০১, ২০১১) অনুযায়ী গুজরাতের সাফল্য আশাপ্রদ নয়। স্বাক্ষরতার হার ১০% বৃদ্ধি পেলেও মর্যাদাক্রম অনুযায়ী গুজরাত ১৬-তম থেকে ১৮-তম স্থানে নেমে গেছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য-বিভাগের বেহাল দশায় গুজরাতের ‘উন্নীত’ হওয়ার হার জাতীয় হারের প্রায় সমান (মাত্র ১৩%) এবং এই সূচকের মর্যাদাক্রমানুসারে গুজরাতের স্থান ১২-তম।
যোজনা কমিশন এবং অন্যান্য সরকারী প্রতিবেদনের কথা শ্রীযুক্ত মোদীজী তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের অঙ্গ হিসেবে বরাবরই ব্যবহার করেছেন। অথচ সেই যোজনা কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়, মোদী জমানায় গুজরাত কতটা উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়েছে? এই বিশ্লেষণ না করলে গুজরাত কিংবা অন্য কোনও রাজ্যেরই প্রকৃত মানব উন্নয়নের দিশা পাওয়া অসম্ভব। ইতিহাস মোদী জমানার গুজরাত দেখেছে, নিকট ভবিষ্যতে মোদী জমানার ভারতবর্ষও দেখতে চলেছে। কেবল সময়ের অপেক্ষা!


তথ্য সুত্রঃ
১. যোজনা কমিশন, জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০০১ (২০০২)।
২. যোজনা কমিশন, ভারতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১১- সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পথে (২০১১), অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
৩. ভারতীয় আদমসুমারি (২০০১, ২০১১), রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনার কার্যালয়।

আপনার মতামত জানান